somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সৌদি শ্রমবাজার ও সম্ভাবনা

১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সকাল ১০:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১৯৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ শূন্য হাতে তার যাত্রা শুরু করে।প্রায় সাড়ে সাত কোটি জনসংখ্যার দেশটি খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিত্সা অর্থাত্ বেঁচে থাকতে যে পাঁচটি মৌলিক প্রয়োজন তার সবকটি থেকেই যোজন যোজন দূরে। অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী ছিলো বাঙালি জীবনে। পরাধীনতার কবল থেকে মুক্ত হয়ে ৪৩ বছর পেরিয়ে আজ আমরা উন্নয়নের রোলমডেল। বাংলাদেশ নামক দেশটি কখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না—এমনটি ছিলো পরাশক্তিগুলোর ভাবনায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তত্কালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘বটমলেস বাসকেট’ হিসাবে মূল্যায়ন করেছিলেন। বিশ্বব্যাংকের কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতামতে উঠে আসে—বাংলাদেশ যদি উন্নতি করে তবে পৃথিবীর যেকোনো দেশের পক্ষেই উন্নয়ন সম্ভব। কিন্তু আজ বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব হয়েছে বিশ্ববুকে নিজেকে মেলে ধরবার। প্রতিটি বাঙালির মেধা ও শ্রমে বাংলাদেশ আজ ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ ঘোচাতে পেরেছে। এটাই বাংলাদেশের জবাব।

একটি দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি নির্ভর করে দক্ষ জনশক্তি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহারের ওপর। বাংলাদেশের অগ্রগতি সেখানেও উল্লেখযোগ্য, তবে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের ন্যায় বাংলাদেশে এখনো বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা। নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কিংবা বিদেশে শ্রমশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে বেকারত্ব নামক অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব। জীবনের তাগিদে মানুষ ভীড় করছে শহরে। সেখানে কাজ না পেয়ে তারা জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। তাই দিন দিন বেড়েই চলছে ছিনতাই, রাহাজানি এবং খুনের মতো ভয়াবহ অপরাধ। এছাড়াও অবৈধ পথে বিদেশ পাড়ি দিতে গিয়ে দালালদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কর্মসংস্থানের খোঁজে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরপথেও যাত্রা করছে বেকারগ্রস্ত অসহায় বহু মানুষ। গত এক বছরে বঙ্গোপসাগর দিয়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের পথে পাড়ি দিয়েছেন প্রায় ৫৩ হাজার বাংলাদেশি। অপরদিকে ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সাগরপথে পাচার হওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় এক লাখ ২০ হাজার।

বেকারত্ব ঘোচাতে সরকারকে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি শ্রমশক্তির জন্য বাজারের খোঁজ করতে হবে। সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোতে কূটনৈতিক যোগাযোগ করে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সম্প্রতি বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত হলেও শ্রমশক্তি রপ্তানিতে তেমন অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় সম্প্রতি। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি সুখবর। বিভিন্ন কারণে ২০০৮ সালে সৌদি আরব বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়া বন্ধ করে দেয়। ১৯৭৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ২৫ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬৩ জন বাংলাদেশি সৌদি আরবে গমন করে। ২০০৯ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৌদি আরব সফরের মাধ্যমে শুরু হয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। উদ্দেশ্য, বন্ধ বাজার খোলা এবং সম্পর্ক উন্নয়ন এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে সৌদি আরব সফর করেন। সরকারের দৃঢ় প্রচেষ্টায় হারানো বাজার আবারও নতুন করে ফিরে পায় বাংলাদেশ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে ১২ লাখ ৮০ হাজার বাংলাদেশি সৌদি আরবে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত রয়েছে। ২০০৮ সালে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক নিত সৌদি আরব। নিষেধাজ্ঞার পর সৌদি সরকার ২০১৩ সালের ১০ মে থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত সেখানে বসবাসরত অবৈধ বাংলাদেশিদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। একই সঙ্গে আকামা গ্রহণ ও পেশা পরিবর্তনের সুযোগ দেয়। ৭ লাখ ৯৯ হাজার ১৮৬ জন বাংলাদেশি সাধারণ ক্ষমার এই সুবিধা পান। বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি আমদানির বিষয়ে সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের উপমন্ত্রী ড. আহমেদ আল ফাহাইদ-এর নেতৃত্বে ১৭ সদস্যের সৌদি প্রতিনিধিদল তিনদিনের সফরে বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে। প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনসহ সরকারের শ্রম সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ওই বৈঠকেই বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি আমদানির বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সই হবে। একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কিভাবে জনশক্তি নেয়া যায় তার যথাযথ প্রক্রিয়া তৈরি করা হবে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রবাসী-আয়ের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন সপ্তম। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সাল থেকে গত নভেম্বর পর্যন্ত ৯০ লাখ ৯৯ হাজার বাংলাদেশি কর্মী বৈধভাবে বিদেশে গেছেন। এ সময়ে প্রবাসী-আয় এসেছে ৮ লাখ ৭৯ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশ হতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিটেন্সে এ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৩১১ কোটি ডলার। পরের ছয় মাসে এসেছে আরও ১৬০ কোটি ডলার। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এসেছে ২৬৮ কোটি ডলার। পরের ছয় মাসে এসেছে আরও ১৩৯ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে ২৩২ কোটি ডলার। পরের ছয় মাসে আরও ১১৭ কোটি ডলার। প্রায় ৮০-৯০ লাখ বা তারও বেশি বাংলাদেশি বর্তমানে অবস্থান করছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশ গমন করেছেন ৩ লাখ ৮ হাজার ৪৪৮ জন। ২০১৩ সালেও একই অবস্থা লক্ষ্য করা যায়। অথচ ২০১২ ও ২০১১ সালে বছরের নয় মাসে গড়ে বিদেশ গেছেন ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৪৪৮ ও ৪ লাখ ২৬ হাজার ৪৬ জন। ২০০৭ সালে যান ৮ লাখ ৩২ হাজার ৬০৯ জন, ২০০৮ সালে ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫ যেখানে। ২০০৯ সালে তা অর্ধেকে নেমে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৮ জন এবং ২০১০ সালে কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৯০ হাজার ৭০২ জন।

বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ কমে যাওয়ায় অবৈধ পথেই বেকার যুবকরা অজানা গন্তব্যে পা বাড়াচ্ছেন। আর এতে যেমন ঘটছে জীবনহানি তেমনি বিদেশের কারাগারে ফলে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে অনেক যুবক জীবনের মায়া ছেড়ে বিদেশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দালাল চক্রের দ্বারস্থ হচ্ছে। অসাধু চক্রটি এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাদেরকে পাচারকারীদের হাতে তুলে দিচ্ছে। ভাগ্য বদলের অন্বেষায় মাতৃভূমি ও পরিবার-পরিজনের মায়া ত্যাগ করে এসব মানুষ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন বিদেশের মাটিতে কাজের সুযোগ পেলেও অধিক সংখ্যক মানুষের জীবনই অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুঝুঁকিতে। একদিকে যেমন বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে অন্যদিকে বৈধপথে বিদেশে যাওয়ার পথও রুদ্ধ হচ্ছে। সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ার বাজার খুলে যাওয়ায় অবৈধ পথে যাত্রা কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকারের মনোযোগী হওয়া দরকার।
সুত্র

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সকাল ১০:১৮
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রংয়ের মানুষ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৫০


গ্রেট মাদ্রাজ ফ্যামিন যখন অনুপ্রেরণার উৎস
একদিন আমাদের সবার প্রিয় সংসদ সদস্য আমির হামজা ওয়াজে বেশ গরম গরম কথা বলছিলেন। মহান আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হঠাৎ রাশমিকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনন্দন নাবিহা সাকলায়েন: ৩০ বছর পরের এআই পটেনশিয়াল

লিখেছেন কলাবাগান১, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৩৮


কনসেপ্ট টা খুবই সোজা...পৃথিবীর তাবত মানুষ ই জানে যে আপনার বিশ বছর বয়সে শরীরে যে কোষ গুলি আছে তা আপনার ৬০ বছর বয়সের কোষ আর সেইম না ..লম্বা সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

লক্ষ্মীপুরের সুপারি থেকে উপকূলের অর্থনীতি: কৃষিজ সম্পদই পারে গ্রামীণ ভাগ্য বদলাতে

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮


বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে এমন কিছু নির্দিষ্ট ফল, ফসল বা মৎস্য সম্পদ প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত হয়, যা শুধু স্থানীয় চাহিদা মেটায় না, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে জোরালো প্রভাব ফেলে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

”আমার রাজনীতির রূপরেখা” -- জিয়াউর রহমান

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
আমি তখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। এটা আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম ব্রিটিশ আমলের প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। আজাদ পত্রিকাটি ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের পক্ষের একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

×