তোমাকে পাওয়া - ৩
ট্রেন টা ঠিকমত ঢাকা পৌছে গেল সকালে। স্বর্ণাকে যাত্রাবাড়িতে নিজের বাসার পৌছে দিয়ে নবাবপুরে খালার বাসায় চলে আসলো সজীব। খালার বাসাটা সজীবের খুব ভালো লাগে। ছোট একটা বাসা। খালা-খালু আর খালার ২ মেয়ে নিয়ে ছোট সংসার। সজীবের ২ খালাতো বোনই সজীবের খুব ফ্যান। সজীব ও ওদেরকে অনেক পছন্দ করে। বিকেলে আবার সজীবের যেতে হবে নয়াপল্টনের দিকে। ওর বন্ধু সোহেলের অফিসে যেতে হবে। সোহেল ওর জন্য হংকং থেকে একটা ল্যাপটপ নিয়ে এসেছে। সজীব ই বলে দিয়েছিল নিয়ে আসতে। ল্যাপটপ টা নিয়ে সজীব গেল গুলশান এর দিকে। ওর একটা ফেসবুক ফ্রেন্ড আছে মিলা নামে, তার সাথে দেখা করতে হবে।
মিলার সাথে দেখা করেই বাসায় চলে আসলো সজীব। ফোন দিল স্বর্নাকে।
- হ্যালো।
- কি খবর? কি করছো?
- কিছুনা। এতক্ষন কোথায় ছিলে?
- সোহেলের অফিসে গিয়েছিলাম। আমার ল্যাপটপ টা নিয়ে আসলাম।
- ও।
- তোমার মনে হয় কিছুই বলার নাই।
- কি বলার থাকতে পারে?
- ও আচ্ছা, তাইতো। কী বলার থাকতে পারে?
(কিছুক্ষন চুপ থেকে সজীব বললো )
- স্বর্না, তোমাকে একটা কথা বলি?
- বলো।
- আচ্ছা, তোমার কি মনে হয়না আমাদের মানসিক দুরত্বটা অনেক বেড়ে গিয়েছে?
- এ ব্যাপারে আমার কি করার আছে? তুমি যদি বুঝে থাকো সেটা তাহলে তুমিই ডিসিশন নিতে পারো কী করা উচিৎ।
- আমার মনে হচ্ছে এটা নিয়ে ফোনে কথা না বলে সামনা সামনি কথা বলা ভালো।
- হুম, তো আমাকে কী করতে হবে?
- আমি তো কালকেই সিলেটে চলে যাবো। তুমি যদি আজ কালের ভিতর আমার সাথে দেখা করার সময় বের করতে পারো তাহলে ভালো হয়। আমি কাল রাতের ট্রেনে যাবো।
- দেখি সময় বের করতে পারি কিনা?
- ওকে, তাহলে কাল দেখা হচ্ছে আশা করতে পারি।
- বাই।
ফোন রেখে দিল স্বর্না।
চুপচাপ ভাবছিল সজীব। মানুষ এত বদলায় কীভাবে? চার বছরের সম্পর্ক ওদের। চেনাজান আরো আগে থেকে। কখনো তো ও স্বর্নার ভিতর এই বৈশিষ্ট্য গুলো খেয়াল করেনি। প্রথম থেকে ওরা দুজন দুজন কে অনেক ভালবেসেছে। পরস্পরের মতের মূল্য দিতে চেষ্টা করেছে। স্বর্না অনেক জেদী। সজীব ও জেদী, তবে স্বর্নার জন্য সে সবসময় কম্প্রোমাইজ করেছে। সে জন্যই কী আজও স্বর্না এতটা জেদী। বেশি জেদ যে ভাল না সেটা সজীব স্বর্নাকে সবসময় বোঝানোর চেষ্টা করেছে। কাজ হয়নি বলেই মনে হচ্ছে। দেখা যাক সামনে কী হয়? সজীব এর শেষ দেখতে চায়।
পরদিন দুজনে টিএসসির সামনে দেখা করলো। স্বর্না এসেই বললো,
- কী বলবে বলো, আমার হাতে সময় খুব ই কম।
- আসতে না আসতেই সময় নেই। তোমার কী মনে আছে দেখা হলেই আর ফিরে যেতে ইচ্ছে করতোনা একটা সময় ছিল?
- সেটা তো অতীত। এটা মনে করে লাভ আছে? কী বলবে বলো।
অবাক হয়ে গেল সজীব। এই কথা কি ভাবে স্বর্না বলে? বুঝলো তাদের মানসিক দূরত্ব এতটা বেড়ে গিয়েছে যে সেখান থেকে ফিরে আসাটাই দুষ্কর হবে। সজীব জিজ্ঞাসা করলো,
- স্বর্না, তুমি কি বলতে পারো আমাদের এই সম্পর্কের শেষ কোথায়?
- তোমাকে তো আগেই বলেছি, সব কিছু তোমার হাতে। আমি কি চাই, কী পছন্দ করি সেটা তুমি জানো। সেরকম না হলে আমাকে শক্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
- স্বর্না, কীভাবে বলো তুমি এই কথাগুলো? আমাদের ৪ বছরের সম্পর্ক এক কথায় শেষ হয়ে যাবে?
