
গত সপ্তাহে মাহফুজ আনাম একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টক-শোতে স্বীকার করেন যে, ২০০৭ সালে ১/১১-র সময় তিনি তাঁর পত্রিকায় ডিজিএফআই-এর (প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা) পাঠানো কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যা তথ্য নির্ভর ছিল না৷ প্রশ্নের মুখে আনাম এ কথাও স্বীকার করেন যে, তার মধ্যে ‘শেখ হাসিনার দুর্নীতি' সংক্রান্ত প্রতিবেদনও ছিল৷ তিনি বলেন, ‘‘ঐ প্রতিবেদন প্রকাশ ছিল আমার সাংবাদিকতা জীবনের বড় ভুল৷ আমি আমার সম্পাদকীয় নীতির এই ভুল স্বীকার করছি৷"
প্রথমে তিনি সম্পাদক হিসেবে নিজের এই ভুল স্বীকার করতে চাননি। পরে এক সাংবাদিক যখন ডেইলি স্টার থেকেই এই ধরনের অসত্য খবর প্রচারের উদাহরণ তুলে ধরেন, তখন মাহফুজ আনাম ভুল স্বীকার করেন। ডেইলি স্টারের খবরে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। খবরটি সরবরাহ করেছিল সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা। এই খবরের কোন সত্যতা ছিল না। কিন্তু তা যাচাই না করেই পত্রিকাটিতে ঢালাওভাবে প্রকাশ করা হয়।
তখনই অভিযোগ উঠেছিল ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলো পত্রিকা দুটি দেশে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের শাসনের অবসান ঘটিয়ে অসাংবিধানিক ও অনির্বাচিত সরকার দ্বারা দেশ পরিচালনার লক্ষ্যে ক্যাম্পেনের অংশ হিসেবে হাসিনাবিরোধী প্রচারণা শুরু করেছিল এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও তাদের মাইনাস টু ফর্মুলাতেও সমর্থন জানিয়েছিল। অনেক পর্যবেক্ষকের অভিযোগ, পত্রিকা দুটির এই ভূমিকা দেশে গণতান্ত্রিক শাসনের সম্ভাবনা দূর করে সেনাশাসন দীর্ঘায়িত করার কাজে সাহায্য যোগাতে চেয়েছে।
এটা শুধু সাংবাদিকতার নীতিমালা ভঙ্গ করা নয়, একটা অপরাধও। রাজনীতিকদের ঢালাওভাবে দুর্নীতিবাজ সাজিয়ে দেশের বিগ বিজনেস ও বিদেশী অর্থ পুষ্ট বিগ এনজিওর সমর্থিত কিছু এলিট ক্লাসের মানুষকে গুড গভর্নেন্সের ধারক বাহক হিসেবে তুলে ধরে অনির্বাচিত ও অগণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার এই চেষ্টা আর যাই হোক দেশপ্রেমের পরিচায়ক নয়।
তার ভাষায়ঃ
“এটা আমার সাংবাদিকতার জীবনে, সম্পাদক হিসেবে ভুল, এটা একটা বিরাট ভুল। সেটা আমি স্বীকার করে নিচ্ছি।”
অনেকে এ নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে নানা তর্কে জরিয়েছেন। সবাই যার যার অবস্থান থেকে মাহফুজ আনাম দোষী না নির্দোষ সে প্রমানে ব্যস্ত। প্রকারন্তরে মাহফুজ আনাম ভাল মানুষ না খারাপ মানুষ তা বিচারে নেমেছেন সকলে। কিন্তু মুল কথায় কেউ আসছেন না।
মুল কথা কিন্তু ২ টিঃ
১। জেনেশুনে মিথা খবর ছেপেছেন
২। ভুল স্বীকার করেছেন
জেনেশুনে মিথা খবর ছেপেছেনঃ
সজীব ওয়াজেদ জয় স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘মাহফুজ আনাম, দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক, স্বীকার করেছেন যে, তিনি আমার মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অপবাদ আরোপ করতেই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা দুর্নীতির গল্প ছাপিয়েছিলেন। তিনি সামরিক স্বৈরশাসনের সমর্থনে আমার মাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে এই কাজ করেছিলেন।’ ‘একটি প্রধান সংবাদপত্রের সম্পাদক সামরিক বিদ্রোহে উস্কানি দিতে যে মিথ্যা সাজানো প্রচারণা চালায় তা রাষ্ট্রদ্রোহিতা।’
কথাটি বিশ্লেষণ করে দেখলে ৩টি অপরাধ উনি করেছেনঃ
১- জেনেশুনে মিথ্যা দুর্নীতির গল্প ছেপে সংবাদ প্রকাশের নিতিমালা ভেঙ্গেছেন
২- মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে উনি মানহানি করেছেন, যা শাস্তি যোগ্য অপরাধ
৩- একজন রাজনীতিবিদকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার লক্ষে সামরিক বিদ্রোহে উস্কানি দিতে মিথ্যা সাজানো প্রচারণা চালান তা রাষ্ট্রদ্রোহিতা।
ভুল স্বীকার করেছেনঃ
একটি বিদেশি অনলাইন লিখেছে ‘মাহফুজ আনাম ভুল স্বীকার করে কোনো অন্যায় করেননি'
যদি ধরেই নেই ‘মাহফুজ আনাম ভুল স্বীকার করে কোনো অন্যায় করেননি'। তবে মাহফুজ আনাম ভুল করে অপরাধ করেছেন।
অপরাধের শাস্তি বিধান আইনের শাসনেরই নামান্তর।
মিডিয়া কি তবে আইনের উর্ধে? না আইন ভাঙ্গার দৃষ্টান্ত স্থাপনে ব্যস্ত?
