somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পটা রাফিয়া'র

০২ রা জুলাই, ২০২০ সকাল ১১:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

- রাফিয়া, এই রাফিয়া, কোথায় গেলে? আমার টাই-টা  খুঁজে পাচ্ছি না তো। রাফিয়া।
- আসছি।

জয় অফিসে যাবে। কিন্তু টাই খুঁজে পাচ্ছে না। এই ছেলেটার আবার বিভিন্ন ধরনের রোগ আছে। এই রোগ যেমন তেমন রোগ নয়। সামনে থাকা জিনিস খুঁজে না পাওয়ার রোগ। এই যেমন গতকাল সে মোজা খুঁজে পাচ্ছিল না। এক পায়ের মোজা আছে। কিন্তু আরেক পায়ের নেই। অফিস থেকে এসে তার হুশ থাকে না। নিয়ম করে বউয়ের দু'চোখে দু'টো চুমু দিয়ে জুতা সমেত বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে দেয়। পরে বেচারী রাফিয়ার কষ্ট করে তার সেই জুতা-মোজা, টাই, শার্ট খুলতে হয়।

- কী হলো রাফিয়া? কোথায় তুমি?
- এইতো আসছি দাঁড়াও।
- আর কতক্ষণ?
- আরেকটু।

জয় রুম থেকে বের হয়ে দেখলো রাফিয়া রান্নাঘরে কী যেন করছে। সে এগিয়ে গেল।
- কী করছো এখানে? সেই কখন থেকে তোমাকে ডাকছি। আসছো না কেন?
- দেখো তো ওভানটার কী যেন হয়েছে!
- এটা ওভান নয়, ওভেন। আর ওভেনের কী হবে? কালই না কিনে আনলাম?
- হ্যাঁ। তবুও তুমি দেখো একটু।

রাতের কিছু খাবার অবশিষ্ট ছিল। রাফিয়া সেগুলো ফ্রিজে রেখে দিয়েছিল। ভেবেছিল এখন তো বাসাতে ওভেন আছেই। সো, যখন তখন গরম করে খাওয়া যাবে। জয় ওভেনে হাত দিতেই দেখলো সব ঠিকঠাক আছে।
- কই? কিছুই তো হয়নি। ওভেন তো ঠিকই আছে।
- কিন্তু আমার কাছ থেকে চললো না কেন?
- এখন আসো আমার টাই-টা খুঁজে দাও। অফিসের সময় হয়ে যাচ্ছে।

রাফিয়া রুমে গিয়ে দেখলো আলনার সামনেই টাই-টা কত সুন্দর করে ঝুলানো রয়েছে। সে বললো, এইযে টাই। আচ্ছা তুমি একটা কথা বলো তো, তুমি কি সত্যই খুঁজে পাও না? নাকি খুঁজে না পাওয়ার ভান ধরো।
জয় রাফিয়াকে একটানে তার বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বললো, যদি খুঁজেই পেতাম, তবে কি আর তোমাকে ডাকতাম?
- হয়েছে, এখন ছাড়ো তো।
- ওকে ওকে, ছেড়ে দিলাম। এখন টাই-টা পড়িয়ে দাও। আর আমি জুতা মোজা পড়তে পড়তে তুমি ঝটপট একটা লিস্ট করে ফেলো তো।
- কিসের লিস্ট?
- বাসায় আর কী কী লাগবে তার লিস্ট।
- রাতেই তো করে রাখলাম।
- ও, গুড। এখন ঝটপট ওটা নিয়ে আসো। আমি ফেরার পথে কিনে নিয়ে আসবো।
.
অদ্ভূত সব লিস্ট। একটা এলার্ম দেওয়া দেয়াল ঘড়ি। পাশে বড় করে লেখা, যেন জোড়ে শব্দ হয়। কিছু বাচ্চাদের খেলনা, একটা দোলনা, একটা পিচ্চি মশারি। পাশে ছোট্ট করে লেখা, কী ভাবছেন বাচ্চার বাপ?
জয় এটা পড়ে অবাক হয়ে গেল। খুশিতে তার এই ভরা বাজারে নাচতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু নাচা যাবে না। নাচলে লোকে নির্ঘাত পাগল বলবে। সে বাবা হতে চলছে। এই কথাটা রাফিয়া আগে বলেনি কেন? লিস্টে আর তেমন কিছু লেখা নেই। এই রান্নাঘরের ছোটখাটো কিছু জিনিস ছাড়া।

বাসার কলিংবেলে চাপ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জয়। রাফিয়া এসে দরজা খুলে দিলো। জয় হাতের জিনিসগুলো মেঝেতে রেখেই রাফিয়াকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর প্রতিদিনের মতো দুই চোখে দু'টো চুমু দিল। কিন্তু আজ থেকে সে আরেকটা চুমু যোগ করতে চায়। আর সেটা হলো, তার অনাগত সন্তানের কপালে। মানে রাফিয়ার পেটে। সে খুশিতে কিছু মিষ্টিও নিয়ে এসেছে। রাফিয়া মিষ্টি পছন্দ করে।

