somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অদিতি (দ্বিতীয় পর্বের শেষ পর্ব)

০৭ ই জুলাই, ২০২৩ দুপুর ১২:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
**** এই গল্পখানা মিররডল কে উৎসর্গকৃত *****




বারো টা বাজলো । দুরে গির্জার ঘন্টা ঢং করে বেজে জানিয়ে দিলো । বাদশা চলে গেছে অনেক্ষন হলো । উঠে দাড়াতে গিয়ে বুঝলাম পায়ে তেমন জোর পাচ্ছি না । আবার বসে পরলাম । মাথার মধ্যে বেশ ঝিম ঝিম করছে । সোমরস বেশি খেয়ে ফেলেছি মনে হয় । উত্তেজনায় ঠিক বুঝতে পারি নাই কতোটুকু খেলাম ।সাধারনতো আমি এক পেগ নেই ওটাই ধিরে ধিরে শেষ করি । কিন্তু আজ রাত অন্য আর দশ টা রাতের মতো না ।অন্তত এতোক্ষন ছিলো না ।দুই পায়ের অনিচ্ছা সত্বেও উঠে দাড়ালাম ।আর যাই হোক সোফায় রাতের ঘুম টা আমি ঘুমাতে চাই না । আপাততো আমি বাদশা কে ভুলে যেতে চাচ্ছি । মাথার ভেতরের স্মৃতির টেপ রকর্ডারে প্রীয় কিছু গান জমা আছে তার ভেতর থেকে এক টা বাজিয়ে দিলাম ।মোবাইল টা বেজে উঠে মেজাজ টা বিগড়ে দিলো । সহেলীর কল ।একবার ভাবলাম ধরবো না কিন্তু আবার না ধরলে বাজতেই থাকবে ।
হ্যালো স্যার কোন সমস্যা ? আপনার বাসার লাইট কেনো জ্বলছে?
সহেলী তুমি এখনো কেনো ঘুমাও নাই ?
স্যার ঘুমাতে যাচ্ছিলাম আপনার বাসার লাইট জ্বলছে দেখে চিন্তা হলো তাই ভাবলাম ফোন করি । হালকা নিঃশ্বাস ছেড়ে রাগ কিছু কমিয়ে নিলাম । সহেলী তুমি জানো রাতে আমি ফোন রিসিভ করি না তারপরেও তুমি কল করেছো । যাও ঘুমাতে যাও সকালে কথা হবে ।
সরি স্যার , চিন্তা হচ্ছিল তাই । আর হবে না স্যার । গুড নাইট ।
হুম গুড নাইট, ফোন টা সোফার উপরে ফেলে দিয়ে ঘুড়ে দাড়াতেই পায়ের কাছে এক টুকরো কাগজ দেখলাম । নিচু হয়ে কাগজ খানা তুলে দেখলাম সেখানে বাদশা সাহেবের বাড়ির ঠিকানা । ঠিকানা দেখে অবাক হলাম । চট্রগ্রাম থেকে লোকটা আমার সাথে দেখা করতে এসেছে । চট্রগ্রামের মিরের সরাই নামের এক এলাকার নাম । লোকটার উপর মায়া হলো । অনেক দূর থেকে এসেছে । কিন্তু তার সমস্যার বেশিরভাগটাই তার অভ্যাসের কারনে হচ্ছে । এখানে আমার কিচ্ছু করার নাই । লোকটার আত্মিয় স্বজনের উচিৎ তাকে ভালো কোন রিহ্যাব সেন্টারে ভর্তি করে দেয়া । খোঁজ নিলে দেখা যাবে তার স্ত্রী বহল তবিয়তে বেঁচে আছেন । অথচ লোকটার ধারনা সে তার স্ত্রী কে খুন করেছে । বিচিত্র মানুষের মন বিচিত্র তাদের ধারনা । কাগজ খানা ফেলে দিতে যাচ্ছিলাম কিন্তু অপর পাশে কিছু লেখা দেখে কৌতুহল বসতো দেখলাম ওখানে লেখা আগামীকাল দেখা হবে । হাসি পেলো । মিঃ বাদশা আগামীকাল কেনো ইহ জনমে আর দেখা হচ্ছে না আমাদের । কাগজ টা দলা পাকিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিলাম ।

