somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজোড়া ঘোড়া ও কৃষ্ণচূড়া

২০ শে মে, ২০১৫ রাত ১১:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চার বছর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট পরিবেশে কাজ করার পর এক সন্ধ্যায় জাদুর পরিবহনে আড়াই ঘন্টা ধরে জ্যামে আটকে থাকার পর শাওন এমন একটা দুনিয়ায় পৌঁছায় যেখানে মানুষ এখনো যোগাযোগের জন্য দুই ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করে।
পরপর দু'টি ঘোড়ার গাড়ি দেখে সে। একটার ঘোড়া দুটো তেজী, উদ্যমী। আর অন্যটার ঘোড়াগুলো কেমন দুর্বল, অলস, উদাসীন। দুর্বলের গাড়ি পিছিয়ে থাকে। সবলেরটা এগিয়ে যায়। দু'টো ঘোড়ার গাড়িরই নিয়তি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের ভুং পয়েন্ট থেকে ভাঙ পয়েন্ট পর্যন্ত আসা-যাওয়া করা। ভুং ও ভাঙ দেশের সম্পদ তৈরীর দু'টো বিখ্যাত কারখানা। তেজী ঘোড়ার গাড়ি যতবার যাতায়াত করতে পারে, অলস ঘোড়ার গাড়িগুলো তার অর্ধেকের একটু বেশী সংখ্যক বার যাতায়াত করতে পারে।
যতদিন শরীরে তাগত থাকে, তেজী ঘোড়াগুলো ভালো দানা-পানি পায়, খাতির যত্ন পায়। আর দুর্বল ঘোড়া গুলো খাবারও পায় দায়সারা, তাদের গোসলও করানো হয় দুই তিন দিন পরপর। একদলের পায়ে দামী খুর - আরেকদলের সস্তা খুর। তাগড়া ঘোড়াগুলো হয়তো একটু বেশীদিন বাঁচে, দুর্বল গুলো কম। কিন্তু, কী আশ্চর্য সুতায় বাঁধা তাদের নিয়তি - প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ভুং থেকে ভাঙ আর ভাঙ থেকে ভুং। নিয়মের ব্যতিক্রম নেই।
এককালে ঘোড়াগুলো চোখ মেলে দেখতো। এখন আর দেখার দরকার পড়ে না। অলি, গলি, খানা-খন্দ সব চেনা। তাই চোখে ঠুলি পড়েই বেশী আরাম পায়। চেনা রাস্তা। তাদের পূর্বপুরুষরাও অনেকদিন এই রাস্তা দিয়ে গেছে। বর্ষায় রাস্তায় নতুন নতুন দুই একটা গর্ত হলে দুই একবার হোঁচট খায় - সেও ভালোই লাগে। অন্তত: চোখে বিচ্ছিরি একরাশ আলো লাগানোর চেয়ে ঢের আরামের।

শাওন চোখ ফিরিয়ে হাঁটা শুরু করে। রাস্তার হলুদ আলো কৃষ্ণচূড়া ফুলগুলোকে নোংরা করে দেয়। মানুষের বহুদিনের সচেতন চোখ তাড়াহুড়া করে হোয়াইট ব্যালান্স ঠিক করে নিলে আস্তে আস্তে আস্তে ফুলগুলো লাল হয়ে উঠতে শুরু করে। শাওনের চোখ একটু সময়ের জন্য ঝাপসা হয়। চতুর এডিটর কাট করে পরবর্তী দৃশ্যে চলে যান।

পিচঢালা ভেজা রাস্তা। রাস্তায় পড়ে আছে টকটকে লাল কৃষ্ণচূড়া, সবুজ পাতা । ঝমঝম বৃষ্টি পড়ছে।
- কত সাল? ঠিক জিপিএস লোকেশনটা কোথায়?
- নেই। সেটা সাধারন ছাত্রের হাতে স্মার্টফোনের যুগ না।
- সে না থাক। মোবাইল তো হাতে হাতে চলে এসেছে নিশ্চয়ই। অন্তত: নোকিয়া ১২০০। সময় বলা যায় না ঠিক করে?
- না, বলা যায় না। ওরা বৃষ্টিতে ভিজবে বলে সব রেখে এসেছে। ওদের এমন কোন অনিশ্চয়তার তাড়া নেই।
- সাথে সাইকেল তো ঠিকই আছে।
- হ্যাঁ, ওরা বাইসাইকেলে করে ঘুরবে। মেয়েটা সাইকেলের রডের উপর কষ্ট করে বসে ভিজবে। আনন্দে হুল্লোড় করবে। ছেলেটা পা দু'টো যথাসম্ভব প্রসারিত করে সাবধানে ফাঁকা রাস্তায় সাইকেল চালাবে।
বৃষ্টি হবে। অনেক বৃষ্টি।
অনেকগুলো তরুণ তরুণী নেমে আসবে রাস্তায়।
অনেকে তৃতীয় বিশ্বের অনুভূতিপ্রবণ একটি দেশের রাস্তায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একে অপরকে চুমু খাবে। কোনো কোনো ওড়না শুধু দু'টো মাথা ঢাকবে।
ওদেরকে কেউ বেশীক্ষণ দেখতে পারবে না। বৃষ্টি এসে চোখের পাতায় পড়ে দর্শক চোখগুলোকে ঘুরিয়ে দেবে অন্যপাশে।

