somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রতন পন্ডিত

১৮ ই আগস্ট, ২০১৫ বিকাল ৩:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বিকাল আন্দাজ চারটা বাজে, শ্বরণী বাবুর কথামত তার বাসার পাশের রতন পন্ডিতের চায়ের দোকানে বসে আছি| তিনি অনেক দিন পর আজ হঠাত ফোন করে বললেন
- কেমন আছিস, কোথায় আছিস জানা কিংবা জানানোর সময় নাই| এক প্রকাশকের সঙ্গে মিটিঙে আছি, মিটিংটা শেষ করেই বিকেল চারটার দিকে ফিরবো| বাসায় ওঠার আগে কলা পাউরুটি আর এক কাপ চা খেয়ে বাসায় উঠবো| ততক্ষণ তুই রতন পন্ডিতের চায়ের দোকানে আমার জন্য অপেক্ষা কর, অনেক দিন আমার ব্যস্ততার কারণে তর সঙ্গে কোন দেখা সাক্ষাত নেই, আজ থেকে আগামী সাত দিন আমার কোন কাজ নেই, তুই তল্পিতল্পা সমেত আগামী এক সপ্তাহের জন্য আমার বাসায় চলে আয়, জমিয়ে আড্ডা দেয়া যাবে, আর জানিসই তো তোকে ছাড়া আমি কতটা অচল|
যে রতন পন্ডিতের চায়ের দোকানে বসে আছি, তার পরিচয়টা না দিলেই নয়, পেশায় সে একজন চায়ের দোকানদার, খুবই চমত্কার একটা চরিত্র| নাম আবদুস সাত্তার, ডাক নাম রতন, যদিও সকলের কাছে সে রতন পন্ডিত নামেই পরিচিত| এর পেছনের কারণ হলো তার জ্ঞানের ভান্ডার এবং তার কথা বলার ভঙ্গি, খুব চমত্কার করে সাজিয়ে কথা বলতে পারেন| বয়স আন্দাজ চল্লিশের আশপাশেই হবে| কোন ডিগ্রী তার নেই, গ্রামের স্কুলের পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছিল মাত্র| তার পরেও দোকানে বসে বসে বিভিন্ন বিষয়ের উপর এমন সব জ্ঞান তিনি অর্জন করেছিলেন, যে তার কথা শুনে অবাক না হয়ে উপায় থাকে না| বিস্ময়ে প্রশংসা করলে বলে
- কি যে লজ্জা দেন স্যার| আমি মুর্খ সুর্খ চাওয়ালা, আমার আবার জ্ঞান| যা টুকটাক জানি তা আপনাদেরই বদৌলতে, আপনাদের মত জ্ঞানী মানুষেরা আমার দোকানে আসেন, এই অধমের হাতের চা খেতে খেতে গল্প গুজব করেন তাই শুনে শুনে যা শেখা, তাছাড়া টুকটাক বইতো পড়া হয়ই|
টুকটাক বই পড়ে বলতে তার নিজস্ব লাইব্রেরি আছে, রতন পন্ডিত লাইব্রেরি| তার সংগ্রহে কম করে হলেও দু'হাজারের উপরে বই আছে, এটাও তার ব্যবসার একটি অংশ| বই বিক্রি করা নয়, পড়ার জন্য বই ভাড়া দেয়া| বিষয়টা এমন যে ৫০০ টাকা জামিন রেখে রতন পন্ডিত লাইব্রেরির মেম্বার হতে হবে, এর পর মাত্র ১০ টাকা দিয়ে যে কোন একটা বই নিয়ে যান, পড়া শেষ করে সেই বইটি ফেরত দিয়ে যান, আরেকটা বই ভাড়া নিয়ে পড়তে আবার ১০ টাকা| আর মেম্বারশিপ বাতিল করার সিধান্ত নিলে সমস্যা নেই জামিন রাখা ৫০০ টাকা ফেরত দিয়ে দেয়া হবে| চা দোকানের ব্যবসার পাশাপাশি রতন পন্ডিতের লাইব্রেরির ব্যবসাটাও বেশ জমজমাট, পাঠক গ্রাহকের সংখ্যাও তার অনেক|
যাই হোক সময় কাটাতে চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে সময় কাটাতে রতন পন্ডিতের কাছ থেকে আজকের খবরের কাগজ নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখছি| রতন পন্ডিত আমাকে জিজ্ঞাস করলো
- স্যার চা খাবেন? আরেক কাপ চা বানিয়ে দেই? খান ভালো লাগবে|
শ্বরণী বাবুর অপেক্ষায় এখন পর্যন্ত দু কাপ চা সাবার করে ফেলেছি, এবার রতন পন্ডিত তৃতীয় কাপ চা খাবার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে| আমন্ত্রণ তো নয় যেন আন্তরিক আবদার, ফেলা যায় না তাই বললাম
- রতন পন্ডিত, আমার জন্য ওই চা'টা বানাও তো যেটা তুমি শ্বরণী বাবুর জন্য স্পেশাল করে বানিয়ে থাক|
- কোনটা? ওই কলিজা মিঠা চা?
