somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"বিয়ে" (ছোটগল্প)

০৩ রা জানুয়ারি, ২০১৬ রাত ৮:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চার্চের দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে বসে আছে নিক। রাস্তার গোলাগুলির হাত থেকে বাঁচার জন্য তারা তাকে টেনে ওখানে বসিয়ে দিয়ে গেছে। তার পা দুটো নিস্তেজ অবস্থায় পড়ে আছে। মেরুদন্ডে আঘাত লেগেছে তার। ঘাম আর ধূলাবালিতে তার মূখমন্ডল নোংরা হয়ে আছে।

মেঘহীন আকাশে সূর্যের কড়া রোদ। বেশ গরম পড়েছিল। পাশেই রেনাল্ডের অস্ত্র মাটিতে পড়ে আছে। আর সে দেয়ালের পাশে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। নিক সামনের দিকে তাকাল। রাস্তার ওপারের ভবনটার গোলাপী রঙের দেয়াল খসে পড়েছে। দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া একটা লোহার খাট রাস্তার উপর ঝুলছে। ঘরের পাশের খসে পরা ইটের মধ্যে দুজন অস্ট্রিয়ানের মৃতদেহ পড়ে আছে। রাস্তার উপর পড়ে আছে আরও একটি লাশ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল। যেকোনো মুহূর্তে স্ট্রেচারবাহীরা তাদের উদ্ধারে এসে পড়বে।

নিক অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মাথা ঘুরিয়ে রেনাল্ডের দিকে তাকাল। রেনাল্ড রোদের মধ্যে অত্যন্ত কষ্টের সাথে শ্বাস নিচ্ছে। নিক মৃদু হেসে আবার সতর্কতার সাথে তার মাথা ঘুরিয়ে নিল। রেনাল্ড চুপচাপ পড়ে রইল।

পাদুয়ায় এক ক্যাম্পে আছে নিক। এক উষ্ণ সন্ধ্যায় তারা নিককে ছাদের উপর নিয়ে গেল। সে ছাদের উপর থেকে শহরটা দেখতে পেল। চিমনি থেকে ধোয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে আকাশের দিকে উঠছে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে অন্ধকার নেমে আসল। দূরে সে সার্চ লাইট দেখা গেল। অন্যরা মদপানের জন্য নিচের তলায় বেলকনিতে গেল। শুধু নিক আর লুজ বসে আছে ছাদে। তারা নিচে বেলকনিতে অন্যদের মদপানের আর হৈ হুল্লোড়ের সাড়া টের পাচ্ছিল। লুজ বিছানার উপর বসল। এই উষ্ণ সন্ধ্যায় তাকে বেশ লাবণ্যময়ী আর আকষর্ণীয় লাগছিল নিকের কাছে। তিন মাস ধরে লুজ এখানে নাইট ডিউটি করছে। তার সেবায় সকলে মুগ্ধ। লুজকে পেয়ে এখানকার সবাই বেজায় খুশি। নিকের যখন অপারেশন হল, তখন লুজ তাকে অপারেশনের জন্য প্রস্তুত করেছিল। তখন থেকেই নিক লুজকে ভালবাসতে শুরু করল। যখন সে স্ক্রাচ দিয়ে হাটতে শুরু করল, তখন থেকেই সে নিজে নিজে শরীরের তাপমাত্রা মাপে, যাতে করে লুজকে কষ্ট করে ঘুম থেকে উঠতে হয় না। ওখানে অল্প কয়েকজন রোগী ছিল। তারা সবাই নিক আর লুজের সম্পর্কের ব্যাপারটা আচ করতে পেরেছিল । হাঁটতে-চলতে সবসময় নিক লুজকে নিজের করে পেতে চাইত। আবার যুদ্ধক্ষেত্রে যাবার আগে তারা ডুমোতে গেল এবং প্রার্থনা করল। ডুমোর ভিতরে ছিল হালকা অন্ধকার এবং বেশ শান্ত। সেখানে আরো অনেকে ছিল। তারা চুপচাপ প্রার্থনা করছিল। নিক আর লুজ বিয়ে করতে চাইছিল। কিন্তু আইনগত সমস্যা ছিল। কারণ তাদের কারো কাছেই তাদের জন্ম সনদ ছিল না। যদিও তারা নিজেদেরকে বিবাহিতদের মতই মনে করতো। কিন্তু তারা চাইত তাদের বিবাহের একটা সামাজিক স্বীকৃতি হোক এবং তাদের বিয়ে সম্পর্কে সবাই জানুক। কারণ তারা পরস্পরকে হারাতে চাইত না।

