“জীবনবিধান(দ্বীনের) ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই.....”(আল-কুরআনঃ ২, ২৫৬)
“জীবনব্যবস্থা(দ্বীন) নিয়ে যারা তোমাদের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয় নি, তোমাদেরকে দেশ থেকে বের করে দেয় নি তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না; নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালবাসেন। আল্লাহ কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনে নিষেধ করেন, যারা জীবনব্যবস্থা(দ্বীন) নিয়ে তোমাদের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছে, তোমাদেরকে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে এবং বের করে দেয়ার কাজে সহায়তা করেছে.....”(আল-কুরআনঃ ৬০, ৮-৯)
“কোনো অমুসলিম নাগরিককে যে অত্যাচার করল বা তার অধিকার ক্ষুন্ন করল বা তাকে সাধ্যাতীত পরিশ্রম করাল বা তার অমতে তার থেকে কিছু নিল, কেয়ামতের দিন আমি হবো তার বিপক্ষে মামলা দায়েরকারী।” (আল-হাদিস)
“যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিককে কষ্ট দিলো আমি তার পক্ষে বাদী হব। আর আমি যার বিরুদ্ধে বাদী হব কিয়ামতের দিনে আমি হব বিজয়ী।” (আল-হাদিস)
উপরের এ বাক্যগুলো দিয়েই ইসলামে মুসলিম-অমুসলিম সম্পর্কের মূলনীতি সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারনা লাভ করা যায়। অমুসলিমদের মৌলিক মানবীয় অধিকার রক্ষায় সচেতনতা প্রদর্শন, তাঁদের প্রতি সদাচরণের নির্দেশ এবং তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষনের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত এই মূলনীতি নিঃসন্দেহে ইসলামের সহনশীল মনোবৃত্তির পরিচায়ক, যা ইসলামের ব্যাপারে জানতে আগ্রহী কোন ব্যক্তিরই চোখ এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়।
কিন্তু, আমাদের সমকালীন বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। ইসলামের মূলনীতি ও ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞানতা, ভাসাভাসা জ্ঞান কিংবা একপেশে দৃষ্টিভঙ্গির কারনে অনেক অমুসলিম তো বটেই, বিপুল সংখ্যক মুসলিমও ইসলামের অমুসলিম নীতির ব্যাপারে সমালোচনায় মুখর। অনেককে অপরাধবোধেও ভুগতে দেখা যায়। তার উপর, ‘জিয্ইয়া কর’- এর কথা উঠলে তো কথাই নেই; ইসলাম যে অমুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিকের বেশী কিছু ভাবে না-তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে এই করনীতিকে উপস্থাপন করে দেয়া হয়। আবার, এর সপক্ষে কিছু ব্যাখ্যা দিতে গেলে, সেটিকে কৈফিয়তমূলক বা অ্যাপলোজেটিক(Apologetic) অপচেষ্টা বলে অবজ্ঞা করা হয়।
এমতাবস্থায়, এই বিষয় নিয়ে নন-অ্যাপলোজেটিক বা অ-কৈফিয়তমূলক কিছু লেখা খুবই কঠিন। কিন্তু, একজন প্রায়োগিক(Practical) মুসলিম হিসেবে যেহেতু, ইসলামকে সকল মানুষের জন্যই ঐশী উৎস হতে উৎসারিত একটি যৌক্তিক ও সুষম জীবনব্যবস্থা হিসেবে মেনে নিতে হয়, সেহেতু ইসলামের কোন নীতিমালার ব্যাপারে অপরাধবোধে আক্রান্ত হয়ে কাউকে কৈফিয়ত দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এক্ষেত্রে যেটি করা যেতে পারে সেটি হচ্ছে, উক্ত বিতর্কিত নীতিমালাটিকে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা এবং উদাহরণ সহকারে তুলে ধরে তা গ্রহন বা বর্জনের বিষয়টি শ্রোতার জন্যই ছেড়ে দেয়া।
এ দৃষ্টিভঙ্গিতেই ইসলামে মুসলিম-অমুসলিম সম্পর্কের কাঠামোটিকে ব্যাখ্যার পথে অগ্রসর হচ্ছি। মনে রাখা দরকার যে, ইসলামের যে কোন ধরণের মূলনীতির উৎস আল্লাহর বাণী (আল-কুরআন) এবং মুহাম্মাদের(স) কথা(হাদিস) ও কর্ম(সুন্নাহ্)। এছাড়া, মুহাম্মাদের(স) পরবর্তী চার খলিফার(খোলাফায়ে রাশেদুন) অনুসৃত নীতিসমূহকে ইসলামের যথার্থ প্রয়োগ বলে সকল যুগে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ঐক্যমত রয়েছে। এ কারনে, এদেরকে সর্বোত্তম নজির হিসেবে সামনে রেখেই ব্যাখ্যার কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হবে।
