আজ পূর্ণিমা অপূর্ব গোল চাঁদ উঠেছে আকাশে। চাঁদের দিকে তাকিয়ে মনে হয় যেন যুগ যুগ ধরে বাস করছি এই পৃথিবীর বুকে। জানলার ধারে বসেএসবই ভাবছিল মনসিজ গাঙ্গুলী। কে এই মনসিজ তা এবার একটু দেখে নেওয়া যাক। গল্পে চরিত্র চিত্রন না হলে না কি গল্পের ভিত নড়বড় করে। তা একটু ভিত গড়বার চেষ্টা করি। মনসিজ গাঙ্গুলী ওরফে সিজ নেহাত ই সাদামাটা মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে । তা এহেন সিজের জীবনে মাধ্যমিকে একটা অঘটন ঘটে যায়। ফিজিক্যাল সায়েন্স , লাইফ সায়েন্স আর ম্যাথম্যাটিকস এ লেটার পেয়েছিল সে। সাথে সর্বমোট নাম্বার ও ছিল সম্মানজনক। এই তিনটে চিঠিই ছিল তার জীবনে পাওয়া সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। অবশ্য তার থেকেও বেশী তার বাবা মায়ের কাছে। বেসরকারী সংস্থার সাধারণ কর্মী তার বাবার গর্ব কে দেখে! তিনি স্বগক্তি করেছিলন এবারে সবাই দেখবে আমার ছেলেও কোনো কোম্পানির চিফ ইঞ্জিনিয়ার হয়ে রাজত্ব করবে। সিজের মনে হয়েছিল কেন ইঞ্জিনিয়ার না হলে কি রাজত্ব করা যায় না? কবিরা রাজা হতে পারে না? তবে এসব প্রশ্ন সে তার বাবাকে করেনি। কারন তার বাবা অনেক আগেই তাঁ র স্বপ্নপূরনের চেষ্টা শুরু করে দিয়েছিলেন। সায়েন্স গ্রুপে দুটো করে টিচার রেখে ।আর সেই টিচাররাও বলতেন তোর মেধা আছে তোর হবে ।কিন্তু সে সব কথায় তেমন কোনো আনন্দ হতো না তার ।কারন সে চাইত তার লুকানো খাতার কবিতা পড়ে এমন কথা কেউ বলুক ।বাবা মা জানুক বা নাই জানুক সে তো জানত তার কবিতা লগ্নে জন্ম ।তবু এইসব চিঠিপত্র সেই বয়সে তার বুকেও কনফিডেন্সের এমন বিল্ডিং বানিয়েছিল যে তারও মনে হয়েছিল যে পড়াশুনাটা কোনো ব্যপার না ।দিব্যি ফাঁকি দিয়ে , লুকিয়ে কবিতা লিখেও গর্ব করার মতো রেজাল্ট বাগানো যায় ।তাই বাংলা কবিতার জয়যাত্রার মহান দায়িত্বটা তাকেই নিতে হল ।আর সবাই জানে কবিদের কাছে কবিতার প্রতিশব্দ প্রেম ।তাও আবার একতরফা , বুকে চিনচিনে ব্যথা মাখা , দেবদাস মার্কা প্রেম ।ফলাফল ছয় মাসে দুটো ডায়েরী কবিতায় ভরে গেল ।স্কুলের ফার্স্ট টার্মে যথাক্রমে অংকে পন্চাশ এ আট ফিজিক্সে দশ আর কেমিস্ট্রিতে পনেরো ।অতিরিক্ত বায়োলজি একফালি চাঁদ তুলেছিল তিরিশ নাম্বার দিয়ে ।তার বাবার চোখ ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল । কারন না জেনেই তিনি হিটলারি কায়দায় কেবল টি ভি আর ফোনের সবরকম কানেকসনকে নির্বাসিত করেছিলেন ।
তবে প্রেম বা কবিতার আঠা হল ফেভিকলের থেকেও জোড়াল । একবার যার গায়ে লাগে ইহজীবনে তার মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম ।
কিন্তু মৃত্যু আসন্ন হলে কমবেশি সবাই আধ্যাত্মিক হয় ।তাই টেস্ট পরীক্ষা যখন দরজায় কড়া নারছে তখন তার মনে হল ক্যল্কুলাস জিনিসটি কি ? খায় না মাথায় দেয় ?সায়েন্সের সুমেরু কুমেরু টাইপ সিলেবাসের দিকে তাকিয়ে তখন তার মাথা ভনভন করছে ।বিনা যুদ্ধে নাহি দিব প্রান –একথা স্মরণ করে সে দিনরাত এক করে পড়া শুরু করল ।
কিন্তু স্টেজে কি আর সব মেকাপ করা যায় ? তাই ফার্স্ট ডিভিশন জুটলেও অংক আর ফিজিক্সের অবস্থা ছিল খুবই খারাপ । এরপরেও তার বাবা দুঃসাহস সঞ্চয় করে জয়েন্টের রেজাল্টের দিকে তাকিয়ে থাকলেন । না সেখানেও তথৈবচ ! সরকারি কলেজের আশা তিনি করেননি কিন্তু বেসরকারীতেও করুন অবস্থা । তবু তিনি তার শেষ সম্বল দিয়েও ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানোর কথা ভাবলেন । কিন্তু ইতিমধ্যে সিজের মন ঘোষণা করল ‘ওরে রবীন্দ্রনাথ কি আইনস্টাইন হওয়ার কথা ভেবেছিলেন ? নাকি কিটস অ্যাটমিক থিওরী নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন ? সেরকম তোর এজন্মও শুধু কবিতার জন্য ।তাই সেদিন সে তার বাবার কাছে গিয়ে বলেছিল “ আমি কবিতা লিখি বাবা । আরও লিখব । তুমি দেখো কবিতা লিখে কত নাম হবে আমার ।কবিরাও রাজা হতে পারে । তোমার ছেলেও একদিন অডি গাড়ি নিয়ে এপাড়ায় ঢুকবে । “
সেকথা শুনে তিনি চিৎকার করেননি । সে ক্ষমতা তার ছিল না ।তিনি শুধু শান্তভাবে বলেছিলেন ‘ আজকাল কি আর বই কেউ পড়ে ? তোর মধ্যে ট্যলেন্ট ছিল তাই চেস্টা করেছিলাম ।তুই ইচ্ছে করে সব নষ্ট করলি ।আজ বুঝতে পারছিস না কিন্তু একদিন পারবি ।‘
সেই মুহূর্তে তার মনে হয়েছিল ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ছাড়াও যে বড় হোয়া যায় সে কথা সে প্রমান করে ছাড়বে । তবে তা বাবাকে বোঝাতে যায়নি । বাবাদের বোঝানো যায় না ।তাই কলেজে কেমিস্ট্রি অনার্স নিয়ে একটা দুর্দান্ত শুরু করল ।মনে মনে বলল যে জীবনের এই ইনিংসটা সে বাঁচাতে নামেনি , জিততে নেমেছে ।
যাক আবার ফিরে যাই শুরুতে যেখানে মনসিজ বসে চাঁদ দেখছিল ।তার এই নিস্পলক তাকিয়ে থাকার জন্য চাঁদও একটা অস্বস্তি শুরু করেছে । হঠাৎ মোবাইলের রিংটোনে সম্বিত ফেরে তার । স্ক্রিনে রোহিনীর ছবি ভেসে উঠছে ।………………………………………ক্রমশ

সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জুলাই, ২০১৫ সকাল ৯:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




