somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পের দোকান । তোমার জন্য লেখা (পর্ব ২) | সমকালীন ছোট গল্প |

১০ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



কখনো মেসেজ আসে—
"আজ কি ঠিকমতো খেয়েছো?"
কখনো—
"মায়ের সঙ্গে বেশি সময় কাটিও। পরে যেন আফসোস করার সুযোগ না থাকে।"
কখনো—
"জীবন থামিয়ে রেখো না। আমি চাই তুমি আবার হাসো।"

আরিফ প্রতিদিন উত্তর দিত।
যদিও সে জানতো—
এই উত্তরগুলোর কোনো উত্তর আর কখনো আসবে না।
তবুও লিখতো।
"আজ তোমাকে খুব মনে পড়ছে।"
"আজ তোমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে।"
"আজ খুব একা লাগছে।"

তারপর অনেকক্ষণ মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতো।
হয়তো কোথাও একটা ছোট্ট আশাও ছিল—
নীলা আবার কিছু লিখবে।
কিন্তু ওপাশ থেকে আর কোনো উত্তর আসতো না।
শুধু রাত ১১টার অপেক্ষাটা থেকে যেত

*************
একদিন আরিফ আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। এতদিন ধরে যে প্রশ্নটা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল, তার উত্তর তাকে জানতেই হবে।

সে নীলার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী মিথিলাকে ফোন করলো।
ফোন ধরার পর কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইলো।
তারপর আরিফ ধীরে ধীরে বললো,
"মিথিলা, একটা কথা বলবে? নীলার ফোনটা কি তোমার কাছে আছে?"

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
মনে হলো, মিথিলা হয়তো কিছু একটা বুঝে গেছে।
তারপর খুব ধীরে সে বললো,
"তুমি কি মেসেজগুলো পাচ্ছো?"
আরিফের বুকটা কেঁপে উঠলো।
"তুমি জানো?"

মিথিলার কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।
"হ্যাঁ।"
"কীভাবে?"

কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে মিথিলা বললো,
"কারণ নীলা নিজেই আমাকে বলেছিল।"
মিথিলা জানালো, মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে নীলা একদিন তার ফোন নিয়ে বসেছিল। অনেকক্ষণ ধরে কিছু একটা লিখছিল। মিথিলা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,
"তুই কী করছিস?"

নীলা মৃদু হেসে বলেছিল,
"আরিফের জন্য কিছু রেখে যাচ্ছি।"

প্রতিদিন রাত ১১টার জন্য একটা করে মেসেজ লিখেছিল নীলা।
এক বছরের জন্য।
৩৬৫টা মেসেজ।

মিথিলা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,
"তুই এগুলো কেন করছিস?"

নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর খুব শান্তভাবে বলেছিল,
"আমি জানি, আমি চলে গেলে আরিফ অনেক ভেঙে পড়বে। কিন্তু আমি চাই না, আমার চলে যাওয়ার পর সে শুধু কাঁদুক। আমি চাই,

প্রতিদিন রাত ১১টায় তার মনে হোক—কেউ একজন এখনো তার যত্ন নিচ্ছে।"
কথাটা বলতে বলতে নীলার চোখেও পানি চলে এসেছিল।
তারপর একটু থেমে বলেছিল,
"আর একটা কথা..."
"শেষ মেসেজটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।"
"ওটা যেন এক বছর পরে যায়।"

**************
কথাগুলো বলতে বলতে মিথিলার গলা ভারী হয়ে এলো। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। ফোনের ওপাশ থেকে শুধু কান্নার শব্দ আসতে লাগলো।

আরিফ কিছু বললো না।
কিছু বলার মতো ভাষা তার কাছে ছিল না।
ধীরে ধীরে ফোনটা কেটে দিলো।

************
সেদিন রাতে প্রথমবার আরিফ কাঁদলো।
ভয়ে নয়।
হারানোর কষ্টে নয়।
ভালোবাসায়।

সে বুঝতে পারলো—
নীলা চলে যাওয়ার আগেও নিজের কথা ভাবেনি।
শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শুধু তার কথাই ভেবেছে।

