somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ডেভিস ফল-( ভ্রমন কাহিনী)- ১ম পর্ব

২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৪ দুপুর ১২:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ডেভিস ফল
গত রাতে আচমকা ঠান্ডা লেগে গেল! ঠান্ডা অবশ্য এমনিই লাগে ‘আচমকা’ -বলে কয়ে নিশ্চই নয়, তবে আচমকা শব্দটা ব্যাবহার করার প্রয়োজনীয়তা কি? এই এমনিতেই - শব্দটা না হলে বাক্যটা কেন যেন অসম্পুর্ন মনে হচ্ছিল ।
সকালে ঘুম থেকে উঠতেই শুরু হল আনলিমিটেড হাঁচি , বোনাস হিসেবে নাক দিয়ে পানি পড়া আর খুচরো মাথা ব্যাথাতো আছেই - সেই সাথে গলার মধ্যে শুকনো কফের আনাগোনা সবচেয়ে বিরক্তিকর। এমন অবস্থায় কিচ্ছু ভাল্লাগেনা -ভালকথা শুনলেও রাগ আসে ।
পরশু ঈদ -চারিদিকে উৎসবের রঙ , না চাইলেও যার ছিটে-ফোটা ছোয়া এসে লেগেেেছ আমার মনেও। অন্য বারের থেকে এবারের ঈদটা আমার জন্য একটু ব্যতিক্রম ধর্মী ,কেননা ঈদটা কাটাব দেশের বাইরে -খুবসম্ভব নিরস ভাবে । আমার এক বন্ধুর ইচ্ছে এবারের ঈদটা দেশের বাইরে করবে। তার তালে নেচেছিল আমি ছাড়া আরো দুজন কিন্তু সুযোগ বুঝে সময় মত অভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে দুজনই কেটে পরেছে । বলির সঙ্গী হিসেবে রইলাম আমি । যদিও সেই বন্ধুর প্ররোচনা থেকে আমার ইচ্ছেটাই বেশী ছিল নইলে কেন?
যদিও মাঝখানে বেশ কিছুদিন গাই গুই করেছি , অনেক যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছি ঈদের একদিন পরে গেলে কিইবা এমন ক্ষতি হবে ? আত্মীয় পরিজন বন্ধু ছেড়ে বিদেশ বিভুইয়ে ঈদের মজা পানসে হতে বাধ্য ।
আমার সবযুক্তিই নির্দ্বিধায় মেনে নিয়ে বিগড়ে যাওয়া ছাগলের মত হাত পা খামটি মেরে ঘাড়ের রগ ফুলিয়েবলেছে ‘ তুমি না হয় ঈদের পরে আস । আমি ওখানে গিয়ে অপেক্ষা করব ।’
এরপরে বোঝানো মানে কথার অপচয় । এতদুর পথ একা একা যাওয়া ভীষন বোরিং তাছাড়া একটু ভিন্নধর্মী ঈদের আমেজ পেতে আমিও অবশেষে রাজী হলাম।
ভিসা টিকেট সব রেডি । ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে ভিসা সংগ্রহ বাসের টিকেট কেটে আনা থেকে শুরু করে সবই সে করেছে আমি শুধু পাসপোর্ট দিয়েই খালাস ।
গতরাত ফোন করে বলল , বাস ছাড়বে ন’টায় আমি যেন সাড়ে আটটার মধ্যে কাউন্টারে পৌছে যাই ।
আমাদের গন্তব্য স্থল পথে ঢাকা -দার্জিলিং-কাঠমুন্ডু - পোখরা হয়ে ফের ঢাকা। মোট দশদিনের ভ্রমন । টাকা পয়সায় কুলালে আরো দুয়েকদিন বাড়তে পারে ।
শেষ মুহুর্তে ঠান্ডাটা বাধালাম ,তারপরে যাচ্ছি দার্জিলিং আর কাঠমুন্ডু -হিমালয়ের বেল্টে অবস্থিত এসব পাহাড়ী অঞ্চলে ঢাকার থেকে শীত যে অনেক বেশী হবে এটা ওদেশের জলবায়ু সন্মন্ধে কোন ধারনা না থাকলেও বোঝা যায় । আগে থেকেই খবর নিয়ে জেনেছি দার্জিলিংয়ে নাকি এখন ৪-৬ ডিগ্রী ।
যা থাকে কপালে ! সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার দিকে ব্যাগ গুছিয়ে দুখানা পিরিটন খেয়ে রওনা দিলাম ।যাবার পথ ভাবলাম একটু আড্ডায় ঢু মেরে যাই ,যদিও এই সাত সকালে কারো আসার সম্ভবনা নেই -তবুও সময় যখন আছে একটু দেখে যেতে দোষ কি । গিয়ে দেখি অলরেডি দুজন মেম্বার হাজির ! ওদের জিম্মায় ব্যাগখানা রেখে কিছু শুকনো খাবার আর দিন দশেকের খোরাক হিসেবে এক কার্টুন সিগারেট কিনে নিলাম । ভারত আর নেপালে নাকি এ-মানের সিগারেট মেলে কম- পাওয়া গেলেও দাম সাংঘাতিক । আমার জানামতে বেনসন সিগারেটের দাম শুধুমাত্র ডিউটি ফ্রি সপ গুলো বাদে বাংলাদেশেই সবচেয়ে কম (খুচরো)। চড়া সেলস ট্যাক্স দিতে গিয়ে ওদের দাম অনেক বেশী পরে যায়।
শুকনো খাবার নিলাম পথে কোন বিপদে পড়লে কাজে দেবে ভেবে। গাঢ় কুয়াশা, কোন এ্যাকসিডেন্ট
কিংবা আচমকা রাত্রিকালীন হরতালে রাস্তায় কয়েক ঘন্টার জন্য আটকে গেলে বা রাত জাগা বিস্বাদ মুখে স্বাদ ফিরিয়ে আনতে আর হজমতন্ত্রের অতিরিক্ত চাহিদার যোগান দিতে এগুলো কাজে লাগবে ।
