somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দীর্ঘায়ু হোন ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চু

২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাত ৩:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২০০৭ সালের মার্চ-এপ্রিলের কোন একদিন।সিলেটের বিয়ানীবাজার থেকে ছেড়ে আসা শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসে ঢাকা যাচ্ছিলাম। বড়লেখা ষ্টপ থেকে উঠে যে সিট পেয়েছিলাম সেটি পিছন দিকে ছিল। পুরো বাস যাত্রীতে পরিপূর্ণ। নির্দিষ্ট দু-চারটি সিট ফাঁকা ছিল পরের ষ্টপেজ কুলাউড়ার জন্য। ঘন্টাখানেক পরে বাস এসে পৌঁছাল কুলাউড়া। আমার পাশের সীটে আসন নিলেন এক পৌঁঢ়া। তিনি জানালার ধারে বসলেন। আমি উঠে জায়গা করে দিলাম।



দূরপাল্লার বাসভ্রমণে একাকী যাত্রা করাটা মাঝে মাঝে বিরক্তিকর লাগে। দুইজন হলে গল্পগুজব করেই সময় পার করা যায়। আর একাকী ভ্রমণে যদি সহযাত্রী সেরকম সহৃদয় হন তাহলেও যাত্রা উপভোগ্য হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে আমি অবশ্য কোন সুযোগ পেলেই কারো সাথে আলাপচারিতা জমানোর চেষ্টা করি। এ যাত্রায়ও তার ব্যতিক্রম হলনা।


কিছুক্ষণের মধ্যেই আলাপচারিতা জমে উঠল। কুলাউড়া শহরেই তার পিতৃনিবাস। এক সপ্তাহের জন্য বেড়াতে এসেছিলেন এখানে। আবার ফিরে যাচ্ছেন ঢাকা। নিজেই বললেন আমার নাম রওশন আরা বাচ্চু। আমি একজন ভাষা সৈনিক। বেশ সপ্রতিভভাবেই নিজের পরিচয় তুলে ধরলেন তিনি। এমন একজন উঁচু মাপের মানুষকে সহযাত্রী হিসাবে পেয়ে নিজের ভাগ্যকেই ধন্যবাদ জানালাম।

ভাষা সৈনিক ছাড়াও তার অন্য যেসব গুণাবলী রয়েছে শুধুমাত্র সেগুলো তুলে ধরলেই তিনি যে অন্য সবার চেয়ে আলাদা সেটা না বললেই চলে। তবে সবিনয়ে তিনি সেগুলো উপেক্ষা করে চলেন। পুরো যাত্রায় আমি ছিলাম একজন মনোযোগী শ্রোতা। তিনিই শুধু কথা বললেন। নিজের কথা, পরিবারের কথা, ভাষা আন্দোলনের কথা।

নিজের কথা বলতে গিয়ে জানালেন, চল্লিশের দশকে যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী শেষ করলেন, তখন তার সাথে আর মাত্র দুইজন ছাত্রী ছিলেন। শিক্ষাজীবন শেষে তার পরিবার পড়লেন বেকায়দায়। বিয়ে দিতে উপযুক্ত পাত্র পাচ্ছিলেন না। সিলেটের মেয়ে। তার উপর মাষ্টার্শ পাস। পরিবারের লোকজন আত্মীয়স্বজন গলদগর্ম হচ্ছিলেন তার বিয়ে নিয়ে উপযুক্ত পাত্রের অভাবে। অবশেষে যাকে পাওয়া গেল তিনি উত্তরবঙ্গের লোক। তার চেয়ে বয়সে দশ বছরের বড়।
বেশ অকপটেই কথাগুলো বলছিলেন রওশন আরা বাচ্চু।

আমার বয়স ৭৫ বছর। আর আমার স্বামীর বয়স ৮৫। শুধুমাত্র মনের জোরে বেচেঁ আছি আমরা। আমার স্বামী বাড়ি করার জন্য অনেক পরিশ্রম করে একটি জায়গা বের করেছিলেন। তার পছন্দ ছিল মসজিদের আশেপাশে বাড়ি করার। যাতে আজানের পরেই বাসা থেকে গিয়ে জামাতে নামাজ পড়তে পারেন।