- সজীব, তোমাকে তো আগেই বলেছি, আব্বু-আম্মু তোমাকে পছন্দ করেনা। এমন কি আমার ২ভাই এর ও তোমার ব্যাপারে পজিটিভ কোন ধারনা নেই। বড় ভাইয়া তো সবসময় বলেই একটা জেনারেল ইউনিভার্সিটির ছাত্র কখনোই আমার যোগ্য হতে পারেনা। আমিতো একটা টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করছি। আমার ছোট ভাই ও তোমাকে পছন্দ করেনা। বয়সে ছোট তাই মুখে বলেনা, কিন্তু কাজে কর্মে বুঝিয়ে দেয়। বড় ভাইয়ার এক ফ্রেন্ড আছে গ্রামীনফোনে জব করে। বুয়েট থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল এ পাশ করেছে। লন্ডন থেকে মাস্টার্স করে এসেছে। ভাইয়া চায় আমি ওর সাথে বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হই।
- ভাইয়া চায় সেটা তো বলেছ। তুমি কী চাও?
- আমি তো তোমাকে বলেছি আমার কর্পোরেট লাইফ ভালো লাগে। তোমার ঐ ছাতার মাস্টারি আমার ভালো লাগেনা। তাছাড়া আমি চাই তুমি ঢাকায় সেটেল্ড হও।
- আমার ঢাকা ভালো লাগেনা। আমি কর্পোরেট লাইফ লাইক করিনা। তাছাড়া ঢাকায় খরচ সম্পর্কে তোমার ভালই ধারনা আছে। আমি এত বেশী আয় করতেও চাই না। চাইনা ঢাকার এই দমবন্ধ পরিবেশে নিঃশ্বাস নিতে।
- তার মানে তুমি চাওনা আমাকে সুখী করতে? তোমার কাছে নিজের হিসাব টাই বড়?
- স্বর্না, আমাকে বোঝার চেষ্টা করো। আমি তো তোমার অমর্যাদা করিনি কখনো। তুমি কেন আজ এই গুলো বলছো?
- তাছাড়া তোমাকে আগে ও বলেছি আমার ছোট পরিবার ভালো লাগে। আমি তোমাদের এত বড় পরিবার মেইনটেইন করতে পারবোনা। আমি একজন ইঞ্জিনিয়ার। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছি কি তোমার বাসার রান্নাঘরের চুলা জ্বালাতে?
অবাক হয়ে গেল সজীব, কী বলছে স্বর্না এগুলো?
- স্বর্না, তোমার মাথা ঠিক আছে তো?
- আমার মাথা ঠিক ই আছে। তুমি তোমার চিন্তাধারা ঠিক করো।
- আমি সারাজীবন ভেবেছি তুমি অনেক কম্প্রোমাইজিং মনের মেয়ে। এখন দেখছি আমার ধারনা টা ভুল।
- তুমি কি ভেবেছ সেটা তোমার ব্যপার। আমি একটা ব্যাপার জানি সেটা হলো বিয়ের পরে তোমার আমার একটা আলাদা পরিবার হতে হবে।
- আমি খুব ই হতাশ তোমার কথায়।
- তুমি যদি এইগুলো মেনে নিতে পারো তাহলে তোমার বাসা থেকে আমার বাসায় প্রস্তাব পাঠাতে পারো। তবে প্রস্তাব পাঠানোর আগে অবশ্যই চাকরি টা চেঞ্জ করে নিও। আমি এখন যাচ্ছি। বাসায় আম্মু একা। আজকে শাহীন ভাইয়ের বাসা থেকে মেহমান আসবে। ভালো থেকো।
চলে গেল স্বর্না। বসে বসে সজীব ভাবছিলো, ৪ বছরেও এই মেয়েটা কে সে এক বিন্দু ও চিনতে পারেনি। ওর বন্ধু মেহেদী ঠিক ই চিনেছিল। অনেকবার বলেছিল, দোস্ত এর সাথে তোর বনবেনা। তুই যেরকম সেরকম মেয়ে ও না। সময় থাকতে সরে আয়।
সজীব শোনেনি। বলেছিল, আমি আমার ভালবাসা দিয়ে সব ঠিক করে ফেলব।
এখন তো মনে হচ্ছে মেহেদী ঠিক ই বলেছিল।
আরো মনে পড়ল একদিনের কথা। সজীবের ছোট ভাইটা পরীক্ষায় ফেল করেছিল। ঐদিন স্বর্না বলেছিল, তোমার ছোট ভাইকে বলে ঠিক মতো পড়ালেখা করতে। সারাজীবন কী তোমার উপর বসে খাবে নাকি?
সজীব নিজেও তখন ছাত্র, থার্ড ইয়ারে পড়ে তখন। ভুল করেছে সজীব ঐ সময়েই স্বর্নার সাথে সম্পর্ক চুকিয়ে ফেললে ভালো হতো। কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে অপরাধী হতে চায়নি সজীব।
যাহোক, এখন বেশী চিন্তা করে লাভ নেই। বাসায় যেতে হবে। রাতের ট্রেনেই সিলেটে চলে যাবে ও। সিলেটে যাবার পর শারমিনের সাথে কথা বলতে হবে একবার। শারমিন ওর জুনিয়র হলেও খুব ই ক্লোজ। অনেক টা বন্ধুর মতই। (চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই আগস্ট, ২০১১ সন্ধ্যা ৬:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



