somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

শ্রাবণ আহমেদ
আমি মোঃ রাব্বি হোসেন। "শ্রাবণ আহমেদ" এটা আমার ছদ্মনাম। লেখালেখিতে নিজের এই ছদ্মনামটা দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। পাবনা জেলার সদর উপজেলায় আমার জন্ম। বর্তমানে ঢাকা থাকি। মূলত সুন্দর কিছু মূহূর্ত আপনাদের উপহার দিতেই আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস।

গোয়েন্দা গল্প

০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সকাল ১১:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


স্বর্ণ রহস্য
পর্ব-১
লেখক: Srabon Ahmed (অদৃশ্য ছায়া)
.
ঘরের জানালার ধারে বসিয়া আদিত্য  পাখা নাড়িতেছিলো। গ্রীষ্ম আসিতে মাস দু'য়েক বাকি আছে এখনও। তবু গরমের তীব্র ভাবটা সম্প্রতি চলিয়া আসিয়াছে। ভর দুপুরে কাহাকেই বাহিরে যাতায়াত করিতে দেখা যায় না তেমন। হঠাৎ দু একজনকে দেখা যায় ছাতা মাথায় দিয়া পূর্ব দিকে গমন করিতে। তাঁহারা অবশ্য টাকা পয়সাওয়ালা লোক বটে। সম্প্রতি শোনা যাইতেছে পূর্বদিকের কালভ্রম বাজারে নাকি নূতন পণ্যের আমদানি হইয়াছে। মাছের বাজারের জায়গায় নাকি স্বর্ণের বাজার বসিয়াছে। ব্যাপারটা মন্দ নহে! বৈকাল পেরিয়ে যখন সূর্যের তাপটা ক্রমান্বয়ে কমিয়া আসে, তখন মানুষ দলে দলে সেই বাজারের দিকে যাত্রা আরম্ভ করে। আদিত্য জানালার ধারে বসিয়া তাঁহাই লক্ষ্য করিয়া থাকে। সে স্বল্পভাষী। খুব একটা প্রয়োজন ছাড়া সে কথা বলে না। কিন্তু সহসা কোনো বিষয়ে তাঁহাকে চটাইয়া দিলে তখন আর কথা বলিবার অন্ত থাকে না। তাঁহার কথাগুলো অতিশয় সুন্দর, যুক্তিসংগত এবং সত্য। বয়স সদ্য পঁচিশে পা রাখিয়াছে। তাঁহার সাথে আমি পাঁচ বছর ধরিয়া আছি। তবু তাঁহাকে এখন অব্দিও ভালো করিয়া প্রত্যক্ষ করিতে পারি নাই। গরমের সময় ব্যতীত সে প্রাতঃকালের সূর্য উঠিবার সঙ্গে সঙ্গে বাটি হইতে বাহির হইতো। সঙ্গে আমিও থাকিতাম। কেহ বিপদে পড়িলে তাঁহার কাছে সাহায্য চাহিতে আসিতো। অবশ্য টাকা পয়সার সাহায্য নহে। পুলিশে যে কাজ করিতে পারিতো না, আদিত্য সে কাজ করিয়া দিতো। সরকার হইতে এর জন্যে সে বেশ কয়েকবার পুরস্কারও পাইয়াছে।

আমি পাশেই বসিয়া ছিলাম। সে অন্যদিকে দৃষ্টি রাখিয়াই আমায় বলিলো, শুনলাম কালভ্রম বাজারে নাকি সোনার আমদানি হয়েছে?
আমি তখন কবিতা লেখার অভিপ্রায় কলমখানা মাত্রই হাতে করিয়াছি। এমন সময়ে তাঁহার অমন প্রশ্ন শুনিয়া খাতা কলম টেবিলের উপরে রাখিয়া বলিলাম, আমদানি হয়েছে বৈকি! ব্যবসায়ও জমজমাট চলছে। শুনেছি সোনার দামও বেশি নয়। গাঁয়ের ধনাঢ্য ব্যক্তিদ্বয় সকলে সেসব কিনে কিনে সিন্দুক বোঝাই করছে।
আমার কথা শুনিয়া সে বলিলো, স্যাকরা আছে বাজারে?
আমি কিঞ্চিত চুপ থাকিয়া বলিলাম, না! সেটা জানি না। তবে থাকবে হয়তো।
আদিত্য কিয়ৎকাল ভ্রু কুঞ্চিত করিয়া বসিয়া রহিলো। যেন সে আমার কথায় সম্পূর্ণরুপে সকল বিষয় আয়ত্তে আনিতে পারিলো না। সে বলিলো, সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়লে দুজনে বের হবো, তৈরি থেকো।

