ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হইলাম। এক সিনিয়র ভাই বল্লেন
- প্রেম টেম আছে?
উত্তর কী দিবো! ভ্যাবাচেকা খেয়ে তাকায়ে রইলাম। তিনি মুচকি একটা হাসি দিয়ে বল্লেন
- টেনশন কইরো না। এইখানে পড়াশোনার যেই চাপ, থাকলেও ছুইটা যাবে।
আমি যে সাধ করে ব্র্যাকে ভর্তি হয়েছিলাম তা না। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে থাকলাম ওয়েটিং লিষ্টে। খুলনা বিআইটিতে চান্সই পাইলাম না। মেডিকেলেও না। বড় ভাই হতাস হয়ে বল্লেন, কী করবি? আমি মন খারাপ করে বসে রইলাম। পরের বছর আবার ট্রাই করা ছাড়া গতি নাই।
আমার বাবা প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। তার পক্ষে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে পড়ানো সম্ভব না। ত্রানকর্তা হয়ে এগিয়ে আসলেন আমার চাচা। মূল টাকাটা তিনিই দিলেন। আর গ্রামের বাড়ীর কিছু জমি বন্ধক দিয়ে বাকী টাকা ম্যানেজ করা হইলো। ভর্তি হইলাম ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে। বছর না ঘুরতেই টাকা পয়সায় টানাটানি। ভাবলাম সেমিষ্টার ড্রপ দিবো। আশা নিয়ে স্কলারশিপের জন্য এপ্লাই করলাম। ৮০% স্কলারশিপ দিলো ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি। আর এই কারনেই হয়ত পড়াশোনাটা শেষ করতে পারলাম।
খুব ব্যক্তিগত কথাগুলা কেন বলছি! কয়েকজনের কথাবার্তার জবাব দেওয়ার জন্যই বলছি।
- যাদের ধারণা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ষ্টুডেন্ট মানেই বড়লোকের ছেলেপেলে। তারা হয় ভুল জানেন। না হয় তারা ভীতু। কাছে গিয়ে খবরটা পর্যন্ত নিতে পারেন না। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৮০% ষ্টুডেন্টই মধ্যবিত্ত পরিবারের। যাদের টিউশন ফি ম্যানেজ করতে জান বের হয়ে যায়।
- যাদের ধারণা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় মানেই স্মার্ট ছেলেমেয়েতে ভরা; তারা সারা দিন প্রেম করে বেড়ায়। তাদের ধারণা আংশিক সত্য। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা স্মার্ট হয় (অন্যদের সম্পর্কে মন্তব্য করি নাই কিন্তু)। তবে তারা সারাদিন প্রেম করে বেড়ায় না। পাশ করার তাগিদেই সারা দিন গ্রুপষ্টাডি করে বেড়ায়। আর যে প্রেমগুলা হয়েই যায় সেইগুলা আর দশটা জায়গার মতই হয়ত হয়। এই বিষয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা না থাকায় কিছু বলা গেলো না।
- যাদের ধারণা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের তারা কিছুই জানে না। তারা আজকের কালের কণ্ঠটা পড়ছেন তো? বাংলাদেশে মোট ৩৮টা পাবলিক আর ৮৪ টা প্রাইভেট ভার্সিটি আছে। বিশ্বের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে রেংকিং এ বাংলাদেশের প্রথমেই আছে বুয়েট (২১০৬ তম)। এর পরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (২৪৬২ তম)। আর এর পরেই আছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় (৩০৮৬ তম)। (Click This Link)
পাবলিক ভার্সিটির ষ্টুডেন্টরা জ্ঞানী,গুনি এই নিয়ে কোনই সন্দেহ নাই। কারন দেশের সর্বোচ্চ ব্রিলিয়ান্ট ষ্টুডেন্টরাই এইখানে পড়েন। আর বেসরকারিতে দুই ধরণের ষ্টুডেন্ট ভর্তি হন। যারা সুন্দর একটা পরিবেশে পড়তে চান। আর যারা পাবলিক ভার্সিটিতে চান্স পায় নাই। তাই আমার জানা মতে এমন কোন প্রাইভেট ভার্সিটির ষ্টুডেন্ট নাই, যারা পাবলিক ভার্সিটির কাউকে ছোট করে কথা বলেন। দুঃখজনক হইলেও সত্য, আমার দেখা এমন কমই পাবলিক ভার্সিটির ষ্টুডেন্ট আছেন যারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে দুই পয়সার দাম দেন।
তবে আশার কথা হইলো, পাবলিক ভার্সিটির কেউ দাম দিলোনা বলে কি দুনিয়া থেমে আছে? পৃথিবীর রেংকিংএ কিন্তু ঠিকই বাংলাদেশের তিন নম্বর ভার্সিটি হয়ে গেলো একটা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়। দেশে এবং বিদেশে বড় বড় পোষ্টে কিন্তু ঠিকই মর্যাদার সাথে কাজ পাচ্ছেন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ষ্টুডেন্টরা। বৃটিশ টেলিকমের হেড অব ইঞ্জিনিয়ারিং পদে কে কাজ করে জানেন তো? এবার বিসিএস পরীক্ষায় প্রথম কে হয়েছে জানেন তো?
আইনস্টাইনকে তা সবাই জানেন। তিনিও কিন্তু পরীক্ষায় ফেল করেছেন। ছাত্র হিসাবে মোটেও শুভ্র টাইপ ছিলেন না। কিন্তু তিনি ঠিকই সময়মত আইনষ্টাইন হয়েছেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়নি অথবা ভর্তি হয়নি বলেই কিন্তু একটা ষ্টুডেন্ট খারাপ না। সময়মত সেও কেউ একজন হয়ে যেতেই পারে। এই বিশ্বাস ও সম্মানটা কিন্তু সবার মনে রাখাই যায়। এতে কোন ক্ষতি হয় না। বরং এই সম্মানটা মনে ও মননে না রাখলেই ক্ষতি। আড়ালে আপনাকে সবাই তখন বেকুব বলে ডাকবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




