somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রমোশান

০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ দুপুর ১:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আশরাফ সাহেবের দিনশেষে সব ঠিক থাকলে তিনি বলতে পারেন তার সকালটাও ঠিক ছিলো । চায়ে চিনি ঠিক ছিলো , পত্রিকার ভাঁজ উনিই খুলেছেন , ব্রেকফাস্টে বাটারের বয়ামটাও ছিলো ।

আর যদি ঠিক না থাকে তবে কিছুই ঠিক ছিলো না । চা ছলকে পড়েছে পিরিচে , পত্রিকা দেরীতে এসেছে , বাটারের বয়ামও হাতের নাগালের বাইরে ছিলো ।

এরকম হলে তিনি মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করেন । মনে মনে চিন্তা করেন ঢাকা শহরে কোন জ্যাম নাই , ফুটপাতে বেআইনি দোকান নাই , পার্কে আবর্জনা নাই , সন্ধ্যা রাতের অন্ধকার গলিতে ছিনতাইকারী নাই , অফিসে দুর্নীতি নাই । আশরাফ সাহেবের মন ভালো হয়ে যায় । ভালো মন নিয়ে আশরাফ সাহেব গায়ে কোট চাপিয়ে অফিসে যাওয়ার জন্য বের হন ।

আশরাফ সাহেব পূবালী ব্যাংকে চাকরী করেন । মতিঝিল শাখার সিনিয়র অফিসার । ১৪ বছর হয়ে গেছে চাকরীর । প্রমোশান পেয়েছেন মাত্র দুটো । এর পিছনে কারণ আছে । আজকাল প্রমোশান পেতে গেলে দুটো জিনিস একসাথে থাকা দরকার । টাকা এবং তেল । আশরাফ সাহেবের কোনটাই নেই । ফাইল ছাড়ানোর জন্য টেবিলের নিচ দিয়ে টাকা নেন না তাই তার খুব একটা টাকা নেই আর তেল দিতে পারেন না কারণ যাদেরকে তেল দিতে হবে তারা সবাই তার জুনিয়র । অনেক পরে জয়েন করেও তারা তরতর করে উপরে উঠে গেছে । আটকে আছেন শুধু আশরাফ সাহেব । তবে যদি টাকা এবং তেল দুটোই আশরাফ সাহেবের থাকতো তাহলেও তিনি তা প্রমোশান পাবার পেছনে ঢালতেন কিনা সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে ! *** মতিঝিল শাখার ম্যানেজার আব্দুল লতিফ । বয়স ছাব্বিশ সাতাশ হবে । ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে একাউন্টিং এ অনার্স মাস্টার্স শেষ করে সিনিয়র অফিসার হিসেবে জয়েন করেছিলো । বছর না ঘুরতেই প্রমোশান । দুষ্টু লোকেরা বলে প্রমোশানের পেছনে নাকি সাড়ে সাত কেজি বোয়াল আছে । আশরাফ সাহেব ওসব কথায় কান দেন না । বরফের চাঙে শুইয়ে রাখলেও হিংসুকদের পিঠ জ্বলবেই ।

***

কোন এক অজানা কারণে ম্যানেজার আব্দুল লতিফ , সিনিয়র অফিসার আশরাফ সাহেবকে অনেক শ্রদ্ধা করেন । অথচ এমনটা হওয়ার কথা নয় । অফিসে একমাত্র আশরাফ সাহেবই কোন ফাইল আটকিয়ে রাখেন না , টেবিলের নিচ দিয়ে টাকা নেন না । এরকম মানুষকে শ্রদ্ধা করা যায় না বরং বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হয়, আড়ালে ছোটখাটো গালি দিতে হয় । অসত্‍ মানুষের ভীড়ে সত্‍ মানুষেরা সব সময়ই অপরাধী ।

