somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বৃষ্টিবিলাস (গল্প)

১৪ ই মার্চ, ২০১৫ রাত ২:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাসায় একটা অঘটন ঘটে গেছে । ছোট খাটো না । বেশ বড়সড় । এতই বড় যে সবাই ভয়ে কুঁকড়ে আছে । এমনকি ছোটচাচাও নেমে এসেছেন চিলেকোঠা ছেড়ে । বসার ঘরে বসে গম্ভীরমুখে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন । প্রশ্ন করছে পুলিশের এসআই ওবায়দুল হক । ছোটচাচার পাশে বাবা বসে আছেন । একটু পরপর রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছছেন । বাবার পানের নেশা । তিনি যখন পান খান তখন পানের রস ঠোঁটের কোণা বেয়ে থুতনির কাছাকাছি চলে আসে । যে রুমাল দিয়ে তিনি ঘাম মুছছেন সেই রুমাল তিনি থুতনিতে জমে থাকা পানের রস মুছতে ব্যবহার করেন । টেনশনে আজ সব গোলমাল হয়ে গেছে ।
আম্মা তার শোবার ঘরে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন । প্রায় দুই ঘন্টা অজ্ঞান হয়ে থাকার পর জ্ঞান ফিরেছে । একটু আগে তার মাথায় পানি ঢালা হয়েছে । অঘটনের খবর পেয়ে পাশের বাসার মিতু আপুও এসেছেন । এখন তিনি আম্মার মাথার কাছে বসে আছেন । ধীরে ধীরে মাথার চুলে বিলি করে দিচ্ছেন ।
আমি আমার ঘরে । পড়ার টেবিলে বসে আছি । সামনে এসএসসি পরীক্ষা । টেস্ট শেষ হয়ে গেলো এই কিছুদিন আগে । এখনো রেজাল্ট হয় নি । রেজাল্ট দিলে বাসায় আরেকটা বড় অঘটন হবে । কারণ আমি দুটো পরীক্ষা দেই নি । রসায়ন আর ম্যাথ । প্রস্তুতি ভালো ছিলো না । যা ছিলো তাতে করে টেনেটুনে পাশ করা যেত কিন্তু ভালো রেজাল্ট হতো না । এরচেয়ে না দেয়াই ভালো হয়েছে ।
***
ঠকঠক শব্দ কানে যেতেই ঘুম চটে গেলো । টেবিলের উপর মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । চোখ কচলে টেবিল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত দুটা বাজে । এত রাতে কে জানালায় টোকা দিতে পারে আমি জানি । তারপরও ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম "কে ?"
উত্তরের আশায় কিছুক্ষন কান পেতে রাখার পরও কোন উত্তর পেলাম না । ভয়টা একটু বেড়ে গেলো । জানালার কাছে এগিয়ে গিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলাম । এবার ভারী গলায় উত্তর এলো "আমি !"
গলার স্বর আমার অনেকদিনের পরিচিত । ভয়টা কেটে গেল একমুহুর্তে । জিজ্ঞেস করলাম
"দরজা খুলবো ?"
