somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ডিম (লেখক অ্যান্ডি উইয়ার, অনুবাদ আমার)

৩০ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



মৃত্যুর সময় তুমি বাসায় ফেরার পথেই ছিলে। ঘটনাটা ঘটেছিল গাড়ি দুর্ঘটনার কারণে। এখানে উল্লেখ করার মতো তেমন কিছু নেই, তবে ভয়ানক দুর্ঘটনা ছিল, সন্দেহ নেই! তুমি রেখে গেছ স্ত্রী ও দুই সন্তানকে। তোমার মৃত্যু বলতে গেলে বেদনাহীনই ছিল। তোমাকে বাঁচানোর অনেক চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু তা কাজে আসেনি একদম। তুমি একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিলে বলে চোখের পলকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলে।

আর এর পরই আমার সাথে তোমার দেখা হলো।

-কী-কী হয়েছে? তুমি বললে।

-আমি কোথায়?

-তুমি মারা গেছ। নির্লিপ্তভাবেই বললাম আমি। ওখানে ধেয়ে আসছিল একটা ট্রাক আর তা পিছলে...

-অ্যা! বললে তুমি। আমি মারা গেছি?

-হ্যাঁ এটা নিয়ে কষ্ট পেও না। সবাইকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয়।

চারদিকে তাকালে তুমি। সবখানেই দেখতে পেলে স্রেফ শূন্যতা, যদি শূন্যতাকে দেখা যায় আরকি!

-এটা কোন জায়গা? জিজ্ঞেস করলে তুমি। এটাই কি মৃত্যুর পরের জীবন?

-বলতে পারো। জবাব দিলাম।

-আপনি কি ঈশ্বর? চেঁচিয়ে জানতে চাইলে তুমি।

-হ্যাঁ, আমিই ঈশ্বর। বললাম।

-আমার বাচ্চারা! আমার স্ত্রী! বললে তুমি।

- ওরা কেমন আছে?

-মৃত্যুর সময় তুমি বাসায় ফিরছিলে।

-ওরা কি ভালো থাকবে?

-তেমনটাই আমি হতে দেখতে চাই, বললাম। -তুমি কেবলই মারা গেছ, আর তোমার উদ্বেগ হচ্ছে পরিবার নিয়েই। এটা তো সত্যিই দারুণ ব্যাপার!

তুমি আমার দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়েছিলে। তোমার চোখে আমাকে মোটেও ঈশ্বরের মতো লাগছিল না। আমি যেন স্রেফ একজন সাধারণ মানুষ। কিংবা হয়তো একজন নারী। কোনো অস্পষ্ট কর্তৃত্বপূর্ণ চরিত্র তার বেশি কিছু নয়। সর্বশক্তিমান স্রষ্টার চেয়ে বরং কোনো গ্রামার স্কুলের শিক্ষকের মতোই বেশি লাগছিল আমাকে।

-চিন্তা করো না, আমি বললাম। ওরা ভালোই থাকবে। তোমার সন্তানরা তোমাকে সবদিক থেকে নিখুঁত মানুষ হিসেবেই মনে রাখবে। তোমার প্রতি বিরক্তি জন্মানোর মতো সময় ওরা পায়নি। তোমার স্ত্রী বাইরে থেকে কাঁদবে ঠিকই, কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটু স্বস্তিও পাবে। সত্যি বলতে, তোমাদের দাম্পত্য তো ভেঙেই পড়ছিল। তবে এটুকু সান্ত্বনা পেতে পারো, স্বস্তি পাওয়ার জন্য সে ভীষণ অপরাধবোধেও ভুগবে।

-ওহ! তুমি বললে। তাহলে এখন কী হবে? আমি কি স্বর্গে যাব, নাকি নরকে বা এ রকম কিছু?

- কোনোটাতেই না। আমি বললাম। তোমার পুনর্জন্ম হবে।

- আহা, তুমি বললে। তাহলে হিন্দুরাই ঠিক ছিল।

- সব ধর্মই তাদের নিজস্ব উপায়ে ঠিক। আমি বললাম। -এসো, আমার সঙ্গে হাঁটো।

তুমি আমার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করলে। আমরা শূন্যতার ভিতর দিয়ে এগিয়ে চললাম।

- আমরা কোথায় যাচ্ছি?

