তোমাকে পাওয়া - ৪
শারমীন এখন জব শুরু করেছে, তার দেখা পাওয়াই মুশকিল। শারমীনের কাছে ফোন করেছিল সজীব, মিটিং এ আছে বলে ফোন রেখে দিলো। কী আর করা? রাতের ট্রেনেই সিলেট চলে গেল সজীব। পরদিন থেকে আবার ক্লাস নিতে হবে।
পরদিন টানা ৩টা লেকচার নেয়া শেষে অফিস রুমে বসে ছিল সজীব। হঠাৎ ই মনে হলো রনি কে ফোন দেয়া যেতে পারে। রনি ওর অন্যতম কাছের বন্ধু। ভার্সিটি লাইফে ওরা চারজন সবসময় একসাথে ঘুরাফেরা করতো। সজীব, রনি, মেহেদী আর সাদি। রনি সবসময় ই একটু চিন্তাশীল ছেলে হিসাবে পরিচিত। একটু ভাবুক টাইপের। কিছুদিন হলো রনিও একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসাবে যোগ দিয়েছে। ওর কাছে সবসময় গঠনমূলক পরামর্শ পেয়ে এসেছে সজীব। আজো সেটাই ভেবে রনিকে কল দিলো সজীব।
- রনি, কী খবর কেমন আছো?
- মোটামুটি। তোমার কী খবর?
- ভালো না।
- সেটা আর নতুন কী?
- তা ঠিক, এ আর নতুন কী? তোমরা তো সারাজীবন এটা নিয়ে মজাই করে গেলা। বুঝলানা আমার সমস্যাটা।
- আচ্ছা রাগ কোরোনা। তোমার সাথে কী আমার ফাজলামী করার অধিকার টা নাই?
- সেটা তো আছে। কিন্তু এটা তো জানো সবসময় ফাজলামী ভালো লাগেনা।
- আচ্ছা তোমার কী কারণে মন ভালো না সেটা বলো?
- দোস্ত, স্বর্ণাকে নিয়ে সমস্যায় আছি।
- এটাতো নতুন কোন সমস্যা না। সেই তোমার রিলেশনের প্রথম বছর থেকে শুনে আসছি।
- আবার ফাজলামি শুরু করছো?
- আচ্ছা সরি। তারপর বলো।
- ও তো চায় আমি কর্পোরেট জব করি। অনেক টাকা ইনকাম করি। বিয়ের পর ওকে নিয়ে আমি আলাদা থাকি।
- তো?
- তো মানে কি? তুমি খুব ভালো করে জানো আমি পরিবারের বড় ছেলে। যদিও বাবা এখনো চাকরি করে, তারপর ও পরিবারের প্রতি আমার একটা দায়িত্ব আছে। আমার ছোট ভাই ২টা এখনো পড়ালেখা করছে। ওর এই কথা আমি শুনবো কেন?
- তোমাকে তো কেউ বলেনি ওর কথা শুনতে। তোমার মন কী বলে সেটা বলো।
- আমার বাবা-মা ও ওকে পছন্দ করেন না। ওর কথা বার্তা বা আচরন বাবা মার পছন্দ না। তারপর ও আমি ওর ব্যাপারে বাবা মাকে বুঝানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু যার জন্য এটা করছি সে তো আমাকে রীতিমত হুমকি দিলো কাল। ওর বড় ভাইয়ের কোন এক বন্ধু আছে, বুয়েট থেকে পাশ করে লন্ডন থেকে মাস্টার্স করেছে। এখন গ্রামীণফোনে জব করছে। ওর ফ্যামিলির সবাই চায় ঐ ছেলেটার সাথে ওর বিয়ে হোক। ও যদিও পজিটিভ কিছু বলেনি, কিন্তু আমাকে ফোর্স করছে বিশ্ববিদ্যালের চাকরি ছেড়ে দিয়ে কোন একটা কর্পোরেট হাউজে ঢুকতে। আমার তো মন চায় না।
- আচ্ছা সজীব, তোমার কী জেসমিনের কথা মনে আছে?
- কোন জেসমিন? সাদির সাথে যেই মেয়েটার রিলেশন ছিলো?
- হ্যা।
- ওর কথা এখন কেন আসছে?
- আসছে এজন্য যে, জেসমিনের বড় দুলাভাই ছিলেন ঢাকা ইউনিভার্সিটির টিচার। গোল্ড মেডালিস্ট। জেসমিনের বড় বোনের সাথে বিয়ে হবার পর উনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে কাস্টমস কে জয়েন করেন। এখন তার মাসিক ইনকাম ২ লাখ টাকার উপরে। জেসমিনের বড় বোন নাকি জেসমিনকে মাসে ১০ হাজার টাকা হাতখরচ দিতো। শুধুমাত্র জেসমিনের ব্যবহারের জন্য ড্রাইভার সহ একটা গাড়ী বরাদ্দ ছিলো।
- তাই নাকি? সেটা তো জানতাম না।
- সাদি জেসমিনের রিলেশন কিন্তু ২ বছরের বেশী টিকেনি। জেসমিনের বিয়ে হয়েছে এক বিসিএস ক্যাডার সিভিল ইন্জিনিয়ারের সাথে।
- তুমি এত খবর কি ভাবে জানো?
