৪২ গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল পাতাল রেল স্টেশন ম্যানহাটন। সকাল ৮টা, অফিস টাইম। যে যার গন্তব্য নিয়ে ভীষন ব্যস্ত। সে ব্যস্ততার ভেতর আমিও একজন। পাতাল থেকে উপরে রাস্তায় উঠতে ছুটছি সবাই এক্সেলেটরের জন্য। ভিড়ের ভেতর পরিস্কার বাংলায় আমার পাশ থেকে কেউ বলে উঠলো--দিদি সালাম, কেমন আছো, চিনতে পারছো?
এতো বিদেশীর ভীরে নিজের বর্নের ভাষার কাউকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে গেলাম অস্ফুটে বললাম-- পূর্ণিমা !
আরও বেশী অবাক হলাম তার মুখে বাংলা শুনে।
----জানো দিদি আমি বাংলাদেশে গিয়েছিলাম।
----কে থাকে সেখানে?--
-----কেউ থাকেনা। খুব বিষন্ন হয়ে গেলো মুখটি তাঁর
ততক্ষন আমরা রাস্তায় উঠে এসেছি। দুজনেরই অফিসে যাওয়ার তাড়া।
এইবার ফোন নাম্বার নিতে আর ভুল হলো না। "কেউ থাকেনা" কথাটা বুকে খুব বিধে আছে। কেউ না থাকলে সে কেন গেল? কার কাছেই বা গেল? এসব ভাবনায় লান্চ ব্রেকে ফোন করি তাকে। খুব উচ্ছসিত হয়ে উঠে আমার ফোন পেয়ে। আমন্ত্রণ জানাই এই শনিবারে আমার বাসায়।
কঠিন বাস্তবতায় ক্লান্ত, জন্ম পরিচয়হীন এক দুখি মেয়ের মুখোমুখি বসে নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। ভারাক্রান্ত মনে শুনে যাই তার কথা---
জানো দিদি, শ্লীলতা- অশ্লীলতা, বৈধ- অবৈধ, কাঙ্ক্ষিত- অনাকাঙ্ক্ষিত এই শব্দগুলো এখনো আমার কাছে দুর্বোধ্য লাগে খুব!
ডিস্ট্রিক বোর্ডের পাকা রাস্তাটি টিলা ঘেঁসে চলে গেছে অনেক দূর পর্যন্ত। টিলার উপরেই পর্যটন করপরশনের এই বাংলোটি বেশ আধুনিক। বাংলোর সামনের অংশ সবুজ ঘাস আর মরশুমি ফুলে সজ্জিত। বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার এই বাংলোতে এসেছি আজা পাঁচ দিন।আমেরিকার বর্নিল একঘেয়েমি আর শিকড়হীন জীবনে হাঁপ ধরে গিয়েছিলাম। আমার মায়ের ফুলের সাথে আমার নাভির যোগাযোগ ছিন্ন করার সময়ই আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম আমার মা থেকে কিন্তু আমার শরীরে বইছে যে মা-বাবার রক্ত সেটা থেকে কি করে বিচ্ছিন্ন হই! তাই এসেছি আমি আমার শিকড়ের সন্ধানে এই দেশে। খুঁজে পাবো কিনা জানিনা। কেননা যে সমাজে আমি "জারজ সন্তান" নামে পরিচিত সেখানে আমার জন্মের এত বছর পর আমার প্রকৃত বাবা-মা কি আমাকে স্বীকৃতি দেবে? মেনে নেবে তাদের সন্তান হিসেবে! তাঁদের খুঁজবোই আমি কোন পরিচয়ে? নানান ভাবনায় মন অস্থির! আমার জন্মামদাত্রী মায়ের কাছে খুব জানতে ইচ্ছে করে--মা আমি জারজ সন্তান না হয়ে মানুষ হলাম না কেন ?
আজ ডিসেম্বরের পনের তারিখ আমার জন্মদিন। ১৮ তম জন্মদিনের পর থেকে "জন্মদিন" কথাটা কখনও আমার কাছে আনন্দ নিয়ে আসেনি বরং অজান্তেই ভয়ে শিউরে উঠি। মনের কোণে ভেসে উঠে প্লাস্টিকের প্যাকেটে প্যাঁচানো ক্রন্দনরত নবজাতক আর ভীত সন্ত্রস্ত সদ্য প্রসুতী যুবতী মায়ের আতংকিত চেহারা। "মা" কথাটি মনে পড়লেই আমার ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। আমার তখন খুব ইচ্ছে করে মায়ের বাহুডোরে নরোম ওমের ছোঁয়ায় বুকের গন্ধে, মিশে থাকতে।
আচ্ছা, সে সময় আমার মা কি কেঁদেছিলো? তাঁর চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু মুছে দেওয়ার মত কেউ ছিল কি পাশে ? নয় মাসের গর্ভ ধারণের কষ্ট মুহূর্তেও কি মনে আসেনি! আমার জন্মটা ছিল ঘৃণায়, না ভালবাসায়? নবজাতক কে নরম কোলে আদরে চুমু খেয়ে ঘুম পাড়ানোর বদলে তাকে নর্দমায় ফেলে দেওয়ার মত ঘৃণ্য একটি কাজের জন্য রাজী হয় যে মা---প্রহসন, পরিহাসকে চিরসঙ্গী করে সদ্য জন্মানো কচি প্রাণ থেকে মুক্তি পেতে চায় যে মা সেই মা কি কখনো ভুলতে পারে গর্ভ ধারনের কষ্ট, প্রসব কষ্ট ! গর্ভে ছোট প্রাণের নয় মাসের ছোঁয়া !