ক্ষুধা পেয়েছে অনেক । এই মধ্য রাত্রে খাবার খেতেও ইচ্ছা করছে না । ঠান্ডা পাউরুটি আর ঠান্ডা মানচুরিয়ান ছাড়া তেমন কিছু খাবার নাই । ঠান্ডা পাউরুটিতে কামড় দিয়ে থুক করে ফেলে দিলাম । বিচ্ছিরি স্বাদ । ফ্রিজ থেকে পানির বোতল বের করে ঢক ঢক করে কিছুটা পানি খেয়ে টলতে টলতে বিছানায় নিয়ে গেলাম নিজের ওজনদার শরীরটা কে । চোখের পাতা ভারি হয়ে আসছে । হাত পা ছড়িয়ে দিলাম বিছানায় । হালকা গরম লাগছে । বাসায় এসি নাই । এসির বাতাস আমার সহ্য হয় না । চোখের পাতায় কেউ যেনো পাথর বেঁধে দিয়েছে । অসংখ্য মুখ ঘুরে ঘুরে আসছে । কিছু চেনা কিছু অচেনা । এক ফাঁকে সহেলী কেও দেখলাম । মেয়েটা খালি হাসে । অকারনে হাসে ।

হঠাত করে ঘুম বা তন্দ্রা যাই বলি তা কেটে গেলো । কতোক্ষন ঘুমিয়েছি বলতে পারবো না তবে অনুভব করলাম সমস্ত ঘর ঠান্ডা হয়ে আছে । বরফ ঠান্ডা । বিছানার চাদর টা কে কায়দা করে গায়ে টেনে নিলাম । কিন্তু ঠান্ডা কমছে না । তিব্র কিন্তু বিচ্ছিরি ধরনের পঁচা গন্ধে ঘর ভরে আছে । মৃত কোন প্রানী পঁচে গেলো যেমন হয় ঠিক তেমনি । নিশ্চই জানালা খোলা রেখেছি । বাহির থেকে গন্ধ আসছে । বেশ বিরক্ত লাগছে । এখন উঠে যেয়ে জানালা বন্ধ করতে হবে । খাট বরাবর ডান পাশের জানালাটা বন্ধ করতে গিয়ে দেখি ওটা বন্ধ । বাঁদিকের জানালাটা ও দেখলাম বন্ধ । নিশ্চই চিকা জাতীয় কিছু খাটের নিচে মরে পরে আছে । চাদর মুরি দিয়ে আবার শুয়ে পরলাম । যা করার কাল সকালেই করবো আপাতত ঘুমিয়ে নেই । পঁচা গন্ধ টা ধিরে ধিরে বাড়ছে । খানিক টা পুরানো কোন কফিন যা অনেকদিন মাটির নিচে ছিলো এমন কফিনের ডালা খুলে গেলে যেমন গন্ধ থাকে ঠিক তেমনি । স্বাভাবিক শ্বাস নেয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে । মুখের উপর থেকে চাঁদর সরিয়ে উঠে বসলাম । মনে হলো সমস্ত শহরে এক সাথে লোডশেডিং হচ্ছে । ঘোড় অন্ধকার, আমি আমার নিজের হাত ঠিক মতো দেখতে পাচ্ছি না । চোখের মনি বড় করে অন্ধকার সয়ে নেবার চেষ্টা করলাম । আদ্ভুত ভাবে এখন আর ঠান্ডা লাগছে না , চাপা একটা গুমটো গরম লাগছে। যেনো কোন কিছুর মধ্যে বন্দি হয়ে আছি । নিজের হাত ছুঁয়ে দেখলাম বেশ ঘেমেও গেছি । হাতড়ে মোবাইল খুজতে লাগলাম কিন্তু পেলাম না। বিছানা থেকে নামার জন্য পা বাড়াতে খেয়াল করলাম আমি পা নাড়াতে পারছি না। অনেক চেষ্টা করলাম । দুই হাত দিয়ে হাটু ধরে ঠেলাঠেলি করলাম নাহ একদম নাড়াতে পারছি না । আমার কোমর থেকে নিম্নাংশ সম্পুর্ন রুপে জমাট বেধে গেছে । গরম ভাব বেড়েই যাচ্ছে । গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে । প্রচন্ড পিপাষা পাচ্ছে। অন্ধকার খানিকটা সয়ে আসার পর ভালো করে চেয়ে দেখি সম্পুর্ন মাটির একটা ঘরের মতো কিছুর মধ্যে আমি আছি । একটা আর্তচিতকার আমার অজান্তেই গলা থেকে বেড়িয়ে এলো । আশেপাশে তাকিয়ে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্ক সজাগ হবার চেষ্টা করলাম । আমি আসলে এক টা কবরের মধ্যে আটকে গেছি ।