ম্যানেজার হিসেবে আব্দুল লতিফের জয়েন করার কিছুদিন পর আশরাফ সাহেব একটা মোটা অংকের টিটির ব্যাপারে কথা বলতে গিয়েছিলেন তার সাথে । আব্দুল লতিফ তখন টেলিফোন রিসিভার কানে লাগিয়ে খুব সম্ভবত হেড অফিসে কথা বলছিলেন । আশরাফ সাহেবকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে বসার ইঙ্গিত করলেন । আশরাফ সাহেব বসতেই আব্দুল লতিফ টেলিফোন ছাড়লেন । একটু ইতস্তত করে হাতে ধরে রাখা কাগজ এগিয়ে দিয়ে আশরাফ সাহেব বললেন

-"স্যার এই টিটির ব্যাপারটা যদি একটু দেখতেন !"

আব্দুল লতিফ হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিলেন । অন্য সব কাগজের সাথে আলপিন মেরে টেবিলের এক কোণায় রেখে দিয়ে সরাসরি আশরাফ সাহেবের দিকে তাকালেন । হালকা গলায় বললেন

-"দেখুন, আমি আপনার জুনিয়র । বয়সেও, অভিজ্ঞতাতেও । পোস্টে হয়তো সিনিয়র কিন্তু সেটা কোন ব্যাপার না । আপনি আমাকে স্যার বললে অস্বস্তি হয় । সম্বোধন যদি করতেই হয় লতিফ সাহেব বলে সম্বোধন করলেই হবে ।"

আশরাফ সাহেব চোখ তুলে তাকালেন । একমুহুর্ত তিনি কি বলবেন ভেবে পেলেন না । মাথা ভার হয়ে এলো । কিছুক্ষন ইতস্তত করার পর চেয়ার ছেড়ে "আসি স্যার" বলে উঠে দাড়ালেন । হনহন করে হেটে চলে আসলেন নিজের চেয়ারে । টেবিলের উপর ঢেকে রাখা পানির গ্লাস খালি করে দিলেন একনিমিষেই । এই প্রথমবারের মতো তার নিজেকে অনেক ক্ষুদ্র মনে হতে লাগলো । বিনা কারণে অপমানিত মনে হতে লাগলো । চোখ বন্ধ করে তিনি একাউন্টসের হিসেব করতে লাগলেন । তার মোট ছয়টা একাউন্ট । সবগুলো মিলে লাখ ছয়েক টাকা হয়তো আছে । আশরাফ সাহেব অফিসের পিয়ন মোর্শেদকে ডেকে পাঠালেন । টাকাগুলো তুলতে হবে, একইসাথে কিছুটা তেল মারার ক্ষমতা আয়ত্তে আনতে হবে ।

***

আশরাফ সাহেব এখন মতিঝিল শাখার ম্যানেজার । ম্যানেজারের চেয়ারের পেছন দিকের দেয়ালে একটা বড় কাঠের বোর্ডে তার নাম আর জয়েনিং ডেট লেখা আছে । একটু ফ্রি থাকলে তিনি চেয়ার ঘুরিয়ে সাদা কালিতে লেখা তার নামের দিকে তাকিয়ে থাকেন । তার ঠিক উপরের নামটা আব্দুল লতিফের । কেন জানি হঠাত্‍ করে ছেলেটার চাকরীটা চলে গেলো । বড় ভালো ছেলে ছিলো । আশরাফ সাহেবের হাতে যদি ক্ষমতা থাকতো তবে ছেলেটাকে জোর করে একটা বড় চাকরী দিয়ে দিতেন । ঘুষ দিতে হলে দিতেন । তার একাউন্টসে এখনো প্রায় লাখ ছয়েক টাকা আছেই ।

