এরপর থেকেই শুরু হয়ে গেল প্রবাসের নুতন জীবন। অফিসে ডিউটি পড়লো খোদ মন্ত্রীর দফতরে। তার ব্যক্তিগত বার্তাবাহকের কাজ। আরবীতে যাকে বলে মুরাসেল। কাজ ছিল তার বিভিন্ন পেপার বিভিন্ন সচিবদের অফিসে পৌছে দেয়া। মোটামুটি মানসম্মত। কিন্তু বিপদে পড়লাম ভাষা নিয়ে। তখন আমি আরবী জানতাম না আর সাধারন কুয়েতীরা ইংরেজী (কয়েকজন বাদে)। একদিনের কথা মনে হলে আমি আজো একা একাই হাসি। ঘটনাটাও হাসিরই। সেক্রেটারী একটা পেপার আমার হাতে দিয়ে আরবীতে ডিপার্টমেন্টের নাম বলে বললো আরব ইনতে।অর্থাৎ তুমি চেনো বা জানো কি না। আর আমি মনে করলাম সে আমার নাগরিগকত্ব জানতে চাইছে। কারন কথাতে আরব বাক্যটা ছিল। আমি জবাবে বললাম নো আই এ্যাম বাংলাদেশী। শোনামাত্রই পুরো ঘর হাসিতে ফেটে পড়লো আর আমি ভ্যাবলার মত পেপারটা হাতে নিয়ে ভাবছি এতো হাসির কি হলো? যাইহোক হাসি থামতেই আরেকজন বোঝালো যাকে পেপারটা দিতে হবে তাকে চিনি কি না। বললাম রুম নাম্বারটা লিখে দিলে পারবো। এরপর থেকে আমাকে কোন কাজ দিলেই কাকে এবং রুম নাম্বার লিখে দিত। এভাবেই হোচট খেতে খেতে মাস দুয়েকের মাঝেই অফিস এবং সচীবদের নাম চিনে নিলাম। আরবীও ভাঙ্গা ভাঙ্গা বুঝতে শিখলাম। কিন্তু বলতে পারতাম না। যেমনটা হয়েছিলো সিলেট থাকতে। ৯/১০বছর থাকার পর কথা পুরোটা বুঝলেও বলতে পারি নি কোনদিনও। কতযে কথা শুনতে হয়েছে এজন্য। যাই হোক অফিসে আমার কাজ নিয়ে কোন অনুযোগ-অভিযোগ ছিল না কারোরই। আমাদের ফোরম্যানও খুশী। কারন কন্ট্রাক্টের গোড়াতেই আমার কাজ। কিন্তু আমার কাছে ভাল লাগতো না অফিসে ঢোকা এবং বেরোনের সময় গরু-ছাগলের মত নাম ধরে গুনাগুনতি। কেমন যেন মানহানীকর মনে হতো এই ব্যাপারটা,আমার কাছে। অথচ এই নিয়মটা আজও ক্লিনিং কোম্পানীগুলিতে আজো বহাল আছে। বরং পরিস্থিতি আরো খারাব ক্ষেত্রবিশেষে।
অফিসের কাজ তো চলছে মোটামুটি,সমস্যা হলো প্রথম কয়েকদিনের হানিমুন পর্ব শেষে আমাকে বাজার এবং রান্নার জন্য জুড়ে দেওয়া হলো বেজোর ছেলেটার সাথে। ৮জনের মেস। সুতরাং ৩দিন পরপরই পড়তো রান্নার ভার। চালিয়ে নিচ্ছিলাম দু’জনে ভালই। বেশীর ভাগ সময়ে খাওয়া হতো দুম্বা অথবা মুরগী। তাই বলে আপনারা আবার ভেবে বসবেন না যেন বড়লোকীর জন্য।। যা সচরাচর আমাদের দেশে হয়ে থাকে। এগুলি খাওয়ার প্রধান দু’টি কারন হচ্ছে মাছের দাম এগুলির চেয়ে বেশী । আবার কাটা-বাছা বেশ ঝামেলার। দ্বিতীয়তঃ আমাদের মাংস রান্নার পদ্ধতি ছিল দেশের মত না। মাংস ধুয়ে সব মশলা আর তেল মাখিয়ে একসাথে চুলায় বসিয়ে দিতাম। মাংসটা একটু নরম হলেই পানি দিয়ে নামিয়ে দিতাম। খুবই সহজ। আর চাল আতপ বাসমতি। যা হতে ১৫ মিনিটও লাগতো না। মাঝে মধ্যে ছুটির দিনগুলিতে “নিজেদের মত করে ভুনাখিচুরী বা বিরিয়ানী” রান্না করে পরম তৃপ্তি সহকারে খেতাম।তবে প্রায়ই দেখা যেত এটাতে লবন কম-বেশী,ওটাতে হলুদ-মরিচ। এনিয়ে তর্ক-বিতর্ক থেকে মনোমালিন্যও ঘটেছে অনেকবার। তখন বাকীরা জাতিসংঘের ভুমিকা পালন করতাম।
ভাল কথা বলতে ভুলে গেছি খাওয়ার ব্যাপারটা আলাপ করতে যেয়ে। ৩দিন পর আমাদের জন্য এলো লোহারখাট। তাও দোতলা!! জীবনে প্রথম দেলাম যে,খাটও দোতলা হয়। এখন সমস্যা বেধে গেল নিজেদের মাঝেই। সবাই চাইছে বানরের মত লাফালাফি করে উঠা-নামার চেয়ে নীচের অংশটা। সমাধান খুজে না পেয়ে নিজেরাই ঠিক করলাম এভাবে ঝগড়া করে লাভ হবে না। তারচেয়ে বরং লটারী করি যার নাম যেখানে আসবে,সে কোন আপত্তি করতে পারবে না। তাইহলো। আমার ভাগ্যে পড়লো উপরে। আরো ৩জনেরও তাই। সমস্যার সুষ্ঠ সমাধান নিয়ে সবাই খুশী। সমস্যা দখা দিল গরম নিয়ে। এসি আসে নি। এদিকে দিন দিন গরমের প্রকোপ বাড়ছে। এমন অবস্থাও হয়ছে যে,গামছা ভিজিয়ে চিপড়ে পানি ফেলে তা গায়ের উপর দিয়ে শুয়েছি। ফ্যান ছিল কিন্তু ৮জনের জন্য একটা।