হঠাত করে মনে হলো এক টা কিছু বা এক টা মুখ আমার ঠিক মুখ বরাবর এসে দাড়ালো । অন্ধকারে দেখা যায় না কেবল অস্তিত্ব বোঝা যায় । মুখ টা আমার দিকে তাকিয়ে আছে । দুর্গন্ধটা এখন আর নাই তার বদলে চেনা একটা সুবাস যেন ধিরে ধিরে কেউ বাতাসে ছড়িয়ে দিলো । গন্ধ টা কেমন চেনা লাগছে । সহেলী সম্ভবাত এমন একটা পার্ফিউম ব্যবহার করে। মুখ টা ধিরে ধিরে যেনো আমার দিকে এগিয়ে আসছে। অন্ধকারে দেখা না গেলো একটা মনস্ত্বাতিক চাপ বেশ অনুভব করছি । ঠিক নাক বরাবর এসে থেমে গেলো । অন্ধকারের মধ্যেও মুখের অবয়েব পরিষ্কার দেখতে পেলাম । অনুভব করলাম মুখ টা চাপা হাসি হাসছে। যেনো পুরানো কোন জোকস মনে পরে গেছে। আর সহ্য করতে পারলাম না। যতোটা সম্ভব উঁচু গলায় জিজ্ঞাসা করলাম কে আপনি ? কি চান আমার কাছে? কোন প্রতিউত্তর দিলো না। নিরব একটা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো । দমবন্ধ ভাবটা কাটানোর জন্য চোখ বন্ধ করে মনে মনে বললাম আমি যা দেখছি তা সত্য নয় । এটা ভুল , এটা আমার মস্তিষ্কের সৃষ্টি। ইহা সত্য নয় । স্পস্ট শুনতে পেলাম কানের পাশে ফিস ফিস করে কে যেনো বললো এটাই সত্য । চোখ খুলে দেখি মুখটা নেই । আর আমি আমার বিছানায় বসে আছি । সারা ঘর ফটফটা আলোয় ভেসে যাচ্ছে । আমি দ্রুত আমার পা নেড়েচেড়ে দেখলাম নাহ বেশ নাড়তে পারছি, বুঝলাম স্বপ্ন দেখছি । হাফ ছেড়ে বাঁচলাম যাক । ঘরের জানালা দরজা সব খোলা । বিছানা থেকেই দেখতে পেলাম খাবার টেবিলে পানির ভর্তি জগ আর গ্লাস রাখা । পিপাষায় গলা শুকিয়ে আছে । পানি খাবার জন্য এক প্রকার ছুটেই গেলাম । ঢকঢক করে পানি খেয়ে জামার হাতার কোনা দিয়ে মুখ মুছে ভালো করে তাকিয়ে দেখি আসলে আমি আমার ঘরে নাই । সম্পুর্ন অচেনা এক বাসায় অন্যকারো বসার ঘরে আমি দাঁড়িয়ে আছি ।

