
ভাবছি অনেকদিন ধরে, অনেকদিন... একটা গল্প লিখবো । কবিতায় আর হৃদয় ভরছে না। তাই বিয়োগাত্বকভাবে ভেবে চলেছি... যাবতীয় আনকোরা কাব্যিক ঘ্রাণমাখা শব্দ বের করে দেয়ার একটি অ-পাহারাদার সুযোগ খুঁজছি ! লিখতে বসলেই মস্তিষ্কে রিমঝিম শব্দ ঝরে, কী করে আমি একটি গল্প লিখি ! মাঝে মাঝে রুদ্রমূর্তি হয়ে শব্দগুলোকে মুঠে মুঠে ধরে ধরে হৃদয়ের দেয়ালে আছাড় মারি ! কিন্তু এতে ঘটে হিতে বিপরীত ! হৃদয়ের নরম দেয়ালে ওরা দোল খায়, ওদের পেট থেকে আরো শব্দ উগরে বের হয় ! আমি খুঁজি বিষয় ওরা দেয় শিহরণ, আমি খুঁজি বাক্য ওরা দেয় চরণ, আমি খুঁজি প্যারা ওরা দেয় স্তবক....আমি গুটিসুটি হয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে রওয়ানা হই মৃত্তিকা পথে, বিভ্রম জেগে দেখি আমি জোনাকজ্বলা জ্যোৎস্না পথে আকাশতরীতে!
নিতান্তই গল্পের ভেলায় বৈঠা নিয়ে বিপরীতে এঁকে যেতে চাই বহমান স্রোত, গল্পের ঘরে গল্প, গল্পানুভব ! কিন্তু এই অকূল দরিয়ার অতলে শুধুই শব্দের জল, শব্দের জলদেবী- আমার গল্পের ভেলায় হামলে পড়তে চায় ! আমি বৈঠার বেগ বাড়িয়ে দেই, গল্প সাওয়ারি হয়ে ছুটতে থাকি শব্দের সমুদ্রে, অতন্দ্র নাবিকের বেশে নিজেকে উদ্ধার করতে । গল্পের দ্বীপ এখনো বহুদূর, অজস্র খরস্রোতা শব্দ ঢেউ পাড়ি দিতে হবে...
জলের গায়ে জ্যোৎস্না ভাসে
ওরা প্রেম
ওরা অভুক্ত
নিমগ্নে নিঃসৃত নোনা
বিষণ্ণতা
ভাঙন
নীরবতা...
একি ! ওরা আমাকে গ্রাস করতে চাইছে, বিভ্রান্ত করছে, আমি আবারও কবিতায় ঢুকে যাচ্ছি ! নিউরণকে শান্ত করলাম, বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলাম । কঠিন শপথে নিজেকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করলাম- কবিতাকে ছুটি দিলাম। সকল উপকরণাদি- জ্যোৎস্না, জোনাক, চন্দ্র, জল, অশ্রু, অনুভব, প্রেম, সন্ধ্যা, রাত্রি, বিষণ্ণতা, নীরবতা, নিশীথ, ডম্বুর, অঙ্ঘুর, ঘংগুর নীলাম্বরী ঝেড়ে ফেলে দিলাম ! আজ আমি গল্প লিখবো, গল্পের দ্বীপে যাবো । একাকি মধ্য দরিয়ায় গল্পের খড়কুটোয় বানানো ছোট্ট তরীতে খাচ্ছি ঘুরপাক । এখনো তীরের সন্ধান মেলে নি, চোখের আঙ্গিনায় শুধু জলছবি, শব্দকবি। আমি দিশেহারা, পথহারা নাবিক । এগিয়ে যাচ্ছি উদ্দেশ্যহীন গল্পের ভেলায় শব্দের সমুদ্রে ! অনুপ্রেরণা দেবে কে আমায় ? কোন নিশাচর বিহঙ্গ ? যে অথৈ সমুদ্রে চন্দ্রের কিরণে উড়ে যায় কূলের ঠিকানায় ! নাকি হতচ্ছাড়া মেঘদল ? যে আকাশের বুকে বৈঠা চালায় ? আরশিতে রূপ দেখতে দেখতে যে পার করে সমুদ্র !