- বিশেষ কোথাও না, বললাম। -কথা বলতে বলতে হাঁটতে ভালো লাগে, এই আর কী।

- তাহলে পুরো ব্যাপারটার মানে কী? তুমি জিজ্ঞেস করলে। আমি যখন আবার জন্ম নেব, তখন তো একেবারে খালি কাগজের পাতার মতো হয়ে যাব, তাই না? একটা শিশুর মতো! তাহলে এই জীবনের সব অভিজ্ঞতা, আমি যা কিছু করেছি, এসবের কোনো মূল্যই থাকবে না।

- একদম তা নয়! আমি বললাম। তোমার ভিতরে তোমার সব পূর্বজন্মের জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা রয়ে গেছে। শুধু এই মুহূর্তে তুমি সেগুলো মনে করতে পারছ না।

আমি হাঁটা থামালাম এবং তোমার কাঁধে হাত রাখলাম।

- তোমার আত্মা তোমার কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি মহিমান্বিত, সুন্দর এবং বিশাল। মানুষের মন তোমার প্রকৃত সত্তার সামান্য একটা অংশই ধারণ করতে পারে। এটা যেন এক গ্লাস পানিতে আঙুল ডুবিয়ে বোঝার চেষ্টা করা যে পানি গরম না ঠান্ডা। তুমি নিজের এক ক্ষুদ্র অংশ সেই পাত্রে ঢুকিয়ে দাও, আর যখন সেটা আবার ফিরিয়ে আনো, তখন সেই অংশের সমস্ত অভিজ্ঞতা তোমার সঙ্গে চলে আসে। গত আটচল্লিশ বছর তুমি একটা মানুষের দেহে আটকে ছিলে। তাই এখনো পুরোপুরি প্রসারিত হয়ে তোমার বিশাল চেতনাটার বাকি অংশ অনুভব করতে পারছ না। আমরা যদি এখানে অনেকক্ষণ থাকতাম, তাহলে ধীরে ধীরে তুমি সব কিছুই মনে করতে শুরু করতে। কিন্তু প্রত্যেক জীবনের মাঝখানে সেটা করার কোনো মানে হয় না।

-তাহলে আমি কতবার পুনর্জন্ম নিয়েছি?

-বলতে পারো অসংখ্যবার। অগণিত, অগণিত বার। আর নানা ধরনের জীবনে। আমি বললাম।

-এইবার তুমি জন্ম নেবে ৫৪০ খ্রিস্টাব্দের এক চীনা কৃষক পরিবারের মেয়ে হয়ে।

-এক মিনিট। কী বলছেন আপনি? তুমি তোতলাতে তোতলাতে বললে। আপনি আমাকে অতীতে পাঠাচ্ছেন?

-আসলে, কৌশলগত দিক থেকে দেখলে, হ্যাঁ, আমি বললাম। সময়, যেভাবে তোমরা তাকে বোঝো সেটা শুধু তোমাদের মহাবিশ্বেই বিদ্যমান। আমি যেখান থেকে এসেছি, সেখানে ব্যাপারগুলো ভিন্ন।

-আপনি যেখান থেকে এসেছেন?

-অবশ্যই, আমি ব্যাখ্যা করলাম। আমি কোথাও থেকে এসেছি। অন্য কোথাও থেকে। আর আমার মতো আরও অনেকেই আছে। আমি জানি তুমি জানতে চাইবে জায়গাটা কেমন। কিন্তু সত্যি বলতে, তুমি সেটা বুঝতে পারবে না।

- ওহ! তুমি বললে, একটু হতাশ হয়ে। কিন্তু দাঁড়ান। যদি আমি সময়ের বিভিন্ন স্থানে পুনর্জন্ম নিতে থাকি, তাহলে কোনো একসময় তো আমি নিজেকেই দেখতে পেতে পারি।

- অবশ্যই। এমনটা সব সময়ই ঘটে। আর যেহেতু প্রতিটি জীবন কেবল নিজের সময়কাল সম্পর্কেই সচেতন থাকে, তাই তোমরা বুঝতেই পারো না যে ঘটনাটা ঘটছে।

- তাহলে এই সব কিছুর উদ্দেশ্য কী?

- সত্যিই? আমি জিজ্ঞেস করলাম। সত্যি বলছ? তুমি আমার কাছে জীবনের মানে জানতে চাইছ? এটা একটু বেশিই গতানুগতিক হয়ে গেল না?

-কিন্তু এটা তো যথার্থ প্রশ্ন, তুমি জিদ ধরে বললে।

আমি তোমার চোখের দিকে তাকালাম।

-জীবনের অর্থ বা আমি কেন এই পুরো মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছি, সব কিছুর উদ্দেশ্যই হলো তোমাদের পরিণত হয়ে ওঠা।

-মানে মানবজাতির? তুমি বললে। আপনি চান আমরা পরিণত হই?

-না, শুধু তুমি। আমি এই পুরো মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছি তোমার জন্য। প্রতিটি নতুন জীবনের সঙ্গে সঙ্গে তুমি বেড়ে উঠছ, পরিণত হচ্ছ, আর আরও বৃহৎ ও মহৎ বুদ্ধিমত্তায় রূপ নিচ্ছ।

-শুধু আমি? তাহলে অন্য সবাই?

-আর কেউ নেই, আমি বললাম। এই মহাবিশ্বে শুধু তুমি আর আমি আছি।

তুমি শূন্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলে।

-কিন্তু পৃথিবীর এত মানুষ?