আসলে কলিজা মিঠা নামটা মনে আসছিল না, তাই শ্বরণী বাবুর স্পেশাল চা বলেছিলাম| কলিজা মিঠা চা রতন পন্ডিত শুধুমাত্র শ্বরণী বাবুর জন্যই বানিয়ে থাকেন, নামটাও শ্বরণী বাবুই দেয়া| আমি বললাম
- হ্যা হ্যা, ঐটাই কলিজা মিঠা চা|
- জি আচ্ছা, এখুনি বানিয়ে দিচ্ছি|
বলেই রতন পন্ডিত চা বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন| কলিজা মিঠা চা আমি আগে খেয়েছি বটে কিন্তু বানানোর প্রক্রিয়াটা কি তা আমার আগে জানা ছিল না, প্রক্রিয়া এবং উপকরণ জানতেই মূলত আজ হঠাত করেই রতন পন্ডিতকে এই বিশেষ চা বানাতে বলা| দেখলাম অনেক সময় ধরে চায়ের পাতা জাল দেয়া এক কাপ পরিমান চায়ের সঙ্গে এক চামচ খেজুরের চিটা গুড়, তিন টেবিল চামচ চিনি, একটা এলাচি, দুটা লং এবং একটা পুদিনা পাতা দিয়ে খুব ভালো করে চামচ দিয়ে নাড়তে শুরু করলো রতন পন্ডিত| চিনি এবং গুড় খুব নিখুদ ভাবে চায়ের সঙ্গে মিশে গেলে, পিরিচের উপর কাপটি রেখে রতন পন্ডিত আমার দিকে এগিয়ে দিল শ্বরণী বাবু স্পেশাল কলিজা মিঠা চা|
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুমুক দিতে যাব, তখনই রতন পন্ডিত বলে উঠলো
- দারান স্যার, চুমুক দিয়েন না|
কথাটা বলেই একটা বেনসনের পেকেট থেকে একটা সিগারেটের বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল
- কলিজা মিঠা চা খাওয়ার একটা সিস্টেম আছে, প্রথমে ফুসফুস ভর্তি করে সিগারেটে জোরে একটা টান দিতে হয়, খবরদার ধোয়া কিন্তু ছাড়া যাবে না| এবার চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বুকে জমিয়ে রাখা ধোয়া ছাড়ুন| এই সিস্টেমে চা'টা খেয়ে দেখুন, পিনিক হবে|
আমি ভুরু কুচকে বললাম
- তুমি এত কিছু জানলে কেমনে? আমি যতটুকু জানি তুমি তো চা সিগারেট কিছুই খাওনা!
একটু ফেল ফেলিয়ে বোকা বোকা হাসি দিয়ে বলল
- চাদে দাড়াইলে কেমন অনুভুতি হয়ে, চাদের আবহাওয়া কেমন সেটা জানতে হলে নিজেকে চাদে যেতে হয় না, নিল আর্মস্ট্রংএর অনুভুতি থেকেই জানতে পারা যায়| চা সিগারেট আমি খাই না সত্যি, কিন্তু গ্রাহককে দেখে তাদের অনুভুতি কিছুটা হলেও অনুধাবন করা যায়, আর কলিজা মিঠা চা খাওয়ার সিস্টেমটা শ্বরণী বাবুর তৈরী|
রতন পন্ডিতের অসাধারণ যৌক্তিক উদাহরণে আমি পুরাই মুগ্ধ, তার কথামত সিস্টেম অনুযায়ী সিগারেটে টান দিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে ধোয়া ছাড়লাম| অতিরিক্ত টক খেলে মানুষের চেহারায় একধরনের কুচকান ভেঙচির ছাপ ভেষে উঠে| আমারও ঠিক তাই হলো, যদিও টক খেয়ে নয়, কলিজা মিঠা চা খেয়ে, অতিরিক্ত মিষ্টি|
অস্বস্তিকর একটা পরিস্থিতির মধ্যে আটকে আছি, রতন পন্ডিত খুবই উত্সাহের সঙ্গে চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে মনযোগ দিয়ে আমার চা খাওয়া দেখছে| আমার এই একটা সমস্যা, কোন কিছু খাওয়ার সময় যদি কেউ আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, ঠিক মত খেতে পারিনা| মনে হতে থাকে বোধ হয় লোকটা অনেকদিন কিছু খায়নি, তাই আমার খাওয়ায় লোভ দিচ্ছে, আর না হয় আমার খাবার খোয়ার ভঙ্গিটা অদ্ভুত, তাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে| অস্বস্তিতে অসহ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞাসই করে বসলাম
- কি দেখছ অমন করে তাকিয়ে?
খুবই গদগদ হাসি দিয়ে রতন পন্ডিত বললো
- কিছু না স্যার, ওই বিশেষ পদ্ধতিতে চা খেয়ে আপনার পিনিক হলো কিনা বুঝার চেষ্টা করছি|
পিনিক কি জিনিস, কিনবা পিনিক হলে কেমন অনুভুতি হয়, সত্যি সে সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই| তবুও তাকে খুশি করতে বললাম
- হ্যা, ভরপুর পিনিক হয়েছে|
আমার কথাটা শুনে তার চেহারায় একটা সস্তির ছায়া চেয়ে গেল, তার হাসিতে একধরনের সফলতার ছাপ, যেন আমার পিনিকই তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল| হঠাত রতন পন্ডিতের চেহারার পরিবর্তন ঘটলো, দুশ্চিন্তা গ্রস্থ এক আবহাওয়া তার পুরো চেহারায় ছেয়ে গেল, এই চেহারার সঙ্গে আমি আগে থেকেই পরিচিত| যারা রতন পন্ডিতকে চিনে না তারা দেখলে রীতিমত ভয়ই পাবে| ও আগে বলা হয়নি, রতন পন্ডিতের একটা আজব রোগ আছে, মাঝে মাঝে খুবই জটিল এবং ধারালো কিছু প্রশ্ন তার মাথা চাড়া দিয়ে উঠে, যার উত্তর দেয়া সহজ হয় না| আর এমন প্রশ্ন মাথায় চাপলেই তার চেহারায় একটা মানসিক রোগী রোগী ভাব প্রতিফলিত হয়| পরিবর্তিত চেহারায় এমন লাজবাব প্রশ্ন সে ধার্মিকদের কাছে করলে তারা বলে, রতন পন্ডিতের ঘাড়ে শয়তান জীনে আসর করসে কিংবা তার উপর অপদেবতা ভর করসে| যে যাই বলুক, এখন আমি পরেছি বিপদে, কৌতুহলী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললো
- স্যার, একটা প্রশ্ন মাথায় জোরে জোরে গুতা দিচ্ছে, গুতা ঠিক না রীতিমত শুই দিয়ে খোচা| লাল রঙের বিষ পিপড়ার মত বিষয়টা মগজের ভেতর কিলবিল করছে| উত্তর না পেলে মনে হয় পাগল হয়ে যাব|
আধা পাগল, তাই বলে এতটা নয় যে কামড় বসাবে, তবুও খুব সাবধানতার সঙ্গে জানতে চাইলাম
- প্রশ্নটা কি?