আজ আর সে অফিস থেকে ফিরে জুতা মোজা না খুলেই বিছানায় শুয়ে পড়েনি। আজ সে নিজের জিনিস নিজেই খুলেছে। রাফিয়াকে এই সময়ে কোনো কাজ করতে দেওয়া যাবে না। ভারি কাজ তো নয়ই। প্রয়োজনে সে একটা কাজের লোক রাখবে। আর এখন থেকে সে একটু দ্রুত অফিস থেকে ফিরবে। প্রয়োজনে মাঝে মাঝে বসের কাছ থেকে ছুটি নেবে। অফিসে তার কাজের পারফর্মেন্স ভালো। তাই সে যখন যা চায়, অফিসের বস তখন তা নির্দ্বিধায় দিয়ে দেয়।

আজ রাতের রান্নাটা জয় নিজেই করেছে। রাফিয়া কত করে বললো, থাক। আমিই করছি। তুমি যাও।
জয় তার কোনো কথায় শোনেনি। সে বলেছে, কাল একটা কাজের লোক এনে দেবে। যে তার সকল খেয়াল রাখবে। রাফিয়া "না" করেছে। তবুও জয় কাজের লোক রাখবেই।
- রান্নাটা কেমন হয়েছে বউ?
জয়ের মুখে আজ হঠাৎ করেই বউ ডাক শুনে লজ্জা পেল রাফিয়া। সে মাথা নিচু করে বললো, একদম তোমার মতো?
- সত্যি?
- তুমি খেয়েই দেখো না।

জয় তরকারিটা মুখে দিতেই দেখলো দারুণ স্বাদের হয়েছে। কোনোকালেই সে রান্না করেনি। তাই রান্নার অভিজ্ঞতাও নেই তার। কিন্তু এত স্বাদের হলো কী করে? নিশ্চয়ই ইউটিউব মামার জন্যই হয়েছে। মনে মনে সে ইউটিউবকে ধন্যবাদ দিলো।

একটা কাজের লোক রেখেছে সে। নাম পিংকি। বয়স চৌদ্দ, পনেরো হবে। মেয়েটা সারাদিন বাড়ির মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। দেখে মনে হয় মেয়েটা যেন তাদেরই। রান্নাটাও দারুণ করে। সাথে ঘরটাকে বেশ সুন্দরভাবে গুছিয়ে রাখে। যেমনটা রাফিয়া রাখতো। আবার এদিকে রাফিয়ার দেখাশোনা তো আছেই। পিংকিকে পেয়ে রাফিয়াও বেশ খুশি। মেয়েটার চাঞ্চল্যতা দেখে রাফিয়ার বেশ ভালোই লাগে। সারাদিন তার সাথেই যত আলাপ করে সে! পিংকিও একদম সুবোধ বালিকার ন্যায় তার সেই আলাপ শোনে।
.
জয়ের প্রমোশন হয়েছে। ওদিকে সে বাবা হতে চলেছে। আর এদিকে তার প্রমোশন হয়েছে। এ যেন সর্গীয় সুখ। সে দু'হাত তুলে তার ইশ্বরকে বলছে, হে ইশ্বর তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
এখন সে রোজ অতি দ্রুত বাসায় ফেরে। তারপর বাকি সময়টুকু সে রাফিয়ার সাথেই কাটায়। রাফিয়া মুসলিম, জয় হিন্দু। কিন্তু বিয়ের পর তারা জাতপাত ভুলে গিয়েছে। তারা জানে, তারা শুধু একটা সুখী দম্পতী।

জয় সেইবার কী কারণে যেন গ্রামে যায়। সচরাচর তার গ্রামে যাওয়া হয়ে ওঠে না। কিন্তু সেইবার গিয়েছিল। রাফিয়াদের বাড়ির পাশেই তাদের বাড়ি। জয়ের বাবা মা রাজশাহীতে থাকেন। আর জয় ঢাকাতে। চাকরি বাকরির জন্য তারা ইচ্ছে করলেই একসাথে থাকতে পারে না। এদিকে গ্রামের বাড়িটা ফাঁকাই পড়ে থাকে।
জয় যেদিন ঢাকায় ব্যাক করবে তার আগের দিন রাফিয়ার মা মারা যায়। রাফিয়ার পরিবারে তার আপনজন বলতে তার মা'ই ছিল। বাবা গত হয়েছেন বছর দশেক হবে। রাফিয়া এখন একা, বড্ড একা। গ্রামের কিছু লোকজন আছে। তারা হিংস্র জানোয়ার সম। জয় দেখলো এই মেয়েটাকে তার একা ফেলে যাওয়া একদম উচিত হবে না। সে রাফিয়ার অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে নিয়ে ঢাকাতে ব্যাক করে।

