ঘটনা হচ্ছে, ওর হঠাৎ বিদেশী খাবারের প্রতি অনুরাগ জন্মেছে। খুঁজে খুঁজে ইউনির আশে পাশে ইন্দোনেশিয়ান, থাই, লেবানীজ আর ভারতীয় রেস্টুরেন্টে খেয়েছে। এবার বাংলাদেশী খাবারের স্বাদ তার জিভে ঠেকানো চাই-ই। অল্পতেই নাকি হবে। পথও বাতলে দিল, তোমার মা যেদিন রান্না করবে, সেদিন ছোট্ট একটা বাটিতে অল্প একটু নিয়ে এসো, আমি শুধু চেখে দেখব।
মাঝে পরীক্ষা গেল, আমার নিজেরও অর্থহীন সব কিছু নিয়ে ভীষণ ব্যস্ততায় দিনগুলো চলে গেল খুব দ্রুত। ভুলেই গিয়েছিলাম মিশরীয় মেয়ে মিভেতের অনুরোধের কথা।
এখন মা সাত সমুদ্দর তের নদীর ওপারে। বাড়ি কত্রীগিরীর ভার কয়েকদিনের জন্য আমার কাঁধে এসেছে। রান্না বান্না করছি সবার জন্য। এমনি রান্না করতে খারাপ লাগে না, কিন্তু দিনের তিন বেলা বাড়ির লোকজনেরা কি খাবে সেই চিন্তা নিয়ে ঘুরা ফেরা করা খুবই বিরক্তিকর একটা ব্যাপার। যন্ত্রনার ব্যাপার হলো, আমার ইউনিও ছুটি। ব্লগের নেশার তাল কেটে গিয়েছে। এমএসএন, ইয়াহু, জিমেইলও খা খা করে। ফোনটাও একদম চুপ। হঠাৎ খেয়াল করলাম হাতে অফুরন্ত সময়। দিনে পাঁচ ঘন্টা চাকরি, বাসায় ফিরে ঘর দোর গুছাচ্ছি। এক ফাঁকে ঘুরে আসলাম সেই নিউকাসল, দু'দিনের ট্রিপ। আরও কাজ খুঁজে সেলাই নিয়েই বসে গেলাম। একটা ফতুয়া ৭০% বানানোর পরে মেশিন দেখি আর কাজ করে না! আস্তে করে মেশিন ঢেকে চলে এসেছি, মা এসে যেন বুঝতেই না পারে এই বান্দার হাতে মেশিন পড়েছিল! রান্নাবান্নাও চলছে বাসার মানুষের জন্য। আর চলছে সবাইকে কবে থেকে উপোস করিয়ে মারা যায়, সেই ফন্দি আঁটা।
আরও সময় হাতে, তখন হঠাৎই মনে পড়ল মিভেতের অনুরোধের কথা। ধুম ধাম দাওয়াত দিয়ে বসলাম ইউনির বান্ধবীদের, মিভেত উপলক্ষে। নি:সন্দেহে আমার জন্য মহা সাহসের কাজ, কারণ আমি সাধারনত: মেহমান আসলে দু'একটা ডিশ রান্না করি। কখনও সব খাবার একা করি নি। মা নির্দেশনা দেয় আশে পাশে থেকে। মেহমান না আসলে, যা-ই রান্না করি, বাড়ির লোকেরা সোনা মুখ করে খেয়ে ফেলে। এই আমি, মায়ের অনুপস্থিতিতে দাওয়াত দিয়ে বসলাম এতগুলো মানুষকে!
দুরুদুরু বুকে রান্না করেই ফেললাম। সবাইকে ঘোষনা দিলাম--খাঁটি বাঙালি খাবার রান্না করছি, পুরা আনসুইটেনড ভার্শন। তুর্কী, লেবানিজ, মিশরীয় বা মালয় বলে কোন ছাড়া ছাড়ি নেই!
