somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সীমান্তে নিষ্ঠুরতা : নীরব থেকোনা বাংলাদেশ

০৭ ই নভেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৩:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সীমান্তে একটি শিশুকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বিএসএফ এর চাপা মারে আহত শিশুটি মারা গেছে নিজ ভুখন্ডে ফিরে। অনলাইন কাগজগুলোতে এসেছে খবরটি।
এই মর্মান্তি, এই নিষ্ঠুরতার জন্য কত বড় পৈশাচিক হৃদয়ের প্রয়োজন?
সীমান্তকে পুঁজি করে যাদের রুটি-রুজি, চলে জীবন-সংসার, তাদের অধিকাংশজনই হত দরিদ্র মানুষ। দিনমুজুর। টাকার বিনিময়ে অবৈধ পথে তারা বাংলাদেশে নিয়ে আসে চোরাচালানপণ্যের বস্তা। তারা জানে, যেকোন মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে চেনা মেঠো পথ, খাল-বিল, চেনা কাটাতারের বেড়া। দূর থেকে ছুটে আসা বিএসএফ এর গুলি নোম্যন্স ল্যান্ডে থামিয়ে দিতে পারে জীবন প্রদীপ। তবুও থেমে নেই সীমান্ত এলাকার খেটে খাওয়া নিরক্ষর মানুষগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ জীবন সংগ্রাম।
কেবল কি চোরাকারবারী বা গরু ব্যবসায়ী, সীমান্ত এলাকার সাধারণ কৃষক, রাখাল, গৃহবধূও কখনও কখনও বিএসএফ এর নিষ্ঠুরতার শিকার হন ভাগ্যদোষে। ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স মাঝের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে বাংলাদেশ ভূখন্ডে ঢুকে সাধারণ নাগরিকদের ধরে নিয়ে যায়। কখনও পতাকা বৈঠকের পর অর্ধমৃত মানুষ ফেরত আসে, কখনও বা মেলে শক্তকাঠ হয়ে যাওয়া নিথর দেহ।
৬ নভেম্বর'১৪ দেশের বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকায় চাপাইনবাবগঞ্জের জহুরপুর সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক লিটন নামে ১৪ বছরের এক কিশোরকে হত্যার খবর বের হয়। দ্যা রিপোর্টে বাংলাদেশী শিশুকে পিটিয়ে হত্যা করেছে বিএসএফ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, বিজিবি ও স্থানীয়রা জানায়, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লিটনসহ অন্য এক কিশোর জোহুরপুর সীমান্তের নোম্যান্স ল্যান্ড এলাকায় ঘাস কাটতে গিয়ে ভারতীয় অংশে ঢুকে পড়ে। এ সময় ভারতের ২০ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের পিরোজপুর ক্যাম্পের সদস্যরা তাদের ধাওয়া করে লিটনকে ধরে ফেলে। পরে তাকে পিটিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করে ছেড়ে দিলে সে বাংলাদেশে ফেরার পথে মারা যায়। খবর পেয়ে বিজিবি সীমান্ত এলাকা থেকে তার লাশ উদ্ধার করে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জস্থ বিজিবি’র ৯ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আবু জাফর শেখ মোহাম্মদ বজলুল হক ওই পত্রিকার প্রতিবেদককে জানান, ‘২০ বিএসএসফ ব্যাটালিয়নের কমান্ডেন্টকে মৌখিকভাবে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সেই সঙ্গে পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানিয়ে বিএসএফকে পত্র দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।’
দেশের বিভিন্ন সীমান্তে হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে বাংলাদেশী নাগরিকের ওপর বিএসএফ এর নির্মম নির্যাতন । কেবল নিষ্ঠুর নির্যাতন নয়, জীবন্ত মানুষ ধরে নিয়ে গিয়ে ফেরত দেয়া হচ্ছে থেতলে যাওয়া বিকৃত লাশ। প্রতিনিয়ত ঘটছে। সীমান্তলাগোয়া গ্রামগুলোতে বসবাসরত মানুষের জীবনে এ যেন নিত্যদিনের চাপাকান্না।
শিশু লিটনকে পিটিয়ে হত্যার দু'দিন আগে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের জামালপুর সীমান্ত থেকে ইমন নামে ১২ বছরের এক শিশুকে ধরে নিয়ে যায় বিএসএফ। দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের সীমান্ত সংলগ্ন জামালপুর গ্রামের বজলুর রহমানের ছেলে ইমন ১৫৩/৪(এস) সীমান্ত পিলার সংলগ্ন এলাকায় ঘাস কাট ছিল। ওই সময় ভারতের নদীয়া জেলার হোগলবাড়িয়া থানার নাসিরাপাড়া বিএসএফ ক্যাম্পের টহল দল তাকে আটক করে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। এ নিয়ে বিজিবি এবং বিএসএফ এর মধ্যে পতাকা বৈঠক শেষে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। এ্কই দিন নওগাঁর পোরশা উপজেলার নীতপুর সীমান্ত এলাকা থেকে ওমর আলী নামে এক বাংলাদেশিকে ধরে নিয়ে যায় বিএসএফ। তিনি নীতপুর দিয়াড়াপাড়া গ্রামের নিজামউদ্দীনের ছেলে। ৪ নভেম্বর বিকেল ৩ টায় এ ঘটনা ঘটে।