- আদম আর হওয়াটা কে ছিল?
আমি ভাবলাম এত সামান্য প্রশ্ন করতে চেহারার এত পরিবর্তন করা লাগে নাকি? আমার খুদ্র জ্ঞানানুযায়ী উত্তর দিলাম
- আদম হওয়া হল আব্রাহামিক ধর্ম অর্থাত ইহুদি, খ্রিস্টান এবং ইসলামিক ধর্ম মতে মানব জাতির সুত্রপাতের দুই চরিত্র| আব্রাহামিক ধর্ম মতে যারা প্রথম পুরুষ এবং নারী হিসেবে পরিচিত, প্রথম পুরুষের নাম আদম এবং প্রথম নারীর নাম হাওয়া| এই দুজনের যৌনকর্মের ফসল হল আমরা অর্থাত মানুষ।
- আচ্ছা স্যার, আব্রাহামিক ধর্মে যা বলা আছে তা কি বাস্তব না কাল্পনিক?
রতন পন্ডিতের কাছ থেকে এমন প্রশ্ন আমি আশা করিনি| বিষয়টা কিছুটা ধর্মানুভূতির দিক থেকে স্পর্শ কাতর বিধায় আমি চারিদিক ভালো ভাবে দেখে নিলাম যে আশপাশে কোন জিহাদী বেশভুষার কেউ আছে কিনা| কারণ তেমন কারো কানে কথাগুলো পৌছালে ঘাড়ে আর গর্দান থাকবে না, নাড়ায়ে তাকবীর আল্লাহুয়াকবার হয়ে যাবে| প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে আমি বললাম
- এ প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না|
একটু নিরাশ ভঙ্গিতে রতন পন্ডিত বলল
- জানেন না?
- না|
- সমস্যা নেই| এবার আরেকটা প্রশ্ন আছে?
- কি?
- আদম-হাওয়ার কি বিয়ে হয়েছিল?
- আব্রাহামিক ধর্মের কোন গ্রন্থে অর্থাত ইহুদিদের তাওরাত, খ্রিস্টানদের বাইবেল কিংবা মুসলিমদের কুরান কথাও এমন কোন উল্লেখ নেই যে তাদের বিয়ে হয়েছিল।
ইতিমধ্যে পেছন থেকে ফেস ফেসে গলায় আওয়াজ এলো
- লেখক, কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করলাম? আর রতন পন্ডিত, কেমন আছ?
রতন পন্ডিত খুব সারল্যের সঙ্গে জবাব দিল
- জি ভালো|
পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি ডান কাঁধে চটের ঝোলা ঝোলানো ক্ষয়রী রঙের খদ্দরের পাঞ্জাবি পড়া, আর গলায় মাফলার জড়িয়ে শ্বরণী বাবু দাড়িয়ে আছে| বেশ রোগা হয়েছে দেখলাম, এত দিনের ব্যস্ততা এবং নিজের প্রতি অযত্নের চাপ তার চেহারায় পরেছে| শ্বরণী বাবুর করা প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলাম
- আপনার গলায় কি হয়েছে, কন্ঠ ফেসফেসে শোনাচ্ছে কেন?
- আর বলিস না, গতকাল প্রতিবেশী বাচ্চাদেরকে আইসক্রিম কিনে দিয়ে ছিলাম, সাথে আমিও নিজের জন্য ১লিটারের ভেনিলা ফ্লেবারের আইসক্রিম কিনে এক বৈঠকে সবটা শেষ করেছিলাম| তার ফলাফল হলো আমার এই ফেসফেসে কন্ঠ| ফেসফেসে কন্ঠে আমার কিছু যায় আসে না, বাচ্চা গুলোকে সমান্য স্নেহের দ্বারা তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারলেই আমি সন্তুষ্ট| আমার কাছে অবাক লাগে যে এক সময় এই পৃথিবীতে আরবের মরুর বুকে এমন চরিত্রহীন নোংরা মানসিকতার বেদুইন বাস করতো, যে নয় বছরের শিশু মেয়েকে বিছানায় উলঙ্গ করে শারীরিক নির্যাতন করেও সন্তুষ্ট হত না| সেই শিশু ধর্ষক আবার নিজেকে ঈশ্বরের বন্ধু বলে দাবি করতো| যাই হোক লেখক বাকি কথা বাসায় গিয়ে হবে|
- কিছু খাবেন না? আপনার প্রিয় কলিজা মিঠা চা, কিনবা সিগারেট|
- না না, বাসায় চল| আমাদের দুজনের জন্য পুরান ঢাকার রয়েল থেকে শাহী মোগলাই আর দু লিটার বাদামের সরবত এনেছি|
বাদামের সরবত আমার খুব প্রিয়, সরবত খাবার লোভে আর অপেক্ষা না করে রতন পন্ডিত চা আর সিগারেটের দাম দিয়ে, শ্বরণী বাবুর সঙ্গে বাসার উদ্দেশ্যে যেই রওনা দিলাম| বাসার উদ্দেশ্যে দু কদম এগুতেই পেছন থেকে রতন পন্ডিতের ডাক পড়ল| ভেবেছিলাম বোধ হয় চায়ের দামে গন্ডগোল করে ফেলেছি তাই ডাকছে| আমি এবং শ্বরণী বাবু দুজনেই ফেরত গেলাম তার কাছে| শ্বরণী বাবু দুষ্টুমির ছলে রতন পন্ডিত জিজ্ঞাস করলো
- কিরে রতন পন্ডিত, আমার কিপ্টা বন্ধু ঠিক মত টাকা দেয় নাই?
