প্রথম পর্ব
শিক্ষক জীবনের প্রথম দিনটি ভালোই কেটে গেল সজীবের। ক্লাসে ঢোকার আগে একটু দূর্বলতা অনুভব করছিল। মুখে কথা জড়িয়ে আসছিল।তবে ক্লাসের বিষয়টা ওর অন্যতম একটা প্রিয় বিষয় হওয়াতে দ্রুত সেই জড়তাটা কাটিয়ে নিয়েছিল। ছাত্র ছাত্রীদের পরিচয় নিল। নিজের পরিচয় দিলো। তারপর কোর্স সম্পর্কে কিছু আলোচনা করেই প্রথম দিনের ক্লাস শেষ করে দিলো সজীব। ডিপার্টমেন্টে তেমন কোন কাজ ও ছিলোনা তাই ও তুহিন স্যারকে বলে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসলো। বাসায় অনেক কাজ। কিছু কেনাকাটা করতে হবে। স্বর্ণা কে ফোন করা দরকার। গত ২দিন ধরে ওর সাথে মন কষাকষি চলছে।
৪ বছরের সম্পর্ক সজীব স্বর্ণার। সেই ভার্সিটি লাইফের সেকেন্ড ইয়ার থেকে। স্বর্ণা চুয়েটে পড়ে। আর ১টা টার্ম বাকি আছে কমপ্লিট হতে। স্বর্না চাচ্ছিলোনা সজীব সিলেটে যাক। ও চায় সজীব একটা ভালো কর্পোরেট হাউজে জব করুক। ঢাকায় নিজেদের ফ্ল্যাট থাকবে, গাড়ী থাকবে। স্বর্নার বাবা মা ঢাকায় থাকে, ভাই ঢাকায় চাকরি করে। সজীব আবার ঢাকায় থাকতে চায়না। বলে, ঢাকা কি থাকার মত কোন শহর? বিশ্বের সবথেকে বড় বস্তি হলো ঢাকা। ওর কথা হোল আমি নিরিবিলি থাকতে চাই। বেশি ঝঞ্ঝাটের দরকার নাই। খুলনা শহরে সজীবদের নিজেদের বাড়ী। ওখানেই বেশ আরামেই কেটে যাবে। কর্পোরেট চাকরি ও সজীবের ভাল লাগেনা। কোন ফার্মে ইন্টারভিউ পর্যন্ত দেয়নি। সেই থেকেই মন কষাকষির শুরু। প্রায় প্রতিদিনই এইসব নিয়ে খিটিমিটি লেগে থাকতো। সজীব চায় নিজের একটা নির্ঝঞ্ঝাট জীবন। খুব বেশি আয়ের দরকার নেই। তবে পরিবারের জন্য যেন পর্যাপ্ত সময় থাকে।
৩/৪ বার চেষ্টা করে শেষে বিরক্ত হয়ে ফোন রেখে দিল সজীব। স্বর্না ফোন রিসিভ করছেনা। মানুষের জেদের একটা সীমা থাকে। প্রথম প্রথম সজীব এগুলো কম্প্রোমাইজ করেছে। এখন নিজেকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে অনেক কষ্ট হয়। গত কয়েকদিনের হ্যাপা সামলিয়ে এমনিতেই মেজাজটা খিচড়ে আছে। একটা শাওয়ার নিলে একটু ফ্রেশ লাগতে পারে ভেবে বাথরুমের দিকে চলে গেল। শাওয়ার থেকে এসে দেখে ৪/৫ টা মিসড কল, স্বর্নার। ফোনব্যাক করার সাথে সাথেই রিসিভ করলো স্বর্না।
- কোথায় ছিলে এতক্ষন?
- শাওয়ার নিলাম, খুব ক্লান্ত লাগছিলো।
- তা কেমন লাগছে চাকরি?
- ভালোই, তুমি তো জানোই আমি টিচিংটা এনজয় করি।
- হুম, জানি। চট্টগ্রাম কবে আসবে?