পত্রিকার খবরে আরও বলা হয়, দুপুরের পর নীতপুর সীমান্ত সংলগ্ন একটি বিলে মাছ ধরতে যায় ওমর আলী। এরপর ওই অবস্থায় সেখান থেকে বিএসএফ তাকে ধরে নিয়ে যায়। একই দিন চুয়াডাঙ্গার দামূরহুদা উপজেলার বারদি সীমান্তে এক গরু ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে প্রায় মৃত অবস্থায় তাকে নদীতে ভাসিয়ে দেয়। আতিয়ার রহমান নামে ওই গরু ব্যবসায়ীকে পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে। এ ঘটনার পরের দিন পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলার শিংরোড রতনিবাড়ি সীমান্ত এলাকার যমুনা নদী থেকে অপহৃত এক বাংলাদেশী জেলের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনার দিন কয়েক আগে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা সীমান্ত এলাকা থেকে বিপ্লব (২৮) নামে এক বাংলাদেশী পাথর শ্রমিককে ধরে নিয়ে যায় বিএসএফ।
চলতি নভেম্বর মাসের ১ তারিখে সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত এলাকায় আব্দুল খালেক নামে এক বাংলাদেশী যুবককে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নিজেদের সীমানায় নিয়ে যায় কয়েকজন ভারতীয় অস্ত্রধারী। খাসিয়ারা নামে ভারতের একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ ওই যুবককে গুলিবিদ্ধ করে আহত অবস্থায় ধরে নিয়ে যায়। ঘটনাটির সাথে বিএসএফ এর সংশ্লিষ্ট রয়েছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। কানাইঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল আউয়াল চৌধুরী কানইঘাট নিউজকে জানান, বিএসএফ’র সদস্যরা আব্দুল খালিক নামে এক যুবককে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নিয়ে গেছে বলে তিনি শুনেছেন।
অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে বাংলাদেশী নাগরিকদের গুলি করে বা পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনা নতুন কিছু নয়। দেশ স্বাধীনের পর থেকেই আমরা আমাদের একমাত্র প্রতিবেশী বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ভারতের কাছ থেকে এই নিষ্ঠুরতা পেয়ে আসছি। কিন্তু ইদানিং যেন তাদের নির্মমতা বাড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ সীমান্তে ঢুকে বা দুই দেশের মধ্যবর্তী এলাকা বা স্থানে কোন বাংলাদেশী নাগরিক দেখা মাত্রই পাকড়াও করে নিয়ে যাচ্ছে নিজেদের সীমানায়। পরে মিলছে লাশ।
সেই ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি সীমান্তে কাটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকা ১৫ বছরের কিশোরী ফেলানির লাশের সাথে ঝুলে গেছে আরও কতশত লাশ,আমরা কতটুকুই বা হিসেব রেখেছি। ফেলানির মৃত্যুযন্ত্রণাও খুব বেশি দিন আমাদের স্বার্থপর মনকে ভারাক্রান্ত রাখতে পারেনি। রাষ্ট্রিয় ক্ষমতায় থাকা কর্তাব্যক্তিদের মুখ থেকে আশ্বাসের বাণী শুনে ভেবেছি এই বোধ হয় বন্ধ হলো সীমান্তে নিষ্ঠুরতা।
অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে বাংলাদেশের নাগরিক অবৈধ অনুপ্রবেশ করেনা। প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অসংখ্য মানুষ অবৈধ ভাবে এপার-ওপার করছে। ভারতে ঢুকতে গিয়ে যেমন গুলিবিদ্ধ হচ্ছে, তেমনই হচ্ছে ফেরার পথেও। কিন্তু প্রশ্ন হলো ফেনসিডিলের বস্তা বহনকালে কেউ বিএসএফ এর হাতে ধরা পড়েনা কেনো!
আমি সীমান্তবর্তী জেলা শহরের মানুষ। কখনও শুনিনি বা দেখিনি মাদক ব্যবসায়ী বাংলাদেশী নাগরিককে পিটিয়ে হত্যা করেছে বিএসএফ। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি এটি সংবাদকর্মীদের কোন ভুল নয়। তারা সবকিছুতে গরু ব্যবসায়ী, কৃষক বা জেলে বলে চালিয়ে দেন, এমন নয়। বিএসএফ সবসময়ই চেয়ে এসছে বাংলাদেশে নির্বিঘ্নে প্রবেশ করুক মাদক।
বাস্তবতা হলো সীমান্ত নিরাপত্তার কথা বলে ভারতের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিএসএফ) যা করছে তা এক কথায় নজিরবিহীন মানবাধিকার লঙ্ঘন। কিন্তু রাষ্ট্র নীরবতার খোলসে আড়াল করেছে মুখ।
সীমান্তের বর্বরোচিত সকল ঘটনা বিবেচানায় নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি বিশ্বের দরবারে রাষ্ট্রিয় ভাবে ভারতের বিএসএফ এর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন জরুরি। সীমান্তে বসবাসরত মানুষকে শঙ্কামুক্ত নিরাপদ জীবন যাপনে সর্বাত্মক সহযোগিতার কূটনৈতিক চেষ্টাকে দৃঢ় করতে সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টার বিকল্প কিছু নেই।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০১৪ দুপুর ২:১২
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনেকটা পথ হেঁটে এসেছি