বন্ধু দুজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে স্কুটারে চেপে গাবতলী নির্দিষ্ট হানিফের কাউন্টারে গিয়ে দেখি আমার সেই সহযাত্রী বন্ধু এখনো আসেনি । সামান্য উদ্বিগ্ন মুখে ‘রেস্টরুম’ নামের কয়েকখানা চেয়ার পাতা আগোছালো নোংরা একটা রুমে বসে বসে সর্দির সাথে যুদ্ধ করছি,আর মাঝে মধ্যে ঘড়ি দেখে দেখে সল্প আলোকিত পথের দিকে চেয়ে তার আগমনের প্রতিক্ষা করছি ।
অবশেষে সে এল ।
আমাকে দেখেই তার সেই ট্রিপিক্যাল হাসি হেসে কুশল জিজ্ঞেস করল । আমার সর্দির কথা জানাতেই ব্যাগ থেকে একখানা ট্যাবলেট বের করে বলল,- খেয়ে ফেল দুই ঘন্টার মধ্যে ঝরঝরা হয়ে যাবে ’।
ট্যাবলেট খেতেই সে আমার পাসপোর্ট আর নতুন ছাপানো কার্ডের বান্ডিল এগিয়ে দিল । ছাপানো কার্ডের জন্য ধন্যবাদ দিয়ে পাসপোর্ট খুলে ভিসাগুলো দেখে নিলাম ।
বাস ছাড়তে মিনিট ত্রিশেক দেরী হল । বাসে উঠার মুখে পাতলা একখানা তোয়ালে কিনে নিলাম জানালার ফাক গলে ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা থেকে নাক মুখকে রক্ষার জন্য । পূর্ব অভিজ্ঞতায় বলে শীতকালে নন এসি বাসে ভ্রমন করলে এমন একটা তোয়ালে বা মোটা নরম কাপড় খন্ড ( শতভাগ সুতির হলে ভাল হয় -যেন নাকে মুখে বাধলে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া যায়) রাখা জরুরী।
ঢাকা থেকে বুড়িমারীর উদ্দেশ্যে এখান থেকে প্রতিদিন রাতে একখানাই বাস ছাড়ে । সারা রাতের জার্নি -বাসা থেকে স্পোর্টস ট্রাওজার আর পুল ওভার পরে বের হয়েছি। এমন ঢিলে ঢালা নরম পোষাক দুরের ভ্রমনের জন্য বেশ আরামদায়ক ।
বাস ছাড়তেই নরম সিটে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজলাম -উদ্দেশ্য একটু জিরিয়ে নেয়া, ঘুম যে আমার আসবেনা সে জানা ! তা তিনখানা সর্দির ট্যাবলেট খেলেই কি তবুও দু/এক ঘন্টার ঘুম যদি মুফতে মিলে যায় এই আশা করতে দোষ কি! পাশে বসা আমার বন্ধু ঘূমানোর প্রস্তুতি নেয়ার মুখে আমাকে বলল, তাকে যেন যমুনা ব্রিজ আসলে ডেকে দেই।
হেড লাইটের তীব্র আলোতে জমাট অন্ধকারকে এফোড় ওফোড় করে কুয়াশায ভেজা শীতল বাতাসে শিষ কেটে তীব্র গতিতে বাস ছুটে চলছে । ঔষুধের বিক্রিয়ায় মাঝে মাঝে তন্দ্রার মত আসছিল, তবে নিতান্ত সামান্য সময়ের জন্য - বিপরীত দিক থেকে চলন্ত বাস ট্রাকের হাইড্রলিক হর্নের কর্কশ শব্দে পরক্ষনেই সে তন্দ্রা টুটে বিশ্রী একটা অনুভুতি হচ্ছিল সারা শরীর জুড়ে - এমনি করেই চলছিলাম সারাটা পথ, ঘুমের সাথে লুকোচুরি খেলা।
মধ্যরাত পার হতেই বাসের উইনশিল্ড দিয়ে দুর থেকে নজরে কাস্তের মত বাকা আলো ঝলমলে যমুনা সেতু।
পাশে বসে থাকা বন্ধু ঘুমন্ত মাহমুদকে কনুই দিয়ে মৃদু ধাক্কা দিয়েই সে টলমল চোখে সপ্রশ্ন দৃস্টিতে আমার দিকে তাকাতেই আমি তাকে সামনে ইশারা করলাম । প্রায় চার কিলোমিটার লম্বা অনিন্দ্য সুন্দর এ সেতুখানা নিয়ে আমরা একটুখানি গর্ব করতেই পারি । সল্প আলোতে অনেক নীচে নিস্তরঙ্গ গভীর কালো পানির দিকে চেয়ে যেন মনে হয় প্রমত্তা যমুনা তার বিশাল খোলা বুকখানা চিতিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে । ভাঙ্গাচোরা ফেরির বিরক্তিকর ভট ভট শব্দ সেই সাথে পোড়া ডিজেলের গন্ধ আর দুষন এখন তেমনি করে তার শান্তিভঙ্গ করে না ।
সিরাজগঞ্জ ঘাট পেরিয়ে প্রায় ঘন্টা খানেক চলার পরে হাইওয়ে রেস্টুরেন্ট ‘ফুড ভ্যালিতে’ গাড়ি ভিড়ল ।
বিশাল বড় রেস্টুরেন্ট ফাস্টফুড থেকে শুরু গুরুভোজনের সব ব্যাবস্থাই এখানে আছে। সেই সাথে পান বিড়ি চকোলেট মায় শাড়ি চুড়িও মিলবে। দু য়েক রাত থেকে যেতে চাইলে বিলাস বহুল কটেজের বন্দোবস্তও আছে। দিনের থেকে রাতের ভিড়টাই একটু বেশী, কেননা এসব রুটের বেশীরভাগ নাইটকোচ গুলো যাওয়া আসার পথে হাইওয়ে রেস্টুরেন্ট গুলোতে একবার দাড়াবেই । কেননা বহুদুর ভ্রমনের পথে ক্লান্ত ক্ষুধার্ত যাত্রীদের থাকা খাওয়া কেনা কাটা থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক কাজকর্ম সারার জন্য এর থেকে ভাল ডেরা আর মিলবে কোথায় । এতগুলো খদ্দেরের বিনিময়ে হাইওয়ে রেস্টুরেন্টের মালিকরা উৎকোচ(!) হিসেবে ড্রাইভার সুপারভাইজারদের বিনে পয়সায় ভুরিভোজন করায় , আবার চাইলে সাথে কয়েক প্যাকেট খাবারও ধরিয়ে দেয়।
