
১।
ছোটবেলা থেকেই বাংলাদেশের মুসলিমদের বড় হওয়া সুন্নি ইসলামের ক্রোড়ে। হয়তো কখনো কারবালার ঘটনা প্রাসঙ্গিক ছিল এ দেশে। আমাদের মা খালাদের আমলে। তখনও ইন্টারনেটের তরঙ্গে ভেসে সৌদি সালাফিজম বাংলাদেশে থানা গেড়ে বসে নি। হরে দরে মদিনা ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা শেষে নামের শেষে 'মাদানি' টাইটেল লাগিয়ে, মৌলবিদের মাঝে আয়াত নাজিল হওয়ার কনটেক্সটকে ফোরগ্রাউন্ডে না এনে ধর্মগ্রন্থের আক্ষরিক অর্থকেই ইসলামের একমাত্র গ্রহণযোগ্য চেহারা হিসেবে প্রচারের প্রবণতা দেখা যায় নি। হয়তো একটা সময় ছিল আমাদের দেশে, যখন ১০ মুহররমের সন্ধ্যা এলে জাদুকরী কীভাবে যেন সাঁঝের আকাশ রক্তিম বর্ণ ধারণ করে - এটা সচেতনভাবে খেয়াল করতো সবাই। নবী দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (আঃ) - এর নির্মম শাহাদাতের কাহিনী পুঁথির আকারে পড়তে পড়তে বৃদ্ধ দাদী চোখের পানি ঝরাতেন, আর তার সামনে বসে টলটলে চোখে ছোট্ট এক শিশু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতো আর শুনতো দাদীর দরদভরা কণ্ঠে নবী দৌহিত্রের শহীদ হওয়ার কাহিনী।
এখন আর তা হয় না। কারবালা না, আহলে বায়েত(রাসুল সঃ এর পরিবার) এবং তাদের অনুসারী শিয়ানে আলী (শিয়া, তথা আলীর অনুসারী) - দের ব্যাপারে আমাদের প্রধানতম সোর্স হচ্ছে ইজরায়েল - অ্যামেরিকা আর তাদের তাবেদার মিডিয়ার তৈরি দানবীয় ইমেজারি। তাদের প্রধান টার্গেট, পৃথিবীর বুকে সর্ববৃহৎ শিয়া অধ্যুষিত রাষ্ট্র ইরান।
২।

ইরান পৃথিবীর সব বড় বড় সাম্রাজ্যগুলির লোভের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বরাবর। ইরানীরা যে মানুষ না, তারা যে পশু, এবং মাত্র ৩০০ শ্বেতাঙ্গ যোদ্ধা মিলে যে হাজার হাজার ইরানী "পশু"কে হত্যা করা যায়, এটা প্রথম দেখি ২০১০ সালে, ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফিল্ম সোসাইটির রুমে বসে। জেরার্ড বাটলার অভিনীত 300 মুভিতে। ইরানের অত্যাচারি গড কিং ক্সারসাসের বিরুদ্ধে ৩০০ জন মাত্র এথেনিয়ান / গ্রিক সৈন্য মিলে এক অসম যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার বীরত্ব।
দেখে ম্যালা খুশী হয়েছিলাম। ছোটবেলা থেকে আমরা শ্বেতাঙ্গদের ভালোবেসেই বড় হয়েছি। শ্বেতাঙ্গরা সবকিছুতে এগিয়েই থাকবে - এই ছিল সেই কিশোর বয়সেও আমার বিশ্বাস।
ইদানীং বুঝি, ওটা একটা প্রোপ্যাগান্ডা মুভি ছিল। বিশ্বব্যাপী ইরানের চেহারাকে আরও নেতিবাচক, আরও পাশবিক করে তোলার হলিউডি প্রচেষ্টার একাংশ।
ইরানীরা, চাই সে জরুথস্ত্রুর অনুসারী অগ্নিপুজারি হোক, কিংবা শিয়া মুসলিম, তাদের চেহারা পাশ্চাত্যের বরাবরই অপছন্দ ছিল, ঐতিহাসিকভাবেই। তাদের চেহারায় কালিমালেপন সবসময়ই জরুরী ছিল পাশ্চাত্যের জন্য।

(ছবি - উক্ত সিনেমায় ইরানী সেনাদের বেশভূষা ও চেহারা। জঙ্গি বলতেই যে দাঁড়িওয়ালা মুসলমানদের পোর্ট্রে করা হয়, তার সঙ্গে মিল পান?)