জিভ্বায় কামড় দিয়ে রতন পন্ডিত বলে উঠলেন
- না স্যার, ছি! ছি! উনি কিপ্টা হইতে যাবে কেন, উনি তো আমাকে বকশীষও দেয়| আসলে মাথায় একটা প্রশ্ন ছিলো, লেখক ভাই উত্তর দিচ্ছিলেন তা আপনি আসতে শেষ প্রশ্নটা আর করতে পারিনাই|
আমি তখন পাশ থেকে বলে উঠলাম
- কই উত্তর দিলাম তো, বললাম না যে আদম-হাওয়ার বিয়ে হয় নি|
- হ্যা এইটা তো দিয়েছেন, আরেকটা প্রশ্ন করা বাকি ছিল, শেষ প্রশ্ন এইটা|
- ঠিক আছে করো|
- আচ্ছা স্যার, বর্তমান সমাজ অবিবাহিত দম্পত্তিদের দারা জন্মান সন্তানদেরকে জারজ সন্তান বলে ডাকে। আমার প্রশ্ন হল আব্রাহামিক ধর্মনুযায়ী আমরা যেহেতু আদমের সন্তান, আর আপনি বললেন যে আদম-হাওয়ার বিয়ে হয় নি| তবে এই বর্তমান সমাজের দৃষ্টিতে আমরা সবাই জারজ সন্তান, তাই না?
আমি রতনের সহস দেখে অবাক, যদিও বাংলাদেশে এমন প্রশ্ন কাউকে করলে ভয়ানক ফলাফল বয়ে আনতে পারে| দেখলাম শ্বরণী বাবু খুব সুন্দর মলিন এক হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, এমন কঠিন প্রশ্নের কোন উত্তর আমার কাছে নেই| আমি পরাজিত এবং নিরস্ত্র সৈনিকের মত বললাম
- দুঃখিত ভাই, এমন কঠিন ভাবে আমি কখনো চিন্তাও করিনি| এর জবাব দেয়া আমার দ্বারা দুস্কর|
দেখে মনে হলো আমার কোথায় রতন পন্ডিত হতাশ হয়েছে| এরই মধ্যে শ্বরণী বাবু রতন পন্ডিতের প্রশ্নের জবাব দিতে ফেসফেসে গলায় জিজ্ঞাসা করলেন
- হ্যা তোমার দাড় করানো যুক্তি অনুযাই আমরা সবাই জারজ সন্তান| কেন রতন পন্ডিত? নিজেকে জারজ সন্তান বলে মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে?
- না মানে অপমানিত বোধ করছি| মান সম্মানে লাগছে বিষয়টা|
- রতন আমাকে একটা বেনসন দাও তো, তার পরে বলছি|
রতন পন্ডিত একটা সিগারেট এগিয়ে দিল| সিগারেট ধরিয়ে খুবই তৃপ্তির সঙ্গে ফুস ফুস ভর্তি করে ধোয়া টেনে, চোখ বন্ধ করে ধোয়া ছাড়তে বলল
- শুন রতন পন্ডিত! যদি নিজেকে জারজ সন্তান ভাবতে কষ্ট হয় তবে ছুড়ে ফেলে দাও এই নোংরা বাজে আব্রাহামিক কাহিনী গুলোকে| ভয় নেই, পাপ হবে না, কারণ এগুলো সব কটিই অযৌক্তিক কল্প কাহিনী মাত্র, বাস্তবতার সঙ্গে এদের কোন সম্পর্ক নেই|
বিকাল আন্দাজ চারটা বাজে, শ্বরণী বাবুর কথামত তার বাসার পাশের রতন পন্ডিতের চায়ের দোকানে বসে আছি| তিনি অনেক দিন পর আজ হঠাত ফোন করে বললেন
- কেমন আছিস, কোথায় আছিস জানা কিংবা জানানোর সময় নাই| এক প্রকাশকের সঙ্গে মিটিঙে আছি, মিটিংটা শেষ করেই বিকেল চারটার দিকে ফিরবো| বাসায় ওঠার আগে কলা পাউরুটি আর এক কাপ চা খেয়ে বাসায় উঠবো| ততক্ষণ তুই রতন পন্ডিতের চায়ের দোকানে আমার জন্য অপেক্ষা কর, অনেক দিন আমার ব্যস্ততার কারণে তর সঙ্গে কোন দেখা সাক্ষাত নেই, আজ থেকে আগামী সাত দিন আমার কোন কাজ নেই, তুই তল্পিতল্পা সমেত আগামী এক সপ্তাহের জন্য আমার বাসায় চলে আয়, জমিয়ে আড্ডা দেয়া যাবে, আর জানিসই তো তোকে ছাড়া আমি কতটা অচল|
যে রতন পন্ডিতের চায়ের দোকানে বসে আছি, তার পরিচয়টা না দিলেই নয়, পেশায় সে একজন চায়ের দোকানদার, খুবই চমত্কার একটা চরিত্র| নাম আবদুস সাত্তার, ডাক নাম রতন, যদিও সকলের কাছে সে রতন পন্ডিত নামেই পরিচিত| এর পেছনের কারণ হলো তার জ্ঞানের ভান্ডার এবং তার কথা বলার ভঙ্গি, খুব চমত্কার করে সাজিয়ে কথা বলতে পারেন| বয়স আন্দাজ চল্লিশের আশপাশেই হবে| কোন ডিগ্রী তার নেই, গ্রামের স্কুলের পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছিল মাত্র| তার পরেও দোকানে বসে বসে বিভিন্ন বিষয়ের উপর এমন সব জ্ঞান তিনি অর্জন করেছিলেন, যে তার কথা শুনে অবাক না হয়ে উপায় থাকে না| বিস্ময়ে প্রশংসা করলে বলে
