দরজায় ধুম ধুম করে কে যেন ধাক্কাচ্ছে...উফ কেন যে প্রতিদিনই ঘুমটা কারও না কারও ডাকে ভাঙে? সকালের রোদ আলো গন্ধ কিছুই নাকে মুখে ছুঁয়ে কেন চড় থাপ্পড় দিলেও আগের মতো এমনি এমনি করে ঘুমটা ইদানিং কিছুতেই ভাঙে না।
নাহ্, এবার উঠতেই হবে। ময়লা.. ময়লা.. ময়লা দেন চিৎকার করে ফাটিয়ে ফেলছে ময়লা নেয়ার ছেলেটা। উঠে টের পেলাম দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেছে।
অবশ্য যতদূর মনে পড়ে সারারাত ডিজাইন এর কাজ করে সকাল ৯টার দিকে ঘুমিয়েছিলাম। অতএব একটু বেশি ঘুমালে কোন অপরাধ হবে না। ময়লার ড্রামটা গেটের বাইরে রেখে এসে ঘড়িতে দেখি ৪টা ২৩ বাজে। হায় হায় করে উঠল পেটের ভেতরটা। সেই ২১ ঘন্টা আগে খেয়েছি তারপর টানা কাজ করে ঘুমিয়েছি। কিন্তু ক্ষুধার হাহাকার খুব একটা পাত্তা পেল না কারণ ডিজাইনটা নিয়ে অফিস আওয়ার-এর আগে আশরাফ সাহেবের সাথে দেখা করার কথা।
এক দৌড়ে বাথরুমে নতুন মাউথ ওয়াশটা নিয়ে কুলকুচি শুরু করে দিলাম। সময় বাঁচানোর জন্য জিনিসটা বড়ই কাজে দেয়। কোনমতে রেডি হয়ে ডিজাইনগুলো খামে ভরে গেটে তালা দিয়ে বের হয়ে পড়লাম। পাঁচ তলা থেকে নেমে মনে পড়ল ফোন আনতে ভুলে গেছি। ভাগ্য ভাল টাকা নিয়েছিলাম পকেটে।
যাকগে যা হবার হয়েছে এখন দেরি না করে সামনে এগিয়ে যাওয়াই শ্রেয়।
চুলে আঙুল বুলিয়ে ঠিক করতে করতে ম্যারাথন দৌড়বিদদের কাছাকাছি স্পিডে বাড়ির মেইন গেট দিয়ে বের হতে গিয়েই পা থেমে গেল। একটা সাদা ধবধবে বিড়ালের বাচ্চা চার পা ছড়িয়ে মরে আছে। আহারে বলে চোখ সরাতেই আবার তাকালাম, ভাল করে তাকাতে বুঝতে পারলাম বাচ্চাটা মরেনি শ্বাস চলছে। হাঁটু গেড়ে বসতে গিয়ে হাত থেকে খামটা পরে গেল। তখন মনে পড়ল খাম, ডিজাইন, সময় নেই। কোন রকমে নিজেকে বিড়ালটার সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে নিজের কাছেই দীর্ঘশ্বাস গোপন করে অপরাধবোধ, বিড়াল, থেকে পালাবার চেষ্টা করতে লাগলাম।
বাড়ির গেট এর গলির মাথায় এসে মোড় ঘুরতে গিয়ে কেমন হাঁটার দ্রুততায় সিদ্ধান্তহীনতা দেখা গেল। এই সিদ্ধান্তহীনতার ফলে অথবা অন্য কোন কারণেই হোক ভাত ঘুমে অভ্যস্থ আরাম আলস্যে ফুলে ওঠা এক শরীর এসে আমাকে বিষম আকারের এক ধাক্কা দিল। সেই ধাক্কায় আমি ছাদের ন্যাশনাল ফ্যানের মত ঘুরে উঠলাম প্রায় কয়েক পাক। ধাতস্ত হয়ে দেখি আমি বাড়ির দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছি।
যাই হোক গোড়ালীতে ভর দিয়ে মেইন রোডের দিকে ঘুরে আবার চলা শুরু করলাম। হঠাৎ বুঝতে পারলাম সোজা হাঁটতে পারছি না। ডান পা'টা কেমন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যাচ্ছে। একটু দাঁড়িয়ে ডান পা-এ ভর দিতেই গোড়ালিটা লাথি খাওয়া কুকুরের মত ব্যাথায় কেউ কেউ করে উঠল। যখন চোখ জালাপোড়া ছাড়াই ভিজে উঠল তখন বুঝলাম ব্যাথা অনেক তীব্র।
মনে মনে এটা কোন ব্যাপার না বলে ডান পা টেনে টেনে আবার চলা শুরু করলাম। প্রায় আধা কিলো রাস্তা পার হয়ে তারপর রিক্সা নিতে পারব। নিজেকে বড়ই প্রাঞ্জল কিছু গালি দিতে ইচ্ছা করল ভিআইপি রোডের পাশের কানাগলিতে বাসা নেয়ার জন্য। আমার মতে দন্ত বর্গের অক্ষর সম্বলিত শব্দ জোর দিয়ে বললে শ্বাস-প্রশ্বাস এর দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায় ফলে বড় বড় নিশ্বাসে উত্তেজনা কমে আসে। তাই বিড়বিড় করে ইচ্ছামত গালি দিতে লাগলাম নিজেকে, পায়ের ব্যাথাটাকে।
একগুচ্ছ রিক্সার কাছাকাছি এসে খেয়াল করলাম এখন মাথাটা একটু হলেও ঠান্ডা হয়েছে। রিক্সাগুলো কাচকি মাছের ভাগা'র মত এক একটা জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার দুই পাশে। আমার সামনের রিক্সা ডেকে ভাড়া ঠিক করতেই ২৫ টাকার ভাড়া ৭০ টাকা চাইল। পায়ের ব্যাথাটা মনে হল ক্যাঙ্গারুর মত এক লাফে মাথায় উঠে গেল। পরের রিক্সা ৬০ টাকা চাইল।
ততক্ষণে ব্যাথাটা বাম চোখের কোনা থেকে ঘাড় পর্যন্ত একটা লোহার শিকের মত গেঁথে গেল। দাঁড়িয়ে থাকা সবগুলো রিক্সার একটাও বাকি রাখলাম না কিন্তু কেউ ৫০ টাকার কমে রাজিই হল না। শেষে ৫টাকা কম দিয়েন বলাতে ২৫ টাকা দুরত্বে ৪৫ টাকায় যাওয়ার জন্য এক পা রিক্সায় উঠাতেই রিক্সাওয়ালা কেমন জানি খেক খেক করে হেসে উঠে রিক্সা টান দিল সামনের দিকে আর আমি পড়ে গেলাম একগাদা ময়লার মধ্যে। পলিথিন, পঁচা ভাতের টকটক গন্ধ ময়লা আর ময়লা। হাত পা ছুঁড়তে লাগলাম মনে হল মাথার ভেতরের ব্যাথার শিকটা ধরে কেউ ধুম ধুম শব্দে নাড়াচ্ছে। গন্ধ টক গন্ধ। ময়লা... ময়লা... ময়লা... নাহ্ ...
.....
...
ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম বিছানায়। ময়লা ময়লা করে চিৎকার করে ফাটিয়ে ফেলছে ময়লা নেয়ার ছেলেটা। ময়লা না দিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ৪টা ২৩ বাজে...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