- চট্টগ্রাম কেন? আমি তো তেমন কোন প্লান করিনি।
- তা আসবে কেন? এখানে তোমার কেউ থাকে নাকি? এখন তো আবার লেকচারার হইছো, কত সুন্দর সুন্দর মেয়েরা সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াবে আর তুমি সেটা তারিয়ে তারিয়ে দেখবে।
- দেখো, হিসাব করে কথা বল। আমি কেমন তুমি সেটা ভাল করেই জান।
- হুম জানি তো, ছাত্রজীবনে তো মেয়ে ছাড়া আর কাউকে পড়াওনি।
- স্বর্না, খামাখা ঝগড়া করার কোন দরকার কি আছে? আমি এখানে মাত্রই আসলাম। এদিকে একটু গুছিয়ে নেই। চাকরিতে জয়েন করেই তো আর ছুটি নেয়া যায় না। আমি আশা করি তুমি সেটা বোঝ।
- হ্যা, দুনিয়ার সব বুঝ তো আমারই। আর কারো কোন কিছু বোঝার দরকার নেই।
- স্বর্না, এভাবে না দেখলেও পারো ব্যাপারটা। দেখি আমি ইনশাল্লাহ আগামী মাসে আসবো।
- দেখি তোমার কথা ঠিক থাকে কিনা?
এই বলে ফোন রেখে দেয় স্বর্না। সজীব ভাবতে থাকে ৪ বছর এই মেয়েটার সাথে সম্পর্ক। এখনো দুজন দুজনকে বুঝতে পারলোনা। স্বর্নাকে দোষ দেয়া যায়না। সম্পর্কের শুরু থেকেই দুজন দেশের ২ প্রান্তে। দেখা সাক্ষাৎ হতো খুব ই কম। সজিব যদি চট্টগ্রাম যেত তাহলে হোত, স্বর্না কালেভদ্রে খুলনা তে ওর ফুফুর বাসায় আসলে দেখা হতো। ওর ফুফুরা আবার খুব রক্ষনশীল, বাইরে বের হওয়াটাও একটা সমস্যা ছিল। সবসময় এই দূরত্বের কারনেই হয়তোবা স্বর্না একটু বেশীই সন্দেহবাতিকগ্রস্ত। সজীব সবসময় তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে বিশ্বাস হলো ভালবাসার ভিত্তি। এখন মনে হচ্ছে তার এই বোঝানোর চেষ্টাটাই বৃথা গেছে। কম্প্রোমাইজ তো কম করলোনা। কতগুলো টিউশনি ছেড়ে দিয়েছে শুধু স্বর্নার কথায়। কারন একটাই মেয়েদের কে পড়াতে পারবেনা। নিজেকে খুব হতাশ মনে হচ্ছে সজীবের।
অনেক উৎসাহ নিয়ে সিলেটে এসেছিল সে। তার বেশী আগ্রহ ছিল শিক্ষকতা করার। সেটাই পেশা হিসেবে পেল। পাশ করার ৭ দিনের ভিতরেই। আল্লাহ তার ভাগ্য এই পর্যন্ত ভালোই লিখেছিলেন। কিন্তু চাদেও কলংক থাকে। সজীবের সৌভাগ্যের অন্তরায় কি তাহলে স্বর্না-ই? সজীব অবশ্য তা মনে করেনা। স্বর্না তাকে উৎসাহ তো কম দেয়নি পড়ালেখায়। স্বর্না সবসময় একটু ইম ম্যাচিউরড এর মত কথা বলে। এটাও একটা সমস্যা।
বাবা মার কথা ভাবলো সজীব। মা স্বর্নাকে একদম ই পছন্দ করেন না। সজীব বাড়ির বড় ছেলে হওয়াতে তার ইচ্ছা তাকে অত্যন্ত দায়িত্বশীল একটা মেয়ে দেখে বিয়ে দেবেন। এখন ছেলের পছন্দ, তাই কিছু বলতেও পারছেন না মা। সম্পর্কের শুরুতে সজীবের মনে হয়েছিল সে পারবে স্বর্না কে তার মায়ের পছন্দমত করে গড়ে তুলতে। এখন মনে হচ্ছে সে ব্যর্থ হয়ে গেছে। না পেরেছে স্বর্নার মনের মত হতে, না পারলো স্বর্নাকে নিজের মনের মত করে গড়ে তুলতে। দোটানায় পড়ে গেল সজীব। তবে সে নিজে থেকে স্বর্নাকে ছেড়ে যাবেনা। নিজের কাছে নিজে ছোট হতে চায়না সজীব। (চলবে)
আমার অন্যান্য ব্লগেও প্রকাশিত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