আমাদের প্রচন্ড ক্ষুধা ছিল , ভুনা গরুর মাংস আর পরোটাও যথেস্ট স্বুসাদু ছিল বলে মনে হয় কিন্তু কেন যেন দুজনের কেউই ভালমত খেতে পারলাম না । তবে খাবার শেষে ঘন দুধের কফিটা খেলাম খুব আয়েস করে ।
বাস যাত্রীরা এখানে নামার সময় সুপারভাইজার বার বার অনুরোধ করে বলেছে আধাঘন্টার বেশী যেন কেউ দেরী না করে । কিন্তু আধাঘন্টা অতিক্রান্ত হলে দেখা গেল যাত্রীরা সব দাড়িয়ে আছে বাসের কাছে কিন্তু সুপারভাইজার আর ড্রাইভারের দেখা নেই । আরো মিনিট বিশেক বাদে ড্রাইভার আর সুপারভাইজারের দেখা মেলল ।
ভোর সাড়ে চারটের দিকে আমরা গিয়ে পৌছুলাম লালমনিরহাটে । সেখানকার এক নোংরা হোটেলের ততধিক নোংরা কাপে বাশপাতা পচা চা খেয়ে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ফের বাসে গিয়ে বসলাম । এতটা পথ এসেছিলাম মোটামুটি নির্বিঘ্নে কিন্তু বাস লালমনির হাট ছাড়তেই শুরু হল বিপত্তি।গাঢ় কুয়াশা যেন ব্লাক হোলের মত আমাদের চারপাশ ঘিরে ফেলল, হেডলাইটের তীব্র আলোতেও কয়েক ফুট দুরের রাস্তুা যেন দেখতে কস্ট হয়। ড্রাইভার যথাসম্ভব স্পিড কন্ট্রোল করে গভীর একাগ্রতায় গাড়ি চালাতে বাধ্য হচ্ছিল -তবুও সে যে রাস্তা দেখে যে গাড়ি চালাচ্ছে না এব্যাপারে আমি নিঃসন্দিহান । সে রাস্তার দুপাশের গাছের সারির আবছা কালো মুর্তির দিকে নজর রেখে ভাগ্যের হাতে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে ,বিধাতার নাম জপতে জপতে পূর্ব অভিজ্ঞতাকে পুজি করে করে সামনে এগুচ্ছিল ।
আমিও ‘যা হয় হবে ’ নিজের দুঃচিন্তাগ্রস্ত মনকে এমনতর ড্যাম কেয়ার ভাব দেখিয়ে চোখ বুজলাম । ঘুমিয়েই গিয়েছিলাম হয়তোবা - হঠাৎ প্রচন্ড ঝাকুনীতে ধড়মড় করে উঠে বসে দেখি বাস দাড়িয়ে আছে । রাস্তার মাঝে বাস দাড়াতেই পারে কিন্তু এমন ভয়ংকর ঝাকুনি কেন ? পর্দা উচিয়ে আশেপাশে গভীর পর্যবেক্ষন করে দেখি আমরা রেল লাইনের উপর দাড়িয়ে আছি । পথের মাঝে এমন একটা তীক্ষ্ণ বাকের কথা হয়তো ড্রাইভার সাহের হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন -তাই তিনি সোজা রাস্তা ভেবে রেল লাইন বরাবর চালিয়েছেন। তবে সৌভাগ্য যে বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি । মিনিট দুয়েক পরে ফের বাস তার নির্দিস্ট পথে চলতে শুরু করল।
বুড়িমারী পৌছেছিলাম সাতটা পনেরতে -মাত্র দুঘন্টা বিলম্বে !
শেষের সারা পথটুকু গাড়িতে কোরআন তেলওয়াৎ বেজেছে । ভোরের স্নিগ্ধ শীতল মিস্টি হাওয়ার সাথে তেলওয়াতের সুর ভিন্ন আমেজ এনেছিল ।
বুড়িমাড়ি তক আমাদের সাথে ছিল দুটো ফ্যামিলি মিলে জনা দশেক যাত্রী। এরা সবাই ভারতগামী।
ন’টার আগে বর্ডার খুলবে না । সারা রাত্রি ভ্রমনের পর এই দীর্ঘ ক্লান্তিকর সময়টা সাচ্ছন্দে কাটানোর জন্য ট্রান্সপোর্ট কোম্পানীগুলো বিশ্রামাগারের ব্যাবস্থা করেছে -সেখানে ঘুমানোরও বন্দোবস্ত আছে । হানিফ এন্টারপ্রাইজের বিশ্রামাগারটাই যথাসম্ভব সবচেয়ে আনকোরা ও নিচুমানের। এদের এমন হাল কেন জানতে চাইলে একজন বলল, এ রুটে ওরা নাকি সপ্তা দুয়েক বাস ছেড়েছে- তাই এখনো গুছিয়ে উঠতে পারেনি।
বাথরুমের জন্য ওদের অন্য কোম্পানীর সরনাপন্ন হতে হচ্ছিল । অগত্যা আমাদেরও ফ্রেস হওয়ার প্রয়োজনে সেখানেই যেতে হল । তবে এদের দৈন্যতা ভাল ব্যাবহার দিয়ে ঢাকতে চেস্টা করছিল ।
আটার দিকে আহাদ নামে এদেরই কেউ একজন এসে আমাদেরকে জিজ্হেস করল , পাসপোর্ট দিব কিনা?
কেন? জানতে চাইলে প্রতিউত্তরে জানাল - মাত্র পঞ্চাশ টাকার বিনিময়ে এরা নাকি বর্ডার খোলার আগেই বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনের সব ঝামেলা মিটিয়ে রাখে । বর্ডার খুললেই যাতে যত দ্রুত ওপারে পৌছে যেতে পারি।
আমি আমার সহযাত্রী বন্ধু মাহমুদের কাছে জানতে চাইলাম-কি করব? তার কাছে জানতে চাওয়ার কারন সে এর আগেও এ রুটে কয়েকবার গেছে - সেহেতু দারুন অভিজ্ঞ সন্দেহ নেই । কিন্তু কথার প্রতিউত্তরে তার চাহনি আর বিব্রত অবস্থা দেখে বুঝলাম - সবকিছু ভুলে গেছে । অগত্যা সরনাপন্ন হলাম পূর্ব অভিজ্ঞ অন্য যাত্রীর । ভদ্রলোক স-পরিবারে গ্যাংটক যাচ্ছেন । তিনি নিশ্চিন্তে ওদের হাতে পাসপোর্ট দিতে বললেন -প্রতারনার সম্ভাবনা নেই ।