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:০৫




১৯৯৭ সাল।

আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি।

স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে মামুন ভাইয়ের একটা অডিও ক্যাসেটের দোকান ছিল। পাশেই মির্জা ভাইয়ের কনফেকশনারি। টিফিনের সময় ওখানে প্যাটিস খেতাম।

সেই সময় অডিও ক্যাসেটের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশটাতো এখন রাজাকারদের....

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৮




একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বাদী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী (৮৭)। মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রস্তুতি চলার সময় জামাতের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসা শিক্ষা একটা কর্মবিমুখ শিক্ষা

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:১৫

এদেশের মাদ্রাসা শিক্ষারে আপনি একটা স্ক্যাম হিসেবে ধরতে পারেন। মাদ্রাসার বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে যে মাদ্রাসাগুলো আছে সেগুলো বাদ দিয়ে অন্য সব মাদ্রাসাই এই স্ক্যামের ভেতরে। এটা একটা ভিক্ষার সাইকেল, দারিদ্র্য'র দুষ্টু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝর্ণা জল

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:২১


আমি ব্যস্তবতা দেখি
পানকৌড়ির সাঁতার-
কল্পনায় শুধু স্বপ্ন আঁকি,
মধ্যবিকাল ঢেউ তোলা সাগর
হতাশা ডিঙিয়ে যায়- নিরিবিলি
রাত দুপুরের বাসর।

উড়ে ধোয়া, নিঃশ্বাসে সাদা বক,
খেলা করে যে, প্রণয়ের চক-
নীল মেঘ ভীর জমায়, বর্ষা কাঁদাময়,
ভোরের ক্লান্তি দেখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিম করা কি হারাম?

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৬




জিম করা কি হারাম?

হ্যাঁ, জিম করা হারাম!

যদি জিমে গিয়ে নিজের পেশিবহুল বাহুডোরে কোনো ললনাকে জড়িয়ে ধরেন!

কিন্তু তারপরেও কথা থাকে।

এখানে জড়িয়ে ধরাটা হারাম। জিম করাটা নয়!

অর্থাৎ, জিমে গিয়ে শরীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×