ভারত সম্পর্কে বাংলাদেশবাসীর (খানিকটা সঙ্গত) রাগ আছে, সেটা কোলকাতা থেকে এই ব্লগে লেখালেখি করার সুবাদে মাঝে মাঝে টের পাই। একদল এই ব্লগে আবার সম্প্রতি কোলকাতার যে ব্লগের ফেসবুক পেজ নিয়মিত দেখছি সেই গুরুচণ্ডালীতে একটা পালটা চাপান উতোরও চোখে পড়ছে। দুই কট্টর শিবির নিজেদের পক্ষ থেকে অন্যের দিকে গোলাগুলি ছুঁড়ছেন। একটি গোলা আমার পূর্ব পরিচিত। এই ব্লগেও অনেকে আমায় তা ছুঁড়েছেন। সেটি হল ' আমরা মানে প বঙ্গ র বাঙালিরা তো পরাধীন, দিল্লির উপনিবেশ। আমরা কেন স্বাধীন (ঘটি) ল্যান্ড বানাই না ? বাংলাদেশীরা তো বানিয়েছে, স্বাধীন বাংলা।'
এর বিপরীত আর একটি গোলা এই ব্লগে নয় গুরুচন্ডালীতে এমত গোলার পাশেই দেখতে চাই। 'বাংলাদেশ ভারতের আর একটি অঙ্গরাজ্য হয়ে যাক'। বলাই বাহুল্য এ ধরণের বালখিল্যতার কোনও বেশি রাজনৈতিক মূল্য থাকার কথা নয়, কিন্তু ভারতের ভোটের বাজারে এ নিয়ে বিস্তর চাপান উতোর চলছে, ল্যাপটপের বাটন চাপা চলছে।
এই পরিবেশেই এসেছে নরেন্দ্র মোদির উক্তি এবং তার পালটা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া। প বঙ্গর আরামবাগে রাজনৈতিক জনসভা করতে এসে নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বের করে দেবার কথা বলেন। সি পি এম এবং তৃণমূল তার সোচ্চার বিরোধিতা করে। মমতা তো রীতিমত জেহাদ ঘোষণা করেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে মনে রাখা দরকার এখন মমতা সোচ্চারে মোদি বিরোধিতা করলেও একসময় এন ডি এ মন্ত্রীসভার সদস্য হিসেবে অনুপ্রবেশ বিরোধি বিল এ সম্মতি দিয়েছিলেন। ২০০৩ এর ১৮ ডিসেম্বর রাজ্যসভায় এই বিলটি (মন্ত্রীসভার বৈঠকে অনুমোদনের পর ,যেখানে হাজির ছিলেন মমতা স্বয়ং) পেশ করেন তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানি।
এর পরেও ২০০৫ সালে ইউ পি এ শাসনে মমতা যখন বিরোধি আসনে, তখন লোকসভায় অনুপ্রবেশ ইস্যুতে তার বক্তব্য জানাতে জান। বলেন সি পি এম ভোটার তালিকায় বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারীদের নাম ঢুকিয়ে কারচুপি করছে। তাকে এই বিষয়ে ভালোভাবে বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না, এই অভিযোগ জানিয়ে কিছু সময়ের জন্য ওয়াক আউটও করেন। কিন্তু মমতার অসততা ও ভোল বদল এই লেখার বিষয় নয়।
বিষয়টা হল মোদির কথার মধ্যে সত্যতা কতটা ? বাংলাদেশ থেকে কি ভারতে সত্যি অনুপ্রবেশ হয় ? নিশ্চয় হয়। এখন কারা অনুপ্রবেশ করেন। অনেক হিন্দু করেন। মোদি বা বিজেপি তাদের বলেন ধর্মীয় শরণার্থী। বাংলাদেশে জামাত বি এন পির অত্যাচারের কথা অনেক শুনি। ওদেশ থেকে এসেছেন এমন অনেককে চিনি। তারা ভয় পেয়েই এসেছেন তাও বুঝি। এমনি এমনি তো দেশভাগের সময়কার ২৯ শতাংশ হিন্দু কমে ৮ শতাংশ হয়ে যায় নি। এই শরণার্থীদের নিয়ে মোদি বা বিজেপির কোনও সমস্যা নেই। তাহলে কাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা বললেন নরেন্দ্র মোদি ? অনেক মুসলিম বাংলাদেশি নাকি লো এন্ড জব করতে কোলকাতায় চলে আসেন। জানি না এই তথ্য সঠিক কিনা। মনে তো হয় না কোলকাতার কাজের বাজার বা ভারতের কাজের বাজার এত ভালো যে মুসলিম বাংলাদেশীরা কাজ খুজতে এই বিদেশ ভূমিতে আসবেন সোনার বাংলা ছেড়ে। বিষয়টি নিয়ে আরো অনুসন্ধান করা যেতেই পারে। তবে আসামের বোড়ো এলাকায় তারা যে আসছেন এবং প্রত্যাঘাত হচ্ছে সে তো দেখাই যাচ্ছে। বোড়োরা তাদের জমির বিষয়ে স্বাভাবিকভাবেই সংবেদনশীল। বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী মুসলিমদের হাতে জমি চলে যাওয়াকে তারা যেভাবে হোক আটকাতে চাইছেন। জমি প্রসঙ্গে এই সংবেদনশীলতার সূত্র ধরেই একটা কথা বলেছেন এক বিজেপি নেতা। সুব্রক্ষণ স্বামী।
মোদি যে কথাটা এখনো বলেন নি সেটা বলেছেন সুব্রক্ষণ স্বামী। একদা হার্ভার্ডের অধ্যাপক, অধুনা জনতা পার্টি হয়ে বিজেপির এই নেতা পরিস্কার বলেছেন বাংলাদেশ থেকে যে হিন্দুরা ধর্মীয় কারণে শরণার্থী হয়ে এ দেশে চলে আসছে, তাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে না বাংলাদেশী সরকার। কিন্তু চলে আসা জনসংখ্যার অনুপাতে জমি দিতে হবে বাংলাদেশকে। এটা এখনো ওনার ব্যক্তিগত মত, বিজেপির অফিসিয়াল মত নয়। কিন্তু এই দাবির স্বপক্ষে যুক্তি তৈরি হলে, আবেগ যুক্ত হলে সেটা একটা সীমান্ত সমস্যা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। কারণ ৪৭ থেকে ৭১ এবং ৭১ থেকে এখনো পর্যন্ত শরণার্থী হয়ে আসা হিন্দুরা কমিউনিস্টদের সঙ্গে ছিলেন। তারা উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির সাথে চলে গেলে এবং বিজেপি ভারতের ক্ষমতায় এলে এই দাবিটি আরো জোরাল হবে। ভারত বাংলাদেশ সমস্যা কখোনোই ভারত পাকিস্থান সমস্যার মত ছিল না। কিন্তু অনুপ্রবেশ ইস্যু ও শরণার্থী অনুপ্রবেশের সূত্রে জমির দাবি তীব্র হলে তা মারাত্মক চেহারা নিতে পারে। জমির দ্বন্দ্ব জল নিয়ে দ্বন্দ্বর চেয়ে বেশি ই হবে। আমাদের অবশ্যই সতর্কভাবে আগামী পরিস্থিতির দিকে নজর রাখতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মে, ২০১৪ দুপুর ১:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