- কি যে লজ্জা দেন স্যার| আমি মুর্খ সুর্খ চাওয়ালা, আমার আবার জ্ঞান| যা টুকটাক জানি তা আপনাদেরই বদৌলতে, আপনাদের মত জ্ঞানী মানুষেরা আমার দোকানে আসেন, এই অধমের হাতের চা খেতে খেতে গল্প গুজব করেন তাই শুনে শুনে যা শেখা, তাছাড়া টুকটাক বইতো পড়া হয়ই|
টুকটাক বই পড়ে বলতে তার নিজস্ব লাইব্রেরি আছে, রতন পন্ডিত লাইব্রেরি| তার সংগ্রহে কম করে হলেও দু'হাজারের উপরে বই আছে, এটাও তার ব্যবসার একটি অংশ| বই বিক্রি করা নয়, পড়ার জন্য বই ভাড়া দেয়া| বিষয়টা এমন যে ৫০০ টাকা জামিন রেখে রতন পন্ডিত লাইব্রেরির মেম্বার হতে হবে, এর পর মাত্র ১০ টাকা দিয়ে যে কোন একটা বই নিয়ে যান, পড়া শেষ করে সেই বইটি ফেরত দিয়ে যান, আরেকটা বই ভাড়া নিয়ে পড়তে আবার ১০ টাকা| আর মেম্বারশিপ বাতিল করার সিধান্ত নিলে সমস্যা নেই জামিন রাখা ৫০০ টাকা ফেরত দিয়ে দেয়া হবে| চা দোকানের ব্যবসার পাশাপাশি রতন পন্ডিতের লাইব্রেরির ব্যবসাটাও বেশ জমজমাট, পাঠক গ্রাহকের সংখ্যাও তার অনেক|
যাই হোক সময় কাটাতে চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে সময় কাটাতে রতন পন্ডিতের কাছ থেকে আজকের খবরের কাগজ নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখছি| রতন পন্ডিত আমাকে জিজ্ঞাস করলো
- স্যার চা খাবেন? আরেক কাপ চা বানিয়ে দেই? খান ভালো লাগবে|
শ্বরণী বাবুর অপেক্ষায় এখন পর্যন্ত দু কাপ চা সাবার করে ফেলেছি, এবার রতন পন্ডিত তৃতীয় কাপ চা খাবার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে| আমন্ত্রণ তো নয় যেন আন্তরিক আবদার, ফেলা যায় না তাই বললাম
- রতন পন্ডিত, আমার জন্য ওই চা'টা বানাও তো যেটা তুমি শ্বরণী বাবুর জন্য স্পেশাল করে বানিয়ে থাক|
- কোনটা? ওই কলিজা মিঠা চা?
আসলে কলিজা মিঠা নামটা মনে আসছিল না, তাই শ্বরণী বাবুর স্পেশাল চা বলেছিলাম| কলিজা মিঠা চা রতন পন্ডিত শুধুমাত্র শ্বরণী বাবুর জন্যই বানিয়ে থাকেন, নামটাও শ্বরণী বাবুই দেয়া| আমি বললাম
- হ্যা হ্যা, ঐটাই কলিজা মিঠা চা|
- জি আচ্ছা, এখুনি বানিয়ে দিচ্ছি|
বলেই রতন পন্ডিত চা বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন| কলিজা মিঠা চা আমি আগে খেয়েছি বটে কিন্তু বানানোর প্রক্রিয়াটা কি তা আমার আগে জানা ছিল না, প্রক্রিয়া এবং উপকরণ জানতেই মূলত আজ হঠাত করেই রতন পন্ডিতকে এই বিশেষ চা বানাতে বলা| দেখলাম অনেক সময় ধরে চায়ের পাতা জাল দেয়া এক কাপ পরিমান চায়ের সঙ্গে এক চামচ খেজুরের চিটা গুড়, তিন টেবিল চামচ চিনি, একটা এলাচি, দুটা লং এবং একটা পুদিনা পাতা দিয়ে খুব ভালো করে চামচ দিয়ে নাড়তে শুরু করলো রতন পন্ডিত| চিনি এবং গুড় খুব নিখুদ ভাবে চায়ের সঙ্গে মিশে গেলে, পিরিচের উপর কাপটি রেখে রতন পন্ডিত আমার দিকে এগিয়ে দিল শ্বরণী বাবু স্পেশাল কলিজা মিঠা চা|
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুমুক দিতে যাব, তখনই রতন পন্ডিত বলে উঠলো
- দারান স্যার, চুমুক দিয়েন না|
কথাটা বলেই একটা বেনসনের পেকেট থেকে একটা সিগারেটের বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল
- কলিজা মিঠা চা খাওয়ার একটা সিস্টেম আছে, প্রথমে ফুসফুস ভর্তি করে সিগারেটে জোরে একটা টান দিতে হয়, খবরদার ধোয়া কিন্তু ছাড়া যাবে না| এবার চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বুকে জমিয়ে রাখা ধোয়া ছাড়ুন| এই সিস্টেমে চা'টা খেয়ে দেখুন, পিনিক হবে|
আমি ভুরু কুচকে বললাম
- তুমি এত কিছু জানলে কেমনে? আমি যতটুকু জানি তুমি তো চা সিগারেট কিছুই খাওনা!