"বাবু আপনার চা" হঠাৎই ঘরের মধ্যে নিতাইয়ের প্রবেশ।
আদিত্য বলিলো, পাশের ঘর হইতে কাঠের তৈরি হরিণটা দিয়ে যেও।
"জ্বী বাবু" বলিয়া নিতাই প্রস্থান করিলো। আমি আদিত্যকে বলিলাম, নিশ্চয়ই কালভ্রম বাজারের সোনাতে কোনো গণ্ডগোল আছে। নয়তো এতো কম দামে অধিক সোনা! কী করে সম্ভব এটা?
সে চা টা টেবিলের উপরে রাখিয়া আমার কবিতার খাতাখানা টানিয়া নিয়া তাহাতে কী জানি লিখিলো। অতঃপর খাতাখানা আমার দিকে বাড়াইয়া দিয়া বলিলো, দেখো।
আমি চশমাটা ঠিক করিয়া নিয়া দেখিলাম। তাহাতে লেখা,
          "জলের দামে স্বর্ণ মিলে, এ কথা ভারি মজার।
            স্বর্ণের মধ্যেই জীবনকূপী, না থাকে বোঝার।"

আমি কিয়ৎকাল ভাবিয়া বলিলাম, জীবনকূপী মানে? তুমি বলতে চাইছো স্বর্ণের মাঝে জীবন সংশয়?

আমার কথা শুনিয়া আদিত্য কিঞ্চিৎ  হাসিলো মাত্র। খানিক বাদে নিতাই আসিয়া তাঁহার কাঠের হরিণখানা দিয়া গেলো। একেবারে নিখুঁত হাতের কাজ। মনে হইতেছে যেন, ইহা একটা সত্য হরিণ। কিন্তু আকারে একদমই ছোট হওয়াতে সত্য হরিণ বলিয়া সম্বোধন করিতে পারিলাম না। হরিণখানা আদিত্য পুরো দু'হাজার টাকা খরচ করিয়া বানাইয়াছে। বানাইবার লগ্নে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, এটা বানিয়ে কী হবে? সে ঐ সময় কোনো প্রকার উত্তর না দিয়া বিষয়টা এড়াইয়া গিয়াছিলো। তবে আজ তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিতে হইবে, ইহা বানাইবার কারণটা কী!

