তোমাকে পাওয়া - ২
ইউনিভার্সিটি কতৃপক্ষ অনেক স্ট্রিক্ট হওয়াতে সজীবের পক্ষে পরবর্তী ৩ মাসে ছুটি নেয়া সম্ভব হলোনা। স্বর্নাকে মানিয়ে রাখতে অনেক কষ্ট হয়েছে। তাও যদি ঠিকভাবে সজীবের কথাগুলো বুঝতো। একদিন কথা হয় তো ৪দিন কথা বন্ধ থাকে। শেষে মরিয়া হয়ে সজীব তুহিন স্যারকে বলে ছুটি ম্যানেজ করলো।
- স্যার, আসতে পারি?
- আরে সজীব, এসো এসো।
- কী খবর? টিচিং কেমন লাগছে?
- ভালো, স্যার।
- কোন সমস্যা হচ্ছে না তো?
- না স্যার, কোন সমস্যা হচ্ছে না।
- গুড, সমস্যা হলে আমাকে বলবে। সিলেট কেমন লাগছে?
- স্যার, এই গরমে সিলেট খারাপ লাগে কিভাবে? প্রতিদিন ই বৃষ্টি হয়। রাতে বৃষ্টির শব্দটা খুব ভাল লাগে। অবশ্য একদিন বৃষ্টি না হলে অবস্থা খারাপ হয়ে যায় গরমে।
- হুম, সেটা ঠিক। শুধুমাত্র এই বৃষ্টির কারনে আমি সিলেটে আছি জানো? আমাদের স্থায়ী বাড়ি তো চট্টগ্রাম। বাবা মা চায় আমি ওখানেই থাকি। কিন্তু আমি সিলেটের মায়া ছাড়তে পারিনা। তা তুমি কি আর কিছু বলতে চাও?
- জি স্যার। আমার ৩ দিনের ছুটি দরকার।
- বাড়ি যাবে? জরুরী কিছু?
- না স্যার, আমি একটু চট্টগ্রাম যাবো।
- তাই? হঠাৎ চট্টগ্রাম কেন? কোন রিলেটিভ আছে নাকি?
- (লাজুক হেসে) না স্যার, তবে চট্টগ্রামের জামাই হতে পারি।
- তাই নাকি? কি বলো!! কখনো বলোনি তো?
- আসলে স্যার প্রসংগ ওঠেনি কখনো তাই বলা হয়নি। স্যার আমি কি ছুটিটা পেতে পারি? ৩ দিনের বেশি লাগবেনা।
- বিয়ে কি এবার ই হবে?
- আসলে স্যার আমার প্রেমিকা চুয়েটে পড়ে। ওর সাথে দেখা করবো। বিয়ের ব্যাপার টা এখনো পরে।
- তোমার কথা শুনে আমার ছাত্রজীবনের কথা মনে পড়ে গেল। এরকম ই পালিয়ে পালিয়ে আমিও তোমার ভাবীর সাথে দেখা করতে যেতাম। যাক ওসব কথা। এখন শুনলে তোমার ঘুম আসতে পারে। বয়স্ক মানুষের কথা কারো ভালো লাগেনা। লিভ এপ্লিকেশন দেবার দরকার নেই। আমি ম্যানেজ করে নেব। একজন প্রেমিকের জন্য এটুকু করা যায়।
- আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, স্যার।
- চট্টগ্রামের জন্য এইটুকু ফেভার পাইলা বুঝছো? অন্য কোথাও হলে এপ্লিকেশন দিতে হতো।
- ভাগ্যিস!!! প্রেমটা চট্টগ্রামে করেছিলাম।
- ঠিক আছে, যাও।
তুহিন স্যার কাজে মন দেন আবার।
এই তুহিন স্যারটাও যেন কেমন। বয়সে হয়তো সজীবের থেকে ৬/৭ বছরের বড়। ভাবটা নেয় ৫০ বছরের প্রফেসরের মতো। আবার সবার সাথে খুব ফ্রেন্ডলি সম্পর্ক রাখে। ভালো মানুষ। সজীব মনে মনে অনেকবার থ্যাংকস দেয় স্যার কে।
ওইদিনের রাতের ট্রেনেই উঠে পড়ে সজীব। ভাবে স্বর্নার সাথে একটা বোঝাপড়া করার দরকার। সজীবের একটাই সমস্যা খুব জেদী। এমনিতে সে অনেক স্যাক্রিফাইসিং, অনেক কম্প্রোমাইজিং। কিন্তু ধৈর্যের বাধ ভেঙ্গে গেলে সমস্যা। একবার কোন কিছুর জেদ তাকে পেয়ে বসলেই হয়েছে। ওটা না করে সে ছাড়বেনা।
পরদিন সকাল ৭টার দিকে ট্রেন চট্টগ্রাম পৌছে গেল। আগ্রাবাদে সজীবের বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কের এক বড়ভাই থাকে। তার ওখানেই গিয়ে উঠলো সজীব। ফ্রেশ হতে না হতেই স্বর্নার ফোন।
- পৌছেছো?