- চলো আমরাও ...
- পাগল, সবাই দেখবে না? ওই দেখো কতগুলা পুলিশ সামনের রাস্তায় ...
- তার সামনের রাস্তায় ওই দু'জনকে দেখেছো? আর দেখো ছয়টা পুলিশের মাঝে চারজনের হাতে ফোন । আর আমাদের দিকে তাকানোর জন্য কোনো চোখ ফাঁকা নেই।
- তবুও, থাক।
- থাক।
- তোমার ভালো লাগছে তো?
- অনেক। তুমি মন খারাপ করলে না তো?
- আরে না।
- গান শুনবে?
- শোনাও।
- ৫ মিনিটে রাজনীতি?
- হোক।
- বান্ধবীর প্রেম?
- হোক।
- শেষ পড়া বই?
- হোক।
- সিনেমার ঝোঁক?
- হোক।
- মিথ্যে আশা?
- হোক।
- হিসাব-নিকাশ? মাস তো এখন শেষের দিকে।
- থাক।
- ভবিষ্যত?
- ভূতের মতো চুলোয় যাক।

- সাইকেলের চাকার পাম্প চলে গেছে। এখন হাঁটতে হবে।
- হাঁটব। বৃষ্টিতে ছপছপ শব্দে হাঁটতে অনেক ভালো লাগবে।
- সাইকেলে ভিজতে ভালো লাগছিলো না?
- অনেক ভালো লাগছিলো।
- আমরা কি তাহলে অনেক ভালো থেকে অনেক ভালোর মাঝেই এসে পড়লাম?
- আমরা আসলে এক সুন্দর থেকে আরেক সুন্দরে এসে পড়লাম।
খুব জোরে নীল রঙের একটা ক্যাব ওদের পাশ দিয়ে চলে যায়। দু'জনের গায়ে পানি ছেটে। তারপর আবার বৃষ্টি নামে হয়তো।
কিন্তু এডিটর দৃশ্য বদল করে নীল ক্যাবের ভেতরে চলে যান।
খটখটে রাস্তা। তপ্ত বিকেল।

