somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পের দোকান । হারানো বই । সমকালীন গল্প

১৪ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গতকয়েক দিন যাবৎ পুরোনো শহরের লাইব্রেরিতে লোকজনের আনাগোনা কম। কারণ, মুষলধারে বৃষ্টি।

আজও বৃষ্টি পড়ছে। লাইব্রেরিয়ান মিজান চুপচাপ নিজের কাজ করছিলেন।

দুপুরের দিকে একজন সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ লাইব্রেরির দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। যেন অনেকক্ষণ ধরেই তিনি সেই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে থাকার সাহস জড়ো করছিলেন।




ধীরে ধীরে হাতের ছাতাটা বন্ধ করলেন। হাত দিয়ে চুলগুলো একটু নেড়ে নিলেন। বৃষ্টির ছাটে মাথায় লেগে থাকা পানির ফোঁটাগুলো ঝেড়ে ফেললেন।

লাইব্রেরির দরজার পাশে রাখা ঝুড়িতে ভেজা ছাতাটা রেখে দিলেন। পলিথিনে মোড়া বাদামি কাগজে জড়ানো বইটা বুকের কাছে একটু চেপে ধরলেন, যেন ভিজে না যায়।

তারপর পাপোশে ধীরে ধীরে স্যান্ডেলের তলাটা মুছে নিলেন, খুব যত্ন করে—যেন এই জায়গাটা তার কাছে অচেনা না, বরং অনেক দিনের চেনা কোনো স্মৃতি।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।

তারপর গুটি গুটি পায়ে ভেতরে ঢুকে ডেস্কের সামনে এসে খুব আস্তে করে বললেন—
—বাবা, একটা বই ফেরত দিতে এসেছি।

লাইব্রেরিয়ান মিজান বইটা হাতে নিয়ে একটু চমকে গেলেন।
ধুলোমাখা মলাটে লাইব্রেরির পুরোনো সিল। ভেতরে ইস্যু কার্ডে চোখ রাখতেই তাঁর ভ্রু কুঁচকে গেল।
ইস্যুর তারিখ: ১২ আগস্ট, ১৯৮৬।

তিনি ধীরে ধীরে তাকালেন বৃদ্ধের দিকে। হালকা হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটে।
—চল্লিশ বছর পরে বই ফেরত দিতে এলেন?

বৃদ্ধও খুব সামান্য হাসলেন, যেন কথাটা বলার জন্যই এত বছর অপেক্ষা করেছিলেন।
—দেরি হয়ে গেল।
—এত দিন কোথায় ছিল বইটা?

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। এই চুপ করে থাকা যেন শুধু উত্তর লুকানোর জন্য না, বরং অনেক পুরোনো কিছু গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।
তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
—বইটা আমি নিজের জন্য নিইনি। একজনকে দেওয়ার জন্য নিয়েছিলাম।
—দিতে পারেননি?
—পারিনি।

লাইব্রেরিয়ান মিজান আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।

বৃদ্ধ নিজেই বলতে শুরু করলেন।
—মেয়েটা বই পড়তে খুব ভালোবাসত। তখন বই কেনার সামর্থ্য ছিল না। তাই ওর জন্মদিনে বইটা উপহার দেওয়ার জন্য নিয়েছিলাম । সেদিনই হঠাৎ খবর পেলাম, ওদের পরিবার শহর ছেড়ে চলে গেছে। তারপর আর কোনোদিন দেখা হয়নি। আর বইটাও আর ফেরত দেওয়া হয়নি।

এইটুকু বলে বৃদ্ধ একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

তারপর বইয়ের মলাটে আলতো করে হাত বুলিয়ে বললেন,
—ভাবতাম, কোনো একদিন দেখা হবে। তখন বইটাও দিয়ে দেব। তাই এত বছর রেখে দিয়েছিলাম।

লাইব্রেরিয়ান মিজান চুপচাপ শুনছিলেন।
—দেখা হয়েছিল?
বৃদ্ধ ওপর-নিচ করে মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ, গত সপ্তাহে।
—তাহলে বইটা দিলেন না কেন?

বৃদ্ধ পকেট থেকে ভাঁজ করা একটি মৃত্যুসংবাদ বের করলেন।
সেখানে একটি পরিচিত নাম।
মেয়েটির।
কয়েক দিন আগে তিনি মারা গেছেন।

লাইব্রেরিয়ান মিজান নামটি দেখে অবাক হয়ে বললেন,
—উনাকে তো সবাই চেনে। অনেক সম্মানিত একজন মানুষ। আপনি নিশ্চয়ই জানতেন?
—হ্যাঁ, জানতাম।
—তাহলে বইটা দেননি কেন?
—সাহস হয়নি।
—কেন?

