somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বপ্ন ধরা দিল সত্যি হয়ে

০৯ ই মার্চ, ২০১৪ রাত ৩:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শাইনপুকুর হোল্ডিংস লিমিটেডের বিজ্ঞাপনটির কথা মনে আছে? স্বপ্ন হলো সত্যি এবার ইটের পর ইট! কথাটি কেমন যেন একটা ইতিবাচক ভাবনা ঢুকিয়ে দিত মনের মাঝে। এখনকার বাংলাদেশের ক্রিকেট তখনকার স্বপ্ন। স্বপ্ন মানেই মনে হতো দীর্ঘপথ, বড় কোন আকাঙ্খা মানে যুগের পর যুগ অপেক্ষা। স্বপ্নই আশাবাদী করতো আমাদের। ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয় দিয়ে ওয়ানডে স্ট্যাটাস অর্জনের রঙ ছিটানো আনন্দ আর আকরাম, বুলবুল, রফিক, দূর্জয়দের হৃদয়ের মাঝে আওরাতে আওরাতে বছরটা পেরোল।

এত বড় সাফল্যে তখন ক্রিকেটটা আর লুকিয়ে খেলতে হতো না। পাড়ার কোনো ম্যাচে ম্যাচ সেরা হলে বাসায় বলার মতো সাহস হয়ে গেছে। যদিও তার আগে বলার মতো দুঃসাহস কখনোই দেখাইনি। কেন দেখাচ্ছি? আইসিসি ট্রফি জেতার পর উৎসবের রেশে পুরো বাংলাদেশ রঙে রঙিন হয়ে গেল। ক্রিকেট খেলাটা যে খারাপনা, আকরামরা অনেক নাম করেছে বিদেশের মাটিতে, সম্মান এনেছে। বড় কিছু না হলেতো আর প্রধানমন্ত্রী পুরো দলকে এভাবে সম্মানিত করেনা! তার মানে ক্রিকেট দুর্বোধ্য হলেও অভিভাবক মহলেও ক্রিকেটের একটা জায়গা তৈরি হয়ে গিয়েছিল।


তাইতো ম্যাচ সেরার পুরস্কারটি তখন থেকে লুকিয়ে বা বন্ধুর বাসায় রেখে আসতে হতো না। অভিভাবক মহলে ক্রিকেটর স্বীকৃতি মানে ক্রিকেট খেলাটা বাংলাদেশে স্বাধীনতার রূপ পেয়েছে। স্বাধীনতা কথাটি একটু কেমন কেমন শোনালেও তখনকার বাস্তবতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমন ছিল।

ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়ার পর বাংলাদেশ দলের ওয়ানডে ম্যাচ খেলার পরিমান স্বাভাবিকভাবেই বাড়তে লাগলো। ভারতে তিনজাতি টুর্নামেন্টে কেনিয়াকে হারিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে জয় তুলে নিল বাংলাদেশ। অসাধারণ সেই জয়টির নায়ক দেশের জনপ্রিয় অলরাউণ্ডার মো. রফিক। ব্যাট হাতে ৭৭ রানের পর বল হাতে ৩ উইকেট। তখন কিন্তু কেনিয়া খুবই শক্তিশালী দল। মরিশ ওদুম্বে আর স্টিভ টি-কোলো দুজন মিলেই নাকাল করতেন দেশ সেরা বোলারদের। আর বল হাতে টনি সুজি, মার্টিন সুজিরা সমানে তেড়েফুড়ে ওঠতেন।

আইসিসি ট্রফি হাতে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম অধিনায়ক
আকরাম খান। সাথে আমিনুল ইসলাম বুলবুল (ডানে)

তখন বাংলাদেশের ম্যাচ মানেই সারাদেশে উৎসবের আমেজ। দেশের তরুন ক্রিকেট পাগলরা কাজকর্ম ফেলে শুধুই বাংলাদেশের ম্যাচ শুরুর জন্য অপেক্ষা করতেন। আর ম্যাচের শুরুর সাথে সাথে স্বপ্ন, আশা-আকাংক্ষার পসরা নিয়ে বসে থাকতো পুরো জাতি। তখনকার ক্রিকেটারদের সীমাবদ্ধ পারফরম্যান্সের কথা ভুলেই যেতেন বেশির ভাগ সমর্থকরা। সীমাবদ্ধতার শৃংখল ভাঙতে চেষ্টার কোন এটি থাকতো না ক্রিকেটারদের। তবে নিরাশার মেঘেই ঘোরপাক খেতে হয়েছে বেশির ভাগ সময়। তারপরও বাংলাদেশ ক্রিকেটটা আন্তজার্তিক ম্যাচ খেলতে পারছে এই পরিচিতিটার মর্যাদা ঠিকই অনুধাবন করতে পারতেন ক্রিকেটমোদিরা। হারের মাঝে বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানদের ব্যাক্তিগত কীর্তিগুলো ভালোই উপভোগ্য হতো। ব্যাটিংয়ে কোনো ব্যাটসম্যানের ফিফটি, লোয়ার অর্ডারে হঠাৎই কোনো ব্যাটসম্যানের ঝোড়ো তাণ্ডবে একটি-দুইটি ছয়ের মার কিংবা বল হাতে কারো ২/৩ উইকেটের প্রাপ্তি নিরাশার মাঝে নতুন নতুন সপ্নের বীজ বপন করতো।