-"না , দরজা দিয়ে ঢুকতে পারবো না । কেউ দেখে ফেলবে । তুই জানালা খোল ।"
আমার ঘরের জানালাটা দরজার মতোই কাজ করে । অনেকদিন সময় নিয়ে গ্রীলটা এমনভাবে কেটেছি যে এটা খোলা যাবে আবার লাগিয়ে রাখা যাবে । বাবার পকেট থেকে খুচরো টাকা চুরি করে ধরা পড়লে কিংবা কোনদিন বাড়ি ফিরতে খুব রাত হলে এই জানালাটা কাজে দেয় । কিন্তু দাদা কিভাবে এই জানালার রহস্য জেনে ফেললো বুঝতে পারলাম না ।
দাদা খুব সাবধানে জানালা টপকে ঘরে ঢুকলো । শার্ট ঝাড়তে ঝাড়তে একটা বড় নিঃশ্বাস ফেললো । আমি জানালাটাকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে দিয়ে দাদার দিকে ফিরলাম । বললাম
"দাদা লুঙ্গী নিবি ? আজকেই ধুয়ে রেখেছি । এখনো পড়া হয়নি ।"
-"লুঙ্গী ? হ্যাঁ দে । সাদাটা দিস ।"
আমি আলনা থেকে সাদা লুঙ্গি নিয়ে দাদার পাশে দাড়ালাম । দাদা শার্ট খুলে লুঙ্গী পড়ে নিলো । আমি বিছানার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বইগুলো সরিয়ে রাখলাম । তারপর ঝাড়ু দিয়ে বিছানাটা ঝেড়ে দিলাম । গায়ে কাঁথা টেনে দাদা শুয়ে পড়লো । আমি চেয়ারে গিয়ে বসে মিছেমিছি বইয়ের পাতা উল্টাতে লাগলাম । সন্ধ্যেরাতেই ঠিকমতো পড়াশুনা করতে পারিনা আর এখন তো মাঝরাত পার হয়ে গেছে । দাদা বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে লাগলো । জিজ্ঞেস করলাম
"দাদা , সমস্যা হচ্ছে ?"
-"কিসের সমস্যা ?"
-"না এইযে লাইট জ্বালানো ! তোমার তো আলোতে ঘুম হয় না । নিভিয়ে দেই ?"
দাদা উত্তর না দিয়ে পাশ ফিরে শুলো । আমিও ভাবলাম এত পড়ে কাজ নেই । টেবিল গুছিয়ে , লাইট নিভিয়ে দাদার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লাম । কিছুক্ষন চুপচাপ শুয়ে থাকলাম । দাদা আটোসাঁটো হয়ে শুয়ে আছে । একজনের বিছানায় দুজনের ঠিকমতো জায়গা হওয়ার কথা নয় । অল্প কিছুক্ষনের মধ্যে দাদার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো । আমি খুব আস্তে করে ডাকলাম
"দাদা ! ও দাদা !"
ঘুম জড়ানো গলায় দাদা জবাব দিলো
"হু , কি হয়েছে ?"
ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম
"দাদা খুনটা কি সত্যি তুমি করেছো ?"
-"হ্যাঁ করেছি ।"
-"বাসায় আজকে পুলিশ এসেছিলো জানো ?"
-"জানি"
-"মাকে বাদে বাকী সবাইকে প্রশ্ন করেছে ।"
-"হু !"
-"ছোটচাচা বললো অপরাধ প্রমাণ হলে তোমার নাকি ফাঁসিও হতে পারে !"
-"হু !"
-"তুমি ধরা পড়ো না দাদা ! পালিয়ে থাকো । বাসাতেও এসোনা আর । নাহলে হয়তো বাবাকেও ধরে নিয়ে যাবে ।"
দাদা কিছু বললো না । আমিও চুপ করে গেলাম । দাদার হয়তো ঘুম পেয়েছে খুব । দীর্ঘক্ষন চুপ থাকার পর জিজ্ঞেস করলাম
"দাদা ! ও দাদা ! কেন তুমি খুন করলে ? দাদা ? ও দাদা ?"
হঠাত্‍ রেগে উঠল দাদা । ধমক দিয়ে বললো
"এখন ঘুমা তো ছোটন । জ্বালাতন করিস না ।"
আমি চুপ করে গেলাম । দাদার উল্টোদিকে মুখ ফিরে শুলাম । চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে বালিশ ভিজে যাচ্ছে । আমি কান্না থামাতে পারছি না । দাদা ধমক দিয়েছে এজন্য কাঁদছি না । কাঁদছি কারণ মা দাদাকে অনেক ভালোবাসে । আমার চেয়ে বেশী । দাদার ফাঁসি হয়ে গেলে মা-ও বাঁচবে না । দাদা যে কেন খুন করতে গেলো !
