এতদ অঞ্চলীয় বঙ্গীয় সমপ্রদায়ের সকল সদস্যদের বলতে চাইছি, মোর কাছে নানাবিধ চিন্তা করার পর ইংরেজি শেখাটা নিরর্থক মনে হয়। উদ্ভট উটের পিঠে স্বদেশ চলার পথে অনেক উদ্ভটতর জিনিস দেখে চোখ ছানাবড়া হচ্ছে, এর মধ্যে একটা হচ্ছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভাষার মাধ্যম।
আমরা বাংলাদেশীরা, যারা চিরচরিত মাধ্যমে পড়াশোনা করে এসেছি, তাদের সবারই বোধহয় মনে প্রশ্নোদয় হয়েছে যে, এ কোন জাতের পড়া যেখানে মুখে বুলি ফোটার আগেই একটা বিজাতীয় ভাষা শিখতে হয়? আমাদের একটি শিশু আব্বা-আম্মা-পানি-ভাত শিখার সাথে সাথে সে এ ফর এ্যপেল, বি ফর বিয়ার শিখে, যা কিনা তার মনের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। বিশ্বের অন্য কোন দেশে (ভারতীয় উপমহাদেশ বাদে) এরকম জন্মের ক'দিন পরেই বিদেশী ভাষা শেখানো হয় কিনা আমার জানা নেই। এতে একটা শিশুর জ্ঞানগত গ্রহনক্ষমতার উপর খারাপ প্রভাব পরে, যেমন তাকে একটি বিদেশী ভাষা শেখার কঠিন কাজ করতে হয়। যারা শখে বা ঠেকায় পরে ফ্রেঞ্চ, জার্মান বা চাইনিজ শিখতে গেছেন, তারা নিজেরা টের পেয়েছেন, কাজটা কিরকম ভয়ংকর। আমাদের শিশুরাও একই রকম বুলডোজিং এর নিচ দিয়ে যায়, কিন্তু শত বছরের প্রাকটিস বলে আমরাও তা বুঝতে পারি না। দ্বিতীয়ত, হিন্দি হলেও কথা ছিল, ইংরেজি ভাষার চারদিকের সংস্কৃতি, বহিপ্রকাশ, ভঙ্গি, প্রথাগুলো আমাদের থেকে যোজন যোজন দূরের। যেকোন ভাষা শিখতে হলে সেই অঞ্চলের কালচার জানতে হবে। বাংলার নরম মাটিতে পা দিয়ে নদীর ঢেউয়ে গতর ভিজিয়ে ইংরেজিতে বাহাস করা প্রায়অসম্ভব। কেউ আল মাহমুদের কবিতার অনুবাদ বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ভাষান্তর পড়ে দেখেছেন যে কেমন কিম্ভুত লাগে। আমাদের পাল কিন্তু সেইল নয়, আমাদের নায়ের মাঝি তাদের বোটম্যান নয়, আমাদের ধান তাদের প্যাডি নয়। আমরা যতই ব্রিটেনের পা জড়িয়ে ধরি না কেন, পথের এবং মননের দূরত্ব অমোচনীয়।
যা হোক, যা বলছিলাম, তৃতীয়ত, পুরো শিক্ষাজীবন একটা পোলা বা মাইয়ারে ইংরেজির বোঝাটা বহন করতে হয়, আবু লাহাবের বউয়ের গলার কাটার মত। আমাদের গড়ে ইংরেজিতে দক্ষতা কি ভাল? প্রায় সব পোলাপানকেই এখন দেখি, ইংরেজি নিয়া টেনশনে থাকে, স্যারের কাছে কোচিং করে, ডেইলি ষ্টার পড়ে, বিবিসি শুনে। ইংরেজি শিখতে কিন্তু আমাদের বহুৎ করসত হয়, যেটুকু আমরা অংক বা উদ্ভিদবিজ্ঞান মুখস্ত করলে অনেক বেশী আউটপুট দিত। একটু মাথা চুলকালেই ঠাওর পাবেন, গ্রামের ছেলেদের থেকে শহরের পোলারা ইংরেজিতে ভাল হয়, কারন তারা বেশী কম্পিউটার-টিভি-মুভিজ-রক মিউজিক এর পরশ পায়। তাই তারা ইংরেজ সংস্কৃতিকে চেখে দেখে, সহজে ইংরেজি শিখতে পারে। এছাড়া অন্য কোন বিষয়ে কিন্তু আমরা শহর-গ্রাম বৈষম্য পাই না।
জানি যে অত্যুতসাহীরা ভেঙচিয়ে বলবেন, ক্যা, ভারত-পাকিস্তানের ছেমড়াগুলা ইংরেজি কইতাছে না, ইংরেজি দিয়াইতো তারা জমানাটা উল্টাইয়া দিল। হিসাবের সাদা ঘর চোখে পড়বে যদি আপনি বলেন যে ভারত-পাকদের ইংরেজিকে যোগাযোগের ভাষা মেনে নেয়া ছাড়া উপায় ছিল না, কারন তাদের কোন জাতীয় ভাষা নেই। ভারতের শতকরা ষাট ভাগ লোক অ-হিন্দি বলে, পাকিস্তানেও প্রায় অর্ধেক লোক অ-উর্দু বলে। রাজনৈতিক ও মিডিয়াগত কারনে হিন্দি ও উর্দু সেখানে কইবার ভাষা হয়েছে, আর তাই লেখা পড়ার ভাষা হিসেবে নিরপেক্ষ ইংরেজিকে বসাতে হয়েছে। আমাদের মত 99 ভাগ লোকের কথিত কোন একক ভাষা থাকলে সেটাই ভারতের লেখা পড়ার ভাষা হত, ভারত ইংরেজি দেহাইতাছে বুদ্ধি দিয়া না, বেচারার আর কোন উপায় নাই বইলা।
আমার সাথে এক কোরিয়ান অধ্যাপকের দেখা হয়েছিল, একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সাইন্সের অধ্যাপক, ডক্টরেট করা তো অবশ্যই, সে এক বর্ণ ইংরেজি জানে না। একজন চাইনিজ মহিলা অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাষ্টারি করেন, ওয়ান-টুর ইংরেজিও তার মালুম হয় না। জার্মানি, জাপান, ইটালি, চায়না, কোরিয়া, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, আরব আমিরাত, রাশিয়া এই সবই দেশই ধনী হইছে, সাহস শক্তি পাইছে ইংরেজি না মুখস্ত কইরাই, আমি মনে করি আমাগো সম্ভাবনা আরো অনেক বেশী।
ভাইসব, ইংরেজি পারিনা বইলা না, ইংরেজির ভারি বোঝা নিয়া আমরা বেশী উপরে উঠবার পারুম না। ওইটা ফালায়া দিতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