তার আগেও যে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল নিজেদের প্রমান করার সুযোগ পেতনা তা কিন্তু নয়। এশিয়া কাপ, কিছু ত্রিদেশিয় টুর্নামেন্ট খেলত টাইগাররা। ইংল্যাণ্ড ‘এ’ দল, নাম করা কয়েকটি বিদেশি ক্লাব এসে খেলতো ৪ দিনের টেস্ট ও সীমিত ওভারের ক্রিকেট ম্যাচ।

১৯৯৭ সালের মতো ১৯৯৮ সালটাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ন হয়ে ওঠে এদেশের ক্রিকেটের জন্য। জানুয়ারিতে ঢাকায় বসে ইণ্ডিপেণ্ডেন্স কাপ। অংশ নেয় বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান। উদ্বোধনী ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে ৪ উইকেটের জয় তুলে নেয় ভারত। ৪ উইকেটের ব্যবধানে বাংলাদেশ হারলেও ভারতকে ঘাম ছুটিয়ে জিততে হয়েছিল। কারণ বল হাতে রাখতে পেরেছিল মাত্র ২০টি। বড় দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম ক্লোজ ম্যাচ। লোয়ার অর্ডারে কানিতকার ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে না গেলে এদিনই অন্যরকম কিছু হতে পারতো।

আগের দিন বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ একটি দৈনিকের খেলার পাতার শিরোনাম ছিল এমন- ‘আজ ২০০ রানের লক্ষ্যে নামবে বাংলাদেশ’। সে ম্যাচে বাংলাদেশ করেছিল ১৯১ রান, ২০০’র কাছাকাছি স্কোর। ব্যাটিং করেছিল পুরো ৫০ ওভার। হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোনো বাংলাদেশের জন্য ছিল তা অনন্য কীর্তির।

ইন্ডিপেন্ডন্স কাপের ফাইনাল খেলে দুই পরাশক্তি ভারত-পাকিস্তান। শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালের শেষ ওভারে জয় পরাজয় নির্ধারিত হয়। পাকিস্তানের দেয়া ৩১৫ রানের টার্গেট কানিতকারের বাউন্ডারিতে ১ বল হাতে রেখে পৌঁছে যায় ভারত। ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে চরম রোমাঞ্চকর সেই ম্যাচের সাক্ষী হয় প্রায় কুড়ি হাজার দর্শক। ক্রিকেটপাগল জাতির তকমা তখনই লেগে যায় বাংলাদেশ নামক ছোট্ট দেশটির গায়ে। বিশ্ববাসীর মন কেড়ে নেয় বাংলাদেশ। ক্রিকেট আসর আয়োজন ও আলোড়ন তৈরিতে বাংলাদেশের সুনাম ছড়াতেই থাকে।

১৯৯৮ সালের নভেম্বর, ঢাকায় বসলো ক্রিকেটের মহাআসর মিনি বিশ্বকাপ। ভেন্যু সেই বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম। দেশজুড়ে বইতে শুরু করলো ক্রিকেট উন্মাদনা। ঢাকার মাঠে এক আসরে বিশ্বের সব তারকার মিলনমেলা; ভাবা যায়! শচীন-ওয়ার্ন, মুরালি-স্টিভওয়াহ, ওয়াসিম আকরাম-আজহারউদ্দিন, লারা, ডোনাল্ড-ক্রনিয়ে, ম্যাকমিলান-এমব্রোসদের দ্বৈরথ দেখার মতো বড় স্বপ্ন পূরণের উপলক্ষ পায় দেশের ক্রিকেটপ্রেমিরা। সব ম্যাচ ডে-নাইট। তাইতো প্রথমবারের মতো স্টেডিয়ামে বসলো ফ্লাড লাইট। উইকেট বানানোর জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আসলো ঘাস। ক্রিকেট জোয়ার তৈরি হল পুরো দেশে। শুভ্রদেব-শাকিলা জাফরের কণ্ঠে থিম সংয়ের সুর বাজলো, ‘একই বিশ্ব একই খেলা, ক্রিকেট ক্রিকেট-ক্রিকেট মেলা। সবজাতি এক হয়ে সোনার বাংলা গড়বো...’টেস্ট প্লেয়িং দেশ না হওয়ায় আসরে নেই বাংলাদেশ। অথচ বাংলাদেশের ক্রিকেট পিপাসুদের ক্রিকেট উন্মাদনায় তা বোঝার কোন উপায়ই থাকলো না।