একটু ফেল ফেলিয়ে বোকা বোকা হাসি দিয়ে বলল
- চাদে দাড়াইলে কেমন অনুভুতি হয়ে, চাদের আবহাওয়া কেমন সেটা জানতে হলে নিজেকে চাদে যেতে হয় না, নিল আর্মস্ট্রংএর অনুভুতি থেকেই জানতে পারা যায়| চা সিগারেট আমি খাই না সত্যি, কিন্তু গ্রাহককে দেখে তাদের অনুভুতি কিছুটা হলেও অনুধাবন করা যায়, আর কলিজা মিঠা চা খাওয়ার সিস্টেমটা শ্বরণী বাবুর তৈরী|
রতন পন্ডিতের অসাধারণ যৌক্তিক উদাহরণে আমি পুরাই মুগ্ধ, তার কথামত সিস্টেম অনুযায়ী সিগারেটে টান দিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে ধোয়া ছাড়লাম| অতিরিক্ত টক খেলে মানুষের চেহারায় একধরনের কুচকান ভেঙচির ছাপ ভেষে উঠে| আমারও ঠিক তাই হলো, যদিও টক খেয়ে নয়, কলিজা মিঠা চা খেয়ে, অতিরিক্ত মিষ্টি|
অস্বস্তিকর একটা পরিস্থিতির মধ্যে আটকে আছি, রতন পন্ডিত খুবই উত্সাহের সঙ্গে চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে মনযোগ দিয়ে আমার চা খাওয়া দেখছে| আমার এই একটা সমস্যা, কোন কিছু খাওয়ার সময় যদি কেউ আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, ঠিক মত খেতে পারিনা| মনে হতে থাকে বোধ হয় লোকটা অনেকদিন কিছু খায়নি, তাই আমার খাওয়ায় লোভ দিচ্ছে, আর না হয় আমার খাবার খোয়ার ভঙ্গিটা অদ্ভুত, তাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে| অস্বস্তিতে অসহ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞাসই করে বসলাম
- কি দেখছ অমন করে তাকিয়ে?
খুবই গদগদ হাসি দিয়ে রতন পন্ডিত বললো
- কিছু না স্যার, ওই বিশেষ পদ্ধতিতে চা খেয়ে আপনার পিনিক হলো কিনা বুঝার চেষ্টা করছি|
পিনিক কি জিনিস, কিনবা পিনিক হলে কেমন অনুভুতি হয়, সত্যি সে সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই| তবুও তাকে খুশি করতে বললাম
- হ্যা, ভরপুর পিনিক হয়েছে|
আমার কথাটা শুনে তার চেহারায় একটা সস্তির ছায়া চেয়ে গেল, তার হাসিতে একধরনের সফলতার ছাপ, যেন আমার পিনিকই তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল| হঠাত রতন পন্ডিতের চেহারার পরিবর্তন ঘটলো, দুশ্চিন্তা গ্রস্থ এক আবহাওয়া তার পুরো চেহারায় ছেয়ে গেল, এই চেহারার সঙ্গে আমি আগে থেকেই পরিচিত| যারা রতন পন্ডিতকে চিনে না তারা দেখলে রীতিমত ভয়ই পাবে| ও আগে বলা হয়নি, রতন পন্ডিতের একটা আজব রোগ আছে, মাঝে মাঝে খুবই জটিল এবং ধারালো কিছু প্রশ্ন তার মাথা চাড়া দিয়ে উঠে, যার উত্তর দেয়া সহজ হয় না| আর এমন প্রশ্ন মাথায় চাপলেই তার চেহারায় একটা মানসিক রোগী রোগী ভাব প্রতিফলিত হয়| পরিবর্তিত চেহারায় এমন লাজবাব প্রশ্ন সে ধার্মিকদের কাছে করলে তারা বলে, রতন পন্ডিতের ঘাড়ে শয়তান জীনে আসর করসে কিংবা তার উপর অপদেবতা ভর করসে| যে যাই বলুক, এখন আমি পরেছি বিপদে, কৌতুহলী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললো
- স্যার, একটা প্রশ্ন মাথায় জোরে জোরে গুতা দিচ্ছে, গুতা ঠিক না রীতিমত শুই দিয়ে খোচা| লাল রঙের বিষ পিপড়ার মত বিষয়টা মগজের ভেতর কিলবিল করছে| উত্তর না পেলে মনে হয় পাগল হয়ে যাব|
আধা পাগল, তাই বলে এতটা নয় যে কামড় বসাবে, তবুও খুব সাবধানতার সঙ্গে জানতে চাইলাম
- প্রশ্নটা কি?
- আদম আর হওয়াটা কে ছিল?
