আসলেও দেখলাম তাই। সিগারেট কিনতে বাকালা মানে দোকানে যেয়ে দেশে যে ব্রান্ড খেতাম Wills সেটা নেই। আছে শুধু ট্রিপল ফাইভ আর বেনসন। সাদেক বললো ওটা পাবেন না এরমধ্যে থেকেই কিনতে হবে। এক প্যাকেট নিয়ে ১০দিনারের নোটটা বাড়িয়ে দিতে মিসরীয় দোকানদার হরবরিয়ে কি যেন বললো (অন্ততঃ তখন আমার কাছে আরবী ভাষাটা এমনই লাগছিলো)। সাদেক আবার ২মাসের পুরানো বলে অল্প-স্বল্প কিছু বঝতো বলে আমাকে টাকাটা ফেরত নিতে বলে ২০০ না ২৫০ পয়সা মানে ফিলস দিয়ে দাম মিটিয়ে দিল। এত অল্প দাম! ১০০০ ফিলসে এক দিনার মানে টাকা।
বাসায় মানে ব্যারাকে ফিরে দেখি হুলুস্থুল কারবার। হাড়ি-পাতিলের ঠোকাঠুকি,প্লেটের –পানির আওয়াজ, এরমাঝে আবার কারো কারো কথা-তর্কের মাঝে ভাসছে রসিক গায়কের হেড়েগলার গান। এক রান্নাঘরে ১০/১২জন!! দেশে যার অভিজ্ঞতা আমার ছিলো না। জানলাম নীচের ৫রুমের জন্য একটাই রান্নাঘর। দোতালারও একই অবস্থা। রুমে ঢুকে দেখি এককোনায় রাখা পুরানো একটা টিভিতে আরবী গান চলছে তারই মাঝে পাল্লা দিয়ে চলছে ২০,১৮,ডাবল,রিডাবলের হৈচৈ। দেশে আমরা যাকে “গামছা বিছানো”মানে টোয়েন্টি নাইন খেলা চলছে। বেশীর ভাগ রুমেই একই দৃশ্য। আমাকে কেউ কেউ নিজের আসন ছেড়ে দিতে চাইলে সবিনয়ে খেলতে জানি না বলে প্রত্যাখান করলাম। কোথায় ফ্লাস,রামী,কাচ্চু আর ব্রিজ!! আর কোথায় এটা?? যাক এসব এক/দেড় ঘন্টার মাঝেই রান্নাঘর থেকে একে একে আসতে লাগলো ভাত তরকারির পাতিল। দেখে একজন প্লেটগুলি নিয়ে ধুতে চলে গেল আর বাকীরা খেলাবন্ধ করে মাঝে পেপার বিছিয়ে দুই লাইনে মুখোমুখি বসে পড়লো। খাওয়ার মাঝেই গল্পচ্ছলে জানলাম রুমের ৮জনই একসাথে খায়।বাজার মিলে-মিশে সবাই করে।রান্না দিন ভাগ করে দেওয়া আছে। দুজন করে। যাদের সিরিয়াল পড়বে তারাই সেদিনের খাদ্যমন্ত্রী। (কয়েকমাস পর একক সংসার ভেঙ্গে কয়কটা হয়েছিলো। রান্না আর বাজারের অভিযোগে)। আমাকেও জুড়ে দেওয়া হলো বেজোড় ছেলেটার সাথে। মাসের শেষে একজনের কাছে রাখা হিসাব দেখে সব সমান ভাগে পড়বে। বেশী হলে ফেরত দেয়া হবে,কম হলে নেয়া হবে।