বিশ্ববাসীর কাছে আরেকবার প্রমাণ হলো বাংলাদেশ কতটা ক্রিকেট পাগল জাতি! ফ্লাড লাইটের আলোয় উদ্বোধনী ম্যাচে নামল নিউজিল্যান্ড আর জিম্বাবুয়ে। ক্যাম্ববেল, ফ্লাওয়ারদের নাকের ডগা থেকে ম্যাচ বের করে নিয়ে গেল কিউইরা। শেষ বলে ৩ রানের প্রয়োজনকে বাউণ্ডারিতে রুপ দেন ক্রিশ হ্যারিস। উদ্বোধনী ম্যাচেই এমন উওেজনায় আবারও প্রমান হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট উওেজনার এক উর্বর ভুমি। ক্রিকেটভক্তরা নেচে-গেয়ে উৎসবের আমেজে উপভোগ করলো পুরো আসর।

ভারত-পাকিস্তান রাজনৈতিক দ্বৈরথের কারণে নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে ঢাকায় এলো পাকিস্তানের-শ্রীলংকার মধ্যকার এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল ম্যাচ। ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী পর্বের অংশে ওয়াসিম আকরাম বললেন- ‘বাংলাদেশ আমার সেকেন্ড হোম। এখানকার দর্শকদের ক্রিকেট উন্মাদনা আমাকে বারবারই অবাক করে। ধন্যবাদ বাংলাদেশের দর্শকদের’। আকরামদের এমন বাংলাদেশ বন্দনা পরবর্তীতে বাংলাদেশকে টেস্ট স্ট্যাটাস দেবার ব্যাপারে ইতিবাচক ধারণাই দেয় আইসিসিকে, পরোক্ষভাবে কাজে আসে বিখ্যাত ক্রিকেটারদের বাংলাদেশ নিয়ে এমন সব ইতিবাচক মন্তব্য।

এরপর এলো বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণের সাল। ১৯৯৯ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ, প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ আসরে সুযোগ পাওয়ায় আবেগাপ্লুত পুরো জাতি আর ক্রিকেট দলকে ঘিরে দেশজুড়ে অনন্য এক গৌরবের অনুভূতি। প্রথম ম্যাচে কিউইদের বিপক্ষে বড় হারের পর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর জয়। জয়ের নায়ক মিনহাজুল আবেদিন নান্নু। অথচ নান্নুকে প্রথমে দলেই রাখা হয়নি। এ নিয়ে তখন মধুর বিতর্কেরও জন্ম হয়েছিল।

ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে বড় হারের পর শেষ ম্যাচ পাকিস্তানের বিপক্ষে। ১৯৯৯ সালের ৩১ মে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের হট ফেবারিট ছিল পাকিস্তান। সেই পাকিস্তানকেই কি না হারিয়ে দিল বাংলাদেশ! উৎসবের আমেজ ছড়ালো সারা দেশে। সারা বিশ্বে বাংলাদেশকে নিয়ে হই হই রই রই। আবেগে আপ্লুত হলেন ক্রিকেটপ্রেমি আর দেশপ্রেমিরা। খালেদ মাহমুদ সুজন পেলেন সংগ্রামী ক্রিকেট ক্যারিয়ারে সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষার পুরস্কারটি। হাতে ওঠে বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক ম্যাচটির ম্যাচ সেরার পুরস্কার। ব্যাট হাতে ২৭ রানের পর বল হাতে নেন শহিদ আফ্রিদি, ইনজামাম আর সেলিম মালিকের মূল্যবান উইকেট।

বছরটা দ্রুতই পেরোলো, এল ২০০০ সাল। স্বপ্নকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেবার বছর। তখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতির স্থানে ভিশনারিজ সংগঠক সাবের হোসেন চৌধুরী। আর আইসিসির চেয়ারম্যান তখন ভারতের জগমোহন ডালমিয়া। ক্রিকেট কুটনীতিতে বিচক্ষণ সাবের এরই মধ্যে টেস্ট প্লেয়িং দেশগুলোর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। টাইগারদের কীর্তির ব্যাপারে ইতিবাচক ধারণা ছিল সবারই। আইসিসি সভায় সিদ্ধান্ত হয় বাংলাদেশ পাচ্ছে টেস্ট স্ট্যাটাস। আবার আরেকটি উৎসবে সামিল সবাই। বাংলাদেশ খেলবে টেস্ট ম্যাচ; সাথে কত ধরনের সুযোগ-সুবিধা!
টেস্ট স্ট্যাটাস পাবার পর সাদা জার্সিতে মাঠে নামার অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হয়নি। ১০ নভেম্বর ঢাকায় ভারতের বিপক্ষে অভিষেক টেস্ট ম্যাচ উপলক্ষ্যে ঢাকায় সাজসাজ রব। প্রথম ইনিংসে তাক লাগানো ব্যাটিং! আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ১৪৫ রানের কীর্তিতে বাংলাদেশ ছোয় ৪০০ রানের মাইলফলক। দ্বিতীয় ইনিংসে খারাপ করায় বাংলাদেশ হারে ৯ উইকেটে। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা প্রথম ইনিংসে আজহারউদ্দিনের ভারতকে দুশ্চিন্তা লেপ্টে দিয়েছিল বেশ ভালোভাবেই। প্রথম টেস্ট অধিনায়ক নাইমুর রহমান দূর্জয় অফ স্পিনের ঘূর্ণিতে তুলে নেন ছয় ছয়টি উইকেট।