কারণ, পাশ্চাত্যের জন্য ইরান বরাবরই একটা থ্রেট। তাতে ইসলাম থাকুক, কিংবা না থাকুক।
৩।
ইরান - ইসরায়েল যুদ্ধ অনিবার্য ছিল। আমরা বাঙ্গু মুসলিমরা সেকুলার হওয়ার ভেক ধরলেও, ইসরায়েল বা ইংল্যান্ড - অ্যামেরিকার নেতা ও সেনাপতিরা নিজেদের ইহুদী / খৃষ্টান পরিচয় নিয়ে কখনো ভড়ং ধরে না। পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ডেভিডের তারকা চিহ্ন ছড়িয়ে পড়ার নিয়তি যে ২৫০০ বছর আগে ওল্ড টেস্টামেন্টের খোদা বলে দিয়েছিলেন, তা ইহুদীরা ফলাও করে প্রচার করে।

জেরুজালেমে অটোম্যান আর্মিকে পরাজিত করে ব্রিটিশ বাহিনী ১৯১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর বিজয়ী হিসেবে প্রবেশ করলে, ব্রিটিশ বাহিনীর সেনাপতি এডমুন্ড অ্যালেনবাই ঘোষণা করেন - '“Now the Crusades are over”। অর্থাৎ, শ্বেতাঙ্গ পাশ্চাত্য জেরুজালেমে তাদের লড়াইকে ধর্মযুদ্ধ হিসেবেই দেখেছে বরাবর। খেলাফতে উসমানিকে যুদ্ধে হারানো তাদের কাছে ধর্মযুদ্ধে জয়ী হওয়া ছিল।
আর ইহুদীরা তো খোলামেলাভাবেই ধর্মভীরু। আরবদের সাথে তাদের যতবার লড়াই হয়েছে, ততবার তারা ঘোষণা দিয়েছে - এটা ধর্মযুদ্ধ। উদাহরণত, তারা প্রায় প্রায়ই খায়বর যুদ্ধের রেফারেন্স টেনে আনে তাদের বিভিন্ন মিছিলে, প্ল্যাকার্ডে। বলে - খায়বার ওয়াজ ইওর লাস্ট চান্স। খায়বর যুদ্ধই শেষ, যেখানে তোমরা আমাদের পরাস্ত করেছিলে। এখন তোমাদের জিল্লতি, আর অপমানের পালা।
আশ্চর্য বিষয়, খায়বরের সঙ্গে হজরত আলী (আঃ) এর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

৪।
ইরান ধুমায়ে মার খাচ্ছে। পপুলার মিডিয়ার বয়ানে ইরানে অলরেডি ১৩০০র কাছাকাছি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। ইজরায়েলে সংখ্যাটা ১১, অ্যামেরিকান আর্মি ৬।
বাঙ্গু হিসেবে এখন আমি কোন দিকে যাব?
এইখানে শিয়াদের চরিত্রের একটা দিক বোঝার আছে। আমি বাঙ্গু মুসলমান তাদের সাপোর্ট করি, কিংবা না করি, তারা তাদের হিসেবে যা অন্যায় - তার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে। যাবেই। নিজেদের সৈন্যসংখ্যা তাদের কাছে বিষয় না।
যে লড়াই শিয়ারা জঙ্গে জামাল থেকে শুরু করেছিল, যে যুদ্ধের সূত্রেই কারবালা, যে কারবালায় ইমামুল মুত্তাকিন মাওলা হোসেইন আঃ এর শাহাদতের পর এজিদ বলেছিল, এটা বদরের বদলা ( বদরের যুদ্ধে আমির মুয়াবিয়ার বড় ভাই হানজালা ইবনে আবু সুফিয়ান, নানা উতবা ইবনে রাবিয়া, মামা ওয়ালিদ ইবন উতবা মুসলমানদের হাতে মারা যায়। তার বাবা আবু সুফিয়ান বন্দী হয়), সে সূত্রেই উমাইয়া এবং আব্বাসিয়া খিলাফতের আমলে শিয়া ইমামদের পারজিক্যুশন। কিন্তু তারা থামে নাই। তারা যা কিছু নিজেদের বিবেচনায় হক মনে করে, তার পক্ষে তারা কোনরকম রাখঢাক ছাড়া দাঁড়ায়ে যায়।
আপনি সুন্নি আলেমদের কিনতে পারবেন। সবচে ভালো এক্সাম্পল আরব দেশগুলির উলামা, যারা নিজ দেশে অ্যামেরিকার সেনা ক্যাম্প, এয়ার বেজ তৈরির বিরুদ্ধে একটা কথা বলে না, গাজায় যখন কার্পেট বম্বিং হয়, নারী এবং শিশুদের হত্যা করা হয়, টু শব্দও করে না, করলে এমনভাবে করে, যেন অ্যামেরিকান ও ইজরায়েলি আব্বুরা কষ্ট না পায়, সেখানে শিয়ারা সরাসরি অস্ত্র নিয়ে দাঁড়ায়ে যাবে তাদের বিরুদ্ধে।
ইরানীরা মরবে। শিয়ারা মরবে। কিন্তু আপনি তাদের হারাইতে পারবেন না। যারা হারার বদলে শহীদি মৃত্যুকে প্রেফার করে, আপনি তাদের কীভাবে হারাবেন?