- হু, ৩০ মিনিট আগে।
- স্টেশনে নেমে আমাকে কল করা যেতনা?
- যেত।
- করনি কেন?
- খুব ক্লান্ত লাগছিল। ভাবলাম একেবারে বাসায় পৌছেই তোমাকে কল করি।
- বাসা মানে!! কার বাসায় উঠেছো?
- সোহেল ভাইয়ের বাসায়। আমার ভার্সিটির সিনিয়র।
- ও........... চুয়েটে কখন আসবে?
- হুম, এখানে এসেছি তো ওখানে আসার জন্যই। খাওয়া দাওয়া করে তারপর বের হই?
- ওকে।
ফোন রেখে দিল স্বর্না। শাওয়ার নিতে নিতে সজীব চিন্তা করতে থাকলো আজকের প্রোগ্রাম কি কি হতে পারে?
১। চুয়েটে যেতে হবে।
২। স্বর্নাকে নিয়ে আসতে হবে শহরে। স্বর্নার থিসিস শেষ। সে এবার পার্মানেন্টলি ঢাকায় শিফট করবে। সজীবের দায়িত্ব লাগেজসমেত স্বর্নাকে কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত নিয়ে আসা। এরপর সজীব সিলেটে ব্যাক করবে।
৩। সারাদিন ঘোরাঘুরি ছাড়া আর কোন কাজ নেই।
চুয়েটে গেল সজীব। স্বর্নাকে নিয়ে আসলো শহরে। ওর লাগেজ গুলো সোহেল ভাইয়ের বাসায় রেখে দুজনে ঘুরতে বেরিয়ে গেল। রাত ১১-৪৫ এর তুর্না নিশিথার টিকেট কাটা আছে। তার আগে আসলেই হবে।
প্রথমে ২জন গেল বাদামতলীর মোড় সিঙ্গাপুর-ব্যাংকক শপিং কমপ্লেক্সে। স্বর্না একটা পার্লারে ঢুকলো, ভ্রু প্লাক করার জন্য। সজীব ভাবছিলো আল্লাহ প্রত্যেকটা মেয়েকে এত সুন্দর ভ্রু দিয়েছেন, তারা এটাকে প্লাক করে কেন? নিজের কাছ থেকে কোন জবাব পেলনা সজীব। আজকে মাত্র ৩০ মিনিট লাগলো স্বর্নার রুপচর্চাতে। এরপর সজীব স্বর্নাকে নিয়ে ওই মার্কেট টারে কিছুক্ষন ঘুরলো। স্বর্নাকে একটা সানগ্লাস কিনে দিলো। এরপর একটা ছাতা স্বর্নার পছন্দ হয়ে যাওয়াতে সেটাও কিনলো।
পকেটের টাকা শেষ। স্বর্নাকে অপেক্ষা করতে বলে সজীব পাশের এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে আনলো। এরপর ২জনে গেল জামান হোটেলে। এখানকার বিরিয়ানি খুবই বিখ্যাত। সজীব যখনই চট্টগ্রাম আসতো তখনি এখানের বিরিয়ানী ওর জন্য মাস্ট ছিলো। স্বর্নাও খুব পছন্দ করে জামানের বিরিয়ানী। খাওয়া দাওয়া শেষে দুজন চুপচাপ বসে ছিলো। কোন কথা নেই মুখে। প্রথমে মুখ খুললো সজীব ই,
- কি হলো, কোন কথা বলবে না?
- কি বলবো? আমার কোন কথা কি তোমার ভালো লাগবে?
- কিছুতো বলো। ভালো লাগা না লাগা পরে।
- সিলেটে কতদিন থাকবে?
- টিচিং ভালোই তো লাগছে। দেখি কতদিন থাকা যায়? আমি এই প্রফেশন টা খুব ই এনজয় করি।
- সেটা জানি। আর এটাও তুমি জানো তোমার এই মাষ্টারি আমি একেবারেই পছন্দ করিনা। কোন টাকা পয়সা আছে নাকি এখানে?
- স্বর্না, আমি খুব ই সাধারন থাকতে পছন্দ করি সেটা তুমি জানো।
- আমি তোমার মত সাধারন লাইফ চাই না। আমি তো তোমাকে বলেছি ঢাকায় একটা বাড়ি অথবা ফ্ল্যাট করতে হবে। একটা গাড়ী না থাকলে ভাই বোনের সামনে আমি কিভাবে দাড়াবো?
- তোমার কাছে স্ট্যাটাস টাই বড় হয়ে গেল? আমাদের সাধারন জীবন যাপন তোমার ভালো লাগেনা?