হরিণখানা টেবিলের উপরই ছিলো। আমি তাঁহা হাতে করিয়া এদিক সেদিক নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিতেছিলাম। হরিণটার সম্মুখে একটা ছিদ্র রহিয়াছে। যাহার ভেতর দিয়া পয়সা জাতীয় কোনো কিছু খুব সহজেই প্রবেশ করানো যাইবে। পেছন পথটা আঁটকাইয়া রাখা হইয়াছে। আমি আদিত্যকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তা আদিত্য তোমার এই হরিণ তৈরির কারণটা বললে না কিন্তু!
আদিত্য বোধ করি তখন অন্য মনস্ক ছিলো। কারণ সে আমার কথা শুনিয়া বলিয়া উঠিলো, হুম, কী বললে? আবার বলো!
আমি পুনরায় তাঁহাকে প্রশ্নটা করিলাম। সে গতবারের মতোই মুখে কিঞ্চিৎ হাসির রেখা ফুটাইয়া বলিলো, ও তুমি বুঝবে না নিরব।
আমি বলিলাম, না বুঝালে বুঝবো কী করে?
আদিত্য তখন চেয়ারটা টান দিয়া টেবিলের সমীপে হেলান দিয়া বসিয়া বলিলো, আচ্ছা বলোতো, তোমার এই খাতা আর কলমের কী দরকার? আর এগুলো দিয়ে তুমি কী করো?
অামি অবাক নয়নে তাঁহার দিকে তাকাইয়া বলিলাম, এটা কেমন প্রশ্ন? তুমি তো দেখোই এগুলো দিয়ে আমি কবিতা লিখি।
"হ্যাঁ,  এইতো লাইনে এসেছো। তুমি যেমন এগুলো দিয়ে কবিতা লেখো। ঠিক তেমন আমিও হরিণটা দিয়ে নতুন  কিছু একটা আবিস্কার করবো। যা তোমার কবিতার মতোই।"
তাঁহার কথার আগামাথা কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। কী প্রশ্ন করিলাম আর সে কী উত্তর দিলো! বেশ রহস্যময় লোক বটে। অবশ্য হরিণ তৈরির কারণটা সময় হইলেই জানিতে পারিবো।
আদিত্য আমাকে চুপ থাকিতে দেখিয়া বলিলো, যাও স্নান সেরে এসো। তারপর আহার শেষে নিজেকে একটু জিরিয়ে নাও। বিকেলে রওনা হলে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হতে পারে।
বলিয়া সে পাশের রুমে চলিয়া গেলো। আমিও সেখান হইতে উঠিয়া স্নান করিতে স্নানাগারের অভিপ্রায় পা বাড়াইলাম।
.
স্নান করিয়া আসিয়া দেখিলাম আদিত্য বিছানার উপরে বসিয়া কী যেন পড়িতেছে। মাথা মুছিতে মুছিতে খানিক উঁকি মারিতেই আদিত্য একখানা কাগজ আমার দিকে বাড়াইয়া দিয়া বলিলো, পড়ো নিরব।
আমি তাঁহার হস্ত হইতে কাগজখানা লইয়া পড়িতে গিয়া দেখিলাম, উহা রঙিন কাগজ সমেত পৃষ্ঠা ভর্তি লেখা একখানা ছোট মাপের পত্র। পত্রের ভাঁজ সোজা করিয়া পড়িতে আরম্ভ করিলাম।
পত্রের মর্ম ইহা বলে....

প্রিয় আদিত্য রায় দত্ত,
আপনাকে দেখিবার সুযোগ হইয়া উঠেনি কখনও। তবু আপনার সকল কার্যের কথা আমি আমার সহকারীর কাছ হইতে শুনিতে পারিয়াছি। শুনিয়াছি আপনি কঠিন কঠিন কাজেরও নির্ভুল এবং সহজ  সমাধান করিয়া থাকেন। আপনাকে দেখিবার বড় সাধ ছিলো মোর। কখন না জানি উপর হইতে ডাক আসে। আর আমিও চলিয়া যাই। তাই যাইবার পূর্বে আপনার সহিত সাক্ষাত হইলে জীবনে ধন্য হইতাম।

পত্র পড়িবার অন্তে খামখানা নিয়া দেখিলাম, প্রেরকের নাম ও ঠিকানা- হরিহর দাস, মাহেন্দ্রপুর পুরান বাড়ি।
সে অঞ্চলে কখনও গিয়াছি বলিয়া ধারণা করিতে পারিলাম না। আদিত্যকে বলিলাম, তা কবে যাচ্ছো লোকটির ইচ্ছা পূরণ করতে?
"সময় পাইলে ঘুরে আসবো একসময়। তুমি চিন্তা করো না, তোমাকেও সাথে নিবো।
একটু বসো, আমি স্নানটা সেরে আসি।"

