চোখ খুললাম আমি।
চোখ খোলার পর আমার চোখ ঘরের তিন দিকে ঘুরে এল। হাসপাতালের সুসজ্জিত একটা কক্ষ।
দরজার পর্দায় সুন্দর করে লেখা, ‘মালে কুইন হাসপাতাল।'
মাথায় হাত না দিয়েই বুঝলাম, গোটা মাথায় ব্যান্ডেজ। মাথা ভারি এবং বেদনা।
মাথা বাঁদিকে একটু ঘুরাতেই ডাঃ লোপা কে দেখতে পেলাম।
ডাঃ লোপা এল আমার সামনে।
আমি-‘গুড ইভনিং ডাক্তার।'
ডাঃ লোপা-‘ওয়েলকাম মিঃ এস এইচ সৈকত পাটোয়ারী।'বলে একটু ভাবল ডাঃ লোপা। তারপর বলল, 'গুড ইভনিং বললেন কেন, কি করে বুঝলেন যে এখন বিকেল?'
-'টেবিলের ফুলদানিতে তাজা ফুল দেখে। সাধারণত হাসপাতালের কক্ষগুলোতে বিকেলে ফুল সরবরাহ করা হয়।'
-'স্থান বিশেষে নিয়ম তো আলাদাও হতে পারে।'
-‘হাসপাতালের সকালটা খুব ব্যস্ত সময়। এ সময় হাসপাতালে ফুল সরবরাহের পরিবেশ থাকে না। তবে আরও কিছু কারণ আছে।'
ডাঃ লোপা কিছুটা অবাক হলো। বলতে গেলে বেশির ভাগ সময় হাসপাতালে কাটে, কিন্তু সেতো এ বিষয়টা এতদিন লক্ষ্য করেনি! বলল, 'সে কারণগুলো কি?'
আমি একটু ঈষিৎ হেসে বললাম- ‘প্রথমত, আমার ক্ষুধা। মনে হচ্ছে, খাওয়ার পর অন্তত পাঁচ ছয় ঘন্টা পার হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আপনার ক্লান্তি। দীর্ঘ সময় আপনি ডিউটিতে আছেন। কিন্তু আপনার চোখে-মুখে রাত জাগার চাপ নেই।'
ডাঃ লোপার চোখে-মুখে ফুটে উঠল বিস্ময়। বলল, ‘সামান্য কয়েক মুহূর্তে আপনি এত জিনিস খেয়াল করেছেন! এত সুক্ষ্ণ বিষয় আপনার চোখে পড়ে! আপনার পরিচয় কি? পেশা কি?'
-‘আমার পাসপোর্টে কিছু তো পেয়েছেন?'
-‘আপনার পাসপোর্ট আমি দেখেছি কি করে বুঝলেন?'ডাঃ লোপার কণ্ঠে আবারও বিস্ময়।
-‘পাসপোর্টে লেখা আমার পূর্ণ নাম আপনার মুখে শুনেছি।'
ডাঃ লোপা টেবিলের পাশের চেয়ারটিতে ধপ করে বসে পড়ল।
তার চোখে মুখে প্রবল উৎসুক্য। বলল,আমার নাম জানলেন কিভাবে আর বলুন তো আপনার পকেট থেকে কিছু খোয়া গেছে কিনা?'
-‘না খোয়া যায়নি আর নাম জেনেছি আপনার নেমপ্লেট থেকে।
-আচ্ছা নামের ব্যাপারটা বুঝলাম কিন্তু কি করে নিশ্চিত হলেন আপনি এতটা যে আপনার কিছু খোয়া যায়নি?'
