
দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার পর্যায়ের প্রথম নির্বাচন নিয়ে জনমনে কৌতুহল, সংশয় আর ভয় কম ছিল না। কৌতুহল, সংশয় আর ভয় ছিল তিনটি কারণে- এক) ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে বিএনপির ডাকা ব্যর্থ অবরোধ-হরতালের পর এবারই সমগ্র দেশব্যাপী কোনো নির্বাচনে অংশ নেয়ার (যদিও ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি অংশ নিয়ে বিএনপি নির্বাচনের দিন দুপুরের আগেই সরে দাঁড়ায়) ফলে সরকারী দল ও বিরোধী দলের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের সুযোগ। দুই) রাজনৈতিক অঙ্গনে বিবদমান দুটি দলের (যাদের মধ্যে অহি-নকুল সম্পর্ক বিরাজমান) সরাসরি অংশগ্রহণে ব্যাপক সহিংসতা, কারচুপির আশঙ্কা। তিন) সিটি নির্বাচনের মতো নিজেদের পরাজয়ের আশঙ্কা থেকে মধ্যপথে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো। কিন্তু আশঙ্কা, ভয় ও সংশয় থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। বিএনপির অভিযোগ সত্ত্বেও তারা সরে দাঁড়ায়নি। নির্বাচন সুন্দর হয়েছে, সফল হয়েছে। জনমনের কৌতুহলও নিবৃত্ত হয়েছে।
প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায় আওয়ামী লীগ শুধু জয়লাভই করেনি, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করবে এ ব্যাপারে আমি যেমন আত্মবিশ্বাসী ছিলাম, তেমনি জনগণও ছিলেন বলে ধরে নেয়া যায়। যদিও অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিএনপির দিকে পাল্লাটা ভারি করে রেখেছিলেন এই বলে যে যদি নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়। এখন তারা কী ভাবছেন জানি না। তবে বিএনপির শোচনীয় পরাজয় ও আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ে শুধু হতবাকই হইনি আশ্চর্যও হয়েছি। শুধু আমি নই, নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি সমগ্র জাতিই আমার মতো হতবাক ও আশ্চর্য হয়েছে। কেননা বিএনপির জনপ্রিয়তা যে একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে তা দলটির চরম শত্রুর পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। অথচ তা-ই হয়েছে। কোনো কোনো স্থানে দেখা গেছে বিএনপি প্রার্থীর জামানতও বাজেয়াপ্ত হয়েছে। যেমন সুনামগঞ্জ পৌরসভা এবং সিলেটের কানাইঘাটে বিএনপি প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। কিন্তু আমরা যদি একটু পেছন ফিরে তাকাই তাহলে কী দেখতে পাই? বিগত মহাজোট সরকারের সময় যতগুলো সিটি নির্বাচন হয়েছে সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, গাজীপুর সবখানেই বিএনপির প্রার্থীরা জয়লাভ করেছে। সর্বশেষ ঢাকা সিটির দুই অংশ এবং চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনেও দেখা গেছে দুপুর পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও ঢাকা উত্তরে বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুর আলম ও তাবিথ আউয়াল ভালোই করছিলেন। নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ালে হয়তো ফল ভিন্নও ঘটতে পারতো।
