somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মাদকের বিষে নীল সমৃদ্ধ নগরী

০৮ ই জুলাই, ২০১৬ রাত ৩:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




দূরের বাতিঘর
দুই বছর আগেও সব ঠিকঠাক ছিল সেখানে। কলকারখানায় উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য আর নগরবাসীর ব্যস্ততা সবই চলছিল সমান তালে। শহরের রাস্তা-ঘাট, আর্ট গ্যালারি আর নাইটক্লাবগুলো মুখর ছিল উচ্ছল পর্যটকদের পদচারণায়। কিন্তু হঠাৎ করে কী এমন হয়ে গেল যে, শহরের বড় বড় রেস্তোরাঁ, নাইটক্লাবের মালিকরা ঝোলাতে লাগলেন ‘ফর সেল’ আর ‘ফর রেন্ট’ নোটিশ। ব্যবসা গুটিয়ে নিতে থাকল বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানি। আর বন্ধ হতে লাগল বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানির কারখানাগুলো। কোন্ যাদুমন্ত্রে ফাঁকা হয়ে যেতে থাকল শহরটির রাস্তাঘাট? তবে কি কোনো ভয়ঙ্কর অভিশাপ গ্রাস করল মায়া সভ্যতার উত্তরাধীকারীদের? হ্যাঁ, অভিশাপই বটে! তবে তা কোনো পৌরাণিক অভিশাপ নয়, বর্তমান সভ্যতার এ অভিশাপের নাম ‘মাদক’।
বিষাক্ত মাদকের ছোবল আর মাদকব্যবসার অভিশাপেই ভুতুড়ে হতে চলেছে মেক্সিকোর লিওন স্টেটের মন্টেরি জেলার সমৃদ্ধ নগরী ‘ব্যারিও অ্যান্টিগু’। মেক্সিকোর সর্বোচ্চ মাথাপিছু আয়ের শীর্ষে থাকা অন্যতম এই ব্যারিও নগরী এবং মন্টেরি মোট জিডিপির সাড়ে সাত শতাংশ যোগান দিয়ে থাকে। চার মিলিয়ন অধিবাসীর এই শহরের রয়েছে জাতিসংঘ ও আঞ্চলিক বিভিন্ন সম্মেলন অনুষ্ঠানের গৌরব। এখানেই রয়েছে মেক্সিকোর বিখ্যাত উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র ‘মন্টেরি ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি’। এছাড়াও শহরটির পরিচিতি রয়েছে মেক্সিকোর ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল পাওয়ার হাউস’ হিসেবে। মেক্সিকোর বেশিরভাগ বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কারখানা ছাড়াও বিশ্বখ্যাত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান জনসন অ্যান্ড জনসন, ওয়ার্লপুল, ক্যাটারপিলার, জেনারেল ইলেক্ট্রিকের কারখানা রয়েছে ব্যারিও এবং এর আশপাশে। ফলে সেখানকার অধিবাসীরা এই শিল্পায়নের ফল ভোগ করছিলেন এবং এক পর্যায়ে শহরটি সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। শহরটির সমৃদ্ধ আর্ট গ্যালারি আর রঙিন নৈশজীবন দারুণভাবে আকৃষ্ট করে পর্যটকদের। দুই বছর আগেও সপ্তাহান্তের ছুটি কাটাতে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১০ হাজার পর্যটকের আগমন ঘটত ব্যারিওতে। কিন্তু চিত্রটা দ্রুতই পাল্টে যেতে থাকে ২০১০ সালের পর।
মেক্সিকো উপসাগরের ড্রাগ কার্টেল নির্মূলে নিযুক্ত লস জেটাস নামে সাবেক মাদকবিরোধী কমান্ডোদের একটি গ্রুপ ২০১০ সালে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে নিজেরাই মাদক-চোরাচালান নিয়ন্ত্রণের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে মন্টেরি এলাকায়। তারা অন্যান্য ড্রাগ কার্টেলের মতো শুধু আমেরিকায় মাদক চোরাচালান করেই সন্তুষ্ট থাকেনি। চাঁদাবাজি, কিডন্যাপিং এবং স্থানীয় পর্যায়ে মাদক বিক্রি করে তারা ব্যারিওর পরিবেশকে খুব দ্রুতই ভয়ানক করে তোলে। অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ হয়ে ওঠে, যখন তারা বিভিন্ন সংঘবদ্ধ অপরাধ করতে থাকে এবং ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি করে। মার্কেটের মতো জনবহুল জায়গায় অপরাধ সংঘটনের ফলে ক্রেতারাও ভয় পেয়ে সরে পড়তে থাকে। আর ব্যবসায় মন্দা দেখে একে একে ব্যবসা গোটাতে বাধ্য হন ব্যবসায়ীরা। যারা এখনো টিকে আছেন তারাও ব্যবসা বড় করছেন না ভয়ে। মাদকব্যবসায়ীরা নাইটক্লাবের মালিকদের বাধ্য করছে মাদকদ্রব্য বেচাকেনায়। আবার নিজেরাও লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসায় নেমে স্থানীয় অর্থনীতিতে তাদের ভিত পাকা করে বসছে। বিখ্যাত লা কাসা আমারিল্লা নাইটক্লাবের মালিক, একজন আমেরিকান মহিলাকে দেখা গেল ব্যবসা গোটাচ্ছেন। কারণ তাকে মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে হুমকি দিয়েছে ড্রাগ লর্ডরা। তার মতো আরো অনেকেই চলে যাওয়ায় ৪০টি নাইটক্লাবের মাত্র ৮টি এখন টিকে আছে ব্যারিওতে।
মন্টেরিও এখন পুরোপুরি মাদকব্যবসায়ীদের কব্জায়। ভয়ে সেখানকার অনেক অধিবাসীই টেক্সাস সিটিতে গিয়ে বাস করছেন। মাদকব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের মধ্যেই এখন যুদ্ধ বেধে যায় মাদকব্যবসায়ীদের। ফলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে হামেশাই। ২০১১ সালের আগস্টে এক জুয়ার আড্ডায় টাকা ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বে নিহত হয় ৫২ জন। চলতি বছরের মে মাসের মাঝামাঝি মন্টেরির বাইরে পাওয়া যায় ৪৯টি মস্তকবিহীন মৃতদেহ। এ রকম আরো বহু সংঘর্ষ ও হত্যার ঘটনায় ২০১১ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ৬০০ লোক মারা গেছে মন্টেরিও এবং ব্যারিওতে। ফলে স্থানীয় অধিবাসীদের দিন কাটছে আতঙ্কে। বড় কোম্পানিগুলো ও শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থনীতির চাকাও থমকে গেছে। পুরো শহর যেন ঝিমিয়ে পড়েছে মাদকের নেশায়।
তবে আশার বাণী শোনাচ্ছেন লিওনের গভর্নর, ব্যারিওর সাবেক মেয়র ও কিছু জনপ্রতিনিধি। তারা সবাই মিলে আবার ব্যারিওর হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করতে চান। তবে তাদের প্রচেষ্টা যতদিন সফল না হচ্ছে, ততদিন ব্যারিওর রাস্তাঘাট হয়তো ক্রমেই আরো ফাঁকা হতে থাকবে। আতঙ্ক ঘিরে রাখবে শহরের বাড়িগুলোকে, আর নাইটক্লাবগুলোতে রাতের বেলা ঝলমলে আলোর বদলে জ্বলবে ‘ফর সেল’ লেখা সাদা কালো সাইন। তথ্যসূত্র : এএফপি
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুলাই, ২০১৬ রাত ৩:৫৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশ কি মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৩২