আদিত্য স্নান করিতে চলিয়া গেলো। আমি বিছানার উপর বসিয়া তাঁহার সেই কাঠের হরিণখানা ভালো করিয়া পরখ করিতে লাগিলাম।
.
বৈকাল হইলে আদিত্য ডাকিয়া বলিলো, নিরব তৈরি হয়ে নাও। এখনই বের হবো।
"ছদ্মবেশ ধারণ করতে হবে?"
"না, তা আপাতত করতে হবে না। এখনকার জন্য এরকমই চলবে।"
আমি পাঞ্জাবিখানা গায়ে পড়িতে পড়িতে বলিলাম, টাকাকড়ি কিছু সাথে নিও। স্বর্ণের বাজারে গিয়ে যদি স্বর্ণ না কিনে ফেরত আসি, তবে ব্যাপারটা 'স্বচক্ষে সাপ দেখেও না মারা' এমনটা হয়ে যাবে না?
সে আমার কথায় হাসিলো কিঞ্চিৎ। বলিলো, বুদ্ধির দ্বার খুলেছে দেখছি।

ঘর হইতে বাহির হইবার সময় নিতাই আসিয়া বলিলো, বাবু কোথাও যাচ্ছেন নাকি?
আদিত্য তাঁহার প্রশ্নের জবাব বদলে  বলিলো, যাই একটু প্রকৃতির রূপ রস উপভোগ করে আসি। তুমি সবকিছু খেয়াল রেখো ততক্ষণ।
"জ্বী বাবু।"

খানিক পথ চলিতেই আমি আদিত্যকে বলিয়া উঠিলাম, একটা জিনিস লক্ষ্য করেছো?
আদিত্য বাঁ হস্তে থাকা ছাতাখানা খুলিয়া মাথার উপরে ধরিতে ধরিতে বলিলো, লক্ষ্য না করলে কী এই তপ্ত রৌদ্রে হেঁটে রওনা দিতাম নিরব? অমন কত লোকই তো আমাদের পিঁছু নেয়। তাতে ফল কী আসে?
আমি অবাক হইলাম তাঁহার কথা শুনিয়া। ভাবিয়াছিলাম, সে বোধ করি উক্ত ব্যাপারটা লক্ষ্য করে নাই। কিন্তু না, এখন দেখিতেছি আমার ধারণার পুরো বিপরীত তাঁহার চিন্তা ধারা।
"লোকটিকে চেনাজানা বলে মনে হয় তোমার?"
"আগে কখনও দেখিনি। তবে কারণ ছাড়া কেউ কখনো আমার পিঁছু নেবে না, এটা তো তুমি জানো।"
"তা বটে! কিন্তু_"
"কিন্তু দেখতে তো হবে লোকটি কে? তাইতো!"
"আলবাত।"
"সম্মুখে এগোতে থাকো, আপনাআপনিই বুঝতে পারবে।"