সেসব কীর্তি বাংলাদেশকে আশা দেখালেও আশাহত হয়ে ম্যাচ শেষ করতে হতো বেশির ভাগ সময়ই। কখনো ইনিংস হার এড়ানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা বা কখনো ৩ থেকে ৪ দিন পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে হারার স্বাদ দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা। তবে ওয়ানডে ক্রিকেটে মাঝে মাঝে টাইগাররা জয় এনে দিয়ে ক্রীড়ামোদিদের স্বপ্নের বেলুনে হাওয়া দিতেন।

দলে আসেন আশরাফুল নামে এক ক্ষুদে ক্রিকেটার। ২০০১ সোলে কলম্বোর প্রেমাদাসায় শ্রীলংকার বিপক্ষে অভিষেক হয় মো. আশরাফুলের। মাত্র ১৭ বছর বয়সে অভিষিক্ত আশরাফুল অভিষেক টেস্টেই করে বসেন নিখাদ এক সেঞ্চুরি। বিশ্বক্রিকেটে আশরাফুল বনে যান বিশ্ময় বালক; আর বাংলাদেশের ক্রিকেটের আশার ফুল। কপি বুক ক্রিকেট, নান্দনিক ছন্দের প্রতিভাবান ক্রিকেটার মো. আশরাফুল। শুরু হয় দেশের ক্রিকেটের নতুন এক অধ্যায়। অল্প সময়ের ব্যবধানেই আশির্বাদ হিসেবে দলে মাশরাফি, আফতাবের মতো ক্রিকেটাররা আসেন তারুণ্যের সাথে দায়িত্বশীলতার পসরা সাজিয়ে। স্বপ্নের বীজ তখন শস্য হয়ে ফুলেফেপে উঠতে শুরু করেছে। স্বাভাবিকভাবেই বেশ কিছু সিনিয়র ক্রিকেটারকে তারুণ্যের কাছে সপে দিতে হয় বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের মিশেলে ভালো কিছু করার ইঙ্গিত থাকলেও সমস্য রয়েই যায়। বহু আশা দেখিয়েও টিম বাংলাদেশ হয়ে উঠতে ব্যার্থ হয় টাইগাররা। অর্জন বলতে শুধু ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সগুলো। কখনো হাবিবুল বাশার, কখনো আশরাফুল ব্যাটিংয়ে জ্বলে ওঠতেন, কখনো আবার আফতাব। আবার সবাই একত্রে জ্বলে ওঠলে মাশরাফি, রফিকদের বলের কারুকার্যে ভাটা। কখনো ব্যাটিং ব্যার্থতা আবার কখনো বোলিংয়ে দৈন্য দশা। এভাবে চললো কয়েকটি বছর।

২০০৪ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ওয়ানডে ফরম্যাটে জিম্বাবুয়েকে পরাজিত করে। ২০০৪ সালের ডিসেম্বর ২৬; বাংলাদেশ তাদের শততম ওয়ানডে ম্যাচ খেলতে নামে ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। অবিশ্বাস্যভাবে বাংলাদেশ হারিয়ে দেয় ২০০৩ বিশ্বকাপের রানার্সআপ ভারতকে। জয়ের নায়ক হন মাশরাফি। তৃতীয়বারের মতো কোনো টেস্ট প্লেয়িং দেশকে হারিয়ে দিয়ে আবারো চমক তৈরি করে টাইগাররা।

টেস্ট স্ট্যাটাস পাবার ৫ বছরের মাথায় ২০০৫ সালে বাংলাদেশ পায় প্রথম টেস্ট জয়ের স্বাদ। চট্টগ্রামের এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ জিম্বাবুয়েকে হারায় ২২৬ রানের বিশাল ব্যবধানে। ওই বছরেরই জুনে বাংলা টাইগাররা যায় ইংল্যান্ডে তিনজাতির ন্যাটওয়েস্ট সিরিজ খেলতে। কার্ডিফে বিশ্বকাপ জয়ী অজিদের হারিয়ে দিয়ে নতুন করে বিস্ময়ের জন্ম দেয় নবীন এ দলটি। ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের এমন কীর্তির খবরটি বিদ্যুৎবেগে ছড়াতে থাকে। সেই ম্যাচে আশরাফুলের অসাধারণ সেঞ্চুরির কীর্তিটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে থাকে বাংলাদেশ দলকে।

২০০৫ সালে কার্ডিফে আশরাফুলের অসাধারণ সেঞ্চুরির পর অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক রিকি পন্টিং ছুটে আসেন অ্যাশকে অভিনন্দিত করতে। পরের ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আবার বিধ্বংসী রূপে আবর্তিত হন মো. আশরাফুল। ৫২ বলে খেলেন ৯৪ রানের টর্নেডো ইনিংস। দীর্ঘকায় ফাস্ট বোলার হার্মিসনের বাউন্সারগুলোর ঠিকানা হয় আশরাফুলের হুক আর পুলে ডিপ স্কয়ার লেগ দিয়ে কখনো বাউন্ডারি আবার কখনো ওভার বাউন্ডারিতে সীমানার ওপারে। বাংলাদেশ মানেই আশরাফুল, আশরাফুল মানেই বাংলাদেশ। এমন অবস্থা হলো যে বিশ্ববাসী বাংলাদেশকে চিনুক বা না চিনুক আশরাফুলকে ঠিকই...!

