বেগম জিয়ার পাল্টে দেওয়া বাংলাদেশ কেমন হবে ?
সৈয়দ বোরহান কবীর : বেগম খালেদা জিয়া, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেত্রী, দুবারের প্রধানমন্ত্রী। তার যেকোনো বক্তব্য মূল্যবান এবং আমাদের মতো আমজনতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি তিনি কিছু নীতি নির্ধারণী বক্তব্য দিয়েছেন, যেসব বক্তব্য নিয়ে আমরা ভাবিত, আহ্লাদিত এবং পুলকিত। বেগম জিয়া ১৯ নভেম্বর বরিশালের জনসভায় বলেছেন ‘আরেকবার সুযোগ দিন, দেশের চেহারা পাল্টে দেবো। দেশকে সন্ত্রাস ও দুর্নীতি মুক্ত করব।’ ২০ নভেম্বরে তার জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত দলের আলোচনা সভায় তিনি বলেছেন ‘তারেক রহমান কোনো দুর্নীতি করে নাই।’
বেগম জিয়া একজন সম্মানিত নেত্রী। তার কথা অমৃতবাণী। এর উপর তিনি আপসহীন নেত্রী, তিনি যা বলেন, তা তিনি করেন। কাজেই তিনি যখন বলেছেন, তিনি তা করবেন। কীভাবে করবেন, খালেদা জিয়া আবার ক্ষমতায় এলে কীভাবে দেশ পাল্টে যাবে, আসুন একটু দৃশ্যপটটা ভেবে দেখার চেষ্টা করি।
বেগম জিয়া ক্ষমতায় এসেই বলবেন, তার দুই পুত্র কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নয়। তারা সৎ। তাদের সম্পদ বলতে কিছুই নেই। অতএব, প্রধানমন্ত্রীর এই সার্টিফিকেট অনুযায়ী বেগম জিয়ার দুই পুত্র বীর বেশে দেশে ফিরবে। সার্ফএক্সেলের সৎ মানুষের খোঁজে অথবা সাদা ‘মানুষের সন্ধানে’ কর্মসূচির সমাপ্তি হবে। ‘প্রধানমন্ত্রী’ কর্তৃক সার্টিফিকেটধারী দুজন সৎ মানুষ প্রাপ্তি উপলক্ষে, ‘খোকা বাবু’দের প্রত্যাবর্তন দিনে রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণা করা যেতে পারে। রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণা হলেও ঐ দিন দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ‘সৎ মানুষের প্রত্যাবর্তন’ উপলক্ষে শিক্ষার্থীদের বিমানবন্দর থেকে ‘হাওয়া ভবন’ পর্যন্ত দাঁড় করিয়ে রাখা যেতে পারে (যদিও হাওয়া ভবন এখন নেই ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়া হিসেবে অবিলম্বে হাওয়া ভবন করা যেতে পারে)। তাদের বিমানবন্দর থেকে নেমে হাওয়া ভবন গমন পর্যন্ত যাবতীয় ঘটনাবলি সরকারি এবং বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচার না করা হলে, আবার কিসের পরিবর্তন! যেহেতু ঐ দিন সরকারি ছুটি থাকবে তাই, সবাইকে (জনগণকে) হাওয়া ভবনের সামনে বাধ্যতামূলক উপস্থিতির নির্দেশ দেয়া যেতে পারে। যেখানে একটি ‘প্রত্যাবর্তন মঞ্চ’ করে আগের দিন রাত ১২টা থেকে তারেক-কোকোর কীর্তির উপর নাটক, গান ইত্যাদি মঞ্চস্থ হতে পারে। তবে লক্ষ রাখতে হবে, কোনো অবস্থাতেই যেন আকারে ইঙ্গিতে দুই সু-সন্তানের ব্যাপারে কোনো কটূক্তি করা না হয়।
ক্ষমতায় এসেই বেগম জিয়া বদলে দেয়ার লক্ষ্যে তারেক-কোকোর সব মামলা প্রত্যাহার করে নেবেন। কারণ ইতিমধ্যেই তিনি বলেছেন, তারা দুর্নীতিবাজ নয়। কাজেই অর্থহীন মামলার অপচয় কমানো হবে। এমনকি সিঙ্গাপুর থেকে যে অর্থ আনা হয়েছে তা-ও অবৈধ। দুদেশের সম্পর্ক নষ্টের চক্রান্ত। কাজেই ঐ টাকাও ফেরত দেয়ার দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
দেশের চেহারা পাল্টে দেয়ার জন্য প্রয়োজন অনেক সৎ মানুষ। সেজন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ। তারেক-কোকোর নেতৃত্বে সৎ মানুষ তৈরির প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এজন্য জেল থেকে সব সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজদের বের করে আনাটা অতীব জরুরি। কাজেই তাদের অবিলম্বে মুক্তির ব্যবস্থা করা হবে। যেমন করা হয়েছিল, ২০০১ সালে।