সেই গামছাও শুকিয়ে কড়কড়ে হয়ে যেত গায়ের গরমে আর ফ্যানের বাতাসে। ভাগ্য ভাল যে এই কষ্ট বেশী দিন করতে হলো না। এসি চলে এলো। কিন্তু সবই সেকেন্ডহ্যান্ড। হোক,তবুও এসি বলে কথা। আমাদের আনন্দ দেখে কে। ঘুমটাতো ভাল করে ঘুমাতে পারবো। এবার খোজ শুরু হলো কম্বল খোজা। মালিক মানে কফিল প্রথম দিকেই সবাইকে একটা করে কম্বল কিনে দিয়েছিল। গরমের ঠেলায় সেগুলি অযত্ন-অবহলায় পড়ে ছিলো বারান্দায়। ঝেড়ে-মুছে সেগুলিকেই আবার মোটামুটি গায়ে তোলার মত করে যোগ্য করে তুললাম। এবং সাথে সাথেই সবাই ঘুম। আমি বেচে গেলাম গাদাগাদি আর নাক ডাকার শব্দ থেকে। কারন পুরানো এসির আওয়াজ সব নাকডাকাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পার্থক্য নাক যেমন বিভিন্ন সুরে হতো,এসিতে তা হচ্ছে একই সুরে। বিশেষ করে ঠান্ডায় কম্বলমুড়ি দিয়ে শোয়ার মজাই তো আলাদা।
সব কিছুই চলছিলো ঠিকঠাক। ভেজাল লাগতে শুরু করলো পুরানো হবার সাথে সাথে। রুমের ৮জনের মাঝে ৬জনই পার্টটাইম চাকুরী জুটিয়ে ফেললো (এটা এখনো প্রবাসীদের অর্থপার্জনের মূল উৎস। কারন কোম্পানীর বেতনে কারোরই পোষাতো না। কেন না কেউ সুদে,কেউ গহনা বা জমি বন্দক রেখে,কেউ ধার করে এসেছে। সেটা শোধ করতে হবে না? তাই প্রায় বাধ্য হয়েই অফিসের ৮ঘন্টা ডিউটি শেষ করেই ব্যারাকে ফিরে কোনমতে নাকে-মুখে চারটা খাবার গুজেই বেড়িয়ে যেত পার্টটাইম জবে। এখনও এর হেরফের নেই)।। রান্না করবে কে? আর কারই বা ভাল লাগে এই গরমে রান্না করতে? শুরু হলো ভাঙ্গনের। এক মেস ভেঙ্গে হলো ৫টা। তারপর ৬টা। বাকি আমরা দু’জন আরেকজন নাম দেলোয়ার। কুয়েতেই ক মর্মান্তিক গাড়ী দূরঘটনায় আরো ৩জন সহ মারা গেছে। যারা ঘরে থাকতাম, একসাথে আর বাকী সব ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছিলাম সবাই।(এই দৃশ্যের পরিবর্তন এই ২২বছরে এখনো দেখলাম না। ব্যতিক্রম ছাড়া। হিংসা বা যেকারনেই হোক কেউ কাওকে বেশীদিন ছাড় দেয় না)। তবুও ছুটির দিনগুলিতে সবাই একসাথেই খেতাম। শত দুঃখ-কষ্টের মাঝেও ছিলাম হরিহর আত্মা। একজনের ব্যাথায় সবাই ব্যাথিত হতাম আর আনন্দে আনন্দিত।(আজ এতো ভাল থেকেও যা পাচ্ছি না, যা পাচ্ছি তাও মেকী,লোক দেখানো)। সেদিনের কারো কারো সাথে দেখা হলে খোজ-খবর নিয়ে জানতে পারি, কেউ এখানে,কেউবা দেশে যেয়ে মারা গেছে। কেউ ব্যাবসা করে ভাল আছে,কেউবা তাও নেই।
যারা এখনো আছি কাজের ধরন যাই হোক না কেন,আর দশজনের চেয়ে ভাল। কেউবা আবার সেদিনের মতই ডাবল ডিউটি করে চলছে। আমাদের এই অমানুষিক পরিশ্রম দেশের মানুষ দেখতে পারছে না,জানতে পারছে না। তারা শুধু দেখছে অর্থ। এখনও বেশীর ভাগ ছেলেই দেশে যাওয়ার সময় বাপ-মা,ভাই-বোন তথা আত্মীয়-স্বজনদের তাগিদ মেটাতে যেয়ে কর্জ করে দেশে যায়। যে যায় সে তো কখনো লজ্জায় বলেই না সত্যি কথাটা। আর বাকীদের কোন তাগিদ নেই। তারা পেয়েই খুশী।।
পরের পর্বে থাকবে আমার ভাগ্য বদলানোর কথা। ততদিন পর্যন্ত পাঠকদের কাছে সময়প্রার্থী। আর যারা পড়ছেন তদের ধন্যবাদ জানিয়ে আজকের মত এখানেই ইতি। সকালে আবার অফিস যেতে হবে। খাওয়া এখনো বাকী,লেখার তাগিদে।
…………………..চলবে…………………………

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