এরপর গেলো আরও কয়েকটি বছর। ফর্ম হারালেন আশরাফুল। দলে ঢুকলেন সাকিব, মুশফিকরা। ততদিনে শাহরিয়ার নাফিস, তামিম ইকবালরাও বাংলাদেশের অন্যতম কাণ্ডারী। ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে কুইন্স পার্ক ওভালে জয় পেল বাংলাদেশ। তিন তরুণ সাকিব, তামিম, মুশফিকের অর্ধশতকে ৫ উইকেটের গর্বের জয় পায় বাংলাদেশ। ম্যাচ সেরা সেই মাশরাফিই, ৩৮ রানে ৪ উইকেট নিয়ে।

কখনো প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আবার কখনো চরম হতাশাজনক পারফরম্যান্স তার মাঝে বাংলাদেশ ওয়ানডেতে সব টেস্ট প্লেয়িং দেশকে হারানো হয়ে গেছে। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো টেস্ট জয়ের স্বাদ পায় ২০০৯ সালের জুলাইতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে কিংস্টনে ৯৫ রানের জয়ের পর শেষ টেস্টে সেন্ট জর্জে দ্বিতীয় ইনিংসে সাকিবের অপরাজিত ৯৬ রানের সুবাদে ৪ উইকেটের জয় পায় বাংলাদেশ। ২ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ টাইগাররা জিতে নেয় ২-০ তে। ম্যাচ সেরা ও টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার ওঠে সাকিব আল হাসানের হাতে।

এতসব সাফল্যের পরও উত্থান-পতনের বেড়াজালে বন্দী থাকা বাংলাদেশ দলের জন্য এল পূর্ণাঙ্গ সাফল্যের একটি বছর, ২০১০ সাল। নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশ সফরে এল ওয়ানডে সিরিজ খেলতে। বাংলাদেশ কিউইদের করলো ৪-০ তে হোয়াইটওয়াশ! আরো একবার জোয়ার লাগলো বাংলাদেশের ক্রিকেট পালকে। সেই অর্জনকেও টাইগাররা ছাপিয়ে গেল ২০১২ সালের মার্চে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় এশিয়া কাপে। শ্রীলংকা, ভারতকে হারিয়ে পাকিস্তানের সাথে ফাইনালেও জয়ের কাছে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। ভাবা যায়! এশিয়ার দুই অন্যতম পরাশক্তিকে (ভারত, শ্রীলংকা) কুপোকাত করে এশিয়া কাপ ঘরে তুলতেই যাচ্ছিল টাইগাররা। তবে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের সাথে কুলিয়ে ওঠতে পারেননি। মাত্র ২ রানের জন্য। সাকিব-তামিম-মুশফিকদের সাথে আবেগের কান্না ঝড়েছিল দেশের কোটি দর্শকের চোখে। এশিয়া কাপে রানার্সআপের গৌরবই বা কম কিসে?

নভেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বাংলাদেশ সফরে এলে প্রাপ্তির পরিসংখ্যান আরো বড় হয়ে ওঠে টাইগারদের। বাংলাদেশ পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ জিতে নেয় ৩-২ এ। গেইলদের বধ করতে অনন্য ভূমিকা পালন করেন তরুণ অফ স্পিনার সোহাগ গাজী। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের সাথে সাথে আরো একঝাক তরুণ প্রোমেসিং ক্রিকেটার জায়গা করে নেয় জাতীয় দলে। মুমিনুল, নাসির হোসেন, আবুল হোসেন আর সোহাগ গাজী। সাকিব, তামিম, মাশরাফি, মুশফিকরদের সাথে গাজী, হাসান, নাসির, মুমিনুলে দীর্ঘদিনের স্বল্পকায় পাইপ লাইন হঠাৎই দীর্ঘ এবং পোক্ত হয়ে ওঠে। জাতীয় দলে টিকে থাকার লড়াইও শুরু হয়ে যায়। ক্রিকেট ভক্তদের কাছে এমন প্রতিযোগিতা অনেক সুখের একটি বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আর বাংলাদেশ দলের উন্নতির প্রাসাদ আরো বড় হতে থাকে। হঠাৎ করে পাইপ লাইন দীর্ঘ হওয়ার মূলে বিপিএল রেখেছে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা।

এরপর ২০১৩, টিম বাংলাদেশ হয়ে ওঠার বছর। শ্রীলংকা সফরে গলে বাংলাদেশ পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রেখে টেস্ট ড্র করে। গলে শ্রীলংকার বিপক্ষে দেশের একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরি করে মুশফিকুর রহিম।

