
স্টারবাক্স এর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কফির সুবাসে ভীষণ কফির তেষ্টা পেয়ে বসে। অফিস ফেরত অনেক মানুষের সাথে আমিও লাইনে দাঁড়িয়ে যাই কফির জন্য। এই কফি শপে কফি কিনতে হলে ক্যাশ কাউনটারে আগে কফির দাম শোধ করে দিতে হয়। কফির দাম শোধ করেছি। কাউন্টারে দাঁড়ানো স্প্যানিশ মেয়েটি কিছু খুচরা পয়সার সাথে খালি একটি কাগজের মগ ধরিয়ে চোখের তারা দুটি নাচিয়ে ---কফি দ্যাট সাইড, বলে অন্য কাস্টমারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কাউন্টারে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন ফ্লেভারের কফি, দুধ, চিনি, জিরো ক্যালরি, ক্রিম। যার যেমন পছন্দ সে অনুযায়ী কফি কাপে ঢেলে নিজের পছন্দ মত দুধ চিনি মিশিয়ে নিচ্ছে। ফ্লাস্ক থেকে কাপে কফি ঢালার সময় প্রথম চোখাচোখি হয় মেয়েটির সাথে। শ্যাম বর্ণ, কালো বড় বড় টানাচোখ, ঘন কালো লম্বা চুল দেখে বাংগালীই মনে হলো। অল্প হেসে "হ্যালো" বলে আমি কফি নিয়ে চলে আসি।
জুন-জুলাই এই দুই মাস উত্তর আমেরিকাতে সুর্য ডোবে রাত সাড়ে আটটায়। অফিস ছুটি বিকাল পাঁচটাতে। অফিস ছুটির পর আরও সাড়ে তিন ঘন্টা পর সন্ধ্যা হয়। কারোরই তাড়া থাকেনা ঘরে ফেরার। গরম আসে এই দেশে প্রিয় কোন অতিথির মত। খুব অল্প সময়ের জন্য এসে, চলে যাওয়ার পর রেশ রেখে যায়। এমন এক গরমের বিকালে বসে আছি নিউ ইয়র্কর বানিজ্যিক এলাকা ম্যানহাটনের কলম্বাস সার্কেলের একটি কফি হাউসে। আমি যেখানে বসে আছি সেখান থেকে বাইরের প্রায় পুরোটাই চোখে পড়ে। আজব শহর এই নিউইয়র্ক। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের মানুষের দেখা মেলে এখানে। অফিস ছুটি হয়েছে। রাস্তায় বেশ ভীড়। অনেক বাঙ্গালীও চোখে পড়লো । বাইরের জগতের সাথে প্রায় একাত্ব হয়ে গিয়েছি এমন সময় মিষ্টি স্বরে কেউ বলে উঠলো --ক্যান আই সিট হিয়ার?
চেয়ে দেখি বাংগালী সেই মেয়েটি। হেসে বললাম--শিউর।
সামনা সামনি বসাতে এতক্ষনে খেয়াল করলাম হাল্কা পাতলা গড়নের মেয়েটি খুব সুশ্রী। ইংরেজীটাও পাকা। কোন এক্সেন্ট নেই। হয়তো এই দেশেই জন্ম বা এখানেই বেড়ে উঠা তাই ইংরেজি এত ভালো। আমার কফি প্রায় তলানিতে চলে এসেছে। বাকিটা হাটতে হাঁটতে শেষ করবো এই ভাবনাতেই উঠে দাড়াই। গ্রীষ্মের পড়ন্ত বিকেলের আলোতে ম্যানহাটনের এই রাস্তাটিকে খুব মায়াবী মনে হয়। জিন্স টি শার্ট হাই হিল পড়ে নিশ্চিন্তে আপন মনে হেঁটে চলেছি ---- "এক্সকিউজ মি" শুনে পিছন ফিরে তাকাই। কফি শপের সেই মেয়েটি ।
--- আমাকে বলছো? বলো? শুনার জন্য আগ্রহ নিয়ে দাড়ালাম।
হ্যানড শেকের জন্য হাত বাড়িয়ে বললো----আমি পূর্ণিমা উইলসন।
তার নাম শুনে ভাবলাম মা বাংগালী, বাবা আমেরিকান। এমন তো হয়েই থাকে। কিন্তু দোআঁশলা বাচ্চাদের মত তাকে লাগছেনা। ভাবলাম স্বামীর নামের শেষ নাম নিয়েছে।
-----আমি তোমার সাথে কিছুক্ষন থাকতে পারি?
-----অবশ্যই পারো । তুমি কি এখানেই জব করো? আমিও কথা বলার একজন মানুষ পেয়ে গেলাম যেন।
আমার অফিস বিল্ডিং এর পাশের ত্রিশ তলার দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে বলল ---হ্যাঁ। গুগলে আছি । আমি ওয়েব ডেভলপার ।
বিদেশে নিজ দেশের কাউকে বড় জায়গাতে চাকরি করতে দেখলে আমি বরাবর খুব উচ্ছসিত হয়ে পড়ি বললাম ----- বাহ! বেশ স্মার্ট জব করো তো তুমি।
এতোক্ষন সব কথা ইংরেজীতেই হচ্ছিল। সাধারণত এখানে আমরা বাংগালীরা এক সাথে হলে ইংরেজী বলিইনা প্রায় । কিন্তু এই মেয়েটি একটা বাংলা কথাও বলছেনা। তাই বেশ অবাক হয়েই জানতে চাইলাম----
------তুমি বাংলা একদম জানোনা? এখানে জন্মেছ?
---আমি জন্মেছি বাংলাদেশে। কিন্তু নিজ দেশের জল মাটি আলো বাতাসে বড় হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। মেয়েটির চোখ ছল ছল হয়ে গেলো ।
আমার বুকে মোচর দিয়ে উঠলো আমি কি মেয়েটিকে কষ্ট দিলাম?
---আমি বাংলা বলতে চাই। তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারবে? মেয়েটির চোখে মুখে আকুতি ফুটে উঠলো।
তার বয়স প্রায় তিরিশের কোঠায়। এই বয়সে কাউকে হাতে কলমে শিক্ষা দেওয়া আমার কোন অভিজ্ঞতা নেই। তাই কিছুটা বিব্রত বোধ করলাম। বললাম
---- নিউ ইয়র্কে এখন প্রচুর বাংগালী তুমি চাইলে আমি খোঁজ নিতে পারি কোথায় বাংলা শিখানো হয়।
কথা বলতে বলতে মেট্রো রেল পর্যন্ত এসে পরেছি। ততক্ষন ট্রেন চলে এসেছে। বিদায় নিয়ে ট্রেনে উঠার পর মনে হলো পূর্ণিমার ফোন নাম্বার নেওয়া হয় নি।
তারপর অনেক দিন চলে গেলো প্রায় বছর হবে। চাকরি , ঘর সংসার , লেখালেখি নিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় পার হয়ে যায়।
আমি পূর্ণিমা উইলসন কে ভুলেই গিয়েছিলাম।
মে মাস। দীর্ঘ শীতের পর উত্তর আমেরিকাতে এখন বসন্তের ছোয়া।-
(চলুক)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