সদ্য প্রসুত মায়ের বুকে আর্তনাদ আর অনেক বেদনার জন্ম দিয়ে মাতৃত্বকে বদনাম করে নাম হয় ব্যভিচার। ঘৃণ্য অমানুষ রূপের এক প্রেমিক পুরুষ--আমার বাবা যে পূর্ণিমা নামের ভ্রূণের সৃষ্টি করে দায়িত্ব জ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়ে কেড়ে নেয় সমস্ত সামাজিক স্বীকৃতি । সন্তানটির নাম হয় "জারজ"। সে পিতা কি মানুষ নামের দলভুক্ত ! মানবের বিস্তারে জরায়ূর দায়িত্ত্বে নিয়োজিত নারী শরীরের ভাঁজে ভাঁজে না পাওয়ার রঙ কি কোনো পুরুষ কখনো দেখেছে?
দিদি ঠান্ডা লেগে যাবে গায়ে অন্তত ওলেনটা দাও---বিছানার চাদর টেনে দিতে যেয়ে খোলা বারান্দায় আরাম চেয়ারে বসে থাকা আমার দিকে চোখ যায় বাংলোর কেয়ার টেকার কলমির। ভাবনার অতলে ডুবে যাওয়া আমি তাঁর কথায় সম্ববিত ফিরে পাই। এতক্ষনে বুঝতে পারি বেশ ঠান্ডা পরছে গত কয়েকদিন যাবত। সাগরে লঘুচাপের প্রভাবে দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ঠিক গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি না। মিহি জলের ছিঁটার মতো সূক্ষ্ম বৃষ্টি। তবে নিউ ইয়র্কের হাড় হীম করা ঠান্ডার কাছে এ খুব সামান্য। রাত দশটার মতো বাজে। পশমি শালটি নিতে ঘরে যাই। বিক্ষিপ্ত ভাবনারা মন দখল করে আছে আজ। জীবনের প্রথম ভোরে আমার কান্নায় আনন্দ ধারা বয়ে যায়নি কোথাও বা কারো প্রাণে। ঘরের ভেতর ফিস ফাস চলছে কি করে আমাকে সমাজের রক্ত চক্ষু আড়াল করে নর্দমার ময়লাতে ফেলে দেওয়া হবে। আমার জন্ম রাতেও নাকি এমন বৃষ্টি ছিলো। আমাকে প্লাসটিকের প্যাকেটে মোরানো পাওয়া যায়। আচ্ছা শেষ মূহুর্তে কি আমার জন্য আমার মায়ের মমতা কিছুটা জেগেছিলো! শাল গায়ে ফিরে আসি আবার বারান্দায়।
জন্মের পর পর আমাকে ফেলে দেওয়া হয় ময়লা আবর্জনার স্তূপের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নোংরা নর্দমায়। করুণার প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে আর্তনাদ করে উঠেছিলাম সেই নর্দমায় । কোন এক হৃদয়বান পথচারির চোখ যায় আমার উপর। সেই ব্যাক্তি তুলে এনে আমাকে দিয়ে আসে রাজশাহীর একটি অনাথ আশ্রমে। "জনৈক পথচারী" রেজিস্ট্রি বুকে এই নামটিই আমি খুঁজে পেয়েছি। আমার জন্ম রাতে ছিল ভরা পূর্ণিমা। তাই আশ্রম থেকে আমার নাম রাখা হয় পূর্ণিমা ।
আমি পূর্ণিমা উইলসন । নাম শুনলে সবাই ভাবে আমার বাবা আমেরিকান। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সবাই একটু অবাক হয়ে যায় কারন আমার চেহারা পুরোপুরি বাঙ্গালী। আবার কখনো ভাবে আমেরিকান ছেলে বিয়ে করে তার নাম নিয়েছি। তবে নাম আর চেহারার এই তফাতের জন্য আমাকে বেশ কৌতূহলী দৃষ্টি আর অবাক করা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
জুলিয়ানা উইলসন ও পিটার উইলসন দুটি পুত্র সন্তানের জনক জননী। আমেরিকার ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা। একটি বেসরকারি সাহায্য সংস্থার কাজে তাঁদের বাংলাদেশে যেতে হয়। রাজশাহীর একটি অনাথ আশ্রমের নবজাতক বিভাগে আমাকে রাখা হয়েছিল। আমার বয়স তখন সাত দিন। নর্দমার পোকা-মাকড় আমার কচি নখের কোণা খেয়ে ফেলে। তাতে আমার আঙ্গুলে ও নাভীতে ইনফেশন হয়। আমি সেই সময় খুব কান্না করছিলাম। মিস জুলিয়ানার মনে দয়ার উদ্রেক হয় সাত দিন বয়সি ক্রন্দনরত আমার ছোট্ট মুখটির দিকে চেয়ে। সে কোলে নিতেই আমি শান্ত হয়ে যাই। তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় আমাকে দত্তক নেওয়ার। আমি হয়ে যাই পূর্ণিমা উইলসন। আমার ১৮ তম জন্মদিনে আমাকে জানানো হয় আমার প্রকৃত পরিচয়। তারা আমাকে নিজের সন্তানের মতই লালন করেন।
আমার দুই চোখ উপচে উঠছে। ঝাপসা দৃষ্টি দিয়ে পাশে বসে থাকা পূর্ণিমার মুখটিও আমি পরিষ্কার দেখতে পারছিনা।
বুকের ভেতর অনুভূতির চাপ এতোটাই প্রবল যে, আমি কেবল তাকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারলাম ---এখন থেকে আমাকে মা ডাকবি। তোর সব রকম আদর আবদার আহ্লাদে আমি আছি তোর পাশে। হুহু করে কাঁদছে আমার মেয়েটি। কাঁদুক। মন ভরে আজ কাঁদুক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
