
জঙ্গি উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়েছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটির একশ্রেণির শিক্ষক, কয়েকজন পরিচালক ও কর্মকর্তার মদদে শিক্ষার্থীরা উগ্রপন্থার দিকে ঝুঁকছে। অভিযোগ রয়েছে- বিপথগামী ওইসব শিক্ষক, পরিচালক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ কিংবা সরকারি প্রশাসন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় উগ্রপন্থার চর্চা সেখানে দিন দিন বাড়ছে। ধর্মের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে জঙ্গিবাদকে উসকে দেয়ার অভিযোগ থাকার পরও প্রশাসন নির্বিকার রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে। তবে গুলশানের খাবার দোকানে এবং কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ঈদের নামাজে জঙ্গি হামলার পর নড়েচড়ে বসেছে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়টির কর্মকাণ্ড নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হওয়ায় গতকাল রোববার এক বৈঠকে এক সেমিস্টার ক্লাসে অনুপস্থিতির দায়ে ছাত্রত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উগ্রবাদী আচরণের নিদর্শন নতুন নয়। কাজী মোহাম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নাফিস নামে যে ছেলেটি গত বছরের নভেম্বর মাসে নিউইয়র্কে বোমা হামলা করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল, সেই ছেলেটিও বাংলাদেশে থাকাকালে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হানার সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
গত ১ জুলাই রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান ক্যাফেতে হামলায় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নিবরাস ইসলাম নিহত হওয়া ও হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে চাকরিচ্যুত হাসনাত করিম সেখান থেকে মুক্ত হয়ে আসার পর ফের আলোচনায় আসে বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম। এর পর পরই কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় বৃহত্তম ঈদের জামাতে হামলাকারী আবির আহমেদ নর্থ সাউথের শিক্ষার্থী এ তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়টিতে কীভাবে কারখানা হলো জঙ্গিগোষ্ঠীর, সে প্রশ্নটিও আবারো সামনে চলে এসেছে।
এর আগে ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মিরপুরে ব্লুগার রাজীব হায়দার শোভনকে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনায় পুলিশ নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফয়সাল বিন নাঈম ও রেজওয়ানুল হককে গ্রেপ্তার করে এবং পরবর্তী সময়ে তারা হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও সরাসরি অংশ নেয়ার কথা স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন।
২০১০ সাল থেকেই কোনো না কোনোভাবে জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির নাম জড়িয়েছে। কিন্তু কোনোবারই ইউনিভার্সিটি কর্র্তৃপক্ষ দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি গুলশান ও শোলাকিয়া কাণ্ডের পরও ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ মুখ খোলেনি। এরকম পরিস্থিতিতে নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি গতকাল রোববার একটি বৈঠক করেছে। পরে বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো সংবাদমাধ্যমে পাঠায়। এতে বলা হয়েছে,
কোনো ছাত্রছাত্রী এক সেমিস্টারও অনুপস্থিত থাকতে পারবে না। তাদের নিয়মিত হতে হবে।
নানা কারণে সমালোচিত ও আলোচিত নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির গ্রন্থাগারে জঙ্গিবাদী বই, জমি কেনায় অনিয়ম, ভর্তি বাণিজ্য, সাধারণ তহবিল থেকে ট্রাস্টিদের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ ও বিদেশ ভ্রমণ, ট্রাস্টি বোর্ডের কয়েক সদস্যের স্বেচ্ছাচারিতা ও আদালতে এ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা এবং ট্রাস্টি বোর্ড সদস্যদের মধ্যে বিরোধসহ নানা বিষয়ে তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সত্যতা পেলেও, শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত এক বছরেও এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। গত বছরের ১৩ আগস্ট এ তদন্ত প্রতিবেদনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠায় ইউজিসি। এর পর থেকেই এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফাইলবন্দি হয়ে রয়েছে।
জানতে চাইলে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান ভোরের কাগজকে বলেন, মঞ্জুরি কমিশন চাইলেই সব ব্যবস্থা নিতে পারে না। এর ক্ষমতা অত্যন্ত কম। জঙ্গিবাদের বিষয়টি নিয়ে নর্থসাউথের নাম ফের সামনে চলে আসায় কী করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্যবস্থা তো নিতে হবে। এ জন্য আমরা কিছু পয়েন্ট বের করব। এর পরে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে বাকি পথ খোঁজা হবে।