ক্ষমা প্রার্থনা নয় শুধু অপরাধ শিকারেই সাত খুন মাপ?
প্রেসিডেন্টের ‘পদত্যাগের’ খবর প্রকাশ করে বিপাকে ৪ চীনা সাংবাদিক তাহলে ওনার কি সেই বোধ নেই?
বিবিসির প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে নানা কেলেঙ্কারিতে! তবে কি ডেইলি স্টারের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়নি? মানুষের সরল বিশ্বাস ভাঙার দায় মাহফুজ আনামের নয়?
নিজ অপরাধের দায় নিয়ে বিবিসির নিউজনাইট অনুষ্ঠানে যুক্তরাজ্যের টোরি দলের সাবেক নেতা লর্ড ম্যাকআলপাইনকে শিশু যৌন হয়রানির ঘটনায় ভুল করে অভিযুক্ত করার পরিপ্রেক্ষিতে বিবিসি প্রধান এনটুইসল পদত্যাগ করেন।
জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত ভিন্নধারার একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর সমালোচনার মুখে পদত্যাগ করেছিলেন ব্রিটেনভিত্তিক সাময়িকী 'রিমোট সেন্সিংয়ের' প্রধান সম্পাদক।
সূত্রবিহীন খবর যাচাই না করে প্রকাশকে ‘বিরাট ভুল’ হিসেবে স্বীকার করে নিয়ে তিনি বলেন, তখন এই খবর প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই তাদের সরবরাহ করেছিল।
খুজলে এরকম আরও নজির পাওয়া যাবে। কিন্তু মাহফুজ আনামের ঘটনাটির মত নির্লজ্যতার নজির খুজে পাইনি।
২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনেও স্টার-আলো মিডিয়া গোষ্ঠীর একই ভূমিকা ছিল। তবে আরও একটু প্রচ্ছন্নভাবে। ২০০১ সালের নির্বাচনের সময়ে তাদের ভূমিকাটি দেশের মানুষের কাছে ধরা পড়ে গিয়েছিল। ফলে তারা সতর্ক হয়েছেন। তাছাড়া সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার কাজে প্রচ্ছন্ন সমর্থন দান এবং সেই সরকারের মাইনাস টু ফর্মুলায় নীরব সম্মতিদানের ভূমিকা ধরা পড়ে যাওয়ায় ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় দুটি পত্রিকাকেই সতর্ক হতে হয়েছিল। কিন্তু গোঁফ দেখে যেমন শিকারি বিড়াল চেনা যায়, তেমনি ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময়েও ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর প্রচারণার ধারা দেখে অনেকেরই বুঝতে বাকি থাকেনি, এই মিডিয়া গ্রুপের আসল লক্ষ্যটা কি?