বেশ হাসি-খুশীর মাঝেই খাওয়া শেষ করার পর সবাই আমাকে ঘিরে বসে পড়লো আড্ডায়। তবে প্রায় সবারই মূল প্রশ্ন ছিলো দেশের হাল হকিকত। আইন-শৃখলা পরিস্থিতি। তবে আজকের মত দলীয় রেশারেশির কনমাত্রও ছিল না। ঢাকার যারা তারা নিজ নিজ এলাকার কথা জানতে চাইলে,যতটুকু জানতাম তাই বললাম। এতেই মনে হলো দেশ থেকে প্রায় ৬০০০মাইল দুরে থেকেও আমার চোখ দিয়েই যেন ওরা সব দখতে পেলো। একদিনেই মিশে গেলাম সবার মাঝে। নিজের বন্ধুদের বাহিরে যে কাউকে এতো অল্প সময়ে কাউকে আপন করে নেওয়া যায়,আমার অন্ততঃ এটা জানা ছিল না। সুদুর প্রবাসে শুধুমাত্র একদেশের মানুষ হবার সুবাদে মুহুর্তেই কাছাকাছি চলে এলাম সবাই।বলাই বাহুল্য কথায় হোক বা নুতন মানুষকে দেখাই হোক পাশের সবকটি রুমের কেউ না কেউ উপস্থিত ছিল। কথায় কথায় রাত গভীর হয়ে যাওয়াতে একজন ডিউটির কথা মনে করিয়ে দেওয়াতে ঘোর ভাঙ্গলো সবার। চললো ঢালাও বিছানা। শুনলাম কোম্পানী নুতন বলে খাট তৈরী হচ্ছে,চলে আসবে দু/তিন দিনের মাঝেই। সাথে প্রতিটি রুমের জন্য একটি করে এসি। শুয়ে পড়লাম প্রায় সবাই। ঘুমিয়ে পড়লোও কয়েকজন প্রায় সাথে সাথেই। আর এই অভ্যাসটা ছিল না বলে জেগে রইলাম শুধু একাই।
মাথার মধ্যে এলোমেলো ভাবনা। ভাই-বোন,স্ত্রী-কন্যার কথা। সেই কৈশর থেকে একসাথে বড় হওয়া বন্ধুদের কথা। এলাকার কোনার এক বিল্ডিংএর আলো-আধারী মাঠে রাত ১১/১২টা কখনো বেশী,আড্ডা দেয়া। সেই তর্ক-বিতর্ক,(তবে শর্ত ছিল আর যাই হোক নিজেদের মাঝে থাকবে না রাজনৈতিক বিরোধ আর....। কিন্তু রতনরা সে শর্ত ভেঙ্গে আবার মাফ চেয়ে নিজেদের রক্ষা করেছিলো)।। রাগ আবার সব ভুলে হোটেলে বসে পুরো হোটেল গরম করে চা খাওয়া। মহল্লার দোকানে বাকী খাওয়া না দিলে ভয় দেখানো আরও অনেক কিছুই, সব সেলুলয়েডের পর্দার মত চোখের সামনে একে একে ভেসে উঠতে লাগলো। মিটিং-মিছিল, আর নেতাদের বড় বড় মহৎ বানী কানে ভাসতে লাগলো। মনে মনে বললাম তোমাদের জন্যই আজ আমাকে নাড়ীর বাধন কেঁটে সব ফেলে এই অজানা,অচেনা পরিবেশে এসে পড়তে হলো। আমার ক্ষমা তোমরা কোনদিনও পাবে না। আমি ফারুকের মত সাহসী হলেও অতটা নই যে,তোমাকে খুন করতে যাবো। তাই বিড়ালের মতই চলে এলাম। মিউ মিউ করতে করতে। আপনি বাঁচলে বাপের নাম। তাই আগে নিজেকে তো রক্ষা করি। মনে পড়ে গেলো এক প্রবীন রাজনীতিবীদের কথা,যার সাথে কথা হয়েছিলো বেঙ্গলের সেগুন বাগিচার অফিসে। বলেছিলেন তখন না মানা একটি অমোঘ বাক্য “prostitution is better then politics”. তখন ভুয়া আবেগ আর আদর্শের মোহজ্বালে পড়ে বুঝি নি, এমনকি বুঝতেও চাই নি।। কিন্তু আজ এতগুলো বছর পরও উনার সেদিনের প্রতিটি আলাপচারিতা কানে বাজছে। কিন্তু শুধরাবার সময় নেই।। ……………চলবে…………..।।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