আমার দেহে কাঁপন, ক্রমশ দূর্বল হচ্ছি । আর কতদূর পাড়ি দিলে একটি গল্প পাবো, হৃদয়ের শীরায় শীরায় যন্ত্রণা । আমি দেখি নিঃসৃত তাজা রক্তের দাগ । বৈঠা থমকে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে চেতনা যাচ্ছে খসে । চোখের পাতার সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে আমি দেখছি আলো, একটি আকাঙ্ক্ষার গল্পের দ্বীপ । তীর ঘেঁষে সদ্য জন্ম নেয়া কোমল সবুজ ঘাস জল পান করছে ! আমি জেগে রইলাম, অণুপ্রেরণা পেলাম, এই অদূরে তীর, গল্পের দ্বীপ । সুদীর্ঘ পথ গল্পের স্রোত আঁকতে আঁকতে এখন সকল স্রোত আমার অণুকুলে । তাই ভেলা চলছে বৈঠাহীন । গল্পের চাদর গায়ে দিয়ে আমি মুড়িয়ে আছি চাতক পাখির মতো । ঢেউয়ের নৃত্যে ভেলা ভেসে যাচ্ছে তীরে । এই ক্ষতবিক্ষত হৃদয়েও ঢেউগুলো নিয়ে আমার গর্ব হচ্ছে, এ গুলো যে আমার সৃষ্টি !
যখন আমি গল্পের দ্বীপে সবুজ ঘাসের বিছানায় আঁচড়ে পড়লাম তখন চেয়ে দেখি ভেলা বৈঠার অবশিষ্ট এই নিষ্ঠুর শব্দ সমুদ্র খেয়ে নিচ্ছে । আমি চোখ বুজে আকাশ দেখার চেষ্টা করছি । আমি যন্ত্রণাক্লেষ্ট হৃদয় নিয়ে কোথাও হারিয়ে যাই....
....নরম শুভ্র কোমল বনগোলাপের ঘ্রাণ মাখানো বিছানায় জেগে উঠি যখন আমি তখন ভাবতে পারি নি কতকাল আমি হারিয়ে ছিলাম । অজস্র উৎসুক শব্দের দৃষ্টি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার মনে পড়ছে, আমি গিয়েছিলাম গল্প দ্বীপের খোঁজে, আমি পেয়েছিলাম সেই অধরা গল্প দ্বীপ ! তবে কেন এই আমি বিরক্তিকর শব্দ ঘরে ! তবে কী সবকিছু বিভম ছিলো, বিভ্রান্তি ছিলো ? আমি বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে আসি, উজ্জ্বল রোদের ঝলকানিতে চোখ মেলতে কষ্ট হচ্ছে । আস্তে আস্তে চোখ খুলে দেখি আমার সামনে সেই সমুদ্র যা পাড়ি দিয়ে আমি গিয়েছিলাম গল্প দ্বীপে । আমি চিৎকার দেই, আমি গল্প দ্বীপে খবর পাঠাতে চাই ।
আমার চিৎকার শুনে কিছু শীতল বাতাস আমার কর্ণে লেগে যায়, ওরা বলে- তোমার গল্প তোমার শব্দঘর, শব্দসমুদ্র । তোমার হৃদয় বেঁচে থাকে শব্দে, যাদের তুমি ক্ষরণ চেয়েছিলে ! যাকে তুমি গল্প দ্বীপ মনে করো সে তোমার এই শব্দ সমুদ্রের বুকে বসত করে, এমন আরো অজস্র গল্প দ্বীপ শব্দজলে ডোবে, শব্দজলে জাগে । তুমি নিরাশ হইয়ো না, খুঁজে দেখো তোমার শব্দ, চরণ, অনুভবের রেখা ধরে অজস্র গল্প জেগে আছে উজ্জ্বল হয়ে তোমার অপেক্ষায়....
ছবি- গুগল ইমেইজ !
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০১৭ রাত ৯:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