দালালটাকে পাসপোর্ট বুঝিয়ে দিয়ে হাতমুখ ধুয়ে শুকনো খাবারের প্যাকেট খুলতেই কেয়ারটেকার এসে চা দিয়ে গেল । বিনে পয়সায় মিললেও এত ছোট কাপ যে দু চুমুকেই শেষ হয়ে যায় ।
নয়টার কিছু আগে সেই দালালর এক সাঙ্গাত এসে ব্যাগ গুছিয়ে দ্রুত তার সাথে যেতে বলল । জানাল, এখুনি নাকি বর্ডার খুলে যাবে । তাড়াহুড়ো করে বাইরে বেরিয়ে দেখি একটা ভ্যান দাড়িয়ে আছে , দালাল ছোকড়া আমাদেরকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ব্যাগদুটো হাত থেকে একপ্রকার ছিনিয়ে নিয়ে,সেই ভ্যানের উপর রেখে বসতে ইশারা করে তার সাইকেল নিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেল । তবে যাবার আগে মাহমুদ বুদ্ধি করে কাউন্টারে শ’পাচেক টাকা জমা রেখে রিসিট নিয়ে গেল যাতে ফেরার পথে টাকা ফুরিয়ে গেলে বিপদে না পড়ি।
এখান থেকে সীমান্তের দুরত্ব বড়জোড় শ’তিনেক মিটার হবে - এতটুকু পথ হেটেই যাওয়া যায় তবুও ভ্যানে চেপেই যেতে হল । ভাড়া দশটাকা।
সীমান্তের নোম্যান্স ল্যান্ডের মুখে টিনে ছাওয়া চারদিকে ইটের গাথুনি দেয়া ছোট্ট একটা ঘরে একজন বসে আর বাইরে দুজন বি ডি আর জওয়ান পাসপোর্ট চেক করছে । সেখানে গিয়ে দাড়াতেই ত্রৈয়ীর একজন যার হাতে ধরা অনেকগুলো পাসপোর্ট ,আমাদের নাম জিজ্ঞেস করে ,সেগুলো একে একে মেলে ধরে আমাদের কোনটা জিজ্ঞেস করল । সবগুলো দেখলাম কোনটাই আমাদের নয় । সপ্রশ্ন দৃস্টিতে দালালের দিকে চাইতেই সে অপরাধীর ভঙ্গীতে কাচুমাচু হয়ে বলল , স্যরি সার মনে হয় আপনাদেরটা হয় নাই । আমাদেরকে পাশেই টিন দিয়ে ঘেরা শান বাধানো একটা বসার জায়গা দেখিয়ে বলল , আপনেরা ওইখানে বসেন আমি এক্ষুনি এক দৌড়ে নিয়ে আসতেছি ।
কি আর করার বিগড়ে যাওয়া মেজাজ নিয়ে নিঃশব্দে ওখানে গিয়ে বসলাম । আমাদের সামনে দিয়ে একে একে সবাই বর্ডার ক্রস করে চলে যায় কিন্তু আমাদের পাসপোর্ট আসেনা। এর মাঝ অবশ্য ওদের পক্ষের দু- একজন এসে ক্ষমা চেয়ে সান্তনা দিয়ে গেছে এই এক্ষুনি হবে বলে । সেখানে নাকি সাংঘাতিক ভীড় । কেমন করে যেন আমাদের পাসপোর্ট সবার নীচে চলে গেছে !
দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হলেও আমরা বুঝলাম যে এরা এসব কাজে আনাড়ি । অন্য দালালরা পরিচিতি অবস্থান ও ক্ষমতার জোরে এদেরকে পিছে ফেলে দেয় । ভয় হল সবার শেষে না যেতে হয় এই ভেবে । মনে হয় তাইই হল, ঘন্টা দেড়েক পরে যখন পাসপোর্ট হাতে পেলাম ততক্ষনে ওপারে বিশাল কিউ নজরে এল আর এপারে একদম ফাঁকা।
বাংলাদেশ রাইফেলসের জওয়ানদ্বয়কে পাসপোর্ট দেখিয়ে ভারী ব্যাগখানা কাধে করে নো ম্যান্স ল্যান্ডের শ’দুয়েক মিটার প্রায় দৌড়ে পার হয়ে ওপারের লাইনে দাড়ালাম । দালালরাও আমাদের সাথে সাথে আসছিল - ওদের এপার ওপার করতে ভিসা পাসপোর্ট লাগে না !
স্থল পথে এই আমার প্রথম ভ্রমন । এটা যে এত ক্লান্তিকর এমন ভয়ঙ্কর বিরক্তিকর তা আমার জানা ছিলনা। বিশেষ করে বুড়িমারীর ওপারে ভারতের চ্যাংরাবান্দা ইমিগ্রেশনে । এরি পাসপোর্ট লাগেজ চেক করে মধ্যযুগীয় কায়দায় । কম্পিউটার তো দুরের কথা একটা মেটাল ডিটেক্টর পর্যন্ত নাই । দেহ চেক করে হাত দিয়ে থাবড়ে থাবড়ে । গাছের নিচে বেঞ্চি পেতে কোন রকম ভাঙ্গা বেড়ার ছাওনি দিয়ে ব্যাগ ও পাসপোর্ট চেকের প্রথম পর্বটা সারছে । পাক সেনা অফিসারদের মত চেহারার প্রচন্ড থমথমে রাগী মুখে সিভিল ড্রেসে এক ভদ্রলোক পাসপোর্ট চেক করছে । তার চাহনী ও ব্যাবহারে মনে হচ্ছে সবাই সন্ত্রাসী। মাহমুদের কাছে ক্যামেরা থাকায় ওকে বেশ কিছুক্ষন জেরা করল ( ক্যামেরা বা অন্য কোন ব্যাবহার্য ইলেকট্রনিক্স আইটেম থাকলে পাসপোর্টে এন্ট্রি করতে হয় -যেগুলো ভ্রমনকারী ফিরতি পথে সঙ্গে নিয়ে আসতে বাধ্য) ।
আমরা ভারতের স্থল ট্রানজিট ডাবল এন্ট্রি ভিসা নিয়েছি মাত্র তিনদিনের -প্রতিবার । আগে জানতাম না- পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার পর দেখি এই অবস্থা । আমাদের ইচ্ছে ছিল ভারতেই বেড়াব দিন পাচেক - কিন্তু ভিসা মাত্র তিনদিনের, মানে দু’রাত্রির বেশী থাকলেই অবৈধ। কি মহা সমস্য !
