৪র্থ পর্ব ৩য় পর্ব ২য় পর্ব ১ম পর্ব
বহুবিধ ভাবনায় পড়ে রূপবিলাসী ক্ষণটাকে স্বল্পতায় রূপ দিতে কষ্ট হলো বৈকি। এ কষ্ট মেনে নিতে হয়, কারণ কুঁজোর আচরণে স্বার্থের একটা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তার উপর সঞ্জয় বললো, কুঁজো নাকি ভারী শয়তান প্রকৃতির লোক। কিন্তু জয়কে দিয়ে কোন ধরনের শয়তানি করতে পারে? অবশ্য বিষয়টা যদি নাতনীকে নিয়ে হয়, তবে বাড়িতে একটা নারায়ন সেবা দিতে আপত্তি থাকার কথা নয় জয়’র। কারণ এতোক্ষণে এভাবেই একটা প্রান্তরেখার অংকন হয়ে গেছে। যদিও বিষয়টা সেরকম নাও হতে পারে। কিন্তু কুঁজোর ভেতরের রহস্যটা কি ধরনের? কেনই বা সে এতো আগ্রহী জয়’কে নিয়ে?
অবশেষে যাবতীয় ভাবনাকে শত্র“ বানিয়ে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সুখকর ভাবনায় পথের দীর্ঘতার আশায় শামুক সাদৃশ্য পা ফেলে ফেলে হাসি-চেহারা-উলুধ্বনি-সংসার এর মতো চতুর্ভূজের বাহুগুলো আঁকতে আঁকতে শিল্পী ছুটে চললো অসম্ভব আলসেমীতে। সত্যিই ভাবনাতে একটা আদিম সুখ আছে। সে সুখে চোরাবালিও হয়তো আছে, থাকতে পারে!
মা এখনও পত্র লিখতে ভালোবাসেন। চিঠির প্রতি ভালোবাসা এখনো গেলো না। যদিও এখানে এসেই বাংলাদেশী একটি হাতফোনের সংযোগ নিয়েছে, তবুও জয়’র মা ঠিকই চিঠি পাঠালেন। হোটেলে ফিরেই কাউন্টারে চিঠিটি পেয়ে গভীর কোন মমত্ববোধের আগাম গন্ধে নাকটা ফুলে ফুলে ওঠলো। চোখেও এক আধটু জল দেখা যাচ্ছিলো। দৌড়িয়ে রুমের সামনে গেলো ঠিকই, কিন্তু পকেট থেকে চাবি নিয়ে দরজা খোলার মতো ধৈর্য্য এসময় আর থাকে না। দরজায় হেলান দিয়েই চিঠিটি খুলে ফেললো। চিঠির প্রথম লাইনে কি থাকবে তা জানা আছে। সেটা আগে পড়ে ফেলেছিলো। এবার তার পর থেকে...
--- মোটা গেঞ্জিটা নিশ্চয় তোর গায়েই আছে। ভুলিস না, ওখানে কিন্তু জলের সাথে বিষম শীত নামে। গায়ে শীত লাগাসনে বাপ। আর শোন, তোর বাবা আবারও চশমার ফ্রেম ভেঙ্গেছে। টাকা দিইনি বলে চশমা ছাড়াই তিন দিন রেখেছি। দেখিস আবার বলতে যাসনে বুড়োটারে মাফ দাও। নেই নেই, মাফ নেই। আর শোন ওখানে খাঁটি গরুর দুধ পাওয়া যায়। ভাত খাওয়ার পর দুটো রসগোল্লা আর একগ্লাস দুধ খেয়ে নিস। খবরদার ভাত খেয়েই আবার বিড়ি ফুঁকতে যাসনে। ভীষণ চিন্তায় থাকি, কবে বিড়িইনা তোকে ফুঁকতে শুরু করে। ওদিকে বুড়িটা তোর জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে কান্না করে। বলেছিএবার ঠিকই নাতির সাথে বিয়ে পরিয়ে দেবো। অমনিই হাসির জোয়ার নামে। আমি জানি তুইও এখন হাসছিস। সামনে থাকলেতো অমনই করিস। থাক বাবা