এই লক্ষ্যটা ছিল দুর্নীতি, অযোগ্যতা, গুড গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠায় অক্ষমতাÑ ইত্যাদি অভিযোগ রাজনীতিক ও রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে তুলে (সামরিক শাসকেরা রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগটি ক্ষমতা দখলের জন্য ব্যবহার করেন) দেশে নব্য ধনী ও বিগ বিজনেসের (পেছনে বিশ্বধনবাদের পৃষ্ঠপোষকতা) অনুগ্রহপুষ্ট একটি অনির্বাচিত অরাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠা। এই সরকার প্রতিষ্ঠার কাজে বিএনপির চাইতেও আওয়ামী লীগ ও হাসিনা নেতৃত্ব বড় বাধা। কারণ, আওয়ামী লীগের একটি গণতান্ত্রিক চরিত্র এবং হাসিনা নেতৃত্বের একটা গণসমর্থনের শক্ত ভিত্তি রয়েছে। তাই কায়েমী স্বার্থের প্রতিনিধি হিসেবে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর মুখ্য ভূমিকা ছিল (এবং এখনও আছে) নিরপেক্ষতার আড়ালে প্রচ্ছন্ন প্রচার অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার জনসমর্থনের ভিত্তিটাকে ধ্বংস করে ফেলা।
ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো যে বিগ বিজনেস এবং বিগ এনজিওর স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে তার প্রমাণ খোঁজার জন্য বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই। মাহফুজ আনামের ভুল স্বীকার সংক্রান্ত খবরেই বলা হয়েছে এই মিডিয়া গ্রুপের পরিচালক ট্রান্সকম গ্রুপের লতিফুর রহমান একজন বড় শিল্পপতি (আবার বিএনপির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন)। সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই (২০০৭) দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের তালিকায় তার নাম দেখা গিয়েছিল।
ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো পত্রিকায় হাসিনা ফোবিয়া সকল সীমা অতিক্রম করে যখন তারা গ্রামীণ ব্যাংককে অব্যবস্থাপনা দূর করার জন্য সরকারী উদ্যোগের বিরুদ্ধে ড. ইউনূসের দেশের স্বার্থবিরোধী ভূমিকাকে অন্ধ সমর্থন দিতে শুরু করে। বিদেশী হস্তক্ষেপ ডেকে এনে ড. ইউনূস তার নোবেল প্রাপ্তির প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে যেভাবে হাসিনা সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন, তা জানা থাকা সত্ত্বেও এই পত্রিকা দুটি ড. ইউনূসের প্রতি যে পক্ষপাত দেখায় এবং প্রকারান্তরে ইউনূস সেন্টারের মুখপত্রে পরিণত হয় তা সৎ সাংবাদিকতার কোন নীতিমালা দ্বারা ব্যাখ্যা করা যাবে না।
মাহফুজ আনাম ২০০৭ সালে (শেখ হাসিনা গ্রেফতার হওয়ার কিছু পর) তার লেখা একটি সম্পাদকীয়ের পুনর্মুদ্রণ দ্বারা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন তিনি হাসিনা বিরোধী অথবা বিদ্বেষী নন। কিন্তু আমি তার দশটা সম্পাদকীয় তুলে ধরে দেখাতে পারি, তার সাংবাদিকতা কতটা পক্ষপাতদুষ্ট এবং আওয়ামী লীগ ও হাসিনা বিরোধিতার মানসিকতা দ্বারা প্রভাবিত। তা না হলে তার মতো আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অভিজ্ঞ এক সাংবাদিকের পক্ষে পর পর দুই বছর জিয়াউর রহমানের মতো এক ক্ষমতালোভী জেনারেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে দীর্ঘ সম্পাদকীয় লিখে এ কথা প্রমাণ করার চেষ্টা করা সম্ভব হতো না যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে গণতন্ত্র ধ্বংস করেছেন এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করেছেন। তারপর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে দ্বিদলীয় গণতন্ত্র পুনর্প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছেন। ১৭শ’ মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসার ও জওয়ান (কর্নেল তাহেরসহ) হত্যাকারী জিয়াউর রহমানকে তিনি এই বলে প্রশংসা করেছেন যে, জিয়াউর রহমান আর্মিতে ভেঙ্গে পড়া চেইন অব কমান্ড পুনর্প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
নব্বইয়ের দশকে সাংবাদিক এস এম আলীর উদ্যোগে প্রকাশিত হয় ডেইলি স্টার। মিডিয়া ওয়ার্ল্ড কোম্পানি গঠন করে এই দৈনিকটি প্রকাশে তার সঙ্গে বিনিয়োগ করেন লতিফুর রহমান ও আব্দুর রউফ চৌধুরী।
লতিফুর রহমান ট্রান্সকম গ্রুপ এবং রউফ চৌধুরী র্যাংগস গ্রুপের কর্ণধার। সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকারের সময়ে করা ‘দুর্নীতিবাজের’ তালিকায় লতিফুর রহমানের নামও এসেছিল।
অবশ্য মাহফুজ আনাম বৃহস্পতিবার টেলিফোন করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন,
সামরিক বাহিনী ‘ভুল হয়েছে’ জানিয়ে পরে চিঠি দিয়ে লতিফুর রহমানের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়েছিল। তাহলে স্বার্থই ঐ অপরাধের মুল কারণ?
মাহফুজ আনামঃ মিডিয়া রেস্পন্সিবিলিটির ঊর্ধ্বে না নিচে?
আত্মস্বীকৃত এই তিন অপরাধের শাস্তি কি উনি পাবেন না?
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সকাল ১০:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