কালো মত যে লোকটা ব্যাগ খুলে খুলে চেক করছিল, তাকে দেখে কেন যেন সহৃদ মনে হল । মওকা পেয়ে ভাঙ্গা হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলাম এখান থেকে ভিসার মেয়াদ বাড়ানো সম্ভব কিনা । সে খুব করে চেস্টা করল একটা যুৎসই উত্তর দিতে কিন্তু আমার কেন যেন মনঃপুত হলনা - ভাবলাম ; ইমিগ্রেশনের মুল অফিসারকেই জিজ্ঞেস করব ।
ওখান থেকে মেঠো পথ ধরে কিছুটা হেটে গেলেই চারিদিকে চাটাই -টিনের ছাওয়া একটা ঘরে দু তিনটা টেবিল গাদাগাদি করে সাজয়ে রেখে জনা তিনেক অফিসার বসে বিশাল বিশাল লেজার খাতা নিয়ে কলম পিষে যাত্রীর নাম ধাম জন্ম সবকিছু এন্ট্রি করে, সিল-ছাপ্পর দিয়ে ভ্রমনকারীর সাক্ষর নিয়ে -ভারতে ঢোকার অনুমোদন করছেন । ফিরতি পথের যাত্রীদেরও এখানে রিপোর্ট করতে হয় ।সে এক দীর্ঘ ও বিরক্তিকর কর্মযজ্ঞ ।ওই ঘরটার বাকি খালি জায়গাটুকুতে কয়েকটা বাশ ও কাঠের বেঞ্চি পাতা - যা এতগুলো যাত্রীর জন্য নেহায়েত অকিঞ্চিতকর । ভিড় ঠেলে ভিতরে পাসপোর্ট জমা দিয়ে বাইরে এসে দাড়ালাম । মনে হয় জনা পঞ্চাশেকের পিছনে পড়েছি - যেভাবে কাজ এগুচ্ছে তাতে সারাদিনও লেগে যেতে পারে !
অগত্যা এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে সিগারেট টানছিলাম আর দুজনে পালা করে ভিড় ঠেলে কিংবা জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি ঝুকি মেরে দেখে আসছিলাম ভিতরের অবস্থা । অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হয়না - সিগারেট খেতে খেতে মুখ তেতো আর হাটতে হাটতে পা ব্যাথা হয়ে গেল । *
প্রখ্যাত অভিনেতা বর্তমানে একটা প্রডাকশন হাউসের কর্নধার মামুন ভাইকে (মামুনুর রশিদ) দেখলাম(মাতাল)সাথে বেশ কয়েকজন সাঙ্গপাঙ্গ । হয়তো কোন নতুন প্রডাকশনের উদ্দেশ্যে এখানে আসা । এগিয়ে গিয়ে সালাম দিয়ে পরিচয় দিলাম - আমার মত অধমকে তার মনে না থাকারই কথা । দুয়েকবার তার অফিসে দেখা হয়েছে - কিন্তু সেটা উল্লেখ করার মত কিছুই নয় ।
অবশেষে আমাদের ডাক এল - দীর্ঘ আড়াই ঘন্টা বাদে ! সিগনেচার করতে গিয়ে অফিসারকে জিজ্ঞেস করলাম আমাদের ভিসার মেয়াদের ব্যাপারে - তিনিও দেখি এব্যাপারে জানেন অনেক কম । একবার বললেন সম্ভব না-আবার বলেন, হবে তবে এখান থেকে না কলকাতায় যেতে হবে- পাশ থেকে একজন বললেন দার্জিলিংয়েও হতে পারে । তিনি ডিবি না ভিবি অফিসে যেন যোগযোগ করতে বললেন । কিন্তু ততক্ষনে আমরা যা বোঝার বুঝে গেছি।
পঞ্চাশটাকা লিগ্যাল উৎকোচ দিয়ে আমার পাসপোর্টখানা ফিরিয়ে নিয়ে ওখান থেকে বের হয়ে আবার উল্টো দিকে কিছুদুর এগিয়ে ফের নতুন লাইনে দাড়ালাম । তবে অল্প ক‘জনের পিছনে । এখানে ফের ব্যাগ চেক হল ! জানতে চাইল কত ডলার এনেছি ? দেখালাম । ক্যামেরাটা আবার চেক করে দেহ সার্চ করে সিল মেরে অল্পক্ষনেই ছেড়ে দিল। ভারতে ঢুকতে আর বের হতে গিয়ে পার্সপোর্টে এত বেশী সিল খেতে হয় যে ফালতু দু-চার পাতা নষ্ট হয় !
অবশেষে অনুমতি মিলল তিনদিনের জন্য ভারত ভুমি দেখার।ওদেশের মাটিতে পা রেখেই ঘড়ির কাটাটা আধঘন্টা পিছিয়ে নিলাম। ওখান থেকে মেঠো পথে কিছুদুর হেটে এলেই একটা বাজারের মত জায়গা । সেখানে মাহমুদের পূর্ব পরিচিত মানি চেঞ্জার অভিজিতের সাথে পরিচয় হল।
ছোটখাট গড়নের উজ্জল শ্যামবর্নের ভদ্রলোককে বেশ সল্পবাক ও ব্যাক্তিত্ববান মনে হল। একখানা টেবিল ও খানতিনেক চেয়ার পেতে ছোট্ট একটা ঘরে বসে তিনি ব্যাবসা চালান । ভদ্রলোক আমাদের চা দিয়ে আপ্যায়িত করলেন ।
দেশী টাকা ও ডলারের বিনিময়ে ভারতীয় রুপি নিলাম । সেখানেই বসে ট্যাক্সিওলাদের সাথে দরাদরিটা সেরে নিলাম। ৩০০ রুপীতে ট্যাক্সি ঠিক করে আরো দুজন সহযাত্রী খুজতেই- অভিজিৎ ঠিক করে দিল। বাংলাদেশী, তারাও এখানে বেড়াতে এসেছেন।