আমি ভাবলাম এত সামান্য প্রশ্ন করতে চেহারার এত পরিবর্তন করা লাগে নাকি? আমার খুদ্র জ্ঞানানুযায়ী উত্তর দিলাম
- আদম হওয়া হল আব্রাহামিক ধর্ম অর্থাত ইহুদি, খ্রিস্টান এবং ইসলামিক ধর্ম মতে মানব জাতির সুত্রপাতের দুই চরিত্র| আব্রাহামিক ধর্ম মতে যারা প্রথম পুরুষ এবং নারী হিসেবে পরিচিত, প্রথম পুরুষের নাম আদম এবং প্রথম নারীর নাম হাওয়া| এই দুজনের যৌনকর্মের ফসল হল আমরা অর্থাত মানুষ।
- আচ্ছা স্যার, আব্রাহামিক ধর্মে যা বলা আছে তা কি বাস্তব না কাল্পনিক?
রতন পন্ডিতের কাছ থেকে এমন প্রশ্ন আমি আশা করিনি| বিষয়টা কিছুটা ধর্মানুভূতির দিক থেকে স্পর্শ কাতর বিধায় আমি চারিদিক ভালো ভাবে দেখে নিলাম যে আশপাশে কোন জিহাদী বেশভুষার কেউ আছে কিনা| কারণ তেমন কারো কানে কথাগুলো পৌছালে ঘাড়ে আর গর্দান থাকবে না, নাড়ায়ে তাকবীর আল্লাহুয়াকবার হয়ে যাবে| প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে আমি বললাম
- এ প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না|
একটু নিরাশ ভঙ্গিতে রতন পন্ডিত বলল
- জানেন না?
- না|
- সমস্যা নেই| এবার আরেকটা প্রশ্ন আছে?
- কি?
- আদম-হাওয়ার কি বিয়ে হয়েছিল?
- আব্রাহামিক ধর্মের কোন গ্রন্থে অর্থাত ইহুদিদের তাওরাত, খ্রিস্টানদের বাইবেল কিংবা মুসলিমদের কুরান কথাও এমন কোন উল্লেখ নেই যে তাদের বিয়ে হয়েছিল।
ইতিমধ্যে পেছন থেকে ফেস ফেসে গলায় আওয়াজ এলো
- লেখক, কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করলাম? আর রতন পন্ডিত, কেমন আছ?
রতন পন্ডিত খুব সারল্যের সঙ্গে জবাব দিল
- জি ভালো|
পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি ডান কাঁধে চটের ঝোলা ঝোলানো ক্ষয়রী রঙের খদ্দরের পাঞ্জাবি পড়া, আর গলায় মাফলার জড়িয়ে শ্বরণী বাবু দাড়িয়ে আছে| বেশ রোগা হয়েছে দেখলাম, এত দিনের ব্যস্ততা এবং নিজের প্রতি অযত্নের চাপ তার চেহারায় পরেছে| শ্বরণী বাবুর করা প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলাম
- আপনার গলায় কি হয়েছে, কন্ঠ ফেসফেসে শোনাচ্ছে কেন?
- আর বলিস না, গতকাল প্রতিবেশী বাচ্চাদেরকে আইসক্রিম কিনে দিয়ে ছিলাম, সাথে আমিও নিজের জন্য ১লিটারের ভেনিলা ফ্লেবারের আইসক্রিম কিনে এক বৈঠকে সবটা শেষ করেছিলাম| তার ফলাফল হলো আমার এই ফেসফেসে কন্ঠ| ফেসফেসে কন্ঠে আমার কিছু যায় আসে না, বাচ্চা গুলোকে সমান্য স্নেহের দ্বারা তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারলেই আমি সন্তুষ্ট| আমার কাছে অবাক লাগে যে এক সময় এই পৃথিবীতে আরবের মরুর বুকে এমন চরিত্রহীন নোংরা মানসিকতার বেদুইন বাস করতো, যে নয় বছরের শিশু মেয়েকে বিছানায় উলঙ্গ করে শারীরিক নির্যাতন করেও সন্তুষ্ট হত না| সেই শিশু ধর্ষক আবার নিজেকে ঈশ্বরের বন্ধু বলে দাবি করতো| যাই হোক লেখক বাকি কথা বাসায় গিয়ে হবে|
- কিছু খাবেন না? আপনার প্রিয় কলিজা মিঠা চা, কিনবা সিগারেট|
- না না, বাসায় চল| আমাদের দুজনের জন্য পুরান ঢাকার রয়েল থেকে শাহী মোগলাই আর দু লিটার বাদামের সরবত এনেছি|
বাদামের সরবত আমার খুব প্রিয়, সরবত খাবার লোভে আর অপেক্ষা না করে রতন পন্ডিত চা আর সিগারেটের দাম দিয়ে, শ্বরণী বাবুর সঙ্গে বাসার উদ্দেশ্যে যেই রওনা দিলাম| বাসার উদ্দেশ্যে দু কদম এগুতেই পেছন থেকে রতন পন্ডিতের ডাক পড়ল| ভেবেছিলাম বোধ হয় চায়ের দামে গন্ডগোল করে ফেলেছি তাই ডাকছে| আমি এবং শ্বরণী বাবু দুজনেই ফেরত গেলাম তার কাছে| শ্বরণী বাবু দুষ্টুমির ছলে রতন পন্ডিত জিজ্ঞাস করলো
- কিরে রতন পন্ডিত, আমার কিপ্টা বন্ধু ঠিক মত টাকা দেয় নাই?