ইসলামের অন্য অনেক নীতিমালার মতই অমুসলিমের সাথে সম্পর্কেরও দুইটি দিক রয়েছে- একটি ব্যক্তিগত আর অপরটি সামষ্টিক।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানুষ হিসেবে ইসলামে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের মৌলিক মানবীয় অধিকার স্বীকৃত। তাঁদের এই অধিকারের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের বিরুদ্ধে মুহাম্মাদের(স) হুঁশিয়ারী তো আমরা এই লেখার শুরুতেই দেখেছি। এর বাইরেও তিনি মানুষ হিসেবে তাদের সমানাধিকারের ঘোষনা দিয়েছেন এভাবে, “তাদের রক্ত আমাদের রক্তের মতো এবং তাদের ধনসম্পদ আমাদের ধনসম্পদের মতো”। তিনি এবং তাঁর নিকটতম অনুসারীরা(সাহাবীরা) এই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। সন্দেহ নেই, ধর্ম হিসেবে একজন অমুসলিম যা কিছুর উপর বিশ্বাস রাখেন, ইসলামে সেগুলোকে পছন্দ করে না। কিন্তু, কুরআনে, “তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন এবং আমাদের জন্য আমাদের দ্বীন”- এ কথা বলে তাঁর ঐ ধর্ম পালনের অধিকারের প্রতি পূর্ণাঙ্গ শ্রদ্ধা দেখানো হয়েছে। এমনকি মদ্য উৎপাদন এবং শুকর পালনের মত ইসলামে চিরতরে নিষিদ্ধ কাজগুলোও অমুসলমানদের নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে করতে দেয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে এবং এ সবের ক্ষতিসাধনকারী অন্যান্য ব্যবসার মতই এর পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য। কুরআনে অন্য ধর্মের উপাস্যদের নিন্দা করার ব্যাপারেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নবম হিজরী সনে নাজরান প্রদেশের খৃষ্টান প্রতিনিধিদল মুহাম্মাদের(স) সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে এলে তাদের উপাসনার জন্য তিনি মসজিদে নববীর একটি কোণ ছেড়ে দিয়েছিলেন। উমর(রা) জেরুজালেমের সহস্তে নিয়ন্ত্রনভার গ্রহনকালীন সময়ে একটি গীর্জা সামনে অবস্থান করা অবস্থায় নামাযের সময় উপস্থিত হয়। গীর্জা কর্তৃপক্ষের শত অনুরোধেও তিনি সেখানে নামায পড়তে রাজি হন নি, যাতে পরবর্তীকালে মুসলিমরা ঐ গীর্জাকে মসজিদে পরিণত করার নূন্যতম অজুহাতও না পান। মুহাম্মাদের(স) মৃত্যুশয্যায় যে কয়টি ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, তাদের মাঝে অমুসলিমদের সাথে সদাচরণের কথাও ছিল। এমনকি, উমর(রা) তাঁর শেষ সময়ে তাঁর উত্তরসূরীর উদ্দেশ্যে যে নির্দেশনামা রেখে গিয়েছিলেন তাতে তিনি বলেছিলেন, “নতুন খলিফার প্রতি আমার নির্দেশ, তিনি যেন নীতিমালা এবং চুক্তি অনুযায়ী সেই সব অমুসলিমের দেখাশোনা করেন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের(রা) আশ্রয়ে রয়েছে, তাদের সম্মান ও সম্পদের রক্ষায় প্রয়োজনে যুদ্ধ করেন এবং তাদের সামর্থ্যের অতিরিক্ত করের বোঝা না চাপিয়ে দেন।” এ সকল কিছুর ভিত্তিতে ইসলামী আইনে বুৎপত্তিসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ এই ঐক্যমতে পৌছে গিয়েছেন যে, অমুসলিম নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান মুসলিমদের জন্য ওয়াজিব(অবশ্য পালনীয়) এবং তাদের কোনরূপ কষ্ট প্রদান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাঁদের মতে, “অমুসলিম নাগরিককে যদি কেউ কষ্ট দেয়, একটি খারাপ কথাও বলে, এমনকি অসাক্ষাতেও তাদের সম্মানের উপরে বিন্দুমাত্র আক্রমন চালায় কিংবা তার সাথে অকারণ শত্রুতার ইন্ধন যোগায়, তাহলে সে আল্লাহ, তাঁর রাসূলের(স) এবং দ্বীন ইসলামের দায়িত্বকে লংঘন করলো।”