৫।
বাকি রইলো আলী খোমেনি জল্লাদ, তারা ইরানী নারীদের অধিকার কেড়ে নিয়েছে, জনগণের ভোটাধিকার ডেমোক্রেসি ইত্যাদি কেড়ে নিয়েছে - এইসব এলিগেশন।
ওয়েল, একটা নির্দিষ্ট বয়সে এসে, প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষ যখন এইসব ইস্যুতে একটা অবস্থান নিয়ে ফেলে, সেইটা থেকে তাদের টলানো যায় না। কাজেই ইরানের বিরুদ্ধে যে সমস্ত অভিযোগ আছে, সিরিয়ায় আসাদকে সাহায্য করা, গোটা মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রক্সি স্থাপন ইত্যাদি - এগুলি কি অ্যাকশন ছিল, না তাদের বিরুদ্ধে সিস্টেমিক অনাচারের বিরুদ্ধে বুদ্ধিদীপ্ত রিঅ্যাকশন ছিল, এই বিষয়ে বেশি কথা খরচ করে লাভ নাই। সৌদি আরবে মেয়েদের পড়াশোনার কি অবস্থা, আর ইরানে যে ৭০% স্টেম (সায়েন্স, টেকনলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ম্যাথ) গ্র্যাজুয়েট নারীরা এইসব বলেও লাভ নাই। সৌদিরা ইয়ামনে আক্রমণ চালায়ে ২০১৫ সাল থেকে ২০২১ সালে যে ৩ লক্ষ ৭৭ হাজার মুসলিম হত্যা করসে, এগুলো বলেও লাভ নাই *সোর্স) । এক মাশা আমিনির ইরানী রেজিমের মোরাল পুলিসিং এর শিকার হয়ে মারা যাওয়া ইরানের অপরাধ, কিন্তু এপস্টিনের সঙ্গী হয়ে বছরের পর বছর ধরে মাইনর ও শিশু - কিশোরীদের ধর্ষণের যে অপরাধ পাশ্চাত্য করে আসছে দীর্ঘ দীর্ঘ কাল ধরে, সেটা পয়েন্ট আউট করেও লাভ নাই।
ইরানিয়ানদের খুব ভাইব্রেন্ট একটা কালচার আছে। আব্বাস কিওরিস্তিম, মাজিদ মাজিদি, জাফর পানাহির মতো ফিল্ম ডিরেক্টরেরা খমেনির আমলেই তো সিনেমা বানায়ে গেলেন। গানের ওপর স্পেসিফিক ব্যান নাই তাদের। আমি আজ সারাদিন লুপে একটা পার্সি - উর্দু কাওয়ালি লুপে শুনলাম (শুনতে এই লিঙ্কে খোঁচা দেন)। ওরা ইসলাম আর ইরানী কালচারকে এতো সুন্দর ব্লেন্ড করসে, পৃথিবীতে এটা খুবই রেয়ার।
বাঙ্গু মুসলমান তাদের পীরের জন্য কান্দে, সৌদি আরবের জন্য কান্দে, অ্যামেরিকা - ওয়েস্টরে স্পেস দেয়া মিডলইস্টএর আলেমদের জন্য কান্দে, কিন্তু বাঙ্গু মুসলমানদের মুখে যাদের নাম নাই, তারা হল আহলে বায়েত আলাইহিমুসসালাম। আমার নবী সঃ এবং তার পরিবারবর্গ। এই কাজটা ইরানীরা খুব ভালবেসে করে। আমার খুব পছন্দের একটা ফার্সি নোহা হল তাসবিহে ফাতেমি, মা ফাতেমা (আঃ) কে নিয়ে লেখা এক ফার্সি শোকগাঁথা (এই লিঙ্কে পাবেন) । মা ফাতেমাকে নিয়ে লেখা কোন কবিতা, কোন গাঁথা, কোন আলাপ আমি বাংলাদেশে এতোবছর আছি, এতো বছর ধরে এই দেশের ধর্মীয় সার্কেলে আমার গতায়েত, আমি তো দেখলাম না। ইরানীরা সেই দিনই আমার হৃদয় জয় করে নিয়েছিল, যেদিন আমি এই নোহা খুঁজে পাই।