কিছু টা দুরে কারো খস খস আওয়াজ পেলাম । মনে হলো কে যেনো পা টেনেটেনে হাঁটছে । সমস্ত বাড়িটা আলোয় আলোয় আলকিত । সব কিছু সাজানো গোছানো । সাধারনতো উচ্চবিত্তদের বাড়ি যেমন হয় । ছবির মতোন সুন্দর । দেয়ালে এক টা অদ্ভুত সুন্দর ছবি টানানো। জলরঙের ছবি। ছোট্ট একটা গ্রামের অতি চেনা একটা পুকুর যেনো আমার গাঁয়ের কোন চেনা পুকুর । টলটলা জলে এক ফোঁটা জল পরতে পরতে থেমে গেছে । শিল্পি তার সমস্ত দক্ষতা দিয়ে এঁকেছে । ছবিটার দিকে একমনে তাকিয়ে থাকলে এক ধরনের সুক্ষ অস্বস্তি যেন বুকের মধ্যে খঁচখচিয়ে ওঠে । জোলের ফোঁটাটা কেনো পরছে না এর জন্য অসম্ভব এক বেদনা জেগে ওঠে । বুকের ভেতর টা হু হু করে ওঠে । খস খস আওয়াজ টা যেনো আরো বেড়ে গেলো । আমি বলতে গেলে প্রায় ছবির ভেতর ডুবে গিয়েছিলাম । খস খস আওয়াজ আমাকে ছবি থেকে টেনে বের করে আনলো । আমার ঘাড়ের পশম গুলো আমার অজান্তেই দাঁড়িয়ে গেলো । হঠাত করে জ্বর এলে যেমন লাগে ঠিক তেমন অনুভব হতে লাগলো । মনে হলো ঠিক আমার পেছনে এসে কেউ দাড়ালো । হালকা নিঃশ্বাস ছাড়ার শব্দ পেলাম ।গরম নিশ্বাস পিঠ পুড়িয়ে দিলো । পাই করে উল্টা ঘুড়ে গেলাম, কেউ নাই । পেটের ভেতর একধরনের অস্বস্তি হতে লাগলো । আমার ঠিক ডান পাশের কোন এক টা জায়গা থেকে মৃদু গুনগুন আওয়াজ পেলাম । দুই তিন জন একসাথে গলা নিচু করে কথা বললে যেমন শব্দ হয় তেমন । বসার ঘর থেকে হেটে সেইদিক যাবার চেষ্টা করলাম ।

আবার অনুভব করলাম ঘারের কাছে কারো গরম নিঃশ্বাস। এবার যেনো ঠিক আমার পিঠের কাছেই ছিলো । যতোটা সম্ভব নিজেকে শান্ত রেখে গুনগুন শব্দের দিকে এগিয়ে গেলাম । আমার চলার সাথে সাথে গুনগুন শব্দ থেমে গেলো বদলে খুব জোরে দড়জা বন্দ হবার শব্দ পেলাম ঝড় এলে যেমন করে দরজা শব্দ করে আটকে যায় ঠিক তেমনি । দাঁড়িয়ে গেলাম আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম বাঁদিকে এক টা বারান্দা আছে । বারান্দার দড়জা খোলা । বারান্দা মানে বাড়ির বাহিরে যাবার রাস্তা । বারান্দার দিকে হাঁটা দিলাম । যতই আগাই বারান্দার দড়জার কাছাকাছি হতে পারছি না । বারান্দার দরজা যেনো পেছনে পিছিয়ে যাচ্ছে । থেমে গেলাম । পিছিয়ে এসে বসার ঘরের জানালার দিকে এগিয়ে গেলাম কিন্তু একই অবস্থা । জানালা পিছিয়ে যাচ্ছে । যেনো এই বাড়ির ইট কাট পাথরের ভেতর জান চলে এসেছে। আশে পাশে তাকিয়ে আমি এটাও আবিষ্কার করলাম যে আমি একটা আস্ত রুমের মধ্যে আটকা পরে আছি এবং সেই রুম আমার সাথে সাথে চলাচল করে । আমি সামনে গেলে সে পিছিয়ে যায় আমি পিছিয়ে গেলে সে সামনের দিকে এগিয়ে আসে। এই প্রথম আমি ভয় পেলাম । অসম্ভব রকমের ভয় । আমি স্পস্ট বুঝতে পারলাম আমি একটা ধাঁধার মধ্যে আটকে গিয়েছি । যেখান থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব । আমি চাইলাম কেউ এসে আমাকে এই গোলোক ধাঁধা থেকে বের করে নিয়ে যাক । আমি কখনই প্রার্থনা করি নাই । আমি প্রায় প্রার্থনার মতো বসে পরলাম । কায়ো মনে বাক্য একটাই কথা ভাবতে লাগলাম আমাকে এখান থেকে বের হতে হবে । আমি যা দেখি তা সত্য নয় । একদম সত্য নয় । চোখ মেলতেই আব্বা কে দেখলাম । আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। ভদ্রলোক নেভীতে ছিলেন । তাকে তার সামরিক বাহিনীর ধবধবে সাদা পোশাকে সোনালি রিবনে মোড়ানো ব্যাজে অসম্ভব পৌরষদিপ্ত লাগছিলো । তিনি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন । তার হাত চেপে ধরলাম। ঠিক সেই ছোট বেলার অনুভূতি । আব্বার হাত ধরের অনুভূতি । বলিষ্ঠ কিন্তু মোলায়ম একটা হাত যেখানে স্বস্তি আর পরম নির্ভরতার এক সম্মিলিত আহবান আছে। ছোট বেলায় শুনেছি মৃত মানুষ কে স্বপ্ন দেখা অর্থ নিজের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া । খানিকটা ভয় পেলাম । বাবা যেনো আমার মনের কথা বুঝে গেলেন । তার স্মিত হাসি আর চির চেনা নিকটিনের সুবাস আমার শরীরে এক অসীম শক্তি নিয়ে এলো ।তিব্র এক চিৎকার করে জেগে উঠলাম ।