মুরগির ভুনা, মুরগির ত্রোস্ট (রোস্ট আর তন্দুরীর মাঝামাঝি--নিজেস্ব রেসিপি), গরুর ঝুরা গোশত, আলু ভর্তা, তেলাপিয়া মাছ ভর্তা, ডাল, চিংড়ি মাছের ভুনা, আলু চিংড়ি তরকারী--এই ছিল রেসিপিতে। ডেজার্টটা বাঙালি করতে পারি নি, তাই সাওয়ার ক্রিম আর আনারসের ছোট্ট একটা ডিশ করে ফেললাম।
সর্বশেষ পরিস্থিতি--
মিভেত বিয়ের জন্য দেশী ছেলে খুঁজছে। ছেলেকে অবশ্যই রান্না ভালো জানতে হবে। ছেলে রান্না না জানলে রান্না জানা শাশুড়ি হলেও চলবে, যে ছেলের বউকে রান্না শিখিয়ে দিতে আগ্রহী। তবে সেক্ষেত্রে ছেলেকে বিয়ে করা ছাড়াই শাশুড়ি পাওয়াতে বেশি আগ্রহী মিভেত। এসব ব্যর্থ হলে সর্বশেষ পথ--আমার বিয়ের পরে আমার পাশের ফ্ল্যাটে বাসা নিবে, মাঝে মাঝেই প্রতিবেশী সুলভ ভালবাসায় এটা-সেটা দিয়ে আসব, সেই আশায়।
আরবদের রান্নায় সবচেয়ে তীব্র স্বাদের মসলা হচ্ছে রসুন আর বাসিল। তাই পাগল হলো আমাদের রান্নার স্বাদ আর গন্ধে।
প্রিয় রান্না--মুরগি ভুনা আর গরুর ঝুরা গোশত।
রিমার বাবা মা আরব ছাড়া অন্য ছেলেকে বিয়ে করতে দেখলে কিছু একটা ঘটিয়েই বসতে পারে, তাই মিভেতের প্রস্তাবিত শেষ পথ ওর বেশ মনে ধরল।
প্রিয় রান্না--চিংড়ি ভুনা। পই পই করে শিখিয়ে দেয়ার পরেও ভাত দিয়ে না খেয়ে শুধু শুধুই চিংড়ি ভুনা খাচ্ছিল কপ কপ করে।
জাহিদা ছিল হাত দিয়ে খাওয়া খাওয়িতে আমার একমাত্র সঙ্গী। অন্যরা কখনও হাত দিয়ে খায় নি, খেতে জানে না। জাহিদা মালয় মেয়ে, আমাদের মতই হাতে খায়। ও সবই বেশ আগ্রহ নিয়ে খেল, খাবারের স্বাদে নাকি মিল আছে বেশ।
আমার সর্বপ্রথম দাওয়াত খাওয়ানোটা খুব বেশি রকমের সার্থক হয়ে গিয়েছে দারুণ একটা খবর শুনে।
নুরতিন আর সাইফ বিয়ে করছে!
শুনে সাথে সাথে ভাইয়াকে ফোন করলাম, খবর শুনলা!
নুরতিন, আমাদের তুর্কী বান্ধবী, ভীষণ লক্ষী মেয়েটা। আর সাইফ, সেই শ্যামলা ছোট খাট ভালো মানুষ বাঙালী ছেলেটা, বিনয়ী এবং ভীষণ রকমের মাল্টি ট্যালেন্টেড ছেলেটা। দু'জনেই কথা বার্তায় খুব নরম, চরিত্রে খুব দৃঢ়। নিজ নিজ বৃত্তে সবার ভালোবাসায় ডুবে থাকে সারাক্ষন। দু'জনের মধ্যে কেমিস্ট্রি আছে, আমার মনে হতো প্রায়েই। দারুণ সুন্দর এক জুটি হলো!
জুটি নিয়ে কথা উঠলো, কারণ মিভেতের ধারণা নুরতিন খুব ভাগ্যবতী। সাইফ খুব ভালো বাংলাদেশী রান্না করতে পারে যে!
ছবি: আমার আজকের রান্নার একাংশ।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুলাই, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