নিক যুদ্ধক্ষেত্রে চলে গেল। লুজ নিককে একে একে অনেক গুলো চিঠি লিখেছিল। কিন্তু যুদ্ধবিরতির আগ পর্যন্ত নিক একটা
চিঠিও হাতে পায়নি। যুদ্ধবিরতির পর সে পনেরটা চিঠি একসাথে পেল। তারিখ দেখে দেখে সে চিঠিগুলোর সিরিয়াল ঠিক করল এবং সবগুলো চিঠি এক সাথে পরে ফেলল। লুজের সবগুলো চিঠি ছিল আবেগে ভরপুর। চিঠিতে সে হাসপাতালের বিভিন্ন ঘটনার বর্ননা দিত। সে তাকে কতটা ভালবাসত, সে সব কথাও লিখত। লুজ আরও লিখত যে, তাকে ছাড়া তার বেশ একাকী লাগত। তাকে ছাড়া তার জীবন অসহায় মনে হত। রাতের বেলা সে তাকে প্রচন্ড মিস করে- এ জাতীয় কথাবার্তায় ভরা থাকত তার চিঠি।

যুদ্ধ বিরতি হলে, তারা দুজন একমত হল যে, দেশে গিয়ে শিকাগোতে নিক একটা চাকরি গ্রহণ করবে। যাতে করে তারা
বিয়ে করতে পারে। তবে যতক্ষন নিক চাকরি না পাবে এবং তার সাথে দেখা করার জন্য সে নিউইয়র্ক না যাবে, ততক্ষণ লুজ দেশে ফিরবে না। নিক প্রতিজ্ঞা করল সে আর মদ পান করবে না। এমনকি সে তার কোনো বন্ধুবান্ধবের সাথেও সাক্ষাৎ করবে না। তার শুধু একটা চিন্তা- একটা চাকরি চাই। অন্তত লুজের জন্য তাকে একটা চাকরি পেতেই হবে।

নিকের দেশে ফিরে যাবার সময় হল। লুজ নিককে মিলান পর্যন্ত পৌছে দিতে গেল। পাদুয়া থেকে মিলানে যাবার সময় নিক লুজকে তখনি তার সাথে দেশে ফিরে যাবার জন্য পীড়াপীড়ি করল। কিন্তু লুজ তখন দেশে যেতে চাইল না। এ নিয়ে তারা দুজনে ঝগড়া করছিল। যাহোক, বিদায়ক্ষণ উপস্থিত হল। তারা একে অপরকে চুমু খেয়ে বিদায় নিল। নিকের মনটা কিন্তু তখনো বেশ খারাপ। ঝগড়াঝাটি করে এমন বিদায়
তো সে কখনো চায়নি।

নিক জেনোয়া থেকে জাহাজে করে আমেরিকা গেল। আর লুজ চলে গেল পুরদন। সেখানে সে একটা হাসপাতাল চালু করল। লুজ খুব একাকী বোধ করছিল। যদিও তখন শীতকাল ছিল, সেখানে বেশ বর্ষা পড়ছিল। এরকম একটা স্যাতসেতে শীতে লুজ একাকী তার সময় কাটাচ্ছিল।

অদ্রিতির একটা সেনা ব্যাটালিয়ন তখন সেখানে অবস্থান করছিল। ঐ সেনা ব্যাটালিয়নের এক মেজরের সাথে লুজের ভাব হল। যদিও লুজ এর আগে কখনো ইতালিয়ানদেরকে তেমন ভাল করে চিনত না, তবুও সে মেজরের প্রেমে পড়ল।