রাফিয়ার সাথে তার মনের মিল হতে প্রায়ই অনেকটা সময় লেগে যায়। রাফিয়াকে নিয়ে আসার পর সে মেস ছেড়ে একটা ফ্যামিলি বাসা নেয়। একটা সময় তারা বিয়ে করে। বিয়ের সময় অবশ্য তার বাবা মা'র একটু অমত ছিল। কিন্তু জয়ের কথার কাছে তার বাবা মা হার মেনে যায়।
.
হঠাৎই পিংকি জয়কে কল করে বললো, স্যার আপামনি কেমন জানি করছে। আপনি জলদি আসেন।
জয় অফিস থেকে এক প্রকার দৌঁড়ের সাথেই বাসায় এলো। দেখলো রাফিয়া ছটফট করছে। সে তার বাবা মাকে কল করে রাফিয়াকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটলো। সে তার ইশ্বরকে বারবার স্মরণ করছে, হে ইশ্বর তুমি সহায় হও।

ডাক্তার এসে জানালো তার মেয়ে সন্তান হয়েছে। মা, মেয়ে দু'জনই সুস্থ আছে। এদিকে জয়ের বাবা মাও চলে এসেছেন। ডাক্তার ভেতরে যেতে বললে জয় ভেতরে গেল। রাফিয়া আর তার পিচ্চি মেয়েটাকে পাশাপাশি শুইয়ে রাখা হয়েছে। রাফিয়া তার মেয়ের দিকে অপলক চেয়ে আছে। মাঝে মাঝে তার পিচ্চি পিচ্চি চুলগুলো নেড়ে দিচ্ছে। জয় ভেতরে গিয়েই রাফিয়ার কপালে এবং চোখে চুমু খেলো। তারপর তার মেয়েটাকে কোলে নিয়ে সে বললো, বাব্বাহ আমার পরীটা দেখি একদম তার বাবার মতো দেখতে হয়েছে।
রাফিয়া রাগী চোখে চেয়ে বললো, এই একদম না। সে আমার মতো দেখতে হয়েছে।
.
গল্পটা রাফিয়া'র
লেখক: Srabon Ahmed (অদৃশ্য ছায়া)
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুলাই, ২০২০ সকাল ১১:০২
৪টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তারেক রহমানের প্রথম সফর কেন ভারতেই হওয়া উচিত ছিল?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৯


দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে আড়াই ঘণ্টা বসিয়ে রাখার পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান কলম্বোর পথ ধরে দেশে ফিরে আসেন । তিনি ভারতে ঢোকার অনুমতি পেয়েছিলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৪শের শহীদ নাকি প্রতারক ⁉️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৫:৪৭



'বায়বীয় গুলিতে আহত হয়ে নিহত' এক শহীদের উপাখ্যান।

ইনুস বাটপারের ভূয়া শহীদের বিতর্কিত 'জুলাই শহীদ গেজেট' যে অসংখ্য মিথ্যা, প্রতারনা, জালিয়াতিতে ভর্তি একটা বড় রকমের মিথ্যাচার, বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৬:৪৪


চন্দ্রা পশ্চিমের বারান্দায় উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আকাশে ছড়ানো ছেটানো  মেঘ, সেই মেঘের মতই তার মনটা আজ  বিক্ষিপ্ত ।
ইদানীং মা কি সব সন্দেহ করে তাকে।অকারণই মনে হয় তার কাছে। তারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ষো-ল-ব-ছ-রঃ আর কি বর্ষপূর্তি পোস্ট লেখা হবে?

লিখেছেন আমি তুমি আমরা, ১৮ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:০৬



অবাক হয়েই চেয়ে দেখি
কখন এমন হলো?
এইতো আমার ব্লগবাড়ীটার
বয়স হল ষোল।

দুরুদুরু বুকে তখন
খুলেছিলাম ‘নিক’।
ফেলতে পলক, পেরিয়ে গেল
ষোল বছর ঠিক।

ফেসবুক আর ইউটিউবের
আছড়ে পরে ঢেউ।
সামুপাড়ায় এখন কি আর
উঁকি মারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন পর্ব -১

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ১৮ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫২



(শালবন ভ্রমণ)
২০১২ সাল। সদ্য পাশ করে বের হয়েছি। কঠিন সময় পার করছিলাম। এদিক-সেদিক স্টেজ শো করে যে পেমেন্ট পেতাম, বাড়িতে ফিরতে ফিরতেই প্রায় শেষ হয়ে যেত। সকালে মায়ের হাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×