
খুব ছোটবেলায় আমাদের ঘর ছিল আধাপাকা। টিনের চাল আর ইঁটের গাথুনির দুইটি ঘর পাশাপাশি। বড় উঠানের চারিদিকে এমনিভাবে ছড়িয়েছিটিয়ে অন্যদের ঘর।শুধু দাদা-দাদি থাকত সেকেলে প্রকান্ড দালান ঘরে।
তখন গ্রামাঞ্চলে প্রচন্ড লোডশেডিং হতো।তখন সবাই উঠেনে বের হয়ে আসত।কেউ বারান্দায় আর কেউ ঝকঝকে উঠোনে পাটি বিছিয়ে বসত।আমরা ছোটরা ছুটাছুটি করে খেলতাম।বড়রা গল্পগুজব করত।কৃত্রিম আলো না থাকলে প্রকৃতির আসল আলোগুলো ফুটে ওঠে। রাতকে কি রহস্যময় আর কি সুন্দরই না করে তোলে সেটা!
আমাদের বাড়ির পেছনে ঘন গাছগাছালিতে ভরা পুকুর।আর তারপর দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ।বাড়ির শেষ মাথায় টিউবওয়েল আর বাথরুম। সেটা বাড়ির একেবারে বাইরের সীমানা। নানা প্রয়োজনে সন্ধ্যার পর সেখানে যেতে হতো।কখনো কারো কোলে চড়ে,কখনো বড় কারো হাত ধরে গুটি গুটি পায়ে।সেখান থেকে দেখা যেত পুকুরপাড়ের নিকষকালো ঝোপের মধ্যে ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি জ্বলছে।পুকরের অপর পাড়ে ছিল অ
কিছু তাল গাছের সারি আর বাঁশবন।
বাবার কোলে মুখ লুকিয়ে রাখলেও চুপিচুপি সেদিকে তাকাতাম।ছোট্ট বুক ভয়ে দুরুদুরু করলেও কৌতুহল সেই ভয়কে ছাড়িয়ে যেত।আর সবকিছুকে ছাড়িয়ে যেত অপার বিস্ময়। এত সুন্দর!সেই জোছনামাখা,জোনাকজ্বলা প্রকৃতির দৃশ্য আজও স্মৃতিতে অম্লান রয়েছে।
নতুনের প্রতি দুচোখ ভরা বিস্ময় থাকে বলেই হয়ত শিশুকালের স্মৃতিগুলো এত মধুর বলে মনে হয়।ছোটকালে ভাবতাম পুকুরের অপরপাশে ঘন ঝোপের মধ্যেই আছে সেই রেললাইন যেটা দিয়ে ট্রেন যায়। ভাবলে আশ্চর্য লাগে তখন দেড় বা দুই কিলোমিটার দুরের রেললাইনে ট্রেনের শব্দ শোনা যেত।এখন একদমই যায় না।
এখনও বাড়ি গেলে সুযোগ পেলে পুকুরের দিকে তাকিয়ে থাকি।ঝোপঝাড় গাছপালা কমে গেছে,জোনাকিও তেমনভাবে নেই।এখনও চাঁদ ওঠে,জোৎস্নাপ্লাবিত হয় চরাচর।কিন্ত সেই নিকষ আঁধার নামেনা।ঘরে ঘরে এখন আই,পি,এস, জেনারেটর বা চার্জারবাতির আলো।
সেইদুটি ঘরের জায়গায় পাকা দালান উঠেছে।ছুটি ছাড়া বাড়ি ফেরা হয়না।তবুও টিউবয়েলে পানি আনতে গেলে বিল্ডিংয়ের সিকিউরিটি লাইট এড়িয়ে আজও পুকুরপাড়ের দিকে তাকাই।সেই শিশুটির অনুভূতিগুলো মনে পড়ে যায়,যার চোখে ছিল বিস্ময় আর সামনে পড়ে ছিল পুরোটা জীবন।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মে, ২০২১ রাত ৮:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