অসংখ্য রেকর্ডের সেই টেস্টে বাংলাদেশ পেলো দেশের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ানকে। মুশফিকুর রহিমের উইলো থেকেই আসলো এমন মহাকীর্তি। মুশফিকের আগে মো. আশরাফুলের নামটি লেখা হতে পারতো এত বড় কীর্তির খাতায়। তবে গল টেস্টেই ১৯০ রান করে রঙ্গনা হেরাথের বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান। শেষ পর্যন্ত অভিষিক্ত নাসিরের সেঞ্চুরিতে ৬৮৬ রানের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান গড়ার ইতিহাস হয়ে গেছে। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে গল টেস্ট থেকে যায় ইতিহাসের পাতায়।

২০১০ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ থেকে বাংলাওয়াশ ফেরত কিউইররা ২০১৩ সালের অক্টোবরে খেলতে আসে পূর্ণাঙ্গ (২টি টেস্ট, ৩টি ওয়ানডে ও ১টি টি-২০) সিরিজ। ৩ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ তখন আরো পরিণত একটি দল। তাইতো প্রত্যাশার ঝাপিটাও একটু বড়ই ছিল। ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যাশার চাপও ছিল মুশফিকদের কাঁধে। কিন্ত মাঠের ক্রিকেটে সেই চাপের ছিটেফোটাও দেখা যায়নি। টেস্ট সিরিজ খেলেছে টেস্ট ক্রিকেটের ছন্দেই। ঢাকা টেস্টেও গল টেস্টের সেই ছন্দ আর রেকর্ডের বন্যা। ইমরান খান, কপিল দেব, ভিভ রিচার্ডসরা যা করে দেখাতে পারেননি তাই করে দেখান পটুয়াখালীর ছেলে সোহাগ গাজী। একই টেস্টে ব্যাট হাতে সেঞ্চুরির পর বল হাতে আবার ৬ উইকেট। আর লিটলম্যান মুমিনুল করলেন আরেক ইতিহাস। পরপর দুই টেস্ট সেঞ্চুরি। চট্টগ্রাম টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরির একেবারে কাছ থেকে ঘুরে আসেন। চট্টগ্রাম টেস্টে ১৮১ রানের চমৎকার ইনিংস খেলার পর ঢাকা টেস্টে আবার খেলেন ১২৬ রানের ইনিংস। প্রত্যাশার ঝাঁপি ছাড়িয়ে ওয়ানডে সিরিজে আবারও হোয়াইট ওয়াশ (৩-০) নিউজিল্যাণ্ড! হোয়াইটওয়াশ নির্ধারণী ম্যাচে ফতুল্লায় ৩০৭ রান টপকে যায় টাইগাররা। জয়ের নায়ক কিন্তু সাকিব তামিম কিংবা মুশফিক নন- বিপিএল মাতানো শামসুর রহমান। মিরপুরে তার আগের সিরিজ জয়ী ম্যাচটিতে (বৃষ্টিবিঘ্নিত) রুবেল হোসেনের কীর্তির কথা উল্লেখ করার মতোই। হ্যাটট্রিকসহ ২৬ রানে ৬ উইকেট! তার আগের মাসেই প্রিমিয়ার লিগের এক ম্যাচে হ্যাটট্রিকের প্র্যাকটিস আগেই সেরে রেখেছিলেন রুবেল। তখন কে জানত কিউইদের বিপক্ষে এমন কাণ্ড ঘটাতে উন্মুখ হয়ে আছেন তিনি!

ব্যক্তিগতে পারফরম্যান্সের যতই বন্দনা করি না কেন। সিরিজ চলাকালীন সময়ই কিন্ত বাংলাদেশের খেলায় টিম বাংলাদেশ হয়ে ওঠার প্রতিচ্ছবি। ওয়ানডে সিরিজে ছিলেন না তামিম-সাকিব। অথচ তাদের অভাব ম্যাচের কোনো অংশেই পরিলক্ষিত হতে দেননি শামসুর রহমানরা। কখনো শামসুর পরিচয় দিয়েছেন দায়িত্বশীলতার, কখনো মুমিনুল কখনো মুশফিক আবার কখনো নাইম। আবার ফিনিশিং লাইন টানার আগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দেশসেরা ফিনিশার নাসির হোসেনের ঝলাকানি। যখন বাংলাদেশ সম্পর্কে ক্রিকেট বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেন টিম বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে টাইগাররা। তখন শুনতে গর্ববোধই হয়। সিরিজ জুড়ে খেলোয়াড়দের হাব-ভাব আর চলনে-বলনে, দায়িত্বশীলতায় সাধারণ দৃষ্টিতেই ধরা পড়ল দেশের ক্রিকেটের কাঙ্ক্ষিত এমন পরিবর্তন।

২০১০ সালে কিউইদের বাংলাওয়াশের উদযাপন হয়েছিল মিরপুরে। ফতুল্লায় ২০১৩ সালের কিউই ওয়াশের আনন্দের মিছিল ছাপিয়ে গেল মিরপুরকে। টাইগারদের এমন কীর্তি ফতুল্লাকেও নিয়ে যায় গর্বের স্থানে।