আমি আর আদিত্য পূর্বের ন্যায় বিরামহীন ভাবে সম্মুখে আগাইতে থাকিলাম। কালভ্রম বাজারটা বেশি দূরেও নহে। পায়ে হাঁটিলে মিনিট বিশেক লাগে। এই বিশ মিনিটের প্রতিটা সেকেন্ড, প্রতিটা মিনিট আমি নিরুপনভাবে লক্ষ্য করিয়াছি, জনৈক লোকটি প্রতিটি পদক্ষেপে আমাকে আর আদিত্যকে অনুসরণ করিয়া আসিতেছে। যখন বাজারে পা রাখিলাম, ঠিক তখন পেছনে ঘুরিয়া দেখিলাম লোকটি মুহূর্তেই হাওয়া হইয়া গিয়াছে।
আদিত্যকে ডাকিয়া বলিলাম, লোকটি গেলো কোথায় হঠাৎ করে?
আদিত্য কিঞ্চিৎ হাসিয়া পাঞ্জাবির পকেট হইতে সিগারেট বাহির করিয়া আগুন ধরাইতে ধরাইতে বলিলো, তোমার স্থান হতে দক্ষিণ পশ্চিম কোণের টং দোকানটার দিকে তাকিয়ে থাকো।
আমি তাঁহার কথা শুনিয়া টং দোকানটার দিকে চক্ষুগোচর করিলাম। প্রথমে কাহাকে না দেখিলেও খানিকবাদে উক্ত জনৈক লোকটির দেখা পাইলাম। লোকটি এখনও বেশ করিয়া উঁকি ঝুঁকি মারিতেছে। চোখে চোখ পড়িতেই সে আবারও আড়াল হইয়া গেলো। পরে আর তাঁহার কোনো দেখাই পাই নাই।
.
এদিক সেদিক ঘুরিয়া ফিরিয়া বেবাক দোকান পরিদর্শন করিয়া জানিতে পারিলাম, ব্যবসায় লাভ যেমন হইতেছে, ঠিক স্বর্ণও তেমন বিক্রি হইতেছে। দেখিলাম আমাদের পাশের বাসার দীপেন্দ্র বাবুও স্বর্ণ কিনিতে বাজারে আসিয়াছেন। লোকটা অতিশয় কৃপণ। কখনও কেহ তাঁহার নিকট হইতে দু'পয়সা ধার পাইয়াছে বলিয়া আমার মনে পড়ে না। বড্ড হিসাবী লোক তিনি। প্রয়োজন ছাড়া গাঁটের কড়ি খরচ করিতে তাঁহাকে কোনোদিনও দেখি নাই। এইতো মাস খানেক হইবে, তাঁহার ভাইপো আসিয়াছিলো কিছু টাকার জন্যে তাঁহার সমীপে। আমি, দীপেন্দ্র বাবু আর আদিত্য তখন তাঁহারই বাড়ির আঙিনায় আরাম-কেদারায় বসিয়া কী যেন একটা বিষয় লইয়া আলাপ করিতেছিলাম। ভাইপো আসিয়া কিছু টাকাকড়ি চাইলে তিনি তাঁহাকে নানান ভাবে ইনিয়ে বিনিয়ে নীতি কথা বুঝাইয়া টাকা না দিয়া ফিরাইয়া দিলেন। ভাইপোটি মাথা নিচু করিয়া প্রস্থান করিলে দীপেন্দ্র বাবু বলিলেন, এই ছেলেটা আচ্ছা বেয়াদব। পাক্কা কোকেন খোর। মাঝে মাঝেই হুটহাট করে এসে টাকা চেয়ে বসে। প্রথম প্রথম দিতাম। কিন্তু যবে থেকে জানতে পারলুম সে নেশা করে। তখন থেকে আর দেই না।

আমি দীপেন্দ্র বাবুর পানে তাকাইয়াই বলিলাম, আদিত্য ঐদিকে খেয়াল করিয়া দেখো আমাদের পাশের বাসার দীপেন্দ্র বাবু।
"হুম, সে এসেই দেখেছি।"
"নিশ্চয়ই স্বর্ণ কিনতে এসেছে!"
"ভাবসাব দেখে কিন্তু তা মনে হয় না।"
"মানে?"
"মানে হলো, চলো সামনে যাই। গিয়ে কথা বলি দীপেন্দ্র বাবুর সাথে। আর কিছু স্বর্ণও কিনি।"

আমি আর আদিত্য দীপেন্দ্র বাবুর নিকট উপস্থিত হইলাম। আদিত্য তাঁহাকে পেছন হইতে ডাকিবার মাত্রই তিনি হকচকাইয়া গেলেন। তাঁহাকে দেখিয়া মনে হইলো যেন তিনি চুরি করিতে গিয়া ধরা পড়িয়াছেন। পকেট হইতে রুমালখানা বাহির করিয়া কপালটা মুছিয়া আমতা আমতা করিয়া বলিলেন, নি.. নি.. নিরব বাবু যে! সাথে আদিত্য বাবুও আছেন দেখছি। তা আপনারাও কী স্বর্ণ কিনতে এসেছেন নাকি?
আমি কিছু বলিতে যাইবো, ঠিক তখনই আদিত্য দীপেন্দ্র বাবুর পানে এক বোতল জল আগাইয়া দিয়া বলিয়া উঠিলো, "এই নিন জল খান। দেখে মনে হচ্ছে প্রচন্ড তৃষ্ণা পেয়েছে আপনার।"
আদিত্যের কথাখানা বলিতে দেরি হইলেও দীপেন্দ্র বাবুর জল পান করিতে দেরি হইলো না। তিনি আদিত্যের হস্ত হইতে বোতল খানা এক প্রকার থাবা মারিয়াই নিজ হস্তে লইলেন। অতঃপর জল খাওয়া শেষ করিয়া তিনি আবারও জিজ্ঞাসা করিলেন, ডিটেক্টিভ বাবুও কী স্বর্ণ কিনতে এসেছেন নাকি?
আদিত্য তাঁহার প্রশ্নের জবাব না দিয়া উল্টা তাঁহাকে প্রশ্ন করিয়া বসিলো।
"তা দীপেন্দ্র বাবু কতখানি স্বর্ণ কিনলেন আজ অব্দি?"