-সবাই তুমি। তোমারই ভিন্ন ভিন্ন অবতার।

-দাঁড়ান, আমি-ই সবাই?

-এবার বুঝতে শুরু করেছ। বললাম, তোমার পিঠে অভিনন্দনের চাপড় মেরে।

-আমিই সেই প্রতিটি মানুষ, যে কখনো বেঁচে ছিল?

-এবং যে ভবিষ্যতে কখনো বাঁচবে, সেও।

-আমি আব্রাহাম লিংকন?

-এবং তুমি জন উইলক্স বুথও, আমি যোগ করলাম।

-আমি হিটলার? তুমি আতঙ্কিত গলায় বললে।

-এবং সেই লাখো মানুষও, যাদের সে হত্যা করেছিল?

-আমি যিশু?

-এবং যারা তাকে অনুসরণ করেছে, তারাও।

তুমি চুপ করে গেলে।

-প্রতিবার তুমি কাউকে কষ্ট দিয়েছ। আমি বললাম,

-তুমি আসলে নিজেকেই কষ্ট দিয়েছ। তোমার প্রতিটি দয়ার কাজ তুমি নিজের প্রতিই করেছ। মানুষের অনুভব করা প্রতিটি সুখ আর দুঃখ, সবই তুমি অনুভব করেছ, অথবা করবে।

তুমি দীর্ঘ সময় নিয়ে চিন্তা করলে।

- কেন? তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করলে।

- এসব কেন করছেন?

-কারণ একদিন তুমি আমার মতো হয়ে উঠবে। কারণ এটাই তোমার প্রকৃত সত্তা। তুমি আমারই জাতের একজন। তুমি আমার সন্তান।

- ওহ! অবিশ্বাসের সাথে বলে উঠলে তুমি। মানে আমিও একজন ঈশ্বর?

- না। এখনো না। তুমি এখনো ভ্রুণ। তুমি এখনো বেড়ে উঠছ। সময়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি মানবজীবন যেদিন তুমি আবার বাঁচিয়ে তুলবে, সেদিন তুমি জন্ম নেওয়ার মতো যথেষ্ট বড় হয়ে উঠবে।

- তাহলে পুরো মহাবিশ্বটা, তুমি বললে, এটা আসলে শুধু...

- স্রেফ একটা ডিম বলতে পারো, আমি উত্তর দিলাম। আর এখন সময় হয়েছে তোমার পরবর্তী জীবনে এগিয়ে যাওয়ার।

তারপর আমি তোমাকে তোমার পথে পাঠিয়ে দিলাম।

(**লেখাটি এরইমধ্যে গত শুক্রবারে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশিত)


সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৯
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কেন লিখলাম? ইচ্ছে হলো তাই। কেন ইচ্ছে হলো?

লিখেছেন সুব্রত দত্ত, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৯

একজন নিহিলিস্ট হিসেবে যা-ই লিখি তা-ই হয়তো অর্থহীন হয়ে ওঠে। কিন্তু যা ‘অর্থহীন’ তা কি কখনো কিছু ‘হয়ে ওঠা’? যেহেতু জন্মেছি এবং মৃত্যুর জন্য নিরন্তন অপেক্ষা- সেই অপেক্ষাকে কিছুটা স্বস্তিদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০২

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০২



আমাদের চারপাশে অনেক কিছু আছে।
যা আমরা দেখতে পাই না। ব্যাকটেরিযয়া, ভাইরাস, ডার্ক ম্যাটার, অণু ও পরমাণুর কথা বলছি না। আমি বলছি, মৃত মানুষের কথা। প্রতিদিন বিশ্বে গড়ে দেড়... ...বাকিটুকু পড়ুন

কিছু কিছু স্মৃতি ভুলার মত না।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১৯

আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি ২০১১ সালে। ঐ পরীক্ষার এক মাসের কথা এখনো মনে পড়ে। ১ম পরীক্ষার সময় খাতা পাওয়া, রোল নাম্বার লেখা, প্রশ্ন হাতে পাওয়া এগুলো এখনো মনে পড়ে। মাজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রধানমন্ত্রী বিদেশে, আইনও কি সঙ্গে নিয়ে গেছেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০৬


প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরে গেলেই দেশ অশান্ত হয়ে ওঠে । সালাহউদ্দিন আহমেদের মতো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে কেন? প্রধানমন্ত্রী দেশের বাইরে থাকলেই কিছু নেতাকর্মী যেন নিজেদের দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ আগস্টের সেই ভিডিও, কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন এবং ইতিহাসের নির্মম পরিণতি

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৪৪


৫ আগস্টের সেই ভিডিও, কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন এবং ইতিহাসের নির্মম পরিণতি

ক্ষমতার পালাবদল হয়, কিন্তু ইতিহাসের কাঠগড়া কখনো খালি থাকে না
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নাটকীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×