- বিয়ের সময় জেসমিন আমাকে কল করেছিলো। বলেছিল সাদিকে খবরটা দিতে। আমি দেইনি। আজ তোমাকে বললাম। কেন বললাম জানো?
- কেন?
- তোমার কাহিনীও সেদিকেই যাচ্ছে। শোন তোমাকে একটা পরামর্শ দেই। জীবনটা তোমার। সিদ্ধান্ত ও তোমাকে নিতে হবে। আমি তোমাকে একটু বলতে পারি যে বাবা মা তোমাকে ছোট থেকে এত বড় করেছেন, এখনো তোমার জন্য টেনশন করেন তাদের মনে কোন কষ্ট দিয়ে কাজ করা ঠিক হবেনা। তুমি তোমার প্রেমিকা কে বুঝাতে পারো অথবা............।
- অথবা কি?
- রিলেশন ব্রেক করতে পারো? নিজের মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করা ঠিক হবেনা। তোমার মন যদি বলে যে তার সাথে তোমার রিলেশন রাখতে কষ্ট হচ্ছে তাহলে আমি বলব তোমার মনের কথা শোনাটাই ভালো।
- আমি আমার রিলেশন নিয়ে খুব ই হতাশ। বিতৃষ্ণা এসে গেছে রিলেশনের প্রতি। কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে অপরাধী হতে চাই না। আমি চাই না রিলেশন ভেঙ্গে যাবার পর কেউ বলুক আমার ই দোষ। ব্রেক করতে হলে স্বর্ণা করবে।
- এমন তো হতে পারে সে ও সেটাই চাইছে। সো যে কোন একজন কে স্টেপটা নিতে হবে।
- তুমি কী বলো?
- আমার সাজেশন হলো, তুমি আরেক টু চিন্তা করে দেখ ওর সাথে তুমি সারাজীবন চলতে পারবে কিনা? তারপর ডিসিশান নাও। লোকে কী বললো, কী ভাবলো তাতে কী আসে যায়? জীবন টা তোমার। ডিসিশান ও তোমাকেই নিতে হবে।
- ঠিক আছে, দেখি আরেক টু চিন্তা করে। এখন তাহলে রাখলাম। আল্লাহ হাফিজ।
ফোন রেখে দিয়ে চুপচাপ বসে চিন্তা করতে লাগলো সজীব। একাগ্রমনে চিন্তার ব্যাঘাত ঘটালো একটা নারীকন্ঠ।
- স্যার, আসতে পারি?
তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী তিথি। ক্লাসে এসে চুপচাপ বসে থাকে। ক্লাসে কোন প্রশ্ন ও করেনা। সজীব কয়েকদিন ধমক ও দিয়েছে ওকে পড়া না পারার কারণে। আজকে কী কারণে এসেছে কে জানে।
- এসো।
- স্যার, আমাদের আগামীকালের পরীক্ষাটার ব্যাপারে একটু কথা বলতে চাইছিলাম।
- আগামীকালের পরীক্ষা কোনভাবেই পেছানো যাবেনা। অন্য কোন কথা থাকলে বল।
- স্যার, আসলে পরীক্ষা পেছানো নিয়ে কোন কথা বলতে আসিনি। আমি কয়েক টা জিনিস বুঝতে পারছিনা। তাই এসেছিলাম। কিন্তু আপনাকে দেখে অনেক বিরক্ত মনে হচ্ছে। একবার ভাবলাম আপনাকে ডিস্টার্ব না করি কিন্তু পরীক্ষা তো কালকেই। তাই.................
- আসলেই আমি মেন্টালী একটু এলোমেলো অবস্থায় আছি। আচ্ছা, তোমার এক্সাম তো কাল বিকাল ৩টায়। তুমি সকালের দিকে বই নিয়ে চলে এসো। সকাল মানে ৯টার দিকে।
- আচ্ছা, স্যার।
- আচ্ছা শোনো।
চলে যাচ্ছিলো তিথি। ফিরে তাকালো সজীবের ডাকে।
- কাল সকাল ৯টায় আমার ক্লাস আছে। তুমি বরং ১০টার দিকে এসো।
- ঠিক আছে, স্যার।
চলে গেল তিথি।
সজীব ও উঠে দাড়ালো। বিকাল হয়ে গিয়েছে। বাসায় যাওয়া দরকার। বাকি যা ভাবার কাল ভাববে। এই মুহুর্তে ব্রেন টাকে রেস্ট দেয়া দরকার।
(চলবে)
**লেখাটি আমার অন্যান্য ব্লগেও প্রকাশিত।**
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে আগস্ট, ২০১১ রাত ৮:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



