somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাদের দিদিরা কেন এইভাবে ঝুলে ছিল?

১২ ই নভেম্বর, ২০১৩ সকাল ৯:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শোয়াইব জিবরান

বৈজয়ন্তীরা ছিল ছয় বোন। কিন্তু তাদের কোন ভাই ছিল না। হয়ত তারা অনুরোধ করেছিল অথবা করেনি ফলে একটি ভাইয়ের জন্য তাদের টুলে পণ্ডিত পিতা ক্রমেই ভুল করে খালি বোনই এনে দিচ্ছিলেন। অবশ্য তাদের পিতা যাকে আমার মাস্টার মশাই বলে ডাকতাম তিনি বলে বেড়াতেন এ জন্য ব্রাহ্মণীই দায়ী। আমাদেরও তাই মনে হতো। কেননা, পণ্ডিতজী যেহেতু শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ চরিতামৃত পড়ে থাকেন তিনি মিথ্যা বলবেনইবা কেন? তাছাড়া আমরা তো শুনেছি দাই বলেছে, বোনগুলো বাহ্মণণীর পেট থেকেই নাকি বেরিয়ে এসেছিল।পণ্ডিতজীর কোন পাঠশালা ছিল না। ইতিহাসের শিক্ষক বলেছিলেন, লর্ড মেকলে নাকি সেগুলি বন্ধ করে দিয়েছিলেন দুশ বছর আগে। আর ওগুলি নাকি পাঠশালা ছিল না। ছিল টুল। এজন্য লোকে তাকে টুলে পণ্ডিত বলেও ডাকে শুনেছি। অবশ্য টুলগুলো দুশ বছর আগে বন্ধ হয়ে গেলে পন্ডিত এখনও কীভাবে আছেন আমরা, মানে পাড়ার ছেলেরা বুঝে উঠতে পারিনি।
বৈজয়ন্তীরদের যেহেতু কোন ভাই ছিল না সে জন্য সে অথবা তার দিদিরা আমাদের ভাই বলে জানতো। আমরা ছিলাম শত শত ভাই। তারা আমাদের মানে পাড়ার কিশোরদের কোন ভাইফোটা দেয়নি তবু আমরা তাদের বোন বলেই জানতাম। এর একটি যৌক্তিক কারণ অবশ্য তার পিতার আমাদের প্রাইভেট পড়াতেন। আর আমাদের পাঠ্যবইয়ে লিখা ছিল শিক্ষক হলেন দ্বিতীয় পিতা। আমরা আমাদের পাঠ্যগ্রন্থগুলোকে ধর্মগ্রন্থের মতই সত্যবাদী বলে জানতাম। আমরা পণ্ডিতজীকে পিতা বলেই জানতাম। আমাদের ফসলউঠা মাঠের প্রতিটি খড় সাক্ষ্য আমরা যখন সেখানে ফুটবল খেলতে যেতাম বৈজয়ন্তিরা হাততালি দিতে আসত। হাততালি দিলে বোনের উৎসাহে আমরা আহ্লাদিত হতাম। এখনও যদি তুমি জিজ্ঞাসা করো বিকেলের কনে দেখা আলোকে বা যেবাতাস সেদিগুলোতে বয়ে যেত তাকে, আমরা বৈয়ন্তিদের বোন বলে জেনেছিলাম।
কিন্তু পাড়ায় যারা ছিল আমাদের চেয়ে একটু বয়েসে বড়-তপন, শ্যামল, নান্টু তারা জানি কেমন কেমন ছিল। তারা খেলা মাঝখানে রেখে হঠাৎ হঠাৎ পানি খাওয়ার নাম করে বৈজয়ন্তীর ঘরে যেত। আর আমরা দেখতাম বৈজয়ন্তীর দিদিরা খুব বিরক্ত হতো। ওরা ফিরে আসার পর দিদিরা মুখ কালো করে থাকত। এজন্য আমাদের কোন পানির তুষ্ণা হতো না। কেননা, আমরা কখনও চাইনি যে আমাদের পানির জন্য দিদিদের মুখ কালো হোক। আর দাদাগুলোকে আমাদের এমনিতেই ভাল লাগত না। তারা খেলার সময় বল রেখে আমাদের উরুতে, নিতম্বে চাপ দিতো। আমাদেও মোটেই ভাল লাগত না। এ জন্য তাদের কাছে বল গেলে আমরা খুব একটা কাছে ঘেসতে চাইতাম না ফলে গোল তারা বেশি বেশি দিত।