দেখতে দেখতে চলে এলো ২০১৪ সাল। পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলতে ঢাকায় আসে শ্রীলংকা ক্রিকেট দল। গল টেস্টের সুখকর স্মৃতি নিয়ে টেস্ট সিরিজে মুখোমুখি হয় টিম বাংলাদেশ। শ্রীলংকান ব্যাটসম্যান আর বোলারদের দাপটে প্রথম টেস্টে সফরকারীরা বড় জয় পেলেও দ্বিতীয় টেস্টে ঘুরে দাড়ায় টিম বাংলাদেশ। গল টেস্টের মতো করেই ম্যাচের উপর প্রাধান্য রেখেই ‘ড্র’ করে টাইগাররা। লংকানদের বিপক্ষে ম্যাচে থেকে ‘ ড্র’ করাই বা কম কী।

ওয়ানডে এবং টি-২০ সিরিজে চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হার মানে বাংলাদেশ। প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই জিততে জিততে হেরেছে তারা। দর্শক মনে হতাশা ছড়ালেও লংকানদের মতো শক্তিশালী দলের কিপক্ষে এমন চরম ক্রিকেটীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ায় সাধুবাদও পেয়েছে বাংলাদেশ দল। দেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত টি-২০ বিশ্বকাপের আগে সব কিন্তু ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু এশিয়া কাপে আফগানিস্তানের সাথে হেরে যাওয়ায় স্বপ্ন বোনার জালটা কোথায় যেন একটু পেচিয়ে গেল। মুশফিক আর প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ বলছেন একটি জয়ই হতাশার এতসব চিত্র পাল্টে দিতে পারে। সেই জয়টি দেখার অপেক্ষা আরো দীর্ঘায়িত হলো। দেশের মাটিতে টি-২০ বিশ্বকাপে টিম বাংলাদেশ হয়ে খেলে সাফল্যের ধারায় ফিরবে এটা ১৬ কোটি মানুষেরই স্বপ্ন। এখনকার খারাপ সময় দ্রত কাটিয়ে উঠে বিশ্বের সব বাঘা বাঘা দলের বিপক্ষে ব্যাট বলের ঝড় তুলবে দেশের টাইগাররা দেশের মাটিতে। পাকিস্তানের বিপক্ষে এশিয়া কাপের ম্যাচে আকাঙ্ক্ষিত ঝড় তুলেও অল্পের জন্য শেষ রক্ষাটা হয়নি। তবে অর্জন হয়েছে অনেক। ওয়ানডে ক্রিকেটে ওই ম্যাচেই গড়েছে সর্বোচ্চ ৩২৬ রানের রেকর্ড। অসাধারণ ব্যাটিং করে আজমল-আফ্রিদি বোলিং আক্রমণ নিয়ে ছেলে খেলা করেছে আনামুল, ইমরুল, মুমিনুল, মুশফিক, সাকিবরা। চমৎকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখে নির্বাক হয়েছে সারাবিশ্ব। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে এতটা পরিবর্তন! একটি জয় এবং ধারাবাহিকতা চলে আসলে দ্রুত অগ্রসর হওয়া বাংলাদেশের সামনে সোনালী সময় অপেক্ষা করছে; এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

২০১২ সালের এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকদের কাছে ২ রানে হারার ক্ষত না শুকাতেই এবারের এশিয়া কাপে জিততে জিততে বাংলাদেশের ৩ উইকেটের হার। প্রথমবার সাকিব, মুশফিক, নাসিরদের কান্নায় ভারী হয়েছিল আকাশ-বাতাস; আর এবার হল বাংলাদেশের ভক্ত-সমর্থকদের। তবে টাইগারদের এমন লড়াইয়ের মানসিকতা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার রূপকল্পই রচনা করলো দারুণভাবে।

পরপর দুবার এশিয়া কাপ আয়োজন, ২০১১ সালে বিশ্বকাপ আয়োজন এবং এবার এককভাবে টি-২০ বিশ্বকাপের মতো বড় আসর আয়োজনের সুযোগ দেয়া বাংলাদেশর উপর বিশ্ব ক্রিকেটের আস্থারই বহিঃপ্রকাশ। ৫-৬ বছর আগেও আমরা বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে এত উচ্চাভিলাষী চিন্তাভাবনার ধারে কাছেও পৌঁছতে পারিনি। অথচ সেই আমরাই কি না জয়ের কাছাকাছি গিয়েও হেরে যাওয়টা মেনে নিতে পারছি না। সমালোচনার বৃত্তেই বন্দি রাখছি খেলোয়াড়দের। বড় বড় দলের বিপক্ষে লড়াইয়ের মনোভাবকে আমাদেরতো জোরেশোরেই সাধুবাদ জানানো উচিৎ। বুকে হাত দিয়ে বলুন তো রাতারাতি বাংলাদেশ দলকে নিয়ে এত প্রত্যাশার ঝাপিটা সাজিয়েছিলেন কবে! তাহলে? আর একটু সময় দিন। এত দ্রুততো আর এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন কিংবা টি-২০ বিশ্বকাপ জয়ী হওয়া যায় না।