কখন ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই । ভোর বেলা ঘুম ভাঙার পর পাশে তাকিয়ে দেখি বিছানা খালি । দাদা নেই । ভোর বেলাতেই হয়তো চলে গেছে । আমি বিছানা ছাড়লাম । ফ্রেশ হয়ে বই নিয়ে বসবো কিনা ভাবছি এমন সময় রান্নাঘর থেকে মা চেঁচিয়ে ডাকলেন
"খোকন , এদিকে একটু শুনে যা তো"
রান্নাঘরে যেতেই মা হাতে চায়ের কাপ তুলে দিলেন । বললেন ,
"তোর বড়মামা এসেছে । যা চা দিয়ে বসতে বস গিয়ে ।"
***
আমার বড়মামার নাম আজীজ মোল্লা । কাশিপুর জজকোর্টের মোক্তার । বেশ শক্ত মানুষ । শুনেছি নানা যখন মারা যান তখন তার বয়স ছিলো সতেরো । ঐ সময় থেকে আজ পর্যন্ত শক্ত হাতে সংসার চালাচ্ছেন । দুটো বোনের (আমার মা সহ) বিয়ে দিয়েছেন আর ছোট ভাই অর্থাত্‍ আমার ছোটমামাকে মাস্টার্স পড়াচ্ছেন ।আমি বড় মামার দিকে চা এগিয়ে দিয়ে বললাম
-"মামা আপনার চা !"
বড়মামা চায়ের কাপ হাতে নিতে নিতে বললেন
-"আদব কায়দা সব পানিতে গুলিয়ে খেয়ে ফেলেছিস তাই না ? গুরুজনদের সালাম দিতে হয় না ? বেয়াদব ছেলে !"
আমি মাথা নিচু করে সালাম দিলাম । বড়মামা উচ্চস্বরে সালামের উত্তর দিলেন । এতই উচ্চস্বরে যে আমি চমকে উঠলাম । ছোটচাচা চিলেকোঠা থেকে "কে ? কে ?" বলে চিত্‍কার করতে লাগলেন । আগেই বলেছি বড়মামা শক্ত মানুষ । অপ্রস্তুত বলে যে শব্দ আছে সেটা বড়মামা জানেন না । জানলেও মানেন না । চা শেষ করে পাঞ্জাবীর পকেট থেকে ক্ষুদ্রাকারের পানের বাটা বের করে একটা পান মুখে দিলেন । আমার উঁকি মেরে দেখতে ইচ্ছে হলো ভেতরে কয়টা পান আছে । কারণ পান শেষ হয়ে গেলে আমাকেই দৌড়াতে হবে পান আনতে । বড়মামা পান চিবোতে চিবোতে বললেন
"সালাম এবং সালামের উত্তর দুটোই উচ্চস্বরে দিতে হয় । যারা যারা শুনবে তারা সবাই সওয়াব পাবে ।"
আমি ঘাড় বাঁকা করে নিজের ঘরে ফিরে এলাম । গত তিনদিন থেকে ম্যাথ করা হয়নি । আজকে একটুখানি চেষ্টা করা যায় । অন্তত ম্যাকলরিন এর উপপাদ্য পর্যন্ত চোখবুলানো যায় ।
***
আমার এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে । বাংলা , ইংরেজী হয়ে গেছে । সামনে ম্যাথ । নাকমুখ গুঁজে তিনবেলা ম্যাথ করছি । একটার পর একটা খাতা ভরাচ্ছি । অনেক রাত করে ঘুমাতে যাচ্ছি আবার খুব সকালে উঠে পড়তে বসছি । এমনই এক সকালে বড়মামা আসলেন বাসায় । দরজা খুলে বড়মামাকে দেখে আমি