জিভ্বায় কামড় দিয়ে রতন পন্ডিত বলে উঠলেন
- না স্যার, ছি! ছি! উনি কিপ্টা হইতে যাবে কেন, উনি তো আমাকে বকশীষও দেয়| আসলে মাথায় একটা প্রশ্ন ছিলো, লেখক ভাই উত্তর দিচ্ছিলেন তা আপনি আসতে শেষ প্রশ্নটা আর করতে পারিনাই|
আমি তখন পাশ থেকে বলে উঠলাম
- কই উত্তর দিলাম তো, বললাম না যে আদম-হাওয়ার বিয়ে হয় নি|
- হ্যা এইটা তো দিয়েছেন, আরেকটা প্রশ্ন করা বাকি ছিল, শেষ প্রশ্ন এইটা|
- ঠিক আছে করো|
- আচ্ছা স্যার, বর্তমান সমাজ অবিবাহিত দম্পত্তিদের দারা জন্মান সন্তানদেরকে জারজ সন্তান বলে ডাকে। আমার প্রশ্ন হল আব্রাহামিক ধর্মনুযায়ী আমরা যেহেতু আদমের সন্তান, আর আপনি বললেন যে আদম-হাওয়ার বিয়ে হয় নি| তবে এই বর্তমান সমাজের দৃষ্টিতে আমরা সবাই জারজ সন্তান, তাই না?
আমি রতনের সহস দেখে অবাক, যদিও বাংলাদেশে এমন প্রশ্ন কাউকে করলে ভয়ানক ফলাফল বয়ে আনতে পারে| দেখলাম শ্বরণী বাবু খুব সুন্দর মলিন এক হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, এমন কঠিন প্রশ্নের কোন উত্তর আমার কাছে নেই| আমি পরাজিত এবং নিরস্ত্র সৈনিকের মত বললাম
- দুঃখিত ভাই, এমন কঠিন ভাবে আমি কখনো চিন্তাও করিনি| এর জবাব দেয়া আমার দ্বারা দুস্কর|
দেখে মনে হলো আমার কোথায় রতন পন্ডিত হতাশ হয়েছে| এরই মধ্যে শ্বরণী বাবু রতন পন্ডিতের প্রশ্নের জবাব দিতে ফেসফেসে গলায় জিজ্ঞাসা করলেন
- হ্যা তোমার দাড় করানো যুক্তি অনুযাই আমরা সবাই জারজ সন্তান| কেন রতন পন্ডিত? নিজেকে জারজ সন্তান বলে মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে?
- না মানে অপমানিত বোধ করছি| মান সম্মানে লাগছে বিষয়টা|
- রতন আমাকে একটা বেনসন দাও তো, তার পরে বলছি|
রতন পন্ডিত একটা সিগারেট এগিয়ে দিল| সিগারেট ধরিয়ে খুবই তৃপ্তির সঙ্গে ফুস ফুস ভর্তি করে ধোয়া টেনে, চোখ বন্ধ করে ধোয়া ছাড়তে বলল
- শুন রতন পন্ডিত! যদি নিজেকে জারজ সন্তান ভাবতে কষ্ট হয় তবে ছুড়ে ফেলে দাও এই নোংরা বাজে আব্রাহামিক কাহিনী গুলোকে| ভয় নেই, পাপ হবে না, কারণ এগুলো সব কটিই অযৌক্তিক কল্প কাহিনী মাত্র, বাস্তবতার সঙ্গে এদের কোন সম্পর্ক নেই|
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই আগস্ট, ২০১৫ বিকাল ৩:৩১
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ভাঁট ফুল

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৪৩

ভাঁট ফুল
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

ছোট কালে মায়ের সাথে, হাত ধরে
মেঠো পথে হেটে চলে যেতাম-
মইজদী পুর গ্রামে, বোনের শশুর বাড়ি
রাস্তার পাশে মাঝে মাঝে ভাঁট ফুল-
দেখে মুগ্ধ হতাম, আর বলতাম কী সুন্দর!
ইচ্ছের হলেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোরগের ডাক , বিজ্ঞানের পাঠ এবং গাধার প্রতি আমাদের অবিচার

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:৫৫


গ্রামে বেড়ে ওঠা মানেই একটা অসাধারন শৈশব। আমাদের সেই শৈশবের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল মক্তবের মৌলভি সাহেবদের গল্প। তারা বলতেন, ভোররাতে মোরগ ডাকে কারণ সে ফেরেশতা দেখতে পায়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বঙ্গ ও বেঙ্গলীর শিকড় কী মুছে গেছে? নাকি পুণ্ড্রনগর সভ্যতার মত হারিয়ে গেছে ??

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৯:০৮


বঙ্গ ও বেঙ্গলীর শিকড় কী মুছে গেছে নাকি পুণ্ড্রনগর সভ্যতার মত হারিয়ে গেছে ?? সামু ব্লগের এই ক্রান্তিকালে বিষয়টি নিয়ে একটু আলোচনা/পর্যালোচনা করে কিছু সময় কাঠানো যাক... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংকটে আওয়ামী লীগের কর্মীরা কোথায় দাঁড়িয়ে?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:০০

সংকটে আওয়ামী লীগের কর্মীরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বহুবার প্রমাণ হয়েছে যে, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি থাকে তার তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে। তাদের শ্রম, ত্যাগ, জেল-জুলুম সহ্য করার মানসিকতা এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

খাজনা

লিখেছেন রাজীব নুর, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:২৯



মন! মানুষের মন! মানুষকে তছনছ করে দেয়!
কখনো সে বাঘ, কখনো সে অজগর, কখনো সে শত্রু, কখনো সে বন্ধু!
কখনো সে ঈশ্বর, কখনো সে শয়তান, কখনো সে নিয়তি!
বিদিকিচ্ছিরি কান্ড!

লম্বা টানা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×