
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মৃত সুমন চাকমা
চিকিৎসার অভাবে অনেক মানুষ মারা যাবে যাদের করোনা হয় নি, এরা ধরুন, অতি সাধারন জ্বর জ্বারি, হার্টে সমস্যা আবার জটিল অন্য কোন রোগ অথবা ক্যান্সারে। পত্রিকায় এ ধরনের নিউজ ইদানিং অহরহ দেখছেন, তাই না? আবার পোলাপান পারেও বটে, ঘোষনা দিয়া মারা যায়, নিজের মৃত্যুর ভবিষ্যতবানী নিজে করে এক দম অক্ষরে অক্ষরে ফলিয়ে যাচ্ছে (দেখুন করোনো হয়নি কিন্তু করোনার জন্যই মরতে হবে, ফেসবুকে এই পোস্ট দিয়ে মারাই গেলেন সুমন) আমিও দেখছি, আর অমানুষের মত অন্য কোন নিউজে খুব মনোযোগ দেই। এগুলো নিয়ে ভাবি না, ভাবার মত মানসিকতা নেই, কারন চারিদিকে মহামারি নিয়ে হৈ চৈ, মৃত্যুর হিসাব।
চারিদিকে যানবাহন বন্ধ কারন দেশে সরকার ঘোষিত অঘোষিত লকডাউন চলছিলো, এর মাঝে বিশাল এক শ্রেনীর চাকুরীজীবিদের ওপর হুকুম আসল, আগামীকাল থেকে চাকুরীতে জয়েন কর। অনেকটা ছুটির আমেজে ওই মানুষ গুলো বাড়ী গিয়েছিল, তারা তখনো বুজতে পারেনি কি ভয়াবহ দিন আসছে। এর মাঝেই হুকুম চাকুরীতে আস। ওদিকে সরকারী ঘোষনা সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখ। ছোটলোক মানুষগুলোর তখন "শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা"। যানবাহন বন্ধ। কিভাবে মানুষগুলো কাজে আসবে! তাও পেটের টানে কেউ পায়ে হেটে, কেউ কিছু টা ভ্যানে মানে যে যেভাবে পারছে রওনা দিল ঢাকার উদ্দেশ্যে। কারো সাথে বউ বাচ্চা। ছোটলোকগুলোকে বড়লোক মানুষ গুলা টেনে হিচড়ে ঢাকা এনে পরদিনই হুকুম দিল কাজে যেতে হবে না কারন মহামারী। ছোটলোকদের কারনে এটা আরো স্প্রেড হতে পারে
এইবার এই সব ছোটলোকগুলো পড়ল মারাত্মক ঝামেলায়, যেহেতু সংক্রামক মহামারী তাই তাদেরকে অনেক বাড়ী ওয়ালাই বাড়ীতে ঢুকতে দিচ্ছিল না, অনেক গুলো ভাবছে কালকে কি খাব? করোনা ধরলে নাকি ১০ / ১৫ দিন বাঁচা যায় কিন্তু খাদ্য, বাসস্থান ছাড়া কয়দিন বাঁচা যায়? এই সব মানুষ গুলো কি খাবে? কিভাবে আবার নিজ এলাকায় ফিরে যাবে? আবার গেলেও কি সুস্থ্যভাবে যাবে কিনা, তার প্রিয়জন কে অসুস্থ্য করবে কিনা তার দায় কে নেবে? আমি অবশ্য এনিয়ে খুব একটা ভাবিত না কারন আমি একজন তথাকথিত মধ্যবিত্ত এখনো পরিবার নিয়ে ভালো আছি।

রাস্তায় মানুষ মরে পরে থাকে (দেখুন চট্টগ্রামে রাস্তায় রিকশাচালক ও গার্মেন্ট কর্মকর্তার মৃত্যু) , আবার বাসা বাড়ি থেকে রাস্তায় ফেলেও দিয়ে যায় বুড়া, বুড়িগুলোকে (দেখুন পথে পড়ে ছিলেন বৃদ্ধ নারী, কাছে যাচ্ছিলেন না কেউ) কেউ তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়াতে সাহস করে না। মৃত্যু পথ যাত্রী ছট ফট করছে, দূরে দাড়িয়ে দেখছে। পরে পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার করে কিন্তু ততক্ষনে তারা সাহায্যের উর্ধ্বে। রাস্তায় জন্ম নেয় নবজাতক (দেখুন অবশেষে রাস্তায় জন্ম নিলো নবজাতক) আমার কাছে এগুলো অতি সাধারন লাগছে কারন আমি বাসায় বসে খবরের কাগজে নিউজ দেখছি। সামনা সামনি এখনো দেখিনি। দেখবো কিভাবে আমি তো বাসার দরজা আটকে নিরাপদ থাকার প্রানান্তকর চিন্তায় ব্যাস্ত।
খারাপ লাগছে মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জন্য, তাকে বিভিন্ন বিব্রতকর প্রশ্ন বানে জর্জরিত করছে দেশী বিদেশী সাংবাদিকরা। উনি নিজেই স্বীকার করছেন এখন সদুত্তর দিতে পারছেন না (দেখুন প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি, সদুত্তর দিতে পারি না: স্বাস্থ্যমন্ত্রী)। হাতি কাদায় পড়লে চামচিকাও লাথি মারে। আজকে সুযোগ বুজে উনাকে এইভাবে বিব্রত করার তীব্র নিন্দা করা ছাড়া আমাদের করার কিছু নাই, কারন আমরা গোবেচারা সাধারন মধ্যবিত্ত।
