somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নূর হোসেনের 'সাম্রাজ্য' দখলে নিচ্ছেন বিএনপির গিয়াস! দায়ও বর্তায়!!!

১১ ই মে, ২০১৪ সকাল ৮:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের অফিস, মার্কেট, বালুমহালসহ অবৈধ নানা প্রতিষ্ঠান বেদখল হয়ে যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন গিয়ে বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পলাতক নূর হোসেনের ‘সাম্রাজ্য’ দখল করে নিচ্ছেন বিএনপির সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিন ও তাঁর লোকজন। শিমরাইল ট্রাকস্ট্যান্ডে নূর হোসেনের অফিসটি তাঁরা দখলে নিয়েছেন। সেখান থেকে আধা কিলোমিটার দূরে শীতলক্ষ্যার তীরে উচ্ছেদ করা অবৈধ বালুমহালও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে গিয়াস উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা। এর কিছু দূরেই শিমরাইল মোড়ে এমপি মার্কেট নামে পরিচিত কাসসাফ মার্কেটও দখলে নিয়েছেন গিয়াস উদ্দিন ও তাঁর লোকজন। এই এলাকা ঘিরে রয়েছে মাদক কেনাবেচার প্রকাশ্য হাট, মাছের আড়তসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এগুলোও এখন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন গিয়াস ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে শিমরাইল মোড়ের ট্রাকস্ট্যান্ডের ভেতরে সিটি করপোরেশনের জায়গায় গড়ে তোলা ভবনে নূর হোসেনের অফিস তালাবদ্ধ। কিছু অংশ পুড়ে গেছে। ওই ভবনের ভেতরে রয়েছে ট্রাক মালিক সমিতির কার্যালয়, সিটি করপোরেশনের তথ্যকেন্দ্র ও নূর হোসেনের ব্যক্তিগত অফিস। ওই অফিস ঘিরে গিয়াস উদ্দিনের ১৫-২০ জন সহযোগীকে পায়চারি করতে দেখা যায়। তাঁদের মধ্যে মো. নাদিম নামের একজন বলেন, ‘এটা আগে থেকেই গিয়াস উদ্দিনের অফিস ছিল। কিন্তু জোর করে রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে দখলে নিয়েছিল নূর হোসেন ও তাঁর দুই শতাধিক সন্ত্রাসী। এখানে সিটি করপোরেশন ও মালিক সমিতির অফিস থাকলেও পুরোটাই নূর হোসেন নিয়ন্ত্রণ করতেন।’ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা গিয়াসের অন্য সহযোগী সালাম বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ সব জেনেও তাঁকে (নূর হোসেনকে) কিছু বলত না। এই ট্রাকস্ট্যান্ড ঘিরে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লাখ টাকা চাঁদাবাজি হতো। সেই চাঁদার টাকায় নূর হোসেনের সন্ত্রাসী বাহিনী দাপট দেখাত। এখানে এক বছর ধরে রাতে উলঙ্গ যাত্রাপালা ও জুয়ার বোর্ড বসত।’
নূর হোসেনের অপকর্মের প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন ট্রাকচালকসহ আশপাশের লোকজন জানায়, পুলিশসহসহ প্রশাসনের সামনেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলত এই ট্রাকস্ট্যান্ডে। নূর হোসেনের অফিসের চারপাশে ছিল সিসি ক্যামেরা। ওই ক্যামেরায় অনেক রাঘববোয়ালের আসা-যাওয়ার ছবি আছে। সেটি দেখলেই সব গোমর ফাঁস হয়ে যাবে।
কাঁচপুর ব্রিজের পশ্চিম পাশে বালুমহালে কথা হয় স্থানীয় শেখ সাদী এন্টারপ্রাইজের মালিক মনিরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সাত খুনের পর নূর হোসেনের বালুমহাল এখন সাবেক এমপি গিয়াসের লোকজন দখলে নেওয়ার পাঁয়তারা করছে। তাঁর অধীন স্থানীয় সন্ত্রাসী ইকবালের গ্রুপ দুই দিন আগে এখানে এসে হুমকি দিয়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের শাসিয়ে গেছে, তাদের ছাড়া অন্য কাউকে টাকা (চাঁদা) না দিতে।’ স্থানীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ীরা জানান, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে গিয়াস উদ্দিন এই বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করতেন। এরপর নূর হোসেন দখল করে নেন তা। বর্তমানে নূর হোসেন পালিয়ে যাওয়ায় সেটি দখলে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে গিয়াসের লোকজন। নূর হোসেন ও গিয়াসকে স্থানীয় বাসিন্দারা নদীখেকো বলেই জানে।
গতকাল বিকেল ৩টায় ফজলুর রহমান অ্যান্ড ব্রাদার্স ফিলিং স্টেশনের পেছনে গিয়ে দেখা যায়, আশপাশে ডোবা ও আবর্জনার স্তূপ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে একটি টং ঘরে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রকাশ্যে চলত মাদক কেনাবেচা। প্রতি বোতল ফেনসিডিল এক হাজার টাকা, এক পিস ইয়াবা বিক্রি হতো চার থেকে পাঁচ শ টাকায়। ঘরের দেয়াল কেটে তৈরি করা হয়েছে মাদক বেচাকেনার বিশেষ বুথ। ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার সারোয়ার বলেন, প্রকাশ্যে এখানে মাদক কেনাবেচা করত নূর হোসেনের লোকজন। সাত খুনের পর এটা বন্ধ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বলেন, এই মাদকহাট বিএনপি আমলে গিয়াসের লোকজন নিয়ন্ত্রণ করত। সেটি পুনরায় দখলে নিতে আবার তারা তৎপর হয়েছে।