কেন—এর উত্তর বৃদ্ধ দিলেন না। একটু মৃদু হেসে বললেন,
—এখন আর বইটা রেখে কী হবে? যার জন্য নিয়েছিলাম, সে তো আর পড়বে না। ভেবেছিলাম, কোনো না কোনো দিন বইটা দিতে পারব।

লাইব্রেরিয়ান মিজান কিছুক্ষণ চুপ করে বইটা উল্টে দেখলেন।
প্রথম পাতায় নীল কালিতে লেখা—
"আমি তোমার সাথে সব বলেছি… শুধু ‘ভালোবাসি’ ছাড়া।
কারণ এটা পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী শব্দ—আমি তা বহন করতে পারিনি।"

নিচে কোনো নাম নেই।
শুধু একটি তারিখ।
১২ আগস্ট, ১৯৮৬।

কথাটা পড়ার পর লাইব্রেরিয়ান মিজানের চোখে অজান্তেই একটা ভারী নীরবতা নেমে এলো।
তিনি ধীরে ধীরে বইটা বন্ধ করলেন।
তারপর বইটা ফেরত নেওয়ার রেজিস্টার এগিয়ে দিলেন।
বৃদ্ধ কলম হাতে নিলেন, কিন্তু নিজের নাম লেখার আগে থেমে গেলেন।
কলমটা কাঁপছিল।

ধীরে ধীরে বললেন,
—বইটা এত দিন হারিয়ে ছিল না বাবা...
একটু থেমে জানালার বাইরে তাকালেন।
বৃষ্টি তখনও পড়ছে।
—হারিয়ে ছিলাম আমি।

এইটুকু বলে তিনি আর কিছু বললেন না।
লাইব্রেরিয়ান মিজান বইটি নিলেন। খুব যত্ন করে তাকের সবচেয়ে উপরের শেলফে রেখে দিলেন।
যেন বইটা শুধু একটা বই না—এক অদেখা মানুষের না বলা কথার ঠিকানা।

বৃষ্টি বাইরে আরও জোরে নামছিল।
লাইব্রেরির ভেতরে শুধু একটা নীরবতা রয়ে গেল—যেখানে কোনো শব্দ ছিল না, শুধু অপেক্ষার ভার।

হয়তো কোনো দিন কেউ বইটা খুলবে।
কিন্তু কেউই জানবে না—একটি বইয়ের ভেতরে আসলে লুকিয়ে ছিল চল্লিশ বছরের না-বলা একটা ভালোবাসা, আর একটা মানুষ, যে সময়মতো কিছু বলতে পারেনি।

সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৭
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রিলিফ ওয়ার্ক - আবুল মনসুর আহমেদ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:০৮




রিলিফ ওয়ার্ক
- আবুল মনসুর আহমেদ


বন্যা ।
সারা দেশ ভাসিয়া গিয়াছে। গ্রামকে গ্রাম ধুধু করিতেছে। বিস্তীর্ণ জলরাশির কোথাও কোথাও ঘরের চাল ও বাশের ঝাড়ের ডগা জাগাইয়া লোকালয়ের অস্তিত্ব ঘোষণা করিতেছে। এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্ধের হাতি দেখা ও আধুনিক ব্লগারির এক করুণ রম্যকাব্য

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:২১


মানুষের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে একটি প্রাচীন উপকথা যুগে যুগে নতুন অর্থে ফিরে এসেছে অন্ধের হাতি দেখা। কয়েকজন অন্ধ মানুষ হাতির ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ স্পর্শ করে প্রত্যেকে নিজেকে সত্যের একমাত্র অধিকারী... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাঁদগাজীর বয়ানে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৩৭



গাজী সাহেব বলেছেন, এই ছবির একদম পেছনে যাকে দেখছেন, তিনি ৭১-এর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। একই পরিবারের আত্নীয়সহ আরও পাঁচজন ৭১-এর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। পরিবারের যিনি কোনোভাবে বেঁচে আছেন, তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসুন দেখে আসি, রাজাকার, লালবদর,ছাত্রদল ও শিবিরের উত্তরাধিকারীরা পাকিস্তানে কেমন আছে‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৮:০১



কেমন আছে পাকিস্তানে বসবাসরত ৪০ লক্ষ বাঙালী?

১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে দাড়িয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিচার করার হুঙ্কার দিলেন। পাকিস্তানে বসে তখন খুনি জুলফিকার আলী... ...বাকিটুকু পড়ুন

কি করে কি করি, কি যে করি !

লিখেছেন মেহবুবা, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:০৫




আজ বেশ ক'দিন হোল আমার ব্লগবাড়িতে জ্বীন ভূতের কারসাজি চলছে! আধা পৃষ্ঠা জুড়ে কয়েকটি পোষ্ট আসছে, সব আসছে না।নিজ ব্লগবাড়িতে কত কি আয়োজন থাকে ; যেমন মন্তব্য,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×