বাদ দে, আমি খালি বাজে বকি। যে কাজে গিয়েছিস তা আগে সিদ্দ করে নেয়। তোকে এবার সোনার মেডেলটা পেতেই হবে। গতবার টাইফয়েডেতো সব খেলো। সাবধানে থাকিস, ঠান্ডা বড়ো নাঠা জিনিস। ঘাড়টা এমন বাঁকা করে, হাউস না পুরা পর্যন্ত ছাড়েই না। ততোদিনে শশীরটা পাটখড়ি বানিয়ে ছাড়ে। রাতে ঘুমানোর সময়ও গেঞ্জিটা গায়ে রাখিস। কপালেতো কালির ফোটা দিতে ভুলে গেছিলাম। মেয়েদের থেকে দূরে থাকিস, কলিকালের মেয়েগুলো লেজওয়ালা হনুমানের মতো একলাফেই সাতসমুদ্র পাড়ি দিতে জানে। আমি জানি তুই আমাকে বকছিস। আরে বাপ বকার কিছু নাই। তোকে নিরাপদে রাখিস। তোর দিদি মনি আজও মন্দিরে তোর নামে বাতি দিয়েছে। এবার কিন্তু পাঁচ টাকার মোম, জ্বলতে তিনঘন্টা লেগেছে বরাবর। আসার সময় বুড়ির জন্য বার্রীগাম থেকে ক’বিড়া পান নিয়ে আছিসতো। ঐযে শোন... চশমা ছাড়া বুড়োটা সুঁই খুজে পাচ্ছে না। এখন আমাকে করে ডাকাডাকি। বসলাম একটু কলমের ময়লা শেষ করি, না তা আর হতে দিবে না, ওনাকে সুঁই খুজে দাও। আচ্ছা বাপ ঠিক আছে, তুই ভালো থাকিস। তোর ভয়ে কিন্তু প্রেসারের ঔষধটা ঠিকই খাই। ও আর একটি কথা, মাঝে মাঝে একটু ভগবানের নাম নিস। পাশে কালী মিন্দর থাকলে একটু মা’কে প্রণাম করে আছিস।
- তোর মা বলছি।
চোখের পানি ঝরবে জানতো, কিন্তু এতোটা যে ঝরবে তা আন্দাজ করে কূ’ল পায়নি জয়। ইচ্ছে করছে ফেলোশীপ, ভালো লাগার চতুর্ভূজ সব ফেলে এখনই সে বিমানবালার সাথে ঝগড়া করতে করতে ঘরে ফিরে যায়। ক’মিনিট সময় নিয়ে দরজাটি খুলেই শশীরটাকে বিছানায় আছড়ে ফেলে দিলো।
মমতার ঘোর কাটতেই বাথরুমে গিয়ে গা’টা ধুয়ে নেয়ার পালা শুরু হলো। বাড়িতেতো স্নান সেরে আসার পর গায়ের পানি নিয়ে দিয়ে মা গালে হাত রেখে দেখবে জ্বর করছে কিনা। এক টাইফয়েডে যে ভয় মা পেয়েছিলো! কতোদিন হলো মায়ের হাতের শীতলতা পায় না। কিন্তু এ শীতলতা ছাড়া যে বেশিদিন থাকা যায় না। এখানে এসে ভালোই বিপাকে পড়তে হলো। বিপাকটা ভয়াবহ, কোন পরিপূরকই নেই সে শীতলতার। বেসিনের সামনের আয়নাতে গাল রেখে একটু শীতের ছোঁয়ায় যায়। শীতটা একু বেশিই লাগে, যদিও শীতলতা পায়না ওরকম। মেঝেতে টাইলসের উপর বুক বিছিয়ে শুয়ে পড়ে একটু শীতলতার জন্য, শীতই পায় শীতলতা নয়। আবার মায়ের বকা খাওয়ার ভয়ে ওঠে পড়ে, যদিও মা এখন অনেক দূরে। গদগদে রাগ নিয়ে শাওয়ারের পানি ছেড়ে মেঝেতে পদ্মাসনে বসে পড়ে। এভাবে মিনিট ত্রিশেক। নাহ ভালোইতো। জলের সাথে প্রেমের তুলনাতো মাতৃ প্রেমের সাথেই হয়। মা যেমন পুরোটা জুড়ে, জলও তেমন। একই সাথে সবটি ছুঁয়ে যায়। রাগের গদগদানি জলের শব্দে মিশে একাকার হলেই শান্ত হয় জয়। তবুও ঘন্টা সময় নিয়ে স্নান করে বেরিয়ে পড়ে রাতের শুরুতে শহর দেখতে।
