নূর হোসেনকে যদি আমরা ১০ নভেম্বর তারিখে বন্দি করতে পারতাম, আমরা যদি আজ গণতন্ত্রের পুষ্পোদ্যানে বসে স্বৈরশাসনের দিনগুলোর কেবল স্মৃতিচারণ করতাম তবে তা হতো আমাদের জন্য গৌরবের। কিন্তু ক্যালেন্ডারের পাতা দেখে কেবল ১০ নভেম্বর নয় পুরো মাস পুরো বছর জুড়েই নূর হোসেনের রক্তের ঋণ পরিশোধের নিরন্তর সংগ্রাম। আজও পারলাম না গণতন্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে। গত ৩০ বছর ধরে একই রকম রাজনৈতিক দিন আমরা পার করছি। আজকের দিনটির সাথে হুবুহু মিলে যাওয়া দিন আমাদের স্মৃতিতে অসংখ্য। কবে স্বৈরাচার নিপাত যাবে, গণতন্ত্র আসলেই মুক্তি পাবে! একবুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তাই নূর হোসেনের প্রতি আগাম শ্রদ্ধাঞ্জলি।
নূর হোসেন হয়তো কোন ক্ষ্যাপাটে তরুণের নাম। হয়তো সে গণতন্ত্র সম্পর্কেই বিস্তৃত ধারণা রাখত না। হয়তো সে কেবলই এক দলীয় কর্মী ছিল। নতুন ইতিহাস আবিষ্কারের দেশে হয়তো কোনদিন কেউ জানাবে নূর হোসেনের মৃত্যু পুলিশের গুলিতে হয় নি। কিন্তু এ কথা কেউ কোনদিন অস্বীকার করতে পারবে না গণতন্ত্রের মুক্তি আর স্বৈরশাসনের অবসান চেয়েছিল দেশবাসী সেসময়। কাজেই নূর হোসেন সমগ্র দেশবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়। মৃত্যু অনেক-সময় জীবনকে গৌরবান্বিত করে। নূর হোসেন সেদিন জীবিত থাকলে হয়তো তার কথা কেউ মনে রাখত না কিন্তু স্বৈরশাসনের অবসান আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন উৎসর্গ করে সে অমর হয়েছে। নূর হোসেনের বুকে পিঠে লেখা ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্র মুক্তি পাক’ আজও সমান প্রাসঙ্গিক। স্বৈরশাসন নির্মূলে আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শহিদ নূর হোসেন প্রাসঙ্গিক থাকবে চিরকাল।
নূর হোসেনের সম্মানে কয়েকটি লাইন…
‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’
সাত বছরের এক শিশু,
যে টেলিভিশন দেখছে, পত্রিকা পড়তে শিখছে,
যে পেয়েছে মনে রাখার অধিকার,
তার যাত্রা শুরু
এক গণ-আন্দোলনের চূড়ান্ত বিস্ফোরণের আওয়াজে।
সে মিছিল দেখে, ভাষণ শোনে,
পত্রিকার পাতায় বড় বড় অক্ষরে প্রতিবাদের শব্দ পড়ে।
সে অর্থ খুঁজে ফেরে,
তার প্রথম শেখা শব্দগুলোতে;
গণতন্ত্র, আন্দোলন, মিছিল, স্লোগান, ভাষণ, পতন আরো কত কী!
নতুন দিন, নতুন পত্রিকা, নতুন সব ছবি;
সব বোঝা যায় না, সব মনে থাকে না
এতটুকু বোঝা যায়, ঝাঁঝালো সব সংবাদ, প্রতিদিন প্রতিবাদ।
কিছু স্লোগান হৃদয়ে গেঁথে যায়,
কিছু ছবি স্মৃতির পাতায় অবিচ্ছেদ্য রূপ পায়।
‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’- বুকে পিঠে লেখা
নূর হোসেন নামক এক যুবকের ছবি।
সে নাকি শহিদ হয়েছে!
এক ডাক্তারের নাম প্রথম-বার শোনা,
তার ছবি প্রথমবার দেখা, তাঁর মৃতদেহের ছবি।
সাদা-কালো সব ছবি, সাদা-কালো সব স্মৃতি।
স্বৈরাচারের পতন হল, গণতন্র এলো।
অনেক বছর পর,
সেই শিশু আজ নূর হোসেনের বয়েসী।
আজও সে সেই আন্দোলনের গল্প শোনে,
দেখে নানা দিবস পালন।
জেহাদ, নূর হোসেন, ডাঃ মিলন আরো কত নাম!
অনেক আয়োজন, স্মৃতিচারণ।
রাতের কোন গভীরে ঘুম ভেঙ্গে গেলে
আজকের তরুণ নূর হোসেনের কন্ঠ শোনে,
“স্বৈরাচার কি নিপাত গেছে? গণতন্র কি মুক্তি পেয়েছে?”
অস্ফুট-স্বরে তরুণ কহে,
“সেই পতিত স্বৈরাচার আজও ক্ষমতার অংশীদার।
আজও গণতন্র বন্দী স্বৈরশাসনের শিকলে”।
নূর হোসেন ডাক দিয়ে যায়, “তবে চুপ কেন! প্রতিবাদ কর”।
নতুন ভোরে ঘুম ভাঙে,
আজকের তরুণ নতুন পত্রিকা খোলে।
তার দৃষ্টি খুঁজে ফেরে
নতুন কোন নূর হোসেনের প্রতিবাদ ছবি।
নূর হোসেনের ভূমিকায়, নিজেকে সে কল্পনাও করে না।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০১৩ রাত ১০:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