চিত্‍কার করে সালাম দিলাম । বড়মামার হাতে মিষ্টির প্যাকেট ছিলো , ওটা ঠাস করে নিচে পড়ে গেলো । মুখে সামান্য খুশীর আভা ছিলো সেটা মুছে গিয়ে শুকনো শুকনো ভাব চলে এলো । আমি বোকা বোকা মুখ করে দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়ালাম । বড়মামা বিড়বিড় করে সালামের উত্তর নিলেন । সেটা ভালো করে আমার কান অবধি পৌঁছালো না । বসার ঘরে বড়মামাকে বসিয়ে রেখে আমি আমার ঘরে ফিরে ম্যাথ করতে বসে পড়লাম । নষ্ট করার মতো সময় হাতে নেই একদম ।
সেদিনই খবর পেলাম কোর্টে নাকি দাদা নির্দোষ প্রমাণীত হয়েছে । যেসব সাক্ষী দাদার বিপরীতে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলো তারা সাক্ষ্য দিয়েছে দাদার পক্ষেই । এছাড়াও কিছু মেডিকেল রিপোর্ট , আবাসিক হোটেলের কাস্টমার হিসাব খাতা ইত্যাদি দাখিল করতে হয়েছে । আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম এ সব কিছু হবে । যেদিন বড়মামা এসেছিলো সেদিনই বুঝে গিয়েছিলাম । শুনেছি মামলা মোকদ্দমায় আজ পর্যন্ত কেউই বড়মামাকে হারাতে পারে নি । আমি ম্যাথ করতে করতেই অপেক্ষা করতে থাকলাম কখন দাদা বাড়ি ফিরবে । রোদে পোড়া তামাটে চেহারা নিয়ে বোকার মতো হাসবে । চোখ ভরা দুষ্টুমি নিয়ে জিজ্ঞেস করবে
"কি রে ছোটন সেদিন রাতে বিছানা ভিজিয়েছিলি ক্যানো ?"
তারপর হো হো করে হাসবে । আমি ম্যাথ করতে পারছি না । মাথা ভার ভার লাগছে । চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে । বাম হাতের উল্টা পিঠ দিয়ে চোখ মুছতে গিয়ে দু ফোঁটা অশ্রু পড়ে গেলো অসম্পূর্ণ ম্যাথের উপর ।
***
একদিন খুব সকালে বাবা আর বিছানা ছেড়ে উঠতে পারলেন না । কথা বলতে পারলেন না । কথা বলার চেষ্টা করলেই গোঙানির মতো আওয়াজ বের হতে লাগলো । মুখের কোনা দিয়ে লালা পড়তে লাগলো অনবরত । পাড়ার প্রথম এমবিবিএস ডাক্তার রমেশ কাকু বাবার বন্ধু । কাকু বললেন বাবার প্যারালাইসিস হয়েছে । সেদিন মা অনেক্ষন কাঁদলেন । দুপুরে রান্না হলো না । আমি ছাড়া সেটা কেউ খেয়ালও করলো না । আমার ভীষন ক্ষিধে পেয়েছিলো । ছোটচাচার কাছে কিছু টাকা চাইলাম । দাদা বাসায় নেই । থাকলে কিছু একটা জোগাড় করে ফেলতো । ছোটচাচা খেকিয়ে উঠলো আমার উপর
"টাকা কোথায় পাব আমি ? আমার কি চাকরি আছে ? নাকি ঘরে টাকশাল খুলে বসেছি ? দূর হ সামনে থেকে !"