‘আওয়ামী লীগের শাসনামলে, ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। দুর্নীতিও হয়েছে বেসুমার।’ বেগম জিয়া এসব কথা হরহামেশাই বলছেন। কাজেই এটাও পরিবর্তন দরকার। এজন্যই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সব বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হবে। যেহেতু বিএনপির লোকজন ‘সৎ’ তাদের তেমন কোনো সম্পদ নেই, তাই জ্বালিয়ে দেয়ার পর অবশিষ্ট সব সম্পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিএনপির নেতাকর্মীর কাছে চলে যাবে। আওয়ামী লীগের বাইরেও দেশে কিছু দুষ্ট লোক বসবাস করে, যারা ‘নিরপেক্ষ নিরপেক্ষ’ ভাব করে আবার ‘মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধ’ জপতে থাকে। এরা আসলে ‘নাস্তিক’ ধর্মহীন। এদের শায়েস্তা করার জন্য জামায়াত শিবিরের বিকল্প নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, জামায়াত-শিবিরের সব পুত-পবিত্র নেতাদের ‘তথাকথিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে, জেলে আটকে রাখা হয়েছে।’ বেগম জিয়া এবং তার নেতারা বারবার বলেছেন ‘এটা বিচারের নামে প্রহসন।’ কাজেই অবিলম্বে এই ‘প্রহসন’ বন্ধ করতে হবে। আটক ‘দেশ প্রেমিক’ জামাতী নেতাদের মহাসমারোহে কারাগার থেকে মুক্ত করা হবে। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় উৎসব ও আয়োজন করা যেতে পারে। নিদেনপক্ষে, সরকারি ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোয় শোকরানা মোনাজাত, গজল এবং হামদ-নাত প্রচার করা যেতে পারে।
‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিএনপিও চায়। কিন্তু তা হতে হবে প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার।’ বেগম জিয়া ক্ষমতায় আসার আগেই একথা বলেছেন, তাই যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে প্রহসন করেছেন, তাদেরই যুদ্ধাপরাধ আইনের আওতায় বিচার করা হবে। বিশেষ করে, যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে ‘আজগুবি’ সাক্ষী দিয়েছেন, তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে।
আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের সময় ‘অন্যায়ভাবে’ বেগম জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। কাজেই অবিলম্বে ঐ বাড়ি আগের অবস্থায় পাল্টে ফেলতে হবে।
আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের নামেও প্রহসন করেছেন। কাজেই ডালিম কুমারদের দণ্ড মওকুফ করার ব্যবস্থা করা হবে। তাদের রাষ্ট্রীয় সম্মানও দেয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
আওয়ামী লীগ শাসনামলে নিয়োগের নামে দলীয়করণ করা হয়েছে। কাজেই, সব নিয়োগ বাতিলের ব্যবস্থা করতে হবে।
যেহেতু খালেদা জিয়া দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের কথা বলেছেন, এক্ষেত্রে দুর্নীতির সংজ্ঞা পাল্টে দেয়া হবে। খুশি হয়ে কেউ বিএনপির নেতাকর্মীর ‘কিছু’ দিলে তা দুর্নীতি বলে গণ্য হবে না। বিএনপির নির্যাতিত নেতাকর্মী, কিংবা শিবিরের গেরিলা ভাইয়েরা কাউকে আঘাত করলে, রগ কাটলে বা হত্যা করলেও ইনডেমনিটি দেয়া হবে। কাজেই দেশে আর কোনো সন্ত্রাস হবে না, দুর্নীতিও হবে না- দেশে নেমে আসবে কবরের শান্তি। আর আওয়ামী লীগের স্বৈরশাসন আমলে টকশোতে অনেক সত্য কথা বলা হয়েছে। এতে বিএনপির অনেক লাভ হয়েছে। এখন দেশে স্বৈরশাসনের অবসান হয়েছে, তাই আর টকশো করার প্রয়োজন নেই। এতে দেশের ব্যাপক পরিবর্তন হবে। আর আমরা চুনোপুটিরা যদি, এত পরিবর্তনের ঝড়ে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকি তাহলে বলব- ‘তুমি মা কল্পতরু আমরা তোমার পোষা গরু, শিং বাঁকাতে জানি না, ভুসি পেলেই খুশী হবো, ঘুষি খেলে বাঁচবো না।’
সৈয়দ বোরহান কবীর : নির্বাহী সম্পাদ
আমাদেরসময়, ২৩।১১।২০১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