প্রায় দুই মাস আগে সারা মুসলিম জাহানের মসজিদে জামায়াতে নামায পড়া এক রকম নিষিদ্ধ, হাদীসেও এনিয়ে পরিস্কার বার্তা আছে, আজকে যখন মহামারী আঘাত হানছে তখন বলা হয়েছে জামাতে যেন পাঁচ জনের বেশী না হয় আর জুমার নামাযে যেন দশ জনের বেশী না হয়, এই পাঁচ জন দশ জন কিভাবে নির্ধারিত হবে? জামাতে যদি পাঁচ জনের বেশি হয় তবে কি তাদেরকে মসজিদ থেকে বের করে দেবে? কেন এখনো পাঁচ জন, দশ জনের নিয়ম (দেখুন কিছু দিন আগে পোষ্ট দিয়েছিলাম মহামারীতে জুমার নামায এবং জামাতে নামায হাদীসে কি বলে?) ? বুজিনা কিছু, বোধ বুদ্ধি ভোতা হয়ে যাচ্ছে কারন মহামারী আঘাত হানা শুরু করছে। মনে হয় পানিটা খাচ্ছে, কিন্তু একটু ঘোলা করে এই যা।
সারা বিশ্বের চিকিৎসা ব্যাবস্থা ভেঙ্গে পড়ছে, সেখানে আমাদের চিকিৎসা ব্যাবস্থার ভীত কি এতই সুদৃঢ় যে, পরিস্থিতি আর একটু বেসামাল হলে মিনিমাম চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে? হবে হয়ত কারন কিছু দিন আগেও বিভিন্ন দায়িত্বশীলরা বলেছেন পরিস্থিতি এখনো বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ভালো আছে। যদি অন্যান্য দেশের মত হয় তখন কিভাবে সামাল দেবে? আমি আসলে ভাবতে চাচ্ছি না কারন ভাবার দায়িত্ব আমার না। এর জন্য অনেক দায়িত্ববানরা আছে।
এদেশে সরকারী চাকুরীর বাইরে বিরাট একটা অংশের মানুষ বেসরকারী চাকুরী করে, মাস শেষে তাদের বেতন কে দেবে? পরিবারের সদস্যগুলো কি খাবে? এটা এখন আমারো ভাবনার বিষয়। ভাবছি কারন এই জায়গায় এসে আমাকে এখন ঠেকতে হয়েছে। কার কাছে হাত পাতব? আমি মধ্যবিত্ত, খুব শরম লাগে, আবার ইজ্জতও আছে। বড় মানুষদের মত কয়েক বছর নিশ্চিন্তে খাবার মত জমানো টাকা আমার নেই আবার ছোটলোকদের মত বড় মানুষদের কাছে ত্রানের নামে দয়ার দানও নিতে পারা যাবে না। কি যে করব তাই ভাবছি। মাস শেষে কে আমাকে টাকা দেবে?
বিশ্বের উদাহরন মহামান্যরা কথায় কথায় দিচ্ছেন, তাদের তুলনায় এখনো আমাদের অবস্থা খারাপ না, আল্লাহ যেন তাই করে। আপনাদের কথা যেন আল্লাহ শুনেন, কিন্তু বড় বড় ধনী রাষ্ট্র গুলোতে মহামারীর তান্ডব গত তিন মাস যাবত চলছে, যেভাবেই হোক তারা খাবার পাচ্ছে। যদি কোন কারনে আমাদের ওই রকম পরিস্থিতির মাঝ দিয়ে যেতে হয় তবে তিন/ চার মাস খাব কি? বা তারপর? জানি আমাকে খাওয়ানোর দায়িত্ব আপনার না কারন এখন মহামারীর কাল, অমানবিকতার সময়।
ক্ষুধার কষ্ট কি জিনিস আপনি জানেন? না আমিও জানি না, তবে এটুকু জানি এই বয়সে এসে ক্ষুধার কষ্ট খুব বেশী আর লাগবে না, কিন্তু ক্ষুধার কষ্টে যখন আপনার বাচ্চা ছেলেটা কাঁদবে তখন আপনি কি করবেন? জানি তখনো আমার আহাজারি আপনার কানে যাবে না কারন আপনার অনেক টাকা আছে তখনো নিশ্চিত সময় পার করতে পারবেন, আর যারা বুজবে তারা কিছুই করতে পারবে না, কারন এই অমানবিকতার সময় কেউ কাউকে সাহায্যে আসবে না।

ভারতে চার মেয়ের বাবার খাটিয়া কাধে করে দাহ করতে নিয়ে যাবার হৃদয় বিদারক ছবি চারিদিকে ভাইরাল (দেখুন করোনা আতঙ্কে এগিয়ে আসেনি কেউ, চার মেয়ের কাঁধে বাবার লাশ)। এটাই স্বাভাবিক। এটাই মহামারী। এটাই অমানবিকতার সময়। দয়া করে ছোট লোক এবং মধ্যবিত্ত নামক আধা ছোটলোকগুলো কিভাবে খাবে তাই একটু ভাবুন। মহামারীতে মানুষ মারা যাবে, এটা অতি স্বাভাবিক। কিন্তু একটা মানুষও যেন না খেয়ে মারা না যায় এই অনুরোধটুকু করজোরে আপনাদের কাছে নিবেদন।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই এপ্রিল, ২০২০ দুপুর ২:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