বিকেল ৩টায় শিমরাইল মোড় বাসস্ট্যান্ডে কাশশাফ মার্কেটে গিয়ে দেখা গেছে, শতকোটি টাকা মূল্যের বহুতল এই মার্কেটে শতাধিক দোকান। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে গড়ে তোলা এই মার্কেট তখন গিয়াস উদ্দিন দেখাশোনা করতেন। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে গিয়াসকে হটিয়ে মার্কেট দখল করেন নূর হোসেন। এমপি মার্কেট নামে পরিচিত ওই মার্কেটটি ফের দখলের পাঁয়তারা করছেন গিয়াস ও তাঁর ক্যাডাররা। তিন তলায় নূর হোসেনের অফিসটি এরই মধ্যে দখলে নিয়েছে গিয়াসের লোকজন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, এখন থেকে তাঁদের দোকান ভাড়া গিয়াসের লোকজন নেবে বলে জানিয়ে গেছে। তবে তাঁরা আতঙ্কে রয়েছেন কখন আবার নূর হোসেনের লোকজন এসে পড়ে।
এসব বিষয়ে জানার জন্য চেষ্টা করেও গিয়াস উদ্দিনকে পাওয়া যায়নি। যোগাযোগ করা হলে নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এ টি এম কামাল একটি মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে বলেন এটি গিয়াস উদ্দিনের নম্বর। সেই নম্বরে কল করে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, সাত খুনের ঘটনার পর দায়িত্ব পেয়েই শীতলক্ষ্যা তীরবর্তী বালুমহালের অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তবে কেউ যদি আবারও সেটি দখল করার চেষ্টা করে তা দমন করা হবে। বালুমহাল, ট্রাকস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন সেক্টর দখল করার বিষয়ে আবারও প্রশ্ন করা হলে জেলা প্রশাসক বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিআইডাব্লিউটিএর প্রশ্রয়ে বালুমহাল গড়ে ওঠার অভিযোগ অস্বীকার করে সংস্থার যুগ্ম পরিচালক মো. আলমগীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যখনই আমরা খবর পেয়েছি তখনই অ্যাকশন নিয়েছি। জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় কাঁচপুর ব্রিজ সংলগ্ন সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। সেখানে ইতিমধ্যে ওয়াকওয়ে তৈরি করা হয়েছে। নদীতীর যাতে কেউ দখল করতে না পারে সেদিকে নজরদারি করা হচ্ছে।’ গিয়াস উদ্দিনের লোকজন বালুমহাল দখল করছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা তাঁর জানা নেই।
এ বিষয়ে পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা এখন সাত খুনের ঘটনা তদন্তকাজে ব্যস্ত রয়েছি। বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।’
সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল মজুমদার বলেন, ট্রাকস্ট্যান্ডে সিটি করপোরেশনের একটি অফিস রয়েছে। সেটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
জানা যায়, ১৯৮৫ সাল থেকে নূর হোসেনের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ শুরু। সে সময় জাতীয় পার্টির ছত্রচ্ছায়ায় থেকে পুলিশের সহযোগিতায় প্রভাব বিস্তার করেন তিনি। কিন্তু তাঁর বাধা হয়ে দাঁড়ান তখনকার জাতীয় পার্টির নেতা গিয়াস উদ্দিন। পরে কুলিয়ে উঠতে না পেরে নূর হোসেন হাত মেলান গিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে। শুরু হয় তাঁদের একসঙ্গে চলা। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তাঁরা একসঙ্গেই নারায়ণগঞ্জের বালুমহাল, ট্রাকস্ট্যান্ড, মার্কেট দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ অবৈধ কর্মকাণ্ড চালাতে থাকেন। কিন্তু একপর্যায়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও টাকা-পয়সার ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে নূর হোসেন যোগ দেন সেই দলে। আর গিয়াস উদ্দিন যোগ দেন আওয়ামী লীগে। তখন ক্ষমতা ব্যবহার করে গিয়াস উদ্দিনের সব সাম্রাজ্য দখলে নেন নূর হোসেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ডিগবাজি দেন নূর হোসেন। ১৯৯৭ সালে যোগ দেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে। নূর হোসেনের কারণেই আওয়ামী লীগ ছেড়ে ২০০১ সালে গিয়াস উদ্দিন যোগ দেন বিএনপিতে। সেই থেকে তাঁদের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক চলে আসছে।
গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে শিমরাইল-ডেমরা সড়কের টেকপাড়া এলাকায় নূর হোসেনের বাড়ি গিয়ে দেখা গেছে, আলিশান বাড়ির প্রধান ফটক বন্ধ। খোঁজ নিয়ে জানা গেল বাড়িতে কেউ নেই।
সূত্র
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২০


৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

দেখা হবে যুদ্ধ ফুরোলে সন্ধের মাহফিলে;
দেখা হবে ঠিক চেনা রাস্তার অচেনা-অন্ত্যমিলে।
ছড়াব আবার শস্যের দানা দেশ থেকে মহাদেশে
মানুষই জেতে, খুঁজে নেয় আলো অন্ধকারের শেষে...

তোমার গল্পে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

×