শেষ রাতের আকাশের তারা তখনো আকাশে । যেন আমার জাগার অপেক্ষায় ছিলো । ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা ।মাথা ঝিমঝিম করছে।তারপরেও মনে হলো যেভাবেই হোক আজকের মধ্যে বাদশা নামের লোকটা কে খুঁজে বের করে তার কাছে যেতে হবে। ভদ্রলোক ভয়াবহ এক বিপদে আছেন । সম্ভাবত আজি তার মৃত্যু হতে পারে। গায়ের চাঁদর সরিয়ে বসার ঘরে ছুটে গেলাম । ভালো করে দেখে নিলাম আসলেই জেগে আছি না অন্য কোন স্বপ্নে ঢুকে পরেছি । সোফার কোনে বাদশার ঠিকানা লেখা কাগজটা পরে থাকতে দেখে যেন হাপ ছেড়ে বাঁচলাম । সহেলী কে এক টা চিরকুট লিখে চলে এলাম এয়ারপোর্ট । এক বন্ধুর মাধ্যমে চটগ্রাম যাওয়ার টিকেট কেটে নিলাম ।চট্রগ্রাম নেমে সোজা ভদ্রলোকের দেয়া ঠিকানায় চলে এলাম । একে ওঁকে জিজ্ঞাসা করে খুঁজে পেলাম বাড়ি টা । বিশাল প্রাসাদের মতো এক টা বাড়ি । খানিকটা পুরান আমলের জমিদারের বাড়ির মতো । বাড়ির গেট ঠেলে ঢুকতেই ভদ্রলোককে বাড়ির সামনের বাগানে পেলাম । আমাকে দেখে এগিয়ে এলেন যেনো আমার আসার কথা আগেই ছিলো । খবির সাহেব ভালো ঘুম হয়েছে, বাগানের কাদা মাখা হাত খানা বাড়িয়ে দিলেন । কোন উত্তর দিলাম না কারন তার চোখ বলছে সে যেন জানে গতোরাতে আমার সাথে কি কি ঘটেছে । ভদ্রলোকের হাত ধরে তাকে প্রায় টেনে তার বাড়ির ভেতর নিয়ে গেলাম । বসার ঘড়ে ঢোকার মুখে গতরাতের দেখা জলরঙের ছবি টা দেখতে পেলাম । ছবিটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বাদশা সাহেব কে জিজ্ঞাসা করলাম এই ছবি টা কার আঁকা । ভদ্রলোক মাথা নাড়তে নাড়তে বিজ্ঞের মতো বললেন ওটা আমার স্ত্রীর আঁকা । ভদ্রলোকের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলাম। ভালো করে আশেপাশে নজর বুলাতে একটা ব্যাপার স্পস্ট যে কাল স্বপ্নে যে জায়গায় ছিলাম এখন বাস্তবে ঠিক সেই জায়গায় আছি ।
আমি কি আপনার বাসা টা একটু ঘুড়ে দেখতে পারি , জিজ্ঞাসা করলাম ভদ্রলোক কে ।
হ্যা পারেন, আপনি দেখুন আমি আপনার জন্য চা করতে বলে আসছি । ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে একদিকে চলে গেলেন ।
গতরাতে যেইরকম দেখেছিলাম হুবাহু ঠিক তেমনি এই বাড়িটা । বসার ঘরের প্রতি টা বস্তু ঠিক একই জায়গায় আছে। মানুষ মাঝে মাঝে দুরবর্তি অনেক কিছু দেখতে পায় স্বপ্ন বা ঘোরের মধ্যে যা সে কখনোই দেখে নাই বাঁ সেই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত না । কিন্তু তাই বলে এতোটা নিখুত দৃশ্য কখনই সম্ভব না যদি না কোন ছবি বাঁ ভিডিও সে কখনো দেখে থাকে । ছবিটার কাছে আমি আবার গিয়ে দাড়ালাম । বুঝতে চেষ্টা করলাম যে ঠিক তেমন অনুভুতি হয় কি না যা গতোকাল রাতে হয়েছিলো । ভালো করে দেখার পর তেমন কিছু বুঝলাম না। খুব স্বাভাবিক একটা জলরঙের ছবি। কোথাও কোন অস্বাভাবিকতা নাই ।
ওটা কেবল ওই সময় জ্যান্ত হয়, পেছন থেকে ভদ্রলোক আচমকা বলে উঠলেন ।
কোন সময়? অবাক হবার ভান করে জিজ্ঞাসা করলাম ।
যেই সময় আপনি ওটা দেখেছেন, মৃদু হেসে চায়ের কাপ টা এগিয়ে দিলো । নিখুত ঝকঝকে সুন্দর এক কাপ চা। কাপের গায়ে একফোটা দাগের কোন চিহ্ন নাই । মনে হলো মাত্র প্যাকেট খুলে তাতে চা ঢেলে এনেছে ।
