ধর্ম, সংস্কৃতি এবং ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত স্বাধীনতা।
-----------------------------------
আমি সবসময় বলে থাকি, পৃথিবীর উৎপত্তিতেও ধর্ম ছিল এবং পৃথিবীর ধ্বংসেও ধর্ম থাকবে। মনোবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, সমাজবিদ্যা, জীববিজ্ঞান, জ্যোর্তিবিদ্যা রসায়নবিদ্যা মত সব বিদ্যায় এসেছে বহুপরে। মানুষ একা ছিল, মানুষের মধ্যে ভয়ছিল, মানুষ চিন্তা করতে শুরু করল এবং ধারনা করতে শুরু করলো তার আগমনের / তাকে সৃষ্টি করার পিছনে কোন কারণ বা কেউ আছে। রাত দিন এর জন্য কেউ না কেউ দায়ী। মানুষ মনে করতে শুরু করল, সূর্যই রাত বা দিনের জন্য দায়ী। তাই তারা সূর্যকে তাদের সৃষ্টিকর্তা বা সবচেয়ে ক্ষমতাধর ভেবে তার কাছে ভয় থেকে মুক্তির/ তাদের মনভাব পেশ করতে শুরু করল। তখন থেকেই সূর্য কে পূজা করা শুরু। এবং ঈশ্বরের ধারনার সৃষ্টি হয়। এবং ধর্মতত্ত্বের আবির্ভাব। ধীরে ধীরে মানুষ বাড়তে থাকলো এবং মানুষ হিংস্র জীবজন্তু থেকে বাঁচতে সংঘবদ্ধ হতে লাগলো এবং সমাজবিদ্যার সৃষ্টি। তাই ধর্মকে বাদ দিয়ে মানুষের অস্তিত্বের কথা চিন্তা করা কিংবা ধর্মবিহীন পৃথিবী কল্পনা করা পাগলের প্রলাপ ছাড়া কিছুই না।
সংঘবদ্ধ মানুষ নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ / তথ্যের আদানপ্রদান করার জন্য চিহ্নের ব্যবহার শুরু করে যা সংস্কৃতির ধারনার জন্ম দেয়। দেব দেবীকে উপাসনা/পূজা করার জন্যও বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতির উৎপত্তি হয় যা কালের সাথে সাথে সংস্কৃতিতে রুপ নেয়।
তাই সংস্কৃতি এবং ধর্ম প্রায় কাছাকাছি দুটি উপাদান কিন্তু এক না। এই ব্যপারটাকে আমরা অনেক সময় ঘুলিয়ে ফেলি।
পুঁজিবাদী বিশ্বের ধারনার সাথে সাথে জন্ম নেয় ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন বা গোষ্ঠীগত স্বাধীনতার। এর আগে ব্যক্তিস্বাধীনতা বলতে কিছুই ছিল না। দাসপ্রথা প্রচলন ছিল। মানুষের বেচা কেনা চলত। রাষ্ট্র যা বলত তাই হত। অনেক সময় পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থাই ছিল ধর্মীয় চিন্তার বা কে কাকে পূজা করছে তার উপর ভিত্তি করে। এবং এক একটি রাষ্ট্র ভিন্ন ভিন্ন ধর্মতত্ত্ব বিশ্বাসীদের নিয়েই গড়ে উঠত। বেশী দুর যেতে হবে না, ভারত পাকিস্তান ভাগও কিন্তু দ্বিজাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে হয়েছে। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল, ব্যক্তি স্বাধীনতা বা গোষ্ঠীগত স্বাধীনতা বা ধর্মীয় স্বাধীনতা জন্য।
পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির অংশ। অাকবর সাহেব খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা পুৃঞ্জিকার আবির্ভাব। রাজবংশীয় শাসনের অবসান হলেও বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী তাদের বকেয়া আদায়ের জন্য দিনটিকে বেছে নেয় যা পরবর্তীতে তা হালখাতা সংস্কৃতি নামে পরিচয় লাভ করে।
ধীরে ধীরে ঐদিনকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়িক চিন্তা আরো বাড়লো, মেলা বসতে শুরু করল। মানুষও তা সাদরে গ্রহন করল। এই টুকু পর্যন্ত হিন্দু, মুসলিমদের মধ্যে কোন সমস্যা সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু যখনই মঙ্গল শোভাযাত্রা, যা মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাসের এক ঈশ্বরবাদকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ফলে মুসলিম গোষ্ঠী তা বয়কট করতে শুরু করল। সাথে সাথে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা কারণে সরকারকে চাপ প্রয়োগ করে মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধেরও চেষ্টা চলে। এবং উগ্রবাদীতারও সৃষ্টি করে যার ফলে ২০০১ সাথে বৈশাখে হামলাও হয়। অথচ এই মঙ্গলশোভা যাত্রার অবির্ভাব হয়েছে ১৯৮৯ সালে। সরকার ইচ্ছে করলেই তা বন্ধ করতে পারে এবং সকল বাঙালিকে এক করতে পারে। কিছু কিছু সংস্কৃতমনা(প্রচন্ড ধর্মবিদ্বেষী, এবং গোঁড়ামিতে বিশ্বাসী) যারা এই মঙ্গলশোভা যাত্রার ধারক ও বাহক। এদেরকে যদি প্রশ্ন করা হয়, মঙ্গলশোভা যাত্রা কিভাবে মঙ্গল বয়ে আনে? তবে এর উত্তর এদের কাছেও নেই। এই মঙ্গল শোভাযাত্রার না আছে ধর্মীয়(হিন্দু বা মুসলিম ধর্ম অনুসারে) কোন ব্যাখ্যা, না আছে শতবছর ধরে চলে আসার কোন প্রমান এবং না আছে বস্তুগত বা ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি । বরং তা ধর্মীয় ভাবে সাংঘর্ষিক বলেই এরা এই মঙ্গলশোভা যাত্রা কে ধারন করে, কোন প্রকার সংস্কৃত চিন্তা বাদে।
সরকারি পৃষ্ঠাপোষকতায় কোন সংস্কৃতিই বেশি দিন টিকে না এবং টিকবেও না। সংস্কৃতি লালনের বিষয়। দিন দিন মুসলিম সম্প্রাদায় বৈশাখ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এবং নেয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ সংস্কৃতির জন্য কেউ কোন দিন ধর্মের সাথে আপোষ করতে পারে না। কারণ ধর্ম কে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন সংস্কৃতির সৃষ্টি। আর ধর্মই মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। ধর্মই মানুষের মনের খোরাক, সংস্কৃতি না। সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে যেমন বোনাস, সাধারন ছুটি তবুও বৈশাখের অপমৃত্যু হবে ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং গোষ্ঠীগত স্বাধীনতার কাছে। কারণ স্বতঃফূর্ত বিষয় কে বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে পুরণ করা যায় না। কিছু অতি উৎসাহী লোকের গোঁড়ামি এবং ধর্মবিদ্বেষের কারনে বাঙালিদের প্রাণের অনুষ্ঠান এখন দ্বিখন্ডিত, সাথে বাঙালিরাও বিভাজিত। যার ফলে, একটা সংস্কৃতির অপমৃত্যু।
সকলকে বাঙলা নববর্ষের শুভেচ্ছা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