যাহোক, একদিন সে নিকের কাছে চিঠি পাঠালো। সে লিখল, তাদের মধ্যে যা যা হয়েছিল, তা ছিল নিছক ছেলেমী। সে সবের জন্য সে সত্যিই দুঃখিত। লুজ বুঝতে পারছিল, নিক হয়তো তার এমন আচরণের কারণ বুঝতে পারবে না। কিন্তু সে নিশ্চয়ই তাকে একদিন না একদিন এর জন্য ক্ষমা করবে এবং তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে। সত্যিই সে অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত ভাবে এই বসন্তে বিয়ে করতে চেয়েছিল। লুজ নিককে সত্যিই ভালোবাসত। সে চাইত নিকের একটা বিরাট ক্যরিয়ার হোক এবং নিকের সামর্থ্যের উপর তার বিশ্বাস ছিল। কিন্তু সে বুঝতে পারছিল নিককে বিয়ে করাটা হবে নিছক ছেলেমী। ঐদিকে ইতালিয়ান মেজর ঐ বসন্তে তো নয়ই , এমনকি অন্য কোনো সময়ও লুজকে বিয়ে করে নি। লুজ কখনো শিকাগো থেকে তার চিঠির কোনো জবাব পায়নি।

নিক টেক্সিতে বসে লিঙ্কন পার্কে যাবার সময় একটি লুপ ডিপার্টমেন্টের সেল্স-গার্লের কাছ থেকে গনোরিয়ায় আক্রান্ত
হল। আর এই গনোরিয়াতেই মৃত্যুবরণ করল নিক।

— অনুবাদ- স্বপ্নীল পরান



— মূল লেখকঃ আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জানুয়ারি, ২০১৬ সকাল ৮:৫৬
১২টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাষ্ট্রের ভুলের মূল্য কি তবে শিশুদের জীবন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:০৪


যেকোনো দেশে শিক্ষিত নাগরিককে রাষ্ট্রের সম্পদ মনে করা হয়। তাদের জ্ঞান, বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতা দিয়ে রাষ্ট্র উপকৃত হবে, এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক সময় চিত্রটা যেন উল্টো।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগের সুদিন ফিরিয়ে আনতে ব্লগ টিমের প্রতি বিনীত আবেদন

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:০৬


শ্রদ্ধেয় ব্লগ টিমের প্রতি বিনীত নিবেদন,
ব্লগের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কিছু কথা দীর্ঘদিন ধরেই মনে জমে আছে। কথাগুলো কোনো অভিযোগ হিসেবে নয়, বরং একজন সাধারণ ব্লগার ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশে কোন 'জঙ্গী' নেই

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৫:২৫

'জং' শব্দটার অর্থ 'যুদ্ধ'। এভাবে, জঙ্গী কথাটার অর্থ দাঁড়ায় - যোদ্ধা বা যুদ্ধ করেন। যে কোন যুদ্ধই প্রাণহানি ডেকে আনে। আগের কালে, রাজারা যুদ্ধ করে দেশ জয় করতেন। তাঁদের অণ্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এই প্রথম খাল বাবার পলিটিক্যাল ম্যাচুরিটির নিদর্শন পেলাম

লিখেছেন অপলক , ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৪

২০১০ সালে ফেব্রুয়ারীর ২২ তারিখ। মেয়েলি ব্যাপার বলি, প্রতিহিংসার ব্যপার বলি অথবা পলিটিক্যাল ইমম্যাচুরিটির কথা বলি, বাংলাদেশ জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নতুন করে আকীকা দিয়ে নাম রাখা হয়েছিল হযরত শাহজালাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

।।মাদার অব ড্রাকুলা হাসিনার রাস্ট্রীয় জঙ্গীবাদ।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮


মাদার অব ড্রাকুলা হাসিনা ভারতের প্রযোজনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদেরকে দিয়ে জঙ্গী জঙ্গী নাটক মঞ্চস্থ করতো। বহিবিশ্বকে বোঝাতো দেশে ইসলামী জঙ্গী দিয়ে ভরে গেছে এবং সেই জঙ্গীরা ইউরোপ আমেরিকার ভয়াবহ ক্ষতি করবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×