আপনি বুঝি খুব খুঁতখুঁতে , চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম ।
না আমি খুঁতখুঁতে না, আমার বাসার যে কাজের মেয়েটা আছে ও বেশ পরিপাটি করে রাখে সব কিছু । আমি অনেক এলো মেলো ।
আচ্ছা আপনার স্ত্রী কে ডাকুন ।
আমি মনে হয় বলেছিলাম আমার স্ত্রী কে আমি মেরে ফেলেছি । তাও অনেক দিন হবে । তিনি নেই ।
আচ্ছা মেরে ফেললেন কোন শাস্তি টাস্তি হলো না আপনার ।
না হয় নাই । কোন প্রমান কেউ খুঁজে পায় নাই ।
আপনি যে খুনটা করলেন কেউ দেখতে পায় নাই ?
আশ্চার্য কথা খুন করলে কি কেউ দেখিয়ে করে? হাসতে হাসতে বললো । যেনো অনেক মজার একটা জোকস বলে ফেলেছে ।
কেউ দেখে নাই ?
না কেউ দেখে নাই ।
তো তারপর কি করলেন?
উম ! মাটি চাপা দিলাম ।
কোথায় মাটি চাপা দিলেন ?
দেখুন আপনি মনে মনে যা ভাবছেন তা কিন্তু আমি ঠিকি পড়ে ফেলতে পারছি। বাঁকা হাসি হেসে উত্তর দিলো ভদ্রলোক ।
প্রচন্ড বিরক্ত হলাম । চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে ভদ্রোলোকের চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম কোথায় মাটিচাপা দিয়েছেন জায়গাটা দেখান । ভদ্রোলোক চোখে সরিয়ে নিলেন । না একদম চোখে চোখ সরাবেন না। আপনি এই অবস্থাতেই আমাকে সেইখানে নিয়ে যাবেন যেখানে আপনি আপনার স্ত্রী কে মাটি চাপা দিয়েছেন ।
হাস্যকর কথা বললেন , এইভাবে হয় নাকি । ঘুড়ে দাঁড়িয়ে হাটা দিলেন ।
চোখে চোখে তাকালে বুঝি মনের কথা বুঝতে পারেন না ? পেছন থেকে বললাম । না তা হবে কেনো, ইতস্তত করে বললো বাদশা । আমি ঠিকি বুঝে গেছি আপনি কি ভাবছেন । লোকটার কাঁধ ধরে ঘুড়িয়ে আমার বরাবর দাড় করিয়ে চোখে চোখ রেখে বললাম এইবার বলুন আমি কি ভাবছি । খবরদার একবারের জন্যেও চোখ সরাবেন না । ভদ্রলোক ঘামতে লাগলেন । দেখেই বোঝা যাচ্ছে প্রচন্ড অসস্ত্বি অনুভব করছেন । হাত থেকে ছাড়া পাবার জন্য ছটফট করছেন । শক্ত করে দুহাত দিয়ে চেপে ধরলাম তার কাঁধ। কাঁপতে কাঁপতে মেঝেতে বসে পরলেন । লোকটার পাশে বসলাম । অঝোরে কাঁদছেন ভদ্রলোক । পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে ধরে দাড় করালাম । আমি কিন্তু এখন বলতে পারবো আপনি কি ভাবছেন। চোখ মুছে দাড়াতে দাড়াতে বললো। মুচকি হেঁসে ওনাকে সোফায় বসিয়ে ভদ্রলোকের মুখোমুখি অন্য একটা সোফায় বসলাম ।
বাদশা সাহেব, আমি এতোদুর থেকে আপনার কাছে কেনো এসেছি জানেন?
কেনো, মুখ ভাড় করে মাথা নিচু করে জিজ্ঞাসা করলেন বাদশা ।
এক টা মানুষ নিজেকে নিজেই মানুষিক রুগী ভেবে মেরে ফেলছে এটা আসলে মেনে নেয়া যাচ্ছিলো না। আপনি একজন সুস্থ্য স্বাভাবিক মানুষ । আপনি কারো মন পড়তেই পারেন না। যা পারেন তা অনুমান । প্রকৃতি আপনাকে এক টা বিস্ময়কর শক্তি দিয়েছেন তা হলো অসম্ভব শক্তিশালী অনুমানশক্তি । আর এটা আপনি বেশ ভালোকরেই জানেন । বিপদের কথা হলো আপনি আপনার এই শক্তিকে নিয়ন্ত্রন করতে পারছেন না । আপনি আপনার শক্তির কাছে নতিস্বীকার করে নিয়েছেন । শক্তি মানুষের থাকে উহা মানুষকেই নিয়ন্ত্রন করতে হয় ।