টাউন হলের মোড়ে দোতলায় একটি খাবার হোটেল। নাম বাংলাদেশ কেবিন। সব মুখরোচক খাবারের বিয়ে এই সংসারে হয়েছে। তবে যাই হোক শিং মাঝের ঝাল রান্না দিয়ে সিদ্ধ রুটি খেতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। প্রিয় খাবারের অসম্ভব টান থাকলেও মোড়ে এসেই কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকবে। শহরের ব্যস্ততা এখানে কেন জানি ভীষন ঠেকে। এই মোড়ের ব্যস্ততা সপ্তমাসী গর্ভের মতো দৃশ্যমান। তবে দোতলা থেকে যদি হোটেলের বুড়োটি একবার দেখতে পারে, তবে ওখান থেকেই হাঁক তুলবে- “ও বাপু... শিংমাঝের ঝাল ঝোল এই মাত্র চুলো থেকে নামালাম। তাড়াতাড়ি প্লেট সাজাতে হবে নইলে ঠান্ডা হয়ে যাবে, ঝোল বসে যাবে। আজ কিন্তু শীত নেমেছে খুব।” হয়তো বুড়োর গা থেকে তখনও গরমে ঘাম ঝরছে।
শহরের বড় দীঘিটির পাড়ে পৌরসভা কতোগুলো বেঞ্চি বিছিয়ে পার্কের মতো কিছু একটা বানিয়ে দিলো ভবঘুরে আর ঘুরন্ত মানুষগুলো জন্য। হোটেল থেকে শিং মাছের ঝাল খেয়ে এসে এখন প্রাণের সুখে বিড়ি ফুঁকতেছে জয়ানন্দ জয়। ঝাল খেয়ে ধোঁয়া টানলে জোশ লাগে। মনে হয় একটা বিড়ি জ্বালানোর জন্যই বুঝি ঝাল খাওয়া। সে যাই হোক বিড়িখোরদের জন্য এর স্বাদ বরাবরই মিঠে। দীঘির ওপাড়ের আলো গুলোকে ভীষণ সুখী মনে হলো। এপাড়ের বসে থাকা মানুষগুলোর দৃষ্টি ঐ আলোতেই বিদ্ধ। জ্বলে থাকার স্বার্থকতায় ধন্য হতে থাকা আলোকে ঝাপসা বানিয়ে তার মাঝে ফুলকুমারীর হাসি-চেহারা-উলুধ্বনি-সংসার নামক চতুর্ভূজটাকে বসিয়ে দিয়ে ভালোই তামাশা বাধিয়ে নিলো ইচ্ছে করে। এখন সময় প্রেমময় হতে আর বাধা থাকলো না। প্রেমটা আসলে কোথায়? এভাবে কি পথে পথেই প্রেমে স্নাত হবে? এমন প্রশ্ন যদি জয়'কে কেউ করে তবে নিশ্চিত আংটি পরা হাতের ঘুষি খেতে হবে। এখানে প্রেম আছে বৈকি। প্রেম মানে সেই প্রেম, সৃষ্টির প্রেম। একেবারে মায়ের পায়ের কাছে ফেলার একটু একটু ইচ্ছেগুলো এখন ঐ আলোর ফাঁকে পড়ে অনেকটাই বিম্তৃত হলো। এরকম ইচ্ছে এরআগে একবারই হয়েছিলো তুর্ণাদেবীকে দেখে। সেই তুর্নাদেবী এখন মেয়েকে নিয়ে কিন্ডার গার্টেনে যায়। ওসব মনে করে খালি হাসে। কি জানি বাপু এ প্রেমও কি আবার ক'বছর পর হাসি হয়ে দেখা যায় কি না। এখনতো খালি হাসির জয় জয়কার।
..........চলবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ১১:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