ইউজিসির তদন্ত প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ার কারণ জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে বলেন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বার্থান্বেষী, কুচক্রী মহল শান্তির ধর্ম ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করার ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। ছাত্র-শিক্ষক,অভিভাবকসহ সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের লেবাসধারী, রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিহত করতে হবে।
আর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। গতকাল সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংগঠনের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার বর্ধিত সভায় মোহাম্মদ নাসিম এ কথা জানান। নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কী শিক্ষা দেয়া হচ্ছে এমন প্রশ্ন করে সন্তানরা কী করছে সে বিষয়ে অভিভাবকদের খেয়াল রাখার পরামর্শ দেন।
গোয়েন্দা তথ্যমতে, ১৯৯২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে হিযবুত তাহরীরের বীজ ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এরই রেশ ধরে ২০১২ সালে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উত্থাপিত হলে, হাসনাত করিমকে অব্যাহতি দেয়া হয়। হাসনাত নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির বিবিএর শিক্ষক ছিলেন। শুরুর সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা ভিসি ছিলেন বিএনপি মতাদর্শী অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল আহাদ। উদ্যোক্তা হিসেবে আরো ছিলেন শায়েস্তা আহমদ, ব্যবসায়ী নুরুল এইচ খান, মাহবুব হোসেন ও জামায়াতের নীতিনির্ধারক সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নান। তখনো বিশ্ববিদ্যালয়টির নেতৃত্বে ছিল ডানপন্থীরা। এখনো ডানপন্থীরা।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রপন্থী দল হিযবুত তাহরীরের আস্তানায় পরিণত হয়েছে নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি। সংগঠনটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি সক্রিয় থাকা দেশের একমাত্র বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে এটি। একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের নানাভাবে দীনের দাওয়াত দেয়া হয়। বড় ভাইদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয় এবং এটা একেবারেই অজানা কিছু নয় তাদের কাছে। এর পেছনে শক্তি হিসেবে কাজ করছেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন শিক্ষক-পরিচালনা পরিষদের কর্মকর্তা। বাইরে থেকে একটা ‘সুবেশিত এবং আধুনিক’ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেজ তৈরি হলেও, দিনের পর দিন জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ট্রাস্টি বোর্ডের কয়েকজন সদস্য ও শিক্ষককের প্রত্যক্ষ মদদে উগ্র মৌলবাদীদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পাঠচক্রের আড়ালে নিয়মিতভাবে হয় শিবির ও হিযবুত তাহরীরের ‘ঐক্যবদ্ধ বৈঠক’। এর পেছনে শক্তি হিসেবে কাজ করছেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন শিক্ষক-পরিচালনা পরিষদ কর্মকর্তা।
সম্প্রতি সচলায়তন ব্লুগে নিয়াজ মোর্শেদ চৌধুরী ‘নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি’ শিরোনামের একটি লেখা লিখেছেন, যেখানে তিনি নিজের স্ত্রীর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়কার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘মেয়েদের নামাজের ঘরে নিয়মিত বোরকায় আবৃত এক বা একাধিক মেয়ে গোল হয়ে বসে অন্যান্য সাধারণ মেয়ে যারা নামাজ পড়তে আসে তাদের নিয়ে আলোচনা সভা করে। আপাতদৃষ্টিতে এ ধরনের সভা করা খারাপ কিছু না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই সভাগুলো একটা সময় সাধারণ ছাত্রীদের ব্রেইন ওয়াশের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। আমার স্ত্রী প্রথমে কৌত‚হলবশত এবং পরে তাদের আলোচনার ধরন ও প্রকৃতি বোঝার জন্য নামাজের ঘরে নিয়মিত গিয়ে তাদের সঙ্গে মিশে শোনার চেষ্টা করত তারা কী বলছে। খুব দ্রুতই সে লক্ষ করে ওই নির্দিষ্ট মেয়েদের বক্তব্য এবং দাওয়াত দেয়ার ধরন জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। ওই মেয়েগুলো সাধারণ ছাত্রীদের সঙ্গে প্রথমে মিষ্টি ভাষায় কথা শুরু করলেও, ধীরে ধীরে তাদের উগ্র মতবাদ চাপিয়ে দিতে শুরু করে। আমার স্ত্রীর মুখে শুনেছি, মানুষকে কনভিন্স করার ভয়াবহ ক্ষমতা রয়েছে এ মেয়েগুলোর মাঝে। তাদের ধৈর্য অপরিসীম। এভাবে দিনের পর দিন ব্রেইনওয়াশের ফলে তারা এক সময় ঠিকই তাদের দল ভারি করতে সক্ষম হচ্ছে। সব কথা উন্মুক্ত ব্লুগে লেখা সম্ভব না। শুধু এতটুকু বলব, আমার স্ত্রীর কিছু বান্ধবী যারা এক সময় আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতোই উচ্ছল ছিল, আজ এদের সঙ্গে মিশে পুরোপুরি বদলে গেছে। ফেসবুক থেকে তারা নিয়মিত ছড়াচ্ছে ঘৃণা আর উগ্রবাদ’।
সূত্র

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

