আমার প্রথম সমুদ্র -দেখা অস্ট্রেলিয়ায় । পড়াশুনার জন্য আমি তখন সেখানে ছিলাম । দুনর্ীতি, হতাশা আর নোংরা রাজনীতিতে ভরা বাংলাদেশকে বুকের মধ্যে নিয়ে আমি তখন অস্ট্রেলিয়ায় অস্তিত ্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি । সে অন্য কাহিনী, অন্যদিনের জন্য থাক । আজ সমুদ্র দেখার কথা বলি।
পেপারে একটা চাকুরীর বিজ্ঞাপন দেখে সেখানে যাব রেজ্যুমি দেবার জন্য । জায়গাটার নাম 'এ্যালটোনা'। আমি যেখানে থাকি (ফুটস্ ক্রে) সেখান থেকে এক ঘন্টার পথ । ম্যাপ দেখে স্টেশন, রাস্তা সব বের করে ট্রেনে উঠে বসলাম । ট্রেন চলছে । দু'পাশে দেখার মত কিছুই নেই । বাংলাদেশে যেমন ট্রেনে যাওয়া মানেই দু'পাশে চোখ জুড়োনো সবুজ গ্রাম, আর এখানে শুধুই ফাঁকা , রু ভূমি । মাঝে মাঝে স্টেশন আর তার চারপাশ জুড়ে শহরতলি । অবশ্য শহরতলি গুলো চোখ জুড়োনো । প্রতিটা বাড়ীতে টালির ছাদ, একতলা বা দোতলা । কাঠের নীচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা আর সামনে বাগান । ফুল আর রঙের প্রাচুর্য দেখার মত । ট্রেন প্রায় ত্রিশ মিনিট চলার পর হঠাৎ দেখি দূরে নীল রেখার মত কিছু দেখা যাচ্ছে, ফাঁকা প্রান্তরের দিগন্ত রেখায় । ম্যাপ দেখে বুঝিনি শহরটা সমুদ্রের এত কাছে ! আমি চম্কে উঠি ! ট্রেন যত এগুচ্ছে নীল রেখাটা ততই স্পষ্ট আর কাছাকাছি ! 'এ্যালটোনা' শহর শুরু হল, ছবির মতই বটে ! ট্রেন থেকে দেখা যাচ্ছে, সোজা লম্বা রাস্তা, প্রতিটা রাস্তা শেষ হয়েছে বালুকাবেলায় গিয়ে আর রাস্তার দু'পাশে লাল টালির ছাদের একতলা বাগান ওয়ালা বাড়ী ।
ট্রেন এ্যালটোনা-স্টেশনে থামল । ট্রেন থেকে নেমে, স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখি, আমি যে রাস্তাটায় দাঁড়িয়ে সেটার শেষ প্রান্তে সেই নীল রেখা, জীবন্ত আর স্পষ্ট ! কোন দিকে না তাকিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম । যতই এগুচ্ছি ততই স্পষ্ট হচ্ছে 'তার' অস্তিত্ব । বাতাসটা অদ্ভুত সজীব । আমি এ্যালটোনা সমুদ্র সৈকতে এসে দাঁড়ালাম । আমার চোখ ভরে গেল জলে । ঝাপসা চোখে দাঁড়িয়ে রইলাম অকল্পনীয় বিশালতা আর সৌন্দর্যের সামনে । দেখতে দেখতে পানির রং পান্না সুবজ, আবার নীল, আবার কিছু অংশ সবুজ, কিছু অংশ নীল । পানির কিনারা ধরে হাঁটছে অনেকে। কিছু বুড়ো-বুড়ি বসে আছে কাঠের বেঞ্চে । একটা কালো কাঠের জেটি চলে গেছে সমুদ্রের ভেতর বহুদূর পর্যন্ত । জেটিটাতে উঠলাম, বাতাস মনে হচ্ছে আমাকে উল্টে ফেলে দেবে । জেটির শেষ মাথায় যখন পেঁৗছালাম তখন আমি যেন সমুদ্রের অনেকটা ভেতর দিকে ! বুক হিম করা গর্জন আর তীব্র জলের গন্ধ ! দু'টো লোক এই প্রচন্ড বাতাসের মধ্যে মাছ ধরছে, আমাকে দেখে হাত নাড়ল একজন, আমিও হাত নেড়ে হাসলাম, যদিও আমি তখন রীতিমত কাঁদছি । ুদ্র এই আমি দাঁড়িয়ে রইলাম সেই অতলান্ত জলের কাছে ।
আহ্ এত শূন্যতা কেন ! চুপি চুপি বললাম , আমার গণনাহীন শূন্যতার কাছে' তুমি' হেরে গেছো !
অনেকণ পর এক সময় ফিরে এলাম বীচ্-এ । ফুড-শপটা খুঁজে বের করলাম, যেখানে রেজ্যুমি দেবো । আমার রেজ্যুমি দেখে মিষ্টি হেসে মেয়েটা বলল - তোমার রেজ্যুমি রাখলাম, পরে আমরা যোগাযোগ করব ইন্টারভিউয়ের জন্য ।
দোকান থেকে বেরিয়ে রাস্তায় হাঁটলাম কিছুণ । সুন্দর সুন্দর সব বাড়ী । সব সুখী মানুষেরা থাকে সেখানে । আমার মত অসুখী মানুষের ফিরে যাওয়াই শ্রেয়ঃ । স্টেশনে ফিরে এলাম, একদম নির্জন, শুধু একটা টুকটুকে বুড়ি বসে আছে । আমাকে দেখে বলল - হ্যালো, চমৎকার সকাল , তাই না ? আমি উত্তর দিলাম - হঁ্যা, সত্যিই সকালটা খুব সুন্দর, জায়গাটাও । সে বলল - হঁ্যা, এ্যালটোনা খুব সুন্দর শহর এবং ধনীদের শহর - বলে সে একটা দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে চুপ করে গেল ।
আমি ফিরতি ট্রেনে উঠে বসলাম ।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