লেখাটা লিখলাম নেহায়েত লিখতে হয় বলে। কারণ, মুসলমানদের মধ্যে যারা ইরান - আরব অথবা ইরান - ইজরায়েল, অ্যামেরিকা বাইনারিতে একটা পজিশন নিয়ে ফেলসে, তাদের মতামত চেঞ্জ করা অসম্ভব। আমি পরোয়াও করি না তাদের পারজু করার ব্যাপারে।
কিন্তু সুন্নি আর শিয়াদের মধ্যে এই একটা বেসিক তফাৎ মনে রাখবেন। সুন্নিরা কম্প্রোমাইজ করে। তারা সাহাবাদের সমালোচনা বরদাশত করতে পারে না, কারণ যদি নবীর সঙ্গীদের চরিত্র নিয়ে সমালোচনা করা হয়, তাহলে ইসলামের অর্ডার ধরে রাখা মুশকিল হয়ে যাবে। সুন্নিরা স্থিতি চায়। শিয়ারা অর্ডার, স্থিতির পরোয়া করে না। তারা হকের পথে, আহলে বায়েতদের পক্ষে কেয়ামত পর্যন্ত লড়াই করেই যাবে। তারা পারপিচুয়াল রেভোলিউশনারিদের কাল্ট।
শেষ করি একটা ঘটনা উল্লেখ করে। ২০১৪ সালে যখন আইসিস মাথা চাড়া দিচ্ছে, তখন আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে রাজশাহী মেডিকেলের আমার সমবয়সী এক ছাত্র যুক্ত ছিল। গাজায় সে বছর ইজরায়েল কার্পেট বম্বিং করসিল। ফেসবুক ভেসে গেছিল আই স্ট্যান্ড উইথ গাজা হ্যাশট্যাগে। সেই রাজশাহী মেডিকেলের ছেলেটা স্ট্যাটাস দিলো, সে সিরিয়া ইরাকে গিয়ে আইসিসে জয়েন করার স্বপ্ন দেখে। আমি অবাক হয়ে তাকে ইনবক্স করলাম, বললাম, ভাই আমি তোমাকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনি না, ফেসবুকের সূত্রেই টুকটাক যা পরিচয়। খোদা তোমাকে মেধা দিসে, যেটা অন্য সবাইকে দেয় নাই, তুমি বড় ডাক্তার হও, তোমার মেধা দিয়ে মানুষের সেবা করো, ইসলামের মুকুটে পরিণত হও। তোমারও কেন অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে যাইতে হবে? ছেলেটা কোন উত্তর দেয়া ছাড়াই আমাকে ব্লক মারে। (পরবর্তী জীবনেও আমি দেখসি, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারদের মতো কট্টর নাস্তিক বা জিহাদি আর কারো পক্ষে হওয়া সম্ভব না। সায়েন্সের লোকজন প্রায়ই সাদা কালোর মধ্যে যে একটা গ্রে এরিয়া আছে, সেটা দেখতে পায় না।)
ইমাম আয়াতুল্লাহ আলী খমেনি রহঃ এর শাহাদাতের পর তার একটা ছোট ভিডিও আমার ফেসবুকে রিল আকারে সামনে আসে। সেই রিলে ফেরেশতার মতো ছোট একটা শিশু খোমেনি রহঃকে বলে, আঘা, আমি শহীদ হতে চাই। খোমেনি রহঃ তার নাতির বয়সী সেই শিশুকে আদর করে বলেন - অবশ্যই, ভাইয়া। কিন্তু তার আগে তোমাকে বিজ্ঞানি হতে হবে, ইসলামের খেদমতে কাজ করতে হবে, বেঁচে থাকতে হবে ৮০ - ৯০ বছর। তারপর শহীদ হয়ো।
(রিলটা এই লিঙ্কে)
আমি ইমাম আয়াতুল্লাহ আলী খমেনি রহঃ কে এভাবেই মনে রাখতে চাই। আপনাদের বিবেচনা আপনাদের।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