কিন্তু আপনি যে কাল রাত্রে যা দেখেছেন ওটা তো মিথ্যা না, ছলছল চোখে বেশ জোর গলায় বললো ।

আপনি গতরাত্রে আমার মস্তিষ্কে একটা ছবি গেঁথে দিতে চেয়েছেন এবং তা যথার্ত ভাবে পেরেছেন ।আমি আপনার আঁকা সেই ছবির জগতে ঢুকে পরেছিলাম । আপনি চেষ্টা করলে খুব ভালো মানের মনের ডাক্তার হতে পাড়তেন। গতরাত্রে আমি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় সোমরস পান করেছিলাম এর ফলে আমার মস্তিষ্ক উদার ছিলো অস্বাভাবিকতা কে আমন্ত্রন জানাতে । আসলে অদিতি নামে আপনার জীবনে কেউ নাই । এই যে আপনার বাসার কাজের মানুষ গুলো আছে এরা আপনাকে অসম্ভব ভালোবাসে । তারা আপনার চারপাশে এক ধরনের সুরক্ষা দেয়াল তৈরী করে রেখেছে তাই আপনি এখনো বেঁচে আছেন নতুবা অনেক আগেই আপনি হয় পাগলা গারদে থাকতেন নতুবা রাস্তায় রাস্তায় ঘুড়ে বেড়াতে। আমি আপনার বাসায় আসার আগে আশেপাশে বেশকিছু লোকের সাথে কথা বলেছি তারা সবাই এক বাক্যে স্বিকার করেছেন আপনি চির কুমার । আপন একা থাকবেন না । কাছের মানুষ গুলোকে কাছে ডেকে নিন । আপনার জন্য একা থাকাটা আপনার মানুষিক স্বাস্থ্যের জন্য হানীকারক।