প্রশ্ন হচ্ছে হঠাৎ করে বিএনপির জনপ্রিয়তায় ধস নামলো কেন? সাধারণত বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক ভুল করলে বা ভুল রাজনৈতিক মতাদর্শের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠলে অথবা জনসম্পৃক্ততা হারালে একটি ব্যাপক জনসমর্থনভিত্তিক দলের এরকম পরিণতি হতে পারে। যেমন হয়েছিল মুসলিম লীগের ক্ষেত্রে। মুসলিম লীগ যে দ্বি-জাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল তা ছিল ঐতিহাসিকভাবে ও বাস্তবতার আলোকে ভুল একটি রাজনৈতিক তত্ত্ব। কেননা, হিন্দু-মুসলমান হলো একটি স¤প্রদায় বা গোষ্ঠী, কোনো জাতি নয়। ধর্মের ভিত্তিতে কোনো ধরনের জাতি-গোষ্ঠী গড়ে উঠতে পারে না। একটি জাতি-গোষ্ঠী গড়ে উঠার মূলে হলো ভাষা ও সংস্কৃতিগত মেলবন্ধন। এছাড়া মুসলিম লীগের যারা নেতৃত্বে ছিলেন তারা মূলত ছিলেন কায়েমী স্বার্থবাদী ও তথাকথিত অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধি এবং সুবিধাবাদী চরিত্রের লোক। যাদের জনসম্পৃক্ততা ছিল না বললেই চলে। যদিও ব্রিটিশ শাসনামলে মুসলিম লীগে কিছু সংখ্যক জনসম্পৃক্ত নেতৃত্বের সমাবেশ ঘটেছিল, পাকিস্তান সৃষ্টির পর শাসকগোষ্ঠীর শাসনবাদী মনোভাবের কারণে তারা মুসলিম থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিকার অর্থেই জনসম্পৃক্ত একটি দল গঠন করেন, যার নাম আওয়ামী লীগ এবং এখনো দলটি জনগণের সঙ্গেই আছে অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা পেরিয়ে এসে।
বিএনপির অবস্থাও মুসলিম লীগের মতো। পঁচাত্তরের পনেরো আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে মদদ দিয়ে, পরবর্তী সময়ে নিজে সেনাপ্রধান হওয়া এবং নানা নাটক মঞ্চায়ন, সহকর্মী এবং অধীনস্ত সেনা কর্মকর্তা-সৈনিকদের হত্যা, নানা ষড়যন্ত্র করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষ পদে আসীন হন জিয়াউর রহমান। তিনি দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হলেও ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী রূপ দেয়ার মানসে গড়ে তুলেন বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটি। যার রাজনৈতিক দর্শন হলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। যা দ্বি-জাতি তত্ত্বের মতোই অবাস্তব। দলে সমাবেশ ঘটান সব সুবিধাবাদী-ক্ষমতালোভীদের। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী-যুদ্ধাপরাধীদেরও স্থান হয় সে দলটিতে। দেশের প্রধানমন্ত্রী করা হয় প্রথম শ্রেণির রাজাকার শাহ আজিজুর রহমানকে। জিয়াউর রহমান নিজের ইমেজকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক জনসমর্থনও আদায় করতে সক্ষম হন। যার ফল এখনো দলটি ভোগ করছে। অন্যদিকে পঁচাত্তরে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের ভাঙাচোরা অবস্থা, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, দেশের কতিপয় মিডিয়া মাফিয়া ও সুশীল নাগরিকদের আওয়ামী লীগ বিরোধী প্রচারণা, ভারত বিরোধী প্রচারণা, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনযন্ত্রের সহযোগিতা, ধর্মীয় রাজনৈতিক দল বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামাতের প্রত্যক্ষ সমর্থনে একটি ভুল রাজনৈতিক দর্শনের উপর গড়ে উঠা দল বিএনপি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশ শাসনে সক্ষম হয়। আর দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার কারণে দলটি সমাজে একশ্রেণির সুবিধাভোগী গোষ্ঠীও গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। দলটির তখনকার ব্যাপক জনপ্রিয়তার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো জিয়াউর রহমানের তথাকথিত ‘ক্লিন ইমেজ’।