- দেখ, টাকা না থাকলে সুখ থাকেনা। অভাব যদি দরজায় এসে দাঁড়ায় তাহলে ভালবাসা জানালা দিয়ে পালাবে।
- স্বর্না, আমি এই প্রবাদটাতে বিশ্বাস করিনা। আমার বিশ্বাস হলো ভালবাস থাকলে কুটির ঘরেও সুখ থাকে। এজন্য চাই নিজের কাছে নিজের শুকরিয়া। নিজের যেটা আছে সেটা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা। যাকে বলে আত্নসন্তুষ্টি।
- সংসারে টাকা থাকলেই আমার আত্নসন্তুষ্টি আসবে। টাকা না থাকলে এই সব বড় বড় কথা দিয়ে পেট ভরবে না।
- তুমি কি তোমার এই চাওয়া টাকে কম্প্রোমাইজ করতে পারোনা, স্বর্না?
- সজীব, আমার একটা আলাদা ব্যক্তিস্বত্ত্বা আছে। আমি সেটাকে বিসর্জন দেব কেন?
- (মনে মনে) তোমার চাওয়া আজও বুঝলাম না আমি। আমাকে পরিবর্তন করতে চাও। নিজে কেন একটু চেঞ্জ হতে চাওনা?
সজীবের মোবাইলে সোহেল ভাইয়ের কল আসলো।
- সোহেল ভাই, আসসালামু আলাইকুম।
- ওয়ালাইকুম আসসালাম। সজীব তুমি কোথায়?
- ভাইয়া, এইতো জামান হোটেলে। আগ্রাবাদ।
- আচ্ছা, তোমাকে তো বলা হয়নি। আজকে সুমির বার্থডে।
- তাই নাকি? কোথায় এখন আপু?
- বাসাতেই আছে। শোন, সুমি আজকে একটা ছোটখাট অনুষ্ঠনের আয়োজন করছে। তুমি থাকবে কিন্তু।
- ভাইয়া, আমার তো রাতে ট্রেন। তাছাড়া স্বর্না ও আমার সাথে যাবে ঢাকায়। ও এখন আমার সাথে আছে।
- আরে ভাই, তোমার ট্রেন তো রাত ১১-৩০ এ। পার্টি তো ১০ টার ভিতর শেষ হয়ে যাবে। তারপর আমি তোমাকে গাড়িতে করে দিয়ে স্টেশনে দিয়ে আসবো। আর স্বর্না কে নিয়েই আসো। ওর লাগেজ তো আমাদের বাসায় রেখেছ।
- ঠিক আছে ভাইয়া, আসবো।
- শোন, পার্টি কিন্তু 'বোনানজা' রেস্টুরেন্টে।
- ওকে ভাইয়া।
ফোন রেখে সজীব বললো, সোহেল ভাইয়ের ফোন। আজকে ভাবীর বার্থডে। রাতে পার্টি হবে। তোমাকেও যেতে বলেছে।
- তোমার ভাবীর বার্থডে তুমি ই যাও। আমি যাবোনা।
- স্বর্না, রাগ তো আমার উপর, সেটা ভাইয়া-ভাবীর উপর দেখানোর কোন দরকার তো দেখছিনা।
চুপ করে থাকলো স্বর্না।
এরপর ওরা গেলো জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে। জাদুঘরের সাথে একটা ছোট পার্কের মত আছে। ওখানে অনেকক্ষন বসে থাকলো ওরা। আগের মতোই চুপচাপ। কোথায় যেন তার কেটে গিয়েছে ওদের সম্পর্কের।
রাতে বোনানজা তে পার্টিটা চমৎকার হলো। সোহেল ভাই তার কলিগদের সাথে সজীব-স্বর্নাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন স্বামী-স্ত্রী হিসেবে। স্বর্নার মুখ আগের থেকেও অনেক গম্ভীর। সজীব অনেকবার জিজ্ঞাসা করেও কোন সদুত্তর পেলোনা। বার্থডে পার্টিটা চমৎকার ভাবেই শেষ হলো।
সোহেল ভাই ওদেরকে নিজের গাড়ীতে করে রেলওয়ে ষ্টেশনে দিয়ে আসলেন। ভাবী বারবার বলেছিলেন আরো ২/১ দিন বেড়াতে। সজীবের তো উপায় ছিলোনা, তাছাড়া স্বর্নাও থাকতে চাইছিলোনা।
এমনিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের দুর্নাম আছে ট্রেন লেট করার জন্য। কিন্তু আজকে একেবারে সময়মতো ট্রেন টা ছেড়ে গেল ঢাকার উদ্দেশ্যে। তুর্না নিশীথার ঝিক ঝিক শব্দে ঢাকা পড়ে গেল চারপাশ।
(চলবে)
লেখাটি আমার অন্যান্য ব্লগেও প্রকাশিত।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জুলাই, ২০১১ দুপুর ১:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