(সম্প্রতি কুরআনের বর্ণিত কুরবানী সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে রীট আবেদনকারী বিপক্ষে কথা বলতে গিয়ে যে সব 'একনিষ্ঠ' মুসলিম ঐ ব্যক্তির সম্প্রদায় তুলে অশ্লীল গালিগালাজ করেছেন তাদেরকে উপরের কথাগুলো ভেবে দেখার অনুরোধ রইল।)
উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে একজন ব্যক্তি অমুসলিমের সাথে অপর ব্যক্তি মুসলিমের সম্পর্কের রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা। মানুষ হিসেবে তাঁর কোন অধিকারের প্রতিই ইসলামে অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয় নি এবং তাঁর মানবীয় মর্যাদাকে সমুন্নত রাখার ব্যাপারে মুসলিমদের বারেবারে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
এবারে, আসা যাক, সামষ্টিক পর্যায়ে মুসলিম-অমুসলিম সম্পর্কের নীতিমালা বিষয়ে। কিন্তু, সে আলোচনায় যাওয়ার আগে দুইটি প্রশ্নের গ্রহনযোগ্য মীমাংসা হয়ে যাওয়ার অতীব প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।
এক. ব্যক্তিগত পর্যায়ে একজন অমুসলিমের মৌলিক মানবীয় অধিকারের প্রতি ইসলামের পূর্ণ শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে শুধুমাত্র মানুষ না বলে 'অমুসলিম' অভিধায় অভিহিত করা হচ্ছে?
দুই. মানুষ হিসেবে মুসলিম-অমুসলিমের জীবন ও সম্পদের মূল্য সমান ঘোষনা দেয়া সত্ত্বেও তাঁকে ‘জিম্মী’ নামে অভিহিত করে আলাদাভাবে ‘জিয্ইয়া কর’ চাপিয়ে দিয়ে কেন তাঁকে দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিকে পরিণত করা হচ্ছে?
সে সব নিয়ে আলোচনা নিয়ে আসছি এর পরের পর্বে।
ইসলামে মুসলিম-অমুসলিম সম্পর্কঃ একটি অ-কৈফিয়তমূলক আলোচনা পর্ব-১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
২৬টি মন্তব্য ২২টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
ডায়োজেনিস সিন্ড্রম

ডায়োজেনিস সিন্ড্রমে আক্রান্ত মানুষের ঘর
আমার একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের কিছু অদ্ভুত আচরণ দেখে বুঝতে চাচ্ছিলাম যে তার এমন আচরণ কোনো মানসিক সমস্যা কিনা। তার আচরণের বর্ণনা দেই ইন্টারনেটে, আর তখন জানতে... ...বাকিটুকু পড়ুন
আল কোরআনের ১১৪ সূরায় হানাফী মাযহাবের সঠিকতার অকাট্য প্রমাণ (পর্ব-৩০)

সূরাঃ ৩০ রূম, ৩২ নং আয়াতের অনুবাদ-
৩২। যারা নিজেদের দীনে মতভেদ সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে।প্রত্যেক দল নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উৎফুল্ল।
সূরাঃ ৩০ রূম, ২৯ নং... ...বাকিটুকু পড়ুন
হামে শিশুদের মৃত্যুর দায় ডঃ ইউনুস গভার্নমেন্টের
ইউনিসেফ হামের টিকা কেনার জন্যে গত তত্তবধায়ক সরকার প্রধান ড' ইউনুসকে বারবার অনুরোধ করেছিলো। আমরা এখনো ইউনুস স্যারের উত্তর পাই নাই। কিন্তু, প্রশ্ন হচ্ছে, ইউনিসেফকে প্রধান উপদেষ্টা পর্যন্ত যেতে হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন
মহাশূন্যের অন্তহীন দিগন্তে: আগামীর মহাকাশ গবেষণা, মানবসভ্যতা এবং আল কুরআনের বিস্ময়কর দিকনির্দেশনা
মহাশূন্যের অন্তহীন দিগন্তে: আগামীর মহাকাশ গবেষণা, মানবসভ্যতা এবং আল কুরআনের বিস্ময়কর দিকনির্দেশনা

ভূমিকা:
মানুষ যখন প্রথম আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছিল তখন সেই বিশাল নীলিমা তার... ...বাকিটুকু পড়ুন
যুগে যুগে সারদা দেবী

নদীর নাম রুপসা।
জীবনানন্দ দাশ তার কবিতায়ও রূপসা নদীর কথা বলেছেন। এই নদীতে স্নান করেছেন- রবীন্দ্রনাথের মা এবং স্ত্রী। বর্ষাকালে রুপসা নদী যেন যৌবনে ফিরে যায়। কি তেজ! কি জলের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।