- জানো, প্রেম ব্যাপারটা আমি এখন আর বুঝি না। পুরো ব্যাপারটাই একটা সূক্ষ হিসাব-নিকাশ মনে হয়। এই প্রেম-ভালোবাসা বেঁচে কত কোম্পানী কত ব্যবসা করছে দেখো।
- হুমম, এসবের তৈরী হলো তো শিল্প বিপ্লবের পর। সব মধ্যবিত্ত সমাজের জীবনযাত্রাকে সহনীয় করার জন্য এক একটা মিষ্টি প্রোডাক্ট।
- সুতরাং, প্রেম-ভালোবাসার গল্প নিয়ে সময় নষ্ট না করাই ভালো। সময়ও নেই। আর ওসব থাকলেই ঝগড়াঝাটি, অশান্তি বাড়ে।
- তাহলে পত্রিকার পাতাই ওল্টানো যাক। মানুষ পোড়ানো, মানুষ গুম, সমুদ্রে মানুষের জ্যান্ত কবর, মুক্তমনা মানুষ হত্যা, খাবারে বিষ, ওষুধে ওষুধে বাজার সয়লাব।
- আমাদের কিচ্ছু করার নেই। সব পচে গেছে। ওসব নিয়ে কথা বলে কী লাভ?
- খাওয়া দাওয়া? হাজীর বিরিয়ানি? চাইনিজ? বিউটির শরবত? মিষ্টি কোরমা?
- সেদিনই প্রেসার দেখলাম ১০০-১৪০। আবার ওসব? একদম চুপ।
- জানো, তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে আজ। তোমার মুখটাও, পোশাকটাও দারুণ মানিয়েছে তোমাকে।
- আমি কী কেবল আমার শরীর? নারীবাদের লঙ্ঘন।
- আমি তো তোমার চিরকালের স্তাবক।
- চাকরিটা ছেড়ে দিতে চাই অনেকদিন হলো। গরুর শরীর মেপে গরু কেনার মতো সবসময় ওরা মানুষ মাপে।
- সব অফিস এক। ছাড়ো তো।
- ধর্ম? অধর্ম? আস্তিকতা? নাস্তিকতা?
- হয় গালি খাবে, ব্যাকডেটেড ভাববে সবাই অথবা কোপ খাবে। কোনটা চাও?
- থাক, ওসব থাক।
- বই পড়তে নিলে ইদানীং ঘুম পায়। দুই-তিনটা বই শুরু করে শেষ করতে পারলাম না।
- বই পড়ে কী হবে? সামাজিক না অর্থনৈতিক কোন স্কোর বাড়বে? বাদ দাও।
- বদলি কবে হবে?
- কিছুই আমাদের হাতে নেই। ঘুষের টাকা জমাতে হবে। পুরান নেতা, যে এককালে আমার প্রেমিক হতে চেয়েছিলো নির্লজ্জভাবে, প্রেমিক হয়েছিলো আরো অনেকের, তাকে কায়দা করে আবছা পরকীয়া প্রেম নিবেদন করে ..
- থাক, থাক, সব কথা না শোনাই ভালো।
- তাহলে আমরা কী নিয়ে কথা বলবো?
- আমাদের আসলে কিছুই বলার নেই।
- আমাদের মুখ দু'টো শুধু খাওয়ার জন্য ব্যবহার করাই ভালো।
- ঘোড়ার মতো?
- আর চোখ মেলে না দেখাই ভালো। চোখ মেলে দেখলে অনেক বিপদ, অনেক অনিশ্চিত রাস্তা এবং অনেক বিভৎসতা চোখে পড়ে।
- চলো, আমরা চোখে ঠুলি পড়ি। চলো আমরা আশাবাদী হই। আশাবাদই জীবন। নিরাশাই মৃত্যু।
- চলো, আমরা ঘোড়া হই। দু'টো ডেবিট কার্ড দু'জনে চিবিয়ে খেলেই ঘোড়া হয়ে যাওয়া যায়।
- ধীরে ধীরে চিবুতে হবে। তাড়াহুড়া করলে গাধা হয়ে যাওয়ার চান্স আছে।

নীল ক্যাব ঘোড়ার মতো লাফিয়ে একটা নিরীহ রোড ডিভাইডারের উপর উঠে যায়। কাট, কাট। নেক্সট সিন।

শাওন রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোণ আইসক্রীম খাচ্ছিলো।
সে আরেকটা নতুন দুই ঘোড়ার গাড়ি দেখতে পায়। নতুন কেনা খুর, নতুন ঠুলি। পুরাতন পথ, পুরাতন রাস্তা।
সে সহজে মানুষকে মনে রাখতে পারে না, কিন্তু একটা ঘোড়াকে তার খুব চেনা চেনা মনে হয়।
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গুপ্তদের সকল অপকর্মের তদন্ত হোক....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:৪৮


সময় যত যাচ্ছে, ততই বেরিয়ে আসছে অস্বস্তিকর সত্য!
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে- আর অতীতের অনেক ঘটনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ, সাক্ষ্য ও তথ্য সামনে আসছে-
যেখানে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবির বিরুদ্ধে কবি

লিখেছেন অতন্দ্র সাখাওয়াত, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১০:১০

হে মৃত্যুহীন কবি,
কোন এক কোমল রাতে
তোমার সাথে পায়ে পায়ে
চলতে চাই হাজার বছর।
তারপর তুমি
মিলিয়ে যাবে তারার মাঝে —
তখন আমি লিখবো
তোমার না-লেখা পঙ্ক্তিমালা
কোন এক পূর্ণিমাতে।

হয়তো প্রথম পঙ্ক্তি হবে —
"সে তোমাকে ভালোবাসতো।"
তারপর সমুদ্রের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষকের মর্যাদা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:২৩


কবিতাটার কথা কি মনে আছে? বাদশাহ আলমগীর একদা প্রভাতে গিয়ে দেখলেন, শাহজাদা এক পাত্র হাতে নিয়ে শিক্ষকের চরণে পানি ঢালছে, আর শিক্ষক নিজ হাতে নিজের পায়ের ধূলি মুছে সাফ... ...বাকিটুকু পড়ুন

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শেখ হাসিনার অবদান।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:০৯

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শেখ হাসিনার অবদান।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে গত এক দশকে ব্যাপক উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অদৃশ্য ছায়া: সমুদ্রের সাক্ষী

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪৬



ঢাকার বনানীর সেই ক্যাফেতে বৃষ্টির শব্দ এখন আরও তীব্র। আরিয়ান তার কফির মগে আঙুল বোলাচ্ছিল, তার চোখ দুটো ক্লান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ। সাঈদের দিকে তাকিয়ে সে নিচু গলায় বলতে শুরু করল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×