১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয়, ২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর ভবিষ্যাতের একটি যুগের ক্রিকেট নিয়ে যে স্বপ্ন ক্রিকেট পাগল আর দেশপ্রেমী মানুষ হিসেবে আমরা মনের গভীরে বুনে ছিলাম তাতো সত্যি হয়েই গিয়েছে। স্বপ্নটা ছিল জয়ের জন্য মাঠে নামা, লড়াই করা। তাতো করেই চলেছে মুশফিকরা। আর মাঝে মধ্যেইতো বড় বড় সাফল্য দিয়ে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসছে। আর একটু সময় দেই না আমরা। ক্রিকেটে অভিজ্ঞতার ব্যাপারটিতো থেকেই যায়। তরুণ এই দলটির অভিজ্ঞতার মাপকাঠিতে চিন্তা করলে সমালোচনার জাল থেকে একটু ছাড় পেতেই পারেন। সব দেশের ক্রিকেটেই অভিজ্ঞ কিছু খেলোয়াড় থাকেন। এশিয়ার ক্রিকেটই যদি দেখি পাকিস্তানে আছে আফ্রিদি-মিসবাহর মতো সিনিয়র ক্রিকেটার, শ্রীলংকায় জয়বর্ধনে-সাঙ্গাকারার মতো ক্রিকেটার। আর ভারতে দেখুন না, সিনিয়র অধিনায়ক ধোনি বিহীন দলের আত্মবিশ্বাসই এলোমেলো। এভাবে চিন্তা করলে বাংলাদেশ দলকে নিয়ে তো আমার গর্বই হয়। এক যুগের স্বপ্নের পালঙ্ক সোনায় মুড়িয়ে দিয়েছে এদেশের ক্রিকেটাররা। সাবাশ বাংলাদেশ। এক যুগ আগের দেখা এদেশের ভবিষ্যৎ ক্রিকেটের রূপকল্প শুধু বাস্তবে পরিনতই করনি; নিঃসন্দেহে করেছ তার চেয়ে বেশি কিছু। দিয়েছ নতুন নতুন স্বপ্ন দেখার দারুন বাস্তবতা। এক যুগ পর হয়তো কোন দিন এখনকার স্বপ্নকেও ছুঁয়ে ফেলবে তোমরা (টাইগার ক্রিকেটাররা)।

২০১৪ সালে ওয়ানডে ও টি-২০ মিলে বাংলাদেশ টাইগাররা খেলেছে মোট ৯টি ম্যাচ। এর মধ্যে বাংলাদেশ-শ্রীলংকা সিরিজের ৩য় ওয়ানডে ও এশিয়াকাপে আফগানিস্তান-বাংলাদেশ ম্যাচ ব্যাতীত পাকিস্তান, ভারত এবং শ্রীলংকার সাথে বাকি ৫টি ম্যাচে যেমন লড়াই করেছে তাতে জয় না পেলেও গর্ব ভরা বুকেই এই দলটিকে নিয়ে টি-২০ বিশ্বকাপে বড় কিছু করে ফেলার সপ্নের মালা আমরা গাঁথতেই পারি।

আজ বাংলাদেশ যে ক্রিকেট খেলছে তা একসময়ের স্বপ্নই ছিল। এখন তো মনে হয় এত বড় স্বপ্নও আমরা দেখিনি। আজ ক্রিকেট বাণিজ্যের অন্যতম বাজার বাংলাদেশ। আইপিএলের মতো বড় আসরের ভেন্যু বাংলাদেশকে করার স্বপ্ন দেখে আজ ভারত। বারবারই বিশ্বের ১ নম্বর ওয়ানডে অলরাউন্ডার ক্রিকেটার হয়ে ওঠা সাকিব আল হাসান যে আমাদেরই ক্রিকেটার! আজ বাংলাদেশের একটি ভোটে বদলে যায় আইসিসির নীতিমালা! বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেট বোর্ড প্রধান আজ আইসিসির সহ-সভাপতি! আসলে এতটা কি আমরা স্বপ্নেও দেখেছিলাম? এতটা দূরদর্শী চিন্তা কী আমাদের অবচেতন মনেও এসেছিল? হয়তো না। তখনকার দেখা সেই স্বপ্ন শুধু সত্যি হয়েই আসেনি। স্বপ্নের চেয়ে অনেক গুণ বেশিই আমরা পেয়েছি। যেভাবে এগুচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট তাতেতো ১ যুগ পর এখনকার দেখা স্বপ্নগুলো বাস্তবেই রূপ নেবে। একটু ভাবুনতো কেমন অনুভূতি হবে তখন? সত্যিকারের উন্নতিতো এভাবেই হয়। কারণ সফলতার ছোট-খাটো কোনো ফর্মুলা নেই।

কার্টেসিঃ সাজ্জাদ হোসেন খান
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০১৪ রাত ১২:৪০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২০


৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

দেখা হবে যুদ্ধ ফুরোলে সন্ধের মাহফিলে;
দেখা হবে ঠিক চেনা রাস্তার অচেনা-অন্ত্যমিলে।
ছড়াব আবার শস্যের দানা দেশ থেকে মহাদেশে
মানুষই জেতে, খুঁজে নেয় আলো অন্ধকারের শেষে...

তোমার গল্পে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

×