আদিত্যের এমন প্রশ্ন শুনিয়া তাঁহার মুখখানা আষাঢ়ের মেঘের ন্যায় কালো হইয়া উঠিলো। মুখাকৃতি অমন হইবার কারণ বুঝিয়া উঠিতে পারিলাম না। তিনি কোনোমতে উত্তর দিয়া বলিলেন, "সস্তা জিনিস বাবু, তাই গোটা খানেক কিনে রাখলুম। হয়তো ভবিষ্যতে কাজে দেবে।"
আমি দীপেন্দ্র বাবুর কথা শুনিয়া বলিলাম, "আপনার ক্রীত স্বর্ণ যে আসল, তার প্রমাণ কী?"
তিনি তখন সহাস্যে বলিলেন, "এক্কেবারে খাঁটি স্বর্ণ মশাই।"
বলিয়া একজন ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, "এই যে দেখেন ইনি একজন স্যাকরা। স্যাকরা থাকতে আসল নকলের হিসেব করা নিছক বোকামি।"
"তা বটে, তা বটে!"
আদিত্য বলিলেন, "তা স্যাকরা মশাইকে ডাকুন দেখি একটু!"
দীপেন্দ্র বাবু স্যাকরার নাম ধরিয়া ডাকিলেন, "ওহে কালাচান.. একটু এদিকে আসো দেখি।"
স্যাকরা আসিলে আদিত্য বলিলেন, তা চলুন কিছু স্বর্ণ কেনা যাক।

স্যাকরা কালাচানকে সঙ্গে করিয়া কয়েকটা দোকান হইতে ভিন্ন ভিন্ন আকৃতির কিছু স্বর্ণ কিনিলাম দুজনে। অতঃপর সন্ধ্যের আগেই বাড়ি ফিরিয়া আসিলাম। ফিরিবার পূর্বে দীপেন্দ্র বাবুকে বলিলাম, চলুন একসাথে যাওয়া যাক।
তিনি "না না" করিয়াও এক প্রকার বাধ্য হইয়া আমাদের সঙ্গে বাড়ি ফিরিলেন।
.
রাতে আহার করিবার সময় আদিত্য আমায় বলিলো, নিরব একটা জিনিস কি তুমি লক্ষ্য করেছো?
আমি কিয়ৎকাল ভাবিয়া বলিলাম, কী জিনিস?
"স্যাকরা কালাচানকে কি তোমার পূর্ব পরিচিত কিংবা তুমি তাকে কোথাও দেখেছো বলে মনে পড়ে?"
আমি মনে করিবার চেষ্টা করিতে হঠাৎই আমার মুখ হইতে বাহির হইলো, যেই লোকটি আমাদের অনুসরণ করছিলো!
"একদম ঠিক ধরেছো।"
"কিন্তু স্যাকরা আমাদের কেন অনুসরণ করবে?"
"একটু বুদ্ধি খাঁটাও নিরব, একটু বুদ্ধি খাটাও। দেখবে সবকিছু পরিস্কার হয়ে যাবে।"
"তার মানে দীপেন্দ্র বাবু...."
"এখনও ঠিক সঠিকভাবে বলতে পারছি না। তবে সময় গেলে সবকিছুই জানতে পারবে।"
.
রাতে ঘুমাইবার পূর্বে দেখিলাম আদিত্য কী যেন একটা তাঁহার সেই কাঠের হরিণখানার অভ্যন্তরে প্রবেশ করিতেছে। আমি বিছানা হইতে উঠিয়া তাঁহার কার্যখানা দেখিতে টেবিলের নিকট উপস্থিত হইলাম। দেখিলাম আজকের কেনা সেই স্বর্ণখানা। জিজ্ঞাসা করিলাম, "স্বর্ণখানা হরিণের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখছো কেন?"
সে একগাল হাসিয়া আমার মুখপানে চাহিয়া বলিলো, "স্বর্ণ রাখার জন্য ঠিকঠাক মতো জায়গা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তাই এখানে রাখছি।"
এই বিষয়ে তাঁহাকে আর কোনো প্রশ্ন না করিয়া খাটের উপরে আসিয়া বসিলাম। খানিক বাদে আদিত্য ডাকিয়া বলিলো, নিরব শুনছো?
আমি সিগারেটটা মুখে দিতে দিতে বলিলাম, বলো শুনছি।
"চলো আগামী পরশুদিন হরিহর দাসের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি।"
"তা মন্দ বলোনি। আমারও মন চাইছিলো দূরে কোথাও ঘুরবার।"