জলপাইগুড়ি ও শিলিগুরির মধ্যবর্তী হাইওয়ের নির্জনতার সুযোগে নাকি অনেক ড্রাইভারই যাত্রীদের সবকিছু কেড়ে নিয়ে পথে ছেড়ে দেয় । অভিজিৎকে এসব বলতে সে জানাল- এসব ড্রইভার তার বেশ পরিচিত -কোন অঘটন ঘটার সম্ভবনা নেই । তবুও অতিরিক্ত সতর্কতার জন্য ডাইভারকে সাবধান করে দিলাম সে যেন ইঞ্জিন বিগড়ে গেছে কিংবা তেল নেই বলে মাঝ রাস্তায় থামনোর বাহানা না করে। ড্রাইভার বুঝতে পেরে বলল ‘ কোন ভয় নেই দাদা - একদম ঝা চকচক গাড়ি , ক’দিন আগেই ইঞ্জিন ডাউন দিয়েছি -চোখের পলকে শিলিগুড়ি পৌছে দিব ।
মনে মনে বললাম ‘হা বুঝেছি কেমন তোমার ঝা চকচকে গাড়ি । পুরানো মডেলের এ্যাম্বাসেডর দেখিয়ে বলবে -লাইক মার্সিডিজ।
গাড়ি কোথায় জানতে চাইলে বলল ‘ এখানে নাকি গাড়ি আনার নিয়ম নেই -ভ্যান চালকরা এখানে গাড়ি দাড়াতে দেয়না ।অনেক দুরে গাড়ি থেকে নেমে এখানে ভ্যানে করে আসতে হয় । যেতেও হবে সেভাবে । তবে আমরা চারজনে অতিরিক্ত বিশ রুপি দিলে সে গাড়িটা অনেক কাছে নিয়ে আসতে পারে । কি আর করার দিলাম টাকা ।
অভিজিতের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সামনে এগুলাম । যা ভেবেছি তাই, পুরোনো এক এ্যাম্বাসেডর ।
ভদ্রলোক ড্রাইভ কেমন করেন জানিনা তবে তার ধর্মভক্তি প্রবল বলে মনে হচ্ছে । উইনশিল্ডে লেখা ‘মা মহামায়া’ । গাড়ির ভিতরে ব্যাকভিউ মিররের কাছে ‘মনসা, দুর্গা, কালী আর গোবিন্দর থ্রি--আর সাইজের ছবি বেশ ভক্তি করে টাঙ্গানো আছে। মেকি বেলি ফুলের মালা দিয়ে সে গুলো আবার ঘিরেও রেখেছেন।
বাইরে থেকে দেখতে ভাঙা-চোরা হলেও গাড়ির গতি আছে বেশ । রাস্তাও ফাঁকা । ট্রাইভারকে অনুরোধ করলাম গান ছাড়তে -যদি ক্যাসেট প্লেয়ার থেকে থাকে । আমাদের অনুরোধে ড্রইভারটি বেশ মজা পেল বলে মনে হয় - উচ্ছসিত কন্ঠে জানাল , তার কাছে নাকি দারুন দারুন কিছু বাংলা গানের সংগ্রহ আছে - এবং তার দৃঢ় বিশ্বাস এ-গান আমরা কখনো শুনিনি ।
অঞ্জন আর সুমনের গান আছে ? নাম শুনেই সে মুখ বাকালো ! অগত্যা ঠিক আছে তোমার গানই শোনাও?
ড্যাসবোর্ডের নিভৃত এক কোনে লুকানো যে যন্ত্রটাতে সে ক্যাসেট ঢোকালো তার জীর্ন ভগ্ন চেহারা দেখে আমার গান শোনার আশা উবে গেল। যে গান সে শোনাল তা আমাদের আগে বহুবার শোনা , তবুও ভাল বস্তাপচা নয়। ক্যাসেট প্লেয়ারের শব্দ বাড়াতে কমাতে গিয়ে তার গাড়ি থামাতে হল বেশ কয়েকবার!
কুচবিহারের চ্যাংরাবান্দা ছাড়িয়ে ব্রষ্মপুর ,ময়নাগুড়ি হয়ে তিস্তা নদী পেরিয়ে গাড়ি যখন জলপাই গুড়িতে পৌছুল তখন ভালকরে নড়ে চড়ে বসলাম । ইচ্ছে-দুর থেকে শহরটাকে যতটুকু দেখা যায় দেখে নেয়। সমরেশ মজুমদারের গল্প ও উপন্যাসে এই শহরটার কথা এত বেশী পড়েছি যে আমার স্মৃতি পটে জলপাইগুড়ি শহরের একটা ছবি ভিন্ন আঙ্গিকে আঁকা হয়ে আছে । কৈশরে তিস্তার পারে প্রথম সিগারেটের আস্বাদ আর কাশবনে লুকিয়ে খাটি আবলুস কাঠের রঙ্গে রাঙ্গানো শক্তপোক্ত শারিরিক গঠনের আদি মদেশিয়া রমনীদের নিভাবরন শরির দেখে রোমাঞ্চিত হওয়া - তারপর তাদের তাড়া খেয়ে পালানো । আমিও একলাফে যৌবনকে অনেক পিছনে ফেলে কৌশরের প্রারম্ভের ওঁদের সেই রোমাঞ্চেরে স্বাদ আস্বাদন করে নিলাম খানিকটা ।
শুকনো তিস্তার বেহাল অবস্থা দেখে হতাশ খানিকটা হয়েছিলাম । সমরেশ বাবুর ‘কথা হয়ে গেছে’ উপন্যাসে যেই ধরলা নদীর যে বিখ্যাত স্বুসাদু মাছের কথা বলেছেন, এত কাছে এসে তার স্বাদ নিতে আমারও ইচ্ছে করেছিল -কিন্তু স্রোতহীন শীর্ন ‘ধরলা’র পানির গভীরতা দেখে আমার সন্দেহ হল -এখানে আদৌ কোন মাছ আছে কিনা ?
যথাসম্ভব তিস্তা নদী’র -ব্রিজ পেরুনোর আগে আমাদের গাড়ি টোল দিতে থেমেছিল । টোলর হার নেহায়েৎ কম, মাত্র চার রুপী ! আমাদের টাকা দেয়া-নেয়ার ফাকে সুযোগ বুঝে দ্রুত বেগে পাশ কেটে বেরিয়ে গেল একটা যাত্রী বোঝাই মাইক্রো ! দুয়েকজন হৈ চৈ করে উঠলেও ততক্ষনে সে হাওয়া । আমাদের গাড়ির ড্রাইভার ব্রিজটা পেরিয়েই গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল । তার এই আচমকা গতি বাড়ানোর কারন তখন না বুঝলেও একটু পরে মালুম হল Ñ একটু বাদেই দৃষ্টিগোচর হল টোল ফাকি দেয়া সেই মাইক্রাবাসের, ওটাকে ওভারটেক করতে করতে সেই ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে আমাদেরজন ইচ্ছেমত খিস্তি ঝাড়ল। বুঝতে বাকি রইলনা আমাদের সামনে এঁর আঁ-তে লেগেছে । হাজার হলেও আমরা বিদেশী !
