somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

১৯৭১-এ দৈনিক সংগ্রাম (পর্ব-৩)

০৫ ই জুন, ২০০৮ রাত ১১:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রথম পর্ব দ্বিতীয় পর্ব
১৬এপ্রিল
“জনতা পাকিস্তান চায়” শিরোণামে সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, "পূর্ব পাকিস্তানকে হিন্দভূমি বানানোর ভারতের চরম ষড়যন্ত্রের জবাব দিবে পাকিস্তানের জনগন। জনগন পাকিস্তানকে পাকিস্তান রূপেই দেখতে চায়।” জনগনের নাম বিক্রি করে দৈনিক সংগ্রাম সবসময় এধরণের সংবাদ ছাপতো। অথচ তারা এও জানতো যে, তখন প্রতিদিন যে হারে দৈনিক সংগ্রাম পোড়ানো হতো তাতে এক পরিবারের ৫ বছরের রান্নার লাড়কির যোগান হয়ে যেত।

১৭ এপ্রিল
শান্তি কমিটির করা মিছিলের ভূয়সী প্রসংশা করে এ দিনও বেশ কয়টি রিপোর্ট করা হয়। এমনই একটি রিপোর্টে বলা হয় “ পাকিস্তান রক্ষার সংগ্রাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। শান্তি কমিটি গঠনের পর পুরো পূর্ব পাকিস্তানের জনগন এখন একই পতাকাতলে ঝড়ো হচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগন ফুঁসে উঠেছে ভারতীয় ষড়যন্ত্রের জবাব দিতে।” বস্তুত দৈনিক সংবাদ অতিরঞ্জিত এবং অবাস্তব সংবাদ প্রকাশ করে বাংলাদেশের জনগনকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাতো।
একই দিন পুরো পূর্ব পাকিস্তানে এরকম শান্তি কমিটি গঠনের জন্য জামায়াতে ইসলামী এবং মুসলিম লীগকে আহবান জানানো হয়। এ বিষয়ে লিখতে গিয়ে মোট ৩৭ বার জিহাদ এবং মুজাহিদ শব্দটি উল্লেখ করা হয়।দৈনিক সংগ্রাম একাত্তরে সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে ভারতকে বল্লম এবং ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতো। যদিও বাংলাদেশীরা প্রমান করেছিলো, বাংলাদেশীরা বাস্তবিক অর্থেই শত্রু সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখে। যেমন আজ এই ২০০৮ সনে এসে কি আমরা যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে সোচ্ছার নই?

১৮ এপ্রিল
“শেখ মুজিবের রেফারেন্ডম ছিলো স্বায়ত্বশাসন, স্বাধীনতা নয়” বোল্ড হরফে বড়সড় একটা আর্টিকেল লেখা হয় উপ-সম্পাদকীয়তে। যেখানে শেখ মুজিবের নামে কল্পনা প্রসূত সব অবাস্তব এবং অবান্তর কথা লেখা হয়। বলা হয়, “শেখ মুজিব সত্যিকার অর্থের ভারতীয় দালাল এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গী গোষ্ঠীর ক্ষমতা লোলুপ এজেন্ট। দেশের জনগনকে মুক্তির কথা বলে অত্যুক্তির বুলি শিখিয়ে ভারতের গোলাম বানিয়ে রাখার এক অভিনব নকশা তৈরী করেছে ভারতের দালালেরা। বাংলাদেশের জনগন এখন ইতিহাসের দ্বিতীয় মীরজাফরকে দেখতে পাচ্ছে। মুজিবকে সাথে নিয়ে নয়াদিল্লির ষড়যন্ত্র দেখে মনে হচ্ছে আগরতলা ষড়যন্ত্রও সত্যিকারের ঘটনা ছিলো।”

১৯ এপ্রিল
১৮ এপ্রিল ঢাকাতে জয়বাংলা শ্লোগানে বিশাল এক মিছিল বের করে মুক্তি কামী জনগন। যেখানে জয়বাংলা লেখা খচিত লাল সবুজ পতাকা বহন করা হয় এবং কাযেদে আজমের ছবি পদদলিত করা হয় এবং পোড়ানো হয়। এ ঘটনার পরেই দৈনিক সংগ্রামের খবর প্রকাশের ধারা পাল্টে যায়। কারণ, বিদেশী মিডিয়া এই মিছিলের বেশ কভারেজ দেয়। ১৯ এপ্রিল প্রকাশিত প্রায় সব খবরের মর্মার্থ ছিলো, “পুরো পূর্ব পাকিস্তান ভারতীয় অনুপ্রবেশে ভরে গেছে। পথে পথে এখন ভারতীয় গুপ্তচর। ভারত থেকে লোক আনিয়ে মছিল করানো হয়েছে ঢাকার পথে পথে।” পাকিস্তান সেনা বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয় “ সময় এসেছে নড়েছড়ে বসার। পুরো পাকিস্তানকে ভারতীয় চর মুক্ত করতে হবে।”

২০ এপ্রিল
“জামায়াতে ইসলামী এবং মুসলিম লীগ আগেই সতর্ক করে আসছিলো” নামের উপসম্পাদকীয়তে উল্লেখিত দল সমূহের আগাম সতর্কবাণী সম্পর্কে একটি হায়! হায়!! লেখা ছাপা হয়।
প্রাক নির্বাচনী সতর্কবাণীর বিবরণ দিতে গিয়ে বলা হয়, “জামায়াত এবং মুসলিম লীগ নির্বাচনের আগেই ভারতের ষড়যন্ত্রের বিষয়ে জনগনকে সতর্ক করে আসছিলো। কিন্তু জনগন তাতে কান দেয়নি। এখন কেন পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সামনে এমনভাবে কাতরাচ্ছে? দু’শ বছর ব্রিটিশ শাসনে থেকেও জনগন ভাবতে পারেনি যে, এই পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবের মতো আরো এক মীরজাফরের জন্ম হয়েছে। এই মূহুর্তে পূর্ব পাকিস্তানের উচিত হবে ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী এবং দেশীয় দালাল, মীরজাফরদের ধরে ধরে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া। আমরা গত পহেলা মার্চ থেকে তাদের জয় বাংলা শ্লোগান শুনতেছি এবং তাদের লুন্ঠন, অত্যাচার, রাহাজানি স্বচক্ষে দেখতেছি”

২১ এপ্রিল
এদিন সম্পাদকীয়তে বেশ জোরালো ভাবে বাংলাদেশীদের ধ্বংসের পক্ষে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিকট আহবান জানানো হয়। “প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সেনাবাহিনীকে ছড়িয়ে দেয়ার সময় এসেছে” টাইটেলে শক্তভাবে এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উল্লেখ করে লেখা হয় “ একটি দেশ জন্ম নিতে এবং পরাধীনতা স্বাধীন হতে কয়েকশ বছর লেগে যায়, কিন্তু সে দেশ পরাধীন হতে যেন একদিনও লাগে না। ব্রিটিশরা বিদায় নেয়ার পর এখন নতুন করে ভারতীয়রা চাচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানকে দখল করে তাদের দাস বানাতে। কারণ পূর্ব পাকিস্তানের জনগন অধিক পরিশ্রমী এবং মেধাবী। আমাদের আছে সুদক্ষ সেনাবাহিনী। তারা এবার ছড়িয়ে পড়–ক পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্ছলে, যেখানে তাদেরকে সাহায্য করবে এ প্রদেশের দেশপ্রেমিক জনগন।”

লেখাটি "আমার রাজাকার বিষয়ক যত পোস্ট" - এ সংরক্ষিত আছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ৩:৫৯
১৭টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×