আব্দুল লতিফ একটা কবরের সামনে দাড়িয়ে আছে । এপিটাফে বড় করে একটা নাম লেখা । কবরটা আব্দুল লতিফের বাবার । আব্দুল লতিফ আলতো করে কবরটা স্পর্শ করে । বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসে । ভাঙা গলায় বলে "বাবা, তোমার সততা নিয়ে কত কথা বলেছি, কত কথা শুনিয়েছি কিন্তু শেষ পর্যন্ত তোমার কাছেই হেরে গেলাম । জিতিয়ে দিয়ে গেলাম তোমার মতোই একজনকে ।"

চোখ মুছে উঠে দাড়ালো আব্দুল লতিফ । একটু দূরে দাড়িয়ে থাকা মোর্শেদের হাত থেকে কোটটা নিয়ে ধীর পায়ে এগোতে লাগতো বড় রাস্তার দিকে । মোর্শেদের চোখদুটোও ভিজে ওঠে । ভেজা চোখে তাকিয়ে থাকে আব্দুল লতিফের গমনপথের দিকে । লোকটাকে যেমন ভেবেছিলো আসলে তেমন নয় । অনুতাপ হচ্ছে মোর্শেদের । অফিসে বোয়াল মাছের গল্পটা মোর্শেদই ছড়িয়েছিল ।

মোর্শেদ ঘুরে দাড়ায় । কবরের দিকে হেটে যায় । সন্তানকে দেখেছে সে, সন্তানের বাবাকেও দেখতে হবে । মোর্শেদ চোখমুছে এপিটাফের দিকে তাকায় । কালো কালিতে বড় করে লেখা একটা নাম দেখা যাচ্ছে

"মরহুম আব্দুল আশরাফ"
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথঃ দ্য আয়নাঘর ফাইলস"..

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৯

"আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথঃ দ্য আয়নাঘর ফাইলস"
-একজন গুমের শিকার মানুষের চোখে একটি ভয়াবহ সত্যের দলিল।

“আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ: দ্য আয়নাঘর ফাইলস”- নামটি যতটা আকর্ষণীয়, বইটির ভেতরের সত্য তার চেয়েও বেশি নির্মম, বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটা ফোন কলের দূরত্বে ১০ হাজার মানুষের চাকরি!

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



একটা ফোন কলের দূরত্বে ১০ হাজার মানুষের চাকরি!
বিষয়টি আপনি সমাধান করছেন না কেন, পিএম সাহেব? আপনার তো মাত্র একটা ফোন কলই যথেষ্ট—অন্তত ভুক্তভোগীদের এতদিনের অপেক্ষা দেখে সেটাই মনে হয়!
একটা ভুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

কার জন্য; কেন এতো লেখালেখি

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:২১

লিখে রাখো বৎস'রা ; এ দূর্মুর্খ আর বর্ন ব্লাইন্ড ও বেইমানদের বাংলাদেশ-এ ভালো কিছুই তৈরী হবে না ! লিখে রাখো বৎস'রা !!
যে যে ব্যক্তির মনে বিষাক্ত রাজনীতির বীজ ঢুকেছে;... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষের অহংকার ও বুদ্ধিমত্তার ভ্রান্ত ধারণা

লিখেছেন শেরজা তপন, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৫২


উৎসর্গঃ ব্লগার রাজীব নুর( ঈশ্বর বিশ্বাসের কোল ঘেঁষে যাওয়া কোন লেখা এলেই যিনি লেখককে ভীষন সন্দেহের চোখে দেখেন- ভাবেন; কি অদ্ভুত কথা- ইনি দেখি ঈশ্বর বিশ্বাসী!!))
ধর্ম ও বিজ্ঞান: সংঘর্ষ না... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঠেলায় নাম বাবাজি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৯


সময়টা সরকারের জন্য মোটেও ভালো যাচ্ছে না। একদিকে গ্যাস আর বিদ্যুতের সংকটে মানুষ প্রতিদিন কষ্টে দিন কাটাচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের একের পর এক সিদ্ধান্ত নেটিজেনদের বাধার মুখে পড়ছে। ফলে সরকার নতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×