আমাদের অন্য দু-সহযাত্রীর সাথে পরিচয় হয়েছে প্রথম দফায় । দুজনের সম্পর্ক চাচা ভাতিজা - কিন্তু নাম শুনে খটকা লাগল । দুজনের ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম ! কিন্তু এরকম সম্পর্ক কেমনে হয়?
আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম কারনটা? জানলাম তারা পাড়াতো চাচা - ভাতিজা।
একই এলাকায় থাকতে থাকতে ধর্মের গন্ডি পেরিয়ে অনেক সময় এমন সম্পর্কে বাধা পরে কেউ কেউ! হিন্দু চাচা পুরোনো ঢাকার ব্যাবসায়ী, ভারতে তার প্রচুর আত্মীয় স্বজন আছেন সেই সুত্রেই মাঝে মধ্যে এখানে আসা আর মুসলমান ভাতিজা এদেশে এল প্রথমবার । উদ্দেশ্য চাচার হাত ধরে আশেপাশের কয়েকটা দেশ ঘুরে -পাসপোর্টখানা একটু ভারি করে ইউরোপের ঢোকার চান্স নেয়া। এরকম ধান্দা বাংলাদেশের অনেকেই করে! তবে সন্দেহ হয়েছিল চাচা আদম ব্যাবসায়ী কিনা?
সোওয়া দুইঘন্টা জার্নি শেষে ব্যাস্ত মহানন্দা ব্রিজ পেরিয়ে আমরা শিলিগুরি শহরে পৌছুলাম । মাহমুদের নির্দেশ মত গাড়ি গিয়ে থামল পাঁচতারা নয় পাচতলা ‘হোটেল রাজদরবারে’ ট্যাক্সি ড্রাইভারের ভাড়া চুকিয়ে বাকি দু-জনের সাথে ঠিকানা বিনিময় করে হাত মিলিয়ে বিদায় নিয়ে আমরা দুজন হোটেলের রিসিপসনে না গিয়ে অন্যপাশ দিয়ে সরাসরি ডাইনিং হলে ঢুকে পরলাম । ‘রাজদরবার’ মাহমুদের পূর্ব পরিচিত-আগেরবারও এসে সে এ হোটেলে থেকেছে । তখন অবশ্য অন্যজনের রেফারেন্সে ।
রেস্টুরেন্টটা একদম ফাকা । এককোনে দুজন কর্মচারী নীল ইউনিফর্ম পরে দাড়িয়ে আছে খদ্দের কিংবা রুম সার্ভিসের অপেক্ষায় । কাউন্টারের ওপাশে বয়স্ক এক ভদ্রলোক মাথা নিচু করে বসে কি যেন হিসেব কষছেন। বড় বড় কাঁচাপাকা গোঁফ আর ধবধবে একমাথা চুল তার চেহারায় অন্যরকম সৌম্য ভাব ও অভিজাত্য এনে দিয়েছে । আমাদের পদশব্দে উনি শুধু একবার চোখ তুলে তাকিয়েই হিসেবে মন দিলেন।
হোটেল কর্মচারী এগিয়ে এসে হাসিমুখে আমাদের হিন্দিতে সম্ভাষন করলে আমরাও প্রউিত্তর সে ভাষাতেই দিলাম । ছেলেটা প্রথমে ভেবেছিল যে,আমরা কলকাতা থেকে এসেছি -কিন্তু, যখন শুনল আমরা বাংলাদেশী তখনই আচমকা তার ব্যাবহার আমুল পাল্টে গেল । মনে হল যেন তার কোন ধনবান আত্মীয় এসেছে । কোথায় বসাবে কি খাওয়াবে এই নিয়ে শুরু হল হুলস্থুল । কখন আসলাম ? কতদিন থাকব? কোথায় কোথায় বেড়াতে যাব? ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় অতি ভদ্রতার সাথে এরকম টুকরো টুকরো প্রশ্ন করে আমাদের সাথে খাতির জমিয়ে নিচ্ছিল ।
হাত মুখ ধুয়ে বেশ সময় নিয়ে মেন্যু ঘেটে সব্জি ভাত ডাল আর ঝাল চিকেনের অর্ডার দিলাম। বেশ ক্ষুধার্ত - চা বিস্কুট ছাড়া সকাল থেকে পেটে কিছু পরেনি। এদের রান্না কেমন কে জানে? মাহমুদ অবশ্য আমাকে নিশ্চিন্ত করার জন্য অনেক আগেই বলেছে এদের খাবারের মান বেশ ভাল। তবে সে নিজেও এতদিনে স্বাদ ভুলে যাওয়ায় -খুব বেশী জোর দিয়ে বলেনি বলে- আমিও তেমন ভরসা পাচ্ছি না ।
অর্ডরকৃত খাবারের চিরকুটে সিগনেচার করতে গিয়ে কাউন্টারে বসা সেই ভদ্রলোক আবার চোখ তুলে তাকালেন । চোখে চোখ পরে যাওয়ায় হয়তো ঠোটের কোনে মিস্টি হাসি ঝুলিয়ে ভদ্রতার খাতিরে খাটি বাংলায় শুধালেন , কোত্থেকে এসছেন ?
প্রতিউত্তরে আমি বললাম ,‘ঢাকা থেকে।
এবার যেন উনার চোখের জ্যোতি ফিরে এল । একটু নড়ে চড়ে বসে খুব দরদভরা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন ‘ওখানেই থাকা হয়?
-হ্যা ।
-জন্ম কি ঢাকাতেই ?
- জ্বী-না .............
গল্পে গল্পে খাবার এসে হাজির । সত্যিই স্বুসাদু খাবার । খেতে খেতে আমাদের কথা চলল। উঁনার জন্মও বাংলাদেশে । সেই যুদ্ধের সময়ে এদেশে এসেছেন, মাঝে দেশে মাত্র একবার গিয়েছেন । দু-চারজন আত্মীয়স্বজন থাকলেও ভিটেমাটি উধাও হয়ে গেছে । এখন ইচ্ছে থাকলে সময় পান না । এখানে বসার সুবাদে প্রচুর বাংলাদেশীদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হয় - তাদের চোখেই দেশটাকে দেখে নেন ।