কিন্তু সেই ইমেজটি বেগম জিয়া বা তার পুত্র তারেক-কোকো ধরে রাখতে পারেনি। খালেদা জিয়ার দুইবারের শাসনামলে বিশেষ করে চারদলীয় সরকারের সময় তারেক রহমান পরিণত হন থিফ অব বাগদাদে। গড়ে তোলেন সম্পদের পাহাড়। পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার ও শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানানোর ফলে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। দেখা দেয় ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রবণতা। শুরু হয় ষড়যন্ত্র আবারো ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার। যার ফলশ্রæতি ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ২০০৮ সালের নির্বাচন ও বিএনপি-জামাত জোটের শোচনীয় পরাজয়। তারেক-কোকো মুচলেকা দিয়ে দেশ থেকে বিতাড়িত হন।
এরপর থেকে আর দলটি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ক্ষমতা হারানোর জ্বালা, মামলা-মোকদ্দমা থেকে বেগম জিয়া নিজে ও তার পুত্রকে রক্ষা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য খালেদা জিয়া একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন। জনগণের উপর আস্থা হারিয়ে খালেদা জিয়া সন্ত্রাসের পথ বেঁচে নেন। আর তিনি যতই সন্ত্রাস নির্ভর রাজনীতিতে ঝুঁকেন ততই তার জামায়াত নির্ভরতাও বাড়তে থাকে। ফলে দলটি হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন। আর জনগণের প্রতি আস্থাহীনতাই খালেদা জিয়াকে ১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনে বাধ্য করে। তিনি বেছে নেন জ্বালাও-পোড়াও, মানুষ খুনের পথ। কোন ধরনের সাংগঠনিক প্রস্তুতি ছাড়াই ডাক দিয়ে বসেন অনির্দিষ্টকালের অবরোধের। তিনি বেছে নেয় স্বেচ্ছা অবরোধবাসিনীর বেশ আর তার সাঙ্গাতরা লাদেন স্টাইলে জারি করতে থাকে মানুষ খুনের ফরমান। পেট্রল বোমায় শত শত মানুষ হত্যা করেও যখন অবরোধ সফল করা যায়নি তখন কোনো ধরনের ঘোষণা ছাড়াই অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই দেশে তো অবরোধের কোনো প্রভাবই পড়েনি। তিনি মনে করেছিলেন যদি কোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা যায় তাহলে সেনাবাহিনী এবং বিদেশী কোনো শক্তি দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতার পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে অথবা তিনি ডাক দিলেই দেশের মানুষ হুড় হুড় করে রাস্তায় নেমে আসবে। কিন্তু বাস্তবতা যে ভিন্ন তা তিনি এবং তার পুত্রের বুঝতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইতোমধ্যেই তিনি এবং তার পুত্রের কপালে জনগণ তাদের ভাগ্যলিপি লিখে দিয়েছে। স¤প্রতি সমাপ্ত পৌর নির্বাচন তার প্রমাণ।
খালেদা জিয়া যদি জ্বালা-পোড়াও, মানুষ খুনের রাজনীতির দিকে না গিয়ে জনগণের উপর আস্থা রেখে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিতেন এবং যুদ্ধাপরাধী দল জামাত ও যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় ব্রতী না হতেন, তাহলে ক্ষমতায় ফিরে না আসার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও অন্ততপক্ষে সংসদে বিরোধীদলের আসনে বসতে পারতেন এবং পরবর্তী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারতেন। তাও যদি না হতো অন্ততপক্ষে দলটিকে অস্তিত্ব সংকটে পড়তো হতো না। পৌর নির্বাচনে বিএনপির যে দৈন্যদশা ফুটে উঠেছে তাতে দলটি আদৌ টিকে থাকতে পারবে কিনা তা-ই প্রশ্ন সাপেক্ষ। আর দলটির আজকের পরিণতির জন্য বেগম জিয়া ও তার পুত্রের ভুল রাজনীতিই মূলত দায়ী। ম্যাডামকে ভুলের মাশুল দিতেই হলো। অবশ্য ভুল রাজনৈতিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা বিএনপি নামক দলটির মুসলিম লীগের পরিণতি বরণ করাই রাজনৈতিক বাস্তবতা। হতে পারে তা দুদিন আগে কিংবা পরে।
সূত্র
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জানুয়ারি, ২০১৬ ভোর ৬:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


