জাউরা........এই শব্দটির সাথে প্রথম পরিচয় ক্লাস ওয়ান এ। স্কুলে যেতেই হঠাৎ খেয়াল করলাম ক্লাসের ছেলেগুলো সবাই একজন আরেকজনকে জাউরা বলছে আর যাকে বলছে সে খুব ক্ষেপে যাচ্ছে। এর মধ্যে রিতা সবাইকে এটা বলতে বারবার না করছে। যাই হোক, ক্লাস শুরু হয়ে যাওয়াতে আসলে জাউরা শব্দটির এত কি জাদু বুঝতে পারলাম না। অবশ্য টিফিন টাইম এ বন্ধুদের কাছে এর মানে জানতে পারলাম। ইদ্রিস আমাকে ব্যাখ্যা দিল এরকম, জাউরা হচ্ছে এমন একটি গালি যা খুবই খুবই এবং খুবই খারাপ। যার বাবা-র ঠিক নেই সে হচ্ছে জাউরা। আর এটা কাউকে দেয়া ঠিক না। যদিও আমি পুরো ব্যাখ্যা জানার পরও স্কুল ছুটির পর ঠিকই একজন আরেকজনকে জাউরা জাউরা শ্লোগান দিতে দিতে ফিরলাম।
পরবর্তীতে সেভেন অথবা এইট এ থাকার সময়ে আমাদের ক্লাসের সমাজবিজ্ঞান শিক্ষিকার সাথে বেশ চরম একটা তর্কাতর্কির ঘটনায় স্কুল থেকে টিসি দিয়ে প্রায় বের করে দিচ্ছিল। কারণ সেই গালি।
না, এবার আমি গালি দেইনি........আসলে আমাদের সামাজিক বিজ্ঞান ম্যাডাম ছিলেন খুবই রগচটা স্বভাবের। আর তিনি রেগে গেলেই মা-বাবা চৌদ্দ গুষ্টি তুলে নানা রকম গালি দিতেন। একদিন আমার পাশের জন পড়া পারেনি বলে হঠাৎ ম্যাডাম রেগে গিয়ে ক্লাসের সবাইকে যাচ্ছেতাই গালিগালাজ করে নিয়ে তারপর আমাদের বাবা-মাকে নিয়ে পরলেন। এবং তিনি বারবার আমার পাশের জনের দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছিলেন যদিও কিন্তু আর সবার সাথে তিনি আমাকেও বলছেন। অর্থাৎ আমার বাবা-মাকে গালি দিচ্ছেন। ব্যাস এই কথা মনে হওয়ার সাথে সাথে মাথায় আগুন ধরে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলে ডান হাত দিয়ে একটা বেশ জোরে বাড়ি দিয়ে বলে উঠলাম, আপনি এভাবে কারও বাবা-মা সম্পর্কে কথা বলতে পারেন না। ব্যাস হয়ে গেল, ম্যাডাম সামনের বেঞ্চ থেকে একটা স্কেল নিয়ে এসে ধুম ধাম কয়েকটা বাড়ি দিয়ে আমাকে হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেলেন হেডমাস্টার এর রুমে। মোটামুটি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে রাগে দাঁত কিড়মিড় করে ম্যাডাম এর চিৎকার চেঁচামেচি শুনলাম। তারপর হেড স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার তুমি তো এরকম না, অথচ এত বড় বেয়াদবি করলে কেন? আমি তখনও রাগে কাঁপছি। তারপরও কঠিন স্বরে বললাম, স্যার বাবা-মাকে নিয়ে কেউ কিছু বললে আসলে কারই মাথা ঠিক রাখা সম্ভব না। ম্যাডাম সব সময় বাবা-মা তুলে কথা বলেন। আজ ক্লাসে তিনি গালি গালাজ করেছেন যা সহ্য করার মত না। তাই আমি ম্যাডামকে বলেছি আপনি এভাবে কথা বলতে পারেন না। আর এতে যদি বেয়াদবি হয়ে থাকে তাহলে আমার কিছু করার নেই।
যদিও এ্ই ঘটনার পর প্রায় দুইদিন টিচারদের সামনে গিয়ে অনেক জনের অনেক কথা শুনতে হয়েছিল, বাসা থেকে গার্জেন ডাকা হয়েছিল। এমনকি স্কুল থেকে বের করে দিবে এমন আশংকায়ও পরতে হয়েছিল। কিন্তু তারপরও আমি না বরং ম্যাডাম তার গালিগালাজ করার জন্য স্যরি বলেছিলেন। কারণ আমার বাবা-মা ব্যাপারটিকে মোটেও বেয়াদবি হিসেবে না দেখে অন্যায় এর প্রতিবাদ হিসেবে দেখেছিলেন এবং হেডমাস্টার স্যারকেও তা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
এই দিনটির পর আরও দুইএকবার অনেকের সাথে বাবা-মাকে গালি দেয়ার ব্যাপারে আমার তর্ক এমনকি মারামারি পর্যন্ত করার ঘটনা আছে। এমনকি অনেক আত্মীয় বন্ধুরাও খুব সাবধানে অন্তত পক্ষে বাবা-মা সম্পর্কিত ব্যাপারে কথা বলতেন তা তাঁরা বয়সে যত বড়ই হোক না কেন।
আজ প্রায় ২৬-২৭ বছর পর নিজেকে দেখে একটু না বরং বেশ অবাক হচ্ছি। বাবা-কে জড়িয়ে ভয়ানক আজে বাজে কথা এমনকি জাউরার ঘরের জাউরা শুনেও আমি তাকে কিছুই বলতে পারছি না, করতে পারছি না।
আসলে তার বাবাকেই তো সে বলছে যে এমন কথা আমাকে বলতে পারে। কিন্তু তবুও নিজেকে ভয়ংকর নিকৃষ্ট মনে হচ্ছে কারণ আমি কিছু কি করব, কিছুই কি করব না??
উপরের লেখায় আমাকে সময়ের সাথে বদলে যাওয়া, বদলে যেতে হয়, এক সময় না এক সময় মেরুদন্ড বাঁকিয়ে নিতে বাধ্য হবেই এবং তাই স্বাভাবিক, তাই বাস্তবও। এমন মনে হতে পারে। কিন্তুএমন মনে করে নিয়ে বসে থাকা মানুষ আমি হব না.......যারা রাগ নিয়ন্ত্রন করতে না পেরে এসব কথা বলেন তারা যে প্রকৃতপক্ষে নিজেদের বাবা-মা সম্পর্কেই বলছেন তা তাদের বুঝতেই হবে একদিন না একদিন।
.......
মেরুদন্ড ভেঙে গুঁড়ো করে নিজের গায়ে মাখব
তবু তাকে বাঁকা করে নিজেকে বদলাতে দেব না
নিজেকে প্রয়োজনে শেষ শ্বাস পর্যন্ত নিঃসঙ্গ রাখব
তবু আমাকে বদলাতে এলে
তার সম্ভ্রম, সম্মান, এমনকি নিজের নামটাও সাথে নিয়ে ফিরতে দেব না
আমাকে মিথ্যা বাস্তবতা শেখাতে এসো না চুরমার করে দেব
তোমাকে.........তোমার আত্মবিশ্বাসকে
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে আগস্ট, ২০১২ সকাল ১১:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