একদিন রাতে বৈজয়ন্তিদের বাড়িতে বেশ শোরগোল শোনা দিয়ে গিয়েছিল। কুকুরগুলো হল্লা করছিল আর আর কাদের জানি মেয়েলি কান্না শুনা গিয়েছিল। অবশ্য পৃথিবীর সকল কান্না ও আহাজারির রূপ একই রকম বলে আমরা, কিশোরেরা হয়ত আলাদা করতে পারিনি। এখনও যেমন পারিনা আলাদা করতে ফিলিস্তিন, বসনিয়া, টুতসি-হুতু বা আরাকান মানুষদের আহাজারি বা কান্নার সুর। আর তখন অনেক রাত ছিল আর আমাদের পিতামাতারা আমাদের ঘুমাতে বলেছিলেন। আর আমরা এমনিতেই ভীত ছিলাম গ্রামের তেতুল গাছ আর পাকুড় গাছ আছে বলে। কিন্তু পরদিন তেতুল গাছ বা পাকুড় গাছ নয়, কাঠাল গাছে তিনটি লাশ ঝুলানো পাওয়া গিয়েছিল বৈজয়ন্তি আর তার তিনদিদির।
আমরা অবাক বিষ্ময়ে দেখি আমাদের দিদিরা ঝুলে আছে গাছে গাছে আর ফোটা ফোটা রক্ত ঝরছে তাদের পা বেয়ে। যেমন আমরা রেফ অব প্রমিথিউস ছবিতে দেখেছিলাম। গ্রামের যারা মাথা তারা বলছিলেন, আমাদের দিদিরা আত্মহত্যা করেছে অথবা তাদের ভুতে মেরে ফেলেছে। আমরা সত্যি খুব ভয় পেয়েছিলাম। ঠাকুরমার ঝুলিতে আমরা এমনটি পড়েছিলাম। কিন্তু যেহেতু আমরা স্কুলে অংক আর বিজ্ঞান পড়ে থাকি আমাদের মন অনেকটা যুক্তিবাদী হয়ে উঠৈছিল। দিদিরা ঝুলছিল গাছের ডাল থেকে মাটির সামান্য উপরে। তাদের রক্তের ফোটাগুলো যেখানে জমেছিল সে মাটিকে তারা চাইলেই ছুতে পারত মৃত্যুর আগে। তবে তার কেন ছুল না। আর তাদের রশি বাধা ছিল গলা থেকে তাহলে রক্ত তো মুখে না উঠে কেন আসছিল উরু বেয়ে? আর ভুত তো তাদের নেয়ার কথা ছিল পাকুড় গাছে বা তেতুল গাছে। আমরা তো সে প্রশ্নগুলোর জবাব পাইনি। আর জিজ্ঞাসা করবো যে দাদাগুলোকে তারা কেন জানি সব পালিয়ে গিয়েছিল। তারা কেন পালিয়েছিল?
বিকেলে পুলিশ এসেছিল। আমরা ভয়ে দিদিদের বাড়ি যাইনি। শুুধু সন্ধ্যার পর দিদিদের পাড়ার শ্মশানঘাটে ধোয়া উড়তে দেখেছিলাম। আর তারপর আমাদের দুএকটা দাদা যারা আমাদের উরুতে আর নিতম্বে হাত দিয়ে বিরক্ত করতো হঠাৎ উদয় হয়ে বলত যানসে যেন অবাড়ি। ওখানে ভুত আছে। বাকীগুলোরেও শিঘ্রই নেবে। সত্যি তারা সবাই একদিন উধাও হয়ে গিয়েছিল।
এখন আমাদের সে কাঠাল গাছগুলো অনেক বড় হয়েছে। জৈষ্ঠমাস এলে ঝুলে থাকে কাঠাল, যেমনটি আমাদের দিদিরা একদিন ঝুলে ছিল। কাঠাল আমি খাই নাকো। আমি কী তাই খেতে পারি যাকে আমার মৃত দিদির মতো দেখায়?
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই নভেম্বর, ২০১৩ সকাল ৯:৫৯
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×