বাংলাদেশ কি মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে?

প্রশ্নটি এখন আর নিছক কল্পনা নয়।
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান Makkah Joint Defence Agreement-এ স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা জানেন না তাদের জন্য! কফি এনিমা (Coffee Enema)!

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৩

কফি এনিমা হলো মলদ্বার দিয়ে কোলন বা বৃহদন্ত্রে তরল কফি প্রবেশ করিয়ে পেট পরিষ্কার করার একটি বিকল্প পদ্ধতি। নিচে এটি শরীরে দেওয়ার সাধারণ প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে উল্লেখ করা হলোঃ

প্রয়োজনীয় উপকরণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ একটি পরিচ্ছন্ন শৌচাগার

লিখেছেন রাজসোহান, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৮



বাড়িটা দেখতে বাড়ির মতো না, যেনো একটা ঘোষণা। দ্যাখো, আমি কে।

গেটে দুইটা সিংহ, পাথরের, মুখ হাঁ করা; সিংহ দুইটা কী পাহারা দিচ্ছে তারা নিজেরাও জানে না। ভিতরে উঠান... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসায় শিশুর নিরাপত্তা কোথায়?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০

মাদ্রাসায় শিশুর নিরাপত্তা কোথায়?
====================
একটি ১১ বছরের শিশু যার বয়স খেলাধুলা, পড়াশোনা আর স্বপ্ন দেখার। সেই শিশুকে যদি যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয় এবং তার গর্ভে একটি সন্তান জন্ম নেয়, তাহলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মক্তব চালু করলে শিশুরা ফিরে আসবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪২


ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। মুসা বিন শমসেরের ছেলে। মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে পুরো দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন, নতুন নতুন আইডিয়া দিচ্ছেন। মনে হয়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×