নন্দুবাবুর দোকান থেকে আলুভাজি আর ছয়টা রুটি নিয়ে এলাম বাকীতে । ডায়নিং টেবিলে বসে খেতে খেতে মা কে ডেকে বললাম
"বাকীতে ক'টা রুটি এনেছি নন্দুবাবুর দোকান থেকে । খেয়ে নাও , বাবাকেও খাইয়ে দাও ।"
মা কিছুক্ষন ঠান্ডা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে হনহন করে চলে গেলো । দাদা বাড়িতে থাকলে নিজেই কিছু একটা রেধে ফেলতে পারতো । তাহলে অন্তত মায়ের ওরকম দৃষ্টি দেখতে হতো না । দুটো রুটি পেটে চালান করে আর দুটো একটা প্লেটে ঢেকে নিয়ে চিলেকোঠায় এলাম । ছোটচাচা ঘরেই ছিলো । আমি ধপ করে প্লেটটা সামনে রেখে বেরিয়ে এলাম । আমার ভীষণ কান্না পেতে লাগলো । ছাদের এক কোনায় দাড়িয়ে ছোটবাচ্চাদের মতো শব্দ করে কাঁদলাম কতক্ষন । তারপর মনে হলো আমি আর ছোট নেই । সামনের বছর এইচএসসি দেব । এভাবে কাঁদে ক্লাস টুয়ে পড়া ছেলেরা । সহজ অংক ভুল করে স্যারের হাতে শক্ত মার খেয়ে এভাবে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফেরে ক্লাস টুয়ে পড়া ছেলেরা । এতসব ভেবে চোখ মুছতে গিয়ে আমি আবার হু হু করে কেঁদে ফেললাম ।
***
দাদা হারিয়ে গেছে । মাসতিনেক হলো দাদার সাথে কোন যোগাযোগ নেই । একদিন ভোরবেলা দাদা আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বললো
"ছোটন , দরজাটা লাগিয়ে দে । আমি একটু বাইরে যাচ্ছি । মা কে দেখে রাখিস ।"
আমি ঘুমের ঘোরে দরজা লাগিয়েছিলাম শুধু । কিছু জিজ্ঞেস করা হয় নি । করলেও উত্তর পেতাম কি না সন্দেহ । সেদিন ছোটচাচা নেমে এসেছিলো আমার ঘরে । আমি তখন বসে বসে নিউটন , আইনস্টাইন পড়ছি । পেছনে দাড়িয়েই ছোটচাচা বললো
"তোর দাদা একটা চিঠি পাঠিয়েছে । তোর কথা লিখেছে । ভালো করে পড়াশুনা করতে বলেছে ! আরো কি কি সব যেন । তোর মার কথাও লিখেছে ।"
আমি মুখ ঘুরিয়ে তাকালাম ছোটচাচার দিকে । ছোটচাচা চোখ ফিরিয়ে নিলো । এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো । বললাম
"নিজের কথা কিছু লিখেছে ?"
"হ্যাঁ ! লিখেছে ইন্ডিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছে । ওখানে নাকি কে আছে ওর । বলেছে চাকরীর ব্যবস্থা করে দেবে ।"
ইন্ডিয়ায় রিপনদা থাকে । দাদার বন্ধু । কি এক ঔষধ কোম্পানিতে চাকরী করে । গত দূর্গাপূজার ছুটিতে এসেছিলো । আমি কিছু বললাম না আর । ছোটচাচা কিছুক্ষন আমতা আমতা করে বললো
"ভাবছি আমিও একটা চাকরী করবো । কি বলিস ছোটন ?"
আমি আর কি বলবো ? কিছু বললাম না । চুপ করে ঠায় বসে রইলাম । উত্তরের আশা ছেড়ে দিয়ে চলে গেলো ছোটচাচা । আমি নিউটন , আইনস্টাইনে মনোনিবেশ করলাম আবার ।
***এক বছর পর
আমার এইচএসসি চলছে । দুটো পরীক্ষা বাকী আছে । তারপর প্র্যাকটিক্যাল । তারপর কি করবো সেটা এখনো চিন্তা করতে পারি না । বাবার প্যারালাইসিস হবার পর সংসারের অবস্থা ভালো না । পেনশনের সামান্য কিছু টাকা পাওয়া যায় সেটা দিয়ে পুরো মাসের শাক ভাতই জোটে না ঠিকমতো । ছয়মাস আগে দুটা টিউশানি শুরু করেছিলাম । ওই টাকাতেই ফরম ফিলাপ করেছি । সংসার চালাতে না পেরে একদিন চোখে আঁচল চাপা দিয়ে মা বলেছিলো