কিছুক্ষণ নিরবতা চলিলো দু'জনের কথার মাঝে। নিরবতা ভাঙিয়া আমি আদিত্যকে বলিলাম, "আচ্ছা আদিত্য একটা কথা জিজ্ঞেস করি!"
আদিত্য তখন চেয়ার হইতে উঠিয়া হরিণখানা হাতে লইয়া আলমাড়ির কোণে রাখিয়া বলিলো, "হুম করো।"
"স্বর্ণের দাম কিন্তু একেইবারে কম না। তবে গতানুগতিক মূল্য থেকে কিছুটা কম।"
"এতক্ষণে নজরে পড়লো? তবে কম হয়ে তো আমাদেরই লাভ। কম টাকায় খাঁটি স্বর্ণ পাচ্ছি। এতে তো ক্ষতির কিছু নেই।"
"স্বর্ণ সত্যই আসল তো?"
"সেটা পরে দেখা যাবে।"
"স্যাকরা কালাচান যে প্রকৃত স্যাকরা নয়, সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।"

আদিত্য আর কিছু বলিলো না।
.
সকাল সকাল নিতাইয়ের ডাকে ঘুম ভাঙিয়া গেলো। সে আমার নিকট আসিয়া বলিলো, আদিত্য বাবু উঠবেন কখন?
আমি চক্ষু মুছিতে মুছিতে বলিলাম, খানিক বাদেই। কিন্তু কেন?
"একটা লোক এসেছিলো বাবুর সঙ্গে দেখা করতে।"
"বসতে বলো"
"লোকটি চলে গেছে। যাবার আগে বলে গেছে বিকেলে আবার আসবে।"
"ও, তা নাম পরিচয় কিছু বলে যায়নি?"
"হুম বলেছে, লোকটার নাম নিরেশ চন্দ্র। থাকে ভবানীপুরে।"
"আচ্ছা বিকেলে তাহলে লোকটার সাথে দেখা হচ্ছে! তুমি এক কাজ করো, আমার আর আদিত্যের জন্য দু'কাপ চা করে আনো।"

নিতাই চা আনিতে চলিয়া গেলো। আমি বিছানা ছাড়িয়া উঠিয়া বসিলাম। তন্দ্রাভাবখানা এখনও কাটে নাই। কিছুক্ষণ বসিয়া থাকিবার পর স্নানাগারে ঢুকিলাম হাত-মুখ ধুইবার দরুণ। কিছু সময় যাইতেই ঘর হইতে নিতাইয়ের ডাক শুনিতে পাইলাম।
"নিরব বাবু, চা রেখে গেলাম।"
"হুম রেখে যাও। আর দেখো আদিত্যের ঘুম ভাঙলো কিনা।"
"আচ্ছা বাবু।"