নিজে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার পরও, কীভাবে আরিফকে একটু ভালো রাখা যায়—সেই চিন্তাই করে গেছে।
আরিফ বুঝলো,
কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও ভালোবাসতে থাকে।
শুধু তাদের ভালোবাসার ধরনটা বদলে যায়।

**********
এক বছর কেটে গেল।
এই এক বছরে আরিফ অনেক বদলে গেছে।
নীলার শেষ ইচ্ছার কথা মনে রেখে সে আবার হাসতে শিখেছে। মায়ের সঙ্গে বেশি সময় কাটিয়েছে।
নিজের যত্ন নিতে শিখেছে। ধীরে ধীরে নিজের জীবনটাকে আবার গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।

কিন্তু একটা অভ্যাস কখনো বদলায়নি।
প্রতিদিন রাত ১১টার অপেক্ষা।

এই একটা সময় এখনো তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় সময়।
কারণ সে জানে—
আজ শেষ মেসেজ আসবে।
আজ নীলার সঙ্গে তার শেষ কথা হবে।

*********
ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে।
১০টা ৫৯ মিনিট।

আরিফ মোবাইল হাতে বসে আছে।
ঘরের চারপাশে নীরবতা।
বাইরে হালকা বাতাস বইছে।
এক বছর আগের সেই রাতটার কথা মনে পড়ছে।

যেদিন প্রথমবার মৃত মানুষের নম্বর থেকে মেসেজ এসেছিল।
সেদিন ভয় পেয়েছিল সে।
আজ ভয় নেই।
আজ শুধু একটা অদ্ভুত শূন্যতা।
১১টা বাজলো।
ঠিক তখনই—
ঠুং।

চলবে ...
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:২২
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ছোট গল্পঃ শেষ জীবনে

লিখেছেন সামিয়া, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৯



ঘুমিয়ে থাকা একজন মানুষ কখনো কখনো জেগে থাকা একজন মানুষের চেয়ে অনেক বেশি ভালো থাকতে পারে? কথাটা শুনতে অদ্ভুত। কিন্তু বয়স হলে মানুষ অনেক অদ্ভুত কথাই বিশ্বাস করে চিন্তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাবধান, এই ফলগুলো খাওয়ার আগে সচেতন হোন।

লিখেছেন জীয়ন আমাঞ্জা, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২২

আজ কথা বলব একটা ভিন্নধর্মী সচেতনার বিষয় নিয়ে।
আপনারা অনেকেই জানেন, আপেলের বীজ বিষাক্ত, বেশি পরিমাণে খেলে মানুষ মারা যায়। কখনও ভেবেছেন, কেন মারা যায়? ঘটনাটা আসলে কী?

এর মূলে আছে Amygdalin... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাষ্ট্রপতি পদে আনভীর সোবহানকে দেখতে চাই।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪২


সায়েম সোবহান আনভীর। এক বিশাল বিজনেস টাইকুন, বসুন্ধরা গ্রুপের যোগ্য কান্ডারী। আহা, কী তার ব্যক্তিত্ব! দেখতে যেমন সুন্দর, চরিত্রও যেন মাশাআল্লাহ্ ফুলের মতো পবিত্র। আর বসুন্ধরা গ্রুপের কথা তো... ...বাকিটুকু পড়ুন

=পাপের ওজন কমিয়ে ভারী করো নেকির পাল্লা, ও রব=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:৫০


বহু পাপে জীবন হয়ে গেল আধেক পার,
জেনেও না জানার ভান ছিল,
মোহ আঁকড়ে ধরে রেখেছি, ধরার সুখে যে আচ্ছন্ন!
পাপ জেনেও পাপ সমুদ্দুরে কেটেছি হরদম সাঁতার!

চোখের পাপ, হাতের পাপ, আহা ঠোঁটেরও যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই/ঝুলাই

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:১৯



আমরাই মারবো,লাশ করবো গুম,
আমরাই জানাবো শোক!

আমরাই বলবো , গলা ফাটা চিৎকারে-
ওরা ছিলো আমাদেরই লোক॥

আমরাই বাঁধাবো দু’তরফা দাঙ্গা,
... ...বাকিটুকু পড়ুন

×