"এত পড়ালেখা করে কি করবি ? তারচেয়ে সংসার দ্যাখ ।"
আমি মুখে কিচ্ছু বলিনি । মনে মনে শক্ত হয়েছি । বিড়বিড় করে বলেছি
"তাই তো করছি মা ! সংসার দেখবো বলেই তো করছি ।"
***দুই বছর পরঃ
ছোটচাচা একটা মুদী দোকান করেছে বছর খানেক আগে । ভালোই চলছে । আমি ভর্তি হয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে । শহীদুল্লাহ হলে সিট পেয়েছি । সাথে পেয়েছি তিনটে মহামূল্যবান টিউশানি । কোচিং সেন্টারগুলো যোগাযোগ করছে নিয়মিত । সময় করে উঠতে পারছি না । ওরাও বেশ ভালোই টাকা দেবে । দেখি সামনের মাসে এক্সট্রা কিছু সময় রাখতে হবে হাতে ।
আমি এখন বাসে । বাড়ি ফিরছি শেষবারের মতো । বাবাকে দেখতে আর মাকে আনতে যাচ্ছি । মোহম্মদপুরের দিকে ছোট্ট একটা বাসা নিয়ে মা ছেলে একসাথে থাকবো । বাবাকেও নিয়ে আসা যেত কিন্তু গত রাতে হঠাত্‍ করে বাবা মারা যাওয়ায় আর সম্ভব হলো না । ছোটচাচা বললো হার্ট এটাক করেছে । আমি তখন ক্লাসে ছিলাম । খবরটা শুনে একটুও কাঁদিনি । কেন জানি কান্না আসেই নি । ধীর পায়ে ক্লাস থেকে বের হতে গিয়েছি । স্যার জিজ্ঞেস করলেন
"সংশয় ! কোথায় যাচ্ছো ?"
আমি কিছু না বলে ঠায় দাড়িয়ে থাকলাম । স্যার মনে হয় আমার চোখে কিছু দেখেছিলো । কাছে এগিয়ে এসে কাধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো
"এনিথিং রং ?"
হঠাত্‍ করে মনে হলো ঝড় এসেছে । ভেঙে ফেলছে সবকিছু । উপরে ফেলছে আমার ভেতরের দুইশো বছরের পুরনো শক্ত শেকড়ের বটগাছ । আমি আর ধরে রাখতে পারলাম না । ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম ক্লাসভর্তি ছেলেদের সামনে । চিত্‍কার করে বললাম
"আমার বাবা মারা গেছে স্যার । বাবা মারা গেছে । বাসায় যাচ্ছি স্যার । বাবাকে শেষবার দেখতে ।"
***
বাবাকে যেদিন দাফন করা হলো সেদিন অনেক আশা করে ছিলাম দাদা আসবে । এবার দাদা আসলে আর কোথাও যেতে দেব না । দরকার হলে সাথে করে ঢাকায় নিয়ে আসবো । কিন্তু দাদা আসেনি । ছোটচাচা বললো বর্ডার পার হতে গিয়ে নাকি ধরা পড়েছে বিএসএফের হাতে । বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে আল্লাহই জানে । ঢাকায় ফিরছি । একা । মাকে বলেছিলাম সাথে আসতে । অনেক জোরও করেছিলাম । কিছুতেই রাজী হলো না । বললো বাবাকে ছেড়ে নাকি কোথাও যাবে না । তারপর আর কথা বাড়াই নি । ছোটচাচাকে বলে এসেছি মাকে দেখে রাখতে । প্রতি মাসে কিছু টাকাও পাঠাতে চেয়েছি কিন্তু ছোটচাচার চিত্‍কার চেঁচামেচিতে দমে গিয়েছি । বলে
"এখনো কি আমি বেকার আছি যে এখনো তোদের টাকায় চলতে হবে ?"
এরপর আর কিছু বলা যায় না । ছোটচাচা আমাকে বাসে উঠিয়ে দিতে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এসেছিলেন । আমি আমার সিটে বসে ছিলাম । জানলা দিয়ে ছোটচাচাকে দেখা যাচ্ছিলো । বাস ছাড়ার আগে আগে হাত নেড়ে আমাকে ডাক দিলো ছোটচাচা । আমি বাস থেকে নেমে গিয়ে দাঁড়ালাম তার সামনে ।
"ছোটন , আমাকে মাফ করে দিস !"