হাত-মুখ ধুইয়া বাহির হইতেই দেখিলাম আদিত্য ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ে চুমুক দিয়া পরমানন্দে রবি ঠাকুরের "ভাবনা কাহারে বলে" গানখানা গাহিতেছে। আমি আলনা হইতে তোয়ালেটা হাতে লইয়া বলিলাম, কী ব্যাপার? এই সাত সকালে রবি ঠাকুরের গান গাইছো যে?
"কেন? সাত সকালে রবি ঠাকুরের গান গাওয়া নিষেধ আছে নাকি?"
"তুমি কথা এতো প্যাঁচাও কেন বলোতো?"
"নিরব চা টা খেয়ে কথা বলো। নয়তো ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।"
"ও হ্যাঁ, হ্যাঁ। "
"নিরেশ চন্দ্র নামের একজন ভদ্রলোক এসেছিলেন। "
"হ্যাঁ, কিন্তু তুমি জানলে কী করে? নিতাই বলেছে?"
"হ্যাঁ।  তবে লোকটি কী কারণে এসেছিলেন, সেটা আমি জানি।"
"কী কারণে শুনি।"
"বিকেলে শুনো। এখন যাও নিতাইকে বলো, লোকটি আসলে যেন বসার ঘরে বসতে বলে। আমরা এখন একটু বের হবো।"
"কোথায় বের হবো এত সকালে?"
"যেটা বললাম সেটা আগে করো। যাও..."
"আচ্ছা যাচ্ছি। তার আগে সিগারেটটা দাও।"
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সকাল ১১:০৯
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অটোপসি

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ দুপুর ১২:৩২

যে পাহাড়ে যাব যাব করে মনে মনে ব্যাগ গুছিয়েছি অন্তত চব্বিশবার-
একবার অটোপসি টেবিলে শুয়ে নেই-
পাহাড়, ঝর্ণা, জংগলের গাছ, গাছের বুড়ো শিকড়- শেকড়ের কোটরে পাখির বাসা;
সবকিছু বেরিয়ে আসবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গৌরব গাঁথা আমাদের ইতিহাস : ঘটনাপঞ্জি ও জানা অজানা তথ্য। [১]

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:১৮


আমার এ পোষ্টটি সবার ভালো না ও লাগতে পারে । যাদের মুক্তিযুদ্ধ ও আমাদের স্বাধীনতার গৌরবগাঁথা সর্ম্পকে বিন্দু মাত্র শ্রদ্ধাবোধ বা আগ্রহ নাই তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিজ দেশে অবহেলিত এশিয়া কাপে স্বর্ণ পদক বিজয়ী!

লিখেছেন ঘূণে পোকা, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৫:০৪

‘আমার দেশে আমার কোনো দাম নেই’



রোমান সানা (তীরন্দাজ) : ‘বড় পর্যায়ের কারও কাছ থেকে কোনো শুভেচ্ছা পাইনি। এটা নিয়ে কষ্ট হচ্ছে। অথচ ক্রিকেটে জিম্বাবুয়েকে হারানোর পর আফিফ হোসেনকে কত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকার পথে পথে- ১৪ (ছবি ব্লগ)

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৫:২৩



ঢাকা শহরের মানুষ গুলো ঘর থেকে বাইরে বের হলেই হিংস্র হয়ে যায়। অমানবিক হয়ে যায়। একজন দায়িত্বশীল পিতা, যার সংসারের প্রতি অগাধ মায়া। সন্তনাদের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা- সে-ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছাত্রলীগ নিয়ে শেখ হাসিনার খোঁড়া সমাধান!

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:২৫



Student League News

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর, ছাত্র রাজনীতির দরকার ছিলো না; ছাত্ররা ছাত্র, এরা রাজনীতিবিদ নয়, এরা ইন্জিনিয়ার নয়, এরা ডাক্তার নয়, এরা প্রফেশালে নয়, এরা শুধুমাত্র ছাত্র;... ...বাকিটুকু পড়ুন

×