রওশন আরা বাচ্চু একটি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। বললেন রিটায়ার করেছেন। সেটি সম্ভবত: বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ হবে (পুরোপুরি মনে পড়ছে না)। ছেলেমেয়ের কথা বলতে গিয়ে বললেন আমার তিন মেয়ে। এরা আসলে ছেলেদের মতই। আমি তাদের সেভাবেই গড়ে তুলেছি। এক মেয়ে উচ্চশিক্ষায় বৃত্তি নিয়ে পড়ালেখা করছে কানাডায়। আরেকজন আমেরিকায়। আর ছোট মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বেশ তৃপ্তির সুরেই কথাগুলো বললেন তিনি।

সময়ের পরিক্রমায় আট বছর পরে হয়তো ব্যক্তি জীবনে আরো অনেক পরিবর্তন হয়েছে রওশন আরা বাচ্চুর। তবে পরিবর্তন হয়নি তাদের মূল্যায়নে। এখনো অনেকটা অবহেলায় পড়ে আছেন হয়তো। দেশ, রাষ্ট্র, সমাজ থেকে প্রাপ্যটুকু কখনোই পাননা তারা। নাহলে একজন রওশন আরা বাচ্চুকে আমার মত সাধারন একজন যাত্রীর সাথে দূরপাল্লার বাসের পিছনের সিটে বসতে হবে কেন?

উন্নত দেশে এই মাপের মানুষরা রোল মডেল হয়ে থাকেন। রাষ্ট্র তাদের পৃষ্টপোষকতা করে। বাসস্থান, যাতায়াত সবকিছুতেই ভিআইপি সুবিধা দেওয়া হয়। আর আমাদের দেশে ভিআইপি সুবিধা পান দুর্নীতিবাজ আমলা, মন্ত্রী, রাজনীতিবিদরা।

বছর ঘুরেই আবার আসে একুশে ফেব্রুয়ারী। সারা বছর ভুলে থাকলেও এদিন আমরা কিছুটা হলেও স্মরণ করে আমাদের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের, ভাষা সৈনিকদের। আজ সুদূর স্কটল্যান্ড থেকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি ভাষা শহীদদের। আর জীবিত সকল ভাষা সৈনিকদের।

এই বিশেষ দিনে আপনাকেও বিশেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছি ভাষা সৈনিক রওশন আরা বাচ্চু। ভাল থাকুন। দীর্ঘায়ু হউন।
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ছবি ব্লগ -৫ ফুলদল

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:২৭

প্রকৃতি যখন যন্ত্রণার ভারে নুয়ে পড়ে, সূর্য ক্লান্ত অভিমানে আড়াল করে তার দীপ্ত মুখ। তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। শীতের নিঃশব্দ আগ্রাসনে নিস্তব্ধ চারপাশ। জীবনের স্পন্দন নেই।... ...বাকিটুকু পড়ুন

চলতে চলতে পথে ৬

লিখেছেন কবিতা ক্থ্য, ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৪৭

প্রকৃতির নিষর্গ:



ওবেরন যাওয়ার পথে জুলাই মাসে নিউ সাউথ ওয়েলসের (NSW) মেফিল্ড গার্ডেনে ধারণ করা এই ছবিটি একটি শান্ত পুকুরের বুকে প্রকৃতির প্রতিবিম্বি - প্রাণবন্ত ঋতুভিত্তিক রঙের মাধ্যমে শীতকালের... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘Why you come here?’ সুবিধামতো পরিচয়ের প্রবাসী

লিখেছেন মুনতাসির, ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:১৬

কারো সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে। প্রতিবাদ করার অধিকারও আছে। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা দিয়েই বোঝা যায় প্রতিবাদকারী কে। “Why you come here?” বা “I fuck your country system” কোনো রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রপ্রেমী ও রবীন্দ্রবিরোধী - কারা ভালো লেখে-মন্তব্য করে ব্লগে

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫


আখতারুজ্জামান আজাদ নামে এক লেখকের একটা লেখা দৃষ্টিগোচর হলো কাল। লেখাটা দিয়েই আমার পোস্ট শুরু করব।

স্বল্প-বাংলা-জানা এক জাপানি ভদ্রলোক কোলকাতার এক দাদাকে জিজ্ঞেস করলেন— ‘এই যে আপনারা নামের শেষে দা... ...বাকিটুকু পড়ুন

জানের বদলে জান: ব্যাপারটায় প্রতিহিংসার ফ্লেভার মেশানো

লিখেছেন অপলক , ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৩৬

ইসলামে কি বলা আছে সেটা নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। দেশের আইনে কি আছে সেটাও না। ইংরেজীতে দুটো শব্দ আছে: Equality (Sameness: সমতা) এবং Equity (Fairness: নায্যতা)।




একটা অপ্রাপ্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×