পরের পর্বের জন্যঃ Click This Link




সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ দুপুর ১:৫২
১৫টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কত রাত না খেয়ে ছিলাম (দ্বিতীয়াংশ)

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০১ লা জুলাই, ২০২২ সকাল ৭:১১


প্রথম পর্বের লিঙ্ক: Click This Link
কিন্তু খেতে তো হবে। না খেয়ে কেউ বাঁচতে পারে? তাই হোটেলওয়ালাকে বললাম, একবেলার খাবার টা একটু কষ্ট করে বাসায় দিয়ে আসা যায় কি না।
ওনার ওখানে কাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জামাই ভাগ্য....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা জুলাই, ২০২২ সকাল ১০:১০

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জামাই ভাগ্য....

জামাতাদের নিয়ে বিড়ম্বনা, দুর্ভোগ রবীন্দ্রনাথকে শ্বশুর হিসেবে অনেক বিব্রত হতে হয়েছে। সেইসব অভিজ্ঞতা বড়ই মর্মান্তিক, যন্ত্রণায় পরিপূর্ণ। অতি সংক্ষেপে তার সামান্য বিবরণী তুলে ধরছিঃ-

(১) রবি ঠাকুরের বড়ো... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাদীসের গল্প : ০০৮ : নবীজির পানি পান করারনো ঘটনা

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ০১ লা জুলাই, ২০২২ সকাল ১১:৩২



মুসাদ্দাদ (রহঃ) .... ইমরান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ
আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে এক সফরে ছিলাম। আমরা রাতে চলতে চলতে শেষরাতে এক স্থনে ঘুমিয়ে পড়লাম। মুসাফিরের জন্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

আম কথন.....

লিখেছেন স্বপ্নবাজ সৌরভ, ০১ লা জুলাই, ২০২২ বিকাল ৪:০২




আম্রপালি আম দিয়েই মনে হয় ম্যাঙ্গো ফ্লেভার আইসক্রিম বানায়। যতবার ফ্রিজ থেকে বের করে আম্রপালি খাচ্ছি ততোবার মনে হচ্ছে।
তবে আমার সবচেয়ে প্রিয় আম হচ্ছে ল্যাংড়া, গোপালভোগ আর ক্ষীরসাপাতি। এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

সোনাগাজী নিকে ইচ্ছানুসারে, স্বাধীনভাবে কমেন্ট করতে পারিনি।

লিখেছেন সোনাগাজী, ০১ লা জুলাই, ২০২২ বিকাল ৫:১৯



সোনাগাজী নিকে ৫ মাস ব্লগিং করলাম; ব্লগের বর্তমান পরিস্হিতিতেও বেশ পাঠক পেয়েছি; আমার পোষ্টে মন্তব্য পাবার পরিমাণ থেকে অন্য ব্লগারদের লেখায় মন্তব্য কম করা হয়েছে; কারণ, মন্তব্য করার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×