-‘আপনার প্রশ্ন থেকে।
-‘আমার প্রশ্ন থেকে!!!'বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে বলল ডাঃ লোপা।
-হ্যাঁ।আপনার প্রশ্ন থেকে বুঝা যাচ্ছে, খোয়া যাওয়ার মত কিছু আমার পকেটে ছিল যা আপনি দেখেছেন। যখন দেখেছেন, তখন তা খোয়া যাওয়ার কথা নয়।'
এবার ডাঃ লোপার চোখে বিস্ময় বিমুগ্ধ দৃষ্টি। বলল, ‘আপনি শার্লক হোমস-এর মত কোন গোয়েন্দা নাকি? এমন সুক্ষ্ণ বিশ্লেষণ সাধারণ মাথার কাজ নয়।'
ঠিক তখন আমার জন্যে খাবার এল। সবজির স্যুপ। এক গ্লাস দুধ।
-সবজির স্যুপে প্রাণীজ কোন চর্বি নেই তো?'এ্যাটেনডেন্টের দিকে চেয়ে বললাম।
এ্যাটেনডেন্ট কিছু বলার আগেই ডাঃ লোপা বলল, 'ভেজিটেবল ওয়েল আছে, প্রাণীজ চর্বি কোন ভেজিটেবল স্যুপে দেয়া হয় না।'
-শুকরসহ কিছু প্রাণী আছে, সেগুলো ছাড়া সব কিছুই খাই।
আমাদের ধর্মে এগুলো খাওয়া নিষিদ্ধ।
-বুঝেছি। আচ্ছা বলুন তো, এই নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারটা কি ধর্ম প্রবর্তকদের লোকাল কালচার থেকে এসেছে?'
-'দু'একটা এমন ঘটা বিচিত্র নয়, তবে ইসলামে নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারটা সেই প্রাণীর ধরণ ও গুণাগুণের সাথে সংশ্লিষ্ট। হিংস্র ও জঘন্য চরিত্রের প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার ইসলামে নিষিদ্ধ হয়েছে।'
-‘শুকর নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনেও কি একই কারণ?'
-‘আমার মনে হয় তাই।'
-‘প্রাণীর গোশতের গুনাগুণ একটা যুক্তিসংগত বিবেচ্য বিষয়। কিন্তু প্রাণীর হিংস্রতা ও চরিত্র কি করে নিষিদ্ধের কারণ হতে পারে?'
-‘যা খাওয়া হয়, তার বস্তুগত দিকের মত তার জেনেটিক প্রভাবও পড়ে কিনা তা আপনারা ডাক্তাররাই ভাল বলতে পারেন।'
ডাঃ লোপা হাসল। হাসলে মেয়েটাকে অস্বাভাবিক সুন্দর লাগে।
ডাঃ লোপাই বলল, ‘খাদ্যের উদ্দ্যেশ্যই তো খাদ্য থেকে তার গুণাগুণ আহরণ করা।'
বলে একটু থেমেই আবার বলল, ‘জেনেটিক লাইনও দেখেছি আপনার নজরের বাইরে নয়। আসলে আপনি কে বলুন তো?'
আমি কিছু বলতে যাবো এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করল একটি যুবক।
ডাঃ লোপা যুবকটির দিকে তাকিয়ে'এস রাজ'বলে আমাকে লক্ষ্য করে বলল, 'এ আমার প্রানের বন্ধু রাজ। এই আপনাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। রাজই এখন আপনার'লোকাল গার্ডিয়ান'। তার কাছেই আপনার পাসপোর্ট, মানিব্যাগ ও ব্যাগেজ রয়েছে।' হাসি মুখে কথা শেষ করল ডাঃ লোপা।
শুয়ে থেকেই আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম হ্যান্ডশেক-এর জন্যে।
রাজও হ্যান্ডশেক করার জন্য আসছিলো আর হাসতে হাসতে বললো ও আমার পাগলী বন্ধু নাম হচ্ছে "লোপু পাগলী"
এতক্ষনে নিশ্চই পরিচয় হয়েছে।
ডাঃ লোপার সারা মুখ রক্তিম হাসিতে ভরে গেলো,
চট করে রাজ এর পিঠে একটা কিল বসিয়ে দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেলো আমাদের সামনে থেকে.............

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