"কি বলছো এসব ছোটচাচা ? পাগল হয়ে গেলে নাকি.... ?"
ছোটচাচা হাত তুলে থামিয়ে দিলেন আমাকে ।
"বলতে দে ছোটন । তোর মনে আছে ? একদিন তুই আমার কাছে রুটি কেনার জন্য টাকা চেয়েছিলি । টাকা নেই বলে আমি তোকে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম । মনে আছে ?"
মাথা নিচু করা ছিলো । আমি শুধু মাথা নেড়ে সায় দিলাম । "সেদিন আমার কাছে টাকা ছিলো ।"
আমি মাথা তুলে তাকালাম ছোটচাচার দিকে । ছোটচাচা কাঁদছে । দু চোখ বেয়ে ঝরঝর করে ঝর্ণার মতো নেমে আসছে অশ্রু ।
"আমাকে মাফ করে দিস ছোটন !"
আমি ছোটচাচাকে জড়িয়ে ধরলাম । ছোটচাচা আমার কাধে থুতনি রেখে শব্দ করে কাঁদতে লাগলো । কান্না সংক্রামক । আমিও ছোটচাচাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদতে থাকলাম । পুরো বাসস্ট্যান্ডের সমস্ত মানুষ তখন স্তব্ধ হয়ে এই দৃশ্য দেখছিলো । শুধু বাসস্ট্যান্ড কেন পুরো পৃথিবী তাকিয়ে থাকলেও আমাদের কারো কিছু এসে যেত না ।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথঃ দ্য আয়নাঘর ফাইলস"..

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৯

"আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথঃ দ্য আয়নাঘর ফাইলস"
-একজন গুমের শিকার মানুষের চোখে একটি ভয়াবহ সত্যের দলিল।

“আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ: দ্য আয়নাঘর ফাইলস”- নামটি যতটা আকর্ষণীয়, বইটির ভেতরের সত্য তার চেয়েও বেশি নির্মম, বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটা ফোন কলের দূরত্বে ১০ হাজার মানুষের চাকরি!

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



একটা ফোন কলের দূরত্বে ১০ হাজার মানুষের চাকরি!
বিষয়টি আপনি সমাধান করছেন না কেন, পিএম সাহেব? আপনার তো মাত্র একটা ফোন কলই যথেষ্ট—অন্তত ভুক্তভোগীদের এতদিনের অপেক্ষা দেখে সেটাই মনে হয়!
একটা ভুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

কার জন্য; কেন এতো লেখালেখি

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:২১

লিখে রাখো বৎস'রা ; এ দূর্মুর্খ আর বর্ন ব্লাইন্ড ও বেইমানদের বাংলাদেশ-এ ভালো কিছুই তৈরী হবে না ! লিখে রাখো বৎস'রা !!
যে যে ব্যক্তির মনে বিষাক্ত রাজনীতির বীজ ঢুকেছে;... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষের অহংকার ও বুদ্ধিমত্তার ভ্রান্ত ধারণা

লিখেছেন শেরজা তপন, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৫২


উৎসর্গঃ ব্লগার রাজীব নুর( ঈশ্বর বিশ্বাসের কোল ঘেঁষে যাওয়া কোন লেখা এলেই যিনি লেখককে ভীষন সন্দেহের চোখে দেখেন- ভাবেন; কি অদ্ভুত কথা- ইনি দেখি ঈশ্বর বিশ্বাসী!!))
ধর্ম ও বিজ্ঞান: সংঘর্ষ না... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঠেলায় নাম বাবাজি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৯


সময়টা সরকারের জন্য মোটেও ভালো যাচ্ছে না। একদিকে গ্যাস আর বিদ্যুতের সংকটে মানুষ প্রতিদিন কষ্টে দিন কাটাচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের একের পর এক সিদ্ধান্ত নেটিজেনদের বাধার মুখে পড়ছে। ফলে সরকার নতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×