ভদ্রোলোক অঝোরে কেঁদে যাচ্ছেন । বাচ্চাদের কান্না বাঁ তরুনীর অভিমানী কান্না দেখতে ভালো লাগে কিন্তু বয়ষ্ক মানুষের কান্না মোটেও দৃষ্টি নন্দন না । এটা দেখার মধ্যে কোন আনন্দ নাই । বাদশা সাহেবের প্রাসাদ থেকে বেড়িয়ে আসার সময় দেয়ালে টানানো ছবিটা নিয়ে এলাম । ওটা ওনার জন্য সঠিক না। যদিও আমি কুসংস্কার বিশ্বাস করি না কিন্তু বাদশা সাহেবের জন্য ওটা জমতুল্য । তার অবিবাহিত জীবনের অদেখা স্ত্রীর হাতে আঁকা ছবি তার বসার ঘরের দেয়াল সুশোভিত না করলেও চলবে । ফিরতি পথে বাসেই উঠলাম । পকেটের স্বাস্থ্য কে আর খারাপ করাটা উপযোগী মনে হলো না । বাস ছাড়তে এখনো বেশ সময় । কানে হেডফোন গুজে গান শোনার চেষ্টা করলাম । বেশ কিছু ভয়েস মেসেজ এসেছে সহেলির । সব গুলাই জানি আপনি কোথায় ধরনের চিৎকার সম্মেলিত মেসেজ । পাখির পিউ পিউ ধরনের চিৎকার না মুরগীর কক কক ধরনের চিৎকার । মনে হবে ক্যাসেট টা কেউ একজন বার বার ঘুড়িয়ে একই কথা বাজাচ্ছে আপনি কোথায় ? আপনি কোথায়? তাই ভয়েস মেসেজে আগ্রহ না দেখিয়ে । গান শোনায় মোনযোগ দিলাম । ওই মালতীলতা দোলে পিয়ালতরুর কোলে পুব-হাওয়াতে ।

কেউ যখন ভয়েস মেসেজ পাঠায় তা শুনতে হয় অবহেলা করতে হয় না। চমকে পাশ ফিরে তাকাতে একজন শ্যামলা কিন্তু সুন্দর মুখশ্রী দেখতে পেলাম । হাসিমুখে পাশের সিটে এসে বসলেন। কেউ মেসেজ পাঠালে তা অবহেলা করতে হয় না। হাসি মুখে আবার বললেন ভদ্রোমহিলা । বেশ ভাড়ি গলা হৃদয় ছোয়ার মতো না কিন্তু মনে দাঁগ কাটার মতো। । আমি অদিতি, হাত খানা বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে ।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জুলাই, ২০২৩ সকাল ১০:০৯
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের ওভারব্রীজ

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:০৪

বেশ অনেকদিন আগের কথা। আমি কোন এক দুর্ঘটনায় পা এ ব্যাথা পাই। হাসপাতালে ইমারজেন্সি চিকিৎসা নেই। কিন্তু সুস্থ হতে আরো অনেক দেরী। সম্ভবত চিটাগাং রোডে (নারায়ণগঞ্জ) এ রাস্তা পার হবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বৈচিত্রে ভরা মহাবিশ্ব, তবে মানুষ কেন একই রকম হবে?

লিখেছেন মিশু মিলন, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৩৯



এবার শেখরনগর কালীপূজার মেলায় গিয়ে সন্ধ্যার পর ভাগ্নি আর এক দাদার মেয়েকে বললাম, ‘চল, তোদের অন্য এক জীবন দেখাই।’
সরু গলি দিয়ে ওদেরকে নিয়ে গেলাম পিছনদিকে যেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরানের পক্ষে বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি দাঁড়ানো সম্ভব নয়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:১৫


ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত যখন মাইক্রোফোনের সামনে কথা বলা শুরু করলেন , তখন তার চোখে রাগ ছিল না, ছিল এক ধরনের ক্লান্ত অভিমান। একটা মুসলিম দেশ, কোটি কোটি মুসলিম মানুষের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল্লাহর সুন্নাতের পরিবর্তে রাসূলের (সা.) বিভিন্ন মতের অনুমোদন সংক্রান্ত হাদিস বাতিল হবে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:৪৭



সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ৪৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
৪৩। পৃথিবীতে অহংকার প্রকাশ এবং কূট ষড়যন্ত্রের কারণে (অকল্যাণ)।কূট ষড়যন্ত্র এর আহলকে(এর সাথে সংযুক্ত সকল ব্যক্তি) পরিবেষ্ঠন করে। তবে কি এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতিটি শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি নির্মম দলিল।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৫:৫৫

প্রতিটি শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি নির্মম দলিল।
ইউনূস ক্ষমতা দখল ছিল লুটের উদ্দেশ্যে। কেন শিশুদের টিকা দেয়া হয় নাই? তাদের দায়িত্ব ছিল টিকা পৌঁছে দেওয়া, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×