আজ যাত্রার পঞ্চম দিন ৷ তেইশ ঘণ্টা যাত্রা শেষে উত্তর প্রদেশে আছি ৷ পশ্চিম বঙ্গের পর বিহার, এর পর ইউপি ৷ বিহার খুব বড় প্রদেশ আর ইউপি তো সবথেকেই বড় প্রদেশ ৷ আমাদের ট্রেন এখন তিন ঘণ্টা দেরিতে আছে ৷ এখন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি ইতাওয়া ৷ এটা মুলায়ম সিং যাদবের জায়গা ৷ ভারতের রাজনীতিতে খুব বড় নেতা না হলেও ভোটের রাজনীতিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ৷ সে কথা লিখতে অবশ্য বসিনি ৷
এই ভ্রমণে প্রচুর মানুষ দেখলাম ৷ বিহার আর ইউপির মানুষরা পশ্চিম বঙ্গের লোকদের চেয়ে কম শিক্ষিত, এর কারণে এদের আচারও ততটা মার্জিত নয় ৷ বাঙালিরা ভদ্র, বিহারি বা ইউপিরা ততটা নয় ৷ সবাই এক নয় অবশ্য ৷ যেমন এক প্রেম তিওয়ারি, বিহারি, থাকে রাজস্থান, পড়ছে ৷ ছোটবেলা থেকেই কলকাতায় পড়ালেখা করেছে ৷ বাবা কলকাতায় ট্যাক্সি চালায় ৷ ছেলেটা মোদির ভক্ত, মোটামুটি ভক্তির পর্যায়ে গেছে ব্যাপারটা ৷ ক্রিকেট দেখে, সিএসকে আর ধোনির ফ্যান ৷ ভাল লাগল যে সাকিবকে নিজে থেকেই সেরা অলরাউন্ডার মেনে নিল ৷ ভাল ছেলে, স্বপ্ন দেখে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে অনেক টাকা কামাবে ৷ স্বপ্ন সবারই আমাদের এক ৷ মেনে নিতে কয়জন পারে? এদিক থেকে ও কিন্তু সৎ ৷
আরেকজন লোক সাদিক খান ৷ আমাদের সাথে হাওড়া থেকে উঠেছে ৷ শুধু মাউন্টেন ডিউ কিনে খায়, অন্য কোন খাবার বোধহয় পছন্দ নয় ৷ লোকটা ইউপির, শিক্ষিত কিনা বোঝা গেল না, তবে ভদ্র ৷ আমাদের সাথে মিলেমিশে গল্প করছে ৷ হিন্দি পড়তে পারিনা, তাই পত্রিকা মাঝে মাঝে অনুবাদ করে শোনাচ্ছে ৷ ওখান থেকেই জানলাম ইসরায়েলি এক প্রধানমন্ত্রী ঘুষের দায়ে অভিযুক্ত, ধরা পড়েছে বোধহয় ৷ চাকরি করে বিএসএফে ৷ আগে বাংলা সীমান্তে ছিল ৷ এখন যাচ্ছে পাঞ্জাব সীমান্তে ৷ বড্ড ভাল লোক ৷ সবার সাথে মিশে যান অবলীলায় ৷ আমাকে বলল দিল্লী আর ওদের দেশকে এনজয় করতে ৷ উনি কোন পলিটিকাল পার্টি এনটারটেইন করেন বোঝা মুশকিল ৷ তবে মোদির খবরই বেশি পড়ছেন ৷
ট্রেনে আমাদের অন্যদিক এক বাঙালি দম্পতি আছেন ৷ দিল্লীতে ৩০ বছর ধরে থাকেন, এখন আর বাংলা নিজেদের মধ্যেও বলে না, হিন্দিই চলছে ৷ বিচিত্র দেশ ! মাতৃভাষা ভুলে যায় মানুষ ৷ বিহারের বেশির ভাগ মাটি পাথর মতন ৷ নদীগুলোতে কোনটাতেই এক ফোটা পানি নেই, একেবারে কাঠ হয়ে আছে ৷ বাধ দেয়ার বাজে প্রভাব শুধু বাংলাদেশেই পড়েনি ! ফসলি জমিগুলোতে আগুন ধরিয়ে রেখেছে ৷ কারণটা জানিনা, তবে কৃষি সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জানি না বলে বুঝতে পারলাম না ৷ বিহারের কোন বাড়িই আমি পুরো দেখিনি, সব বাড়িই অর্ধেক তৈরি ! আগে হয়ে থেমে গেছে, না এখন হচ্ছে বোঝার উপায় নেই ৷ তাই অর্থনীতির ব্যাপারটা বুঝলাম না ৷
কেন যেন সবাই মোদি নিয়েই কথা বলছে ৷ দল হিসেবে বিজেপির নাম নেই কিন্তু ৷ গুজরাট আর মোদি মোদি বলে দলটা বোধহয় জিতেই গেল ৷ প্রচার আর প্রসার সত্যি একসাথে যায় ৷ আর অর্থনৈতিক মুক্তির আশায় মানুষ যে কাউকে ভোট দিবে ৷ মানুষের রক্তে রঞ্জিত হাতকেও ! অসাম্প্রদায়িকদের ব্যর্থতা আর চুরি এদের পথ প্রশস্ত করে দেয় ৷ শুধু আদর্শ দিয়ে পেট ভরে না ! মোদিরা খেতে দিয়ে সব করার লাইসেন্স পেয়ে যায় ! এতক্ষণ ধরে ট্রেনে জার্নি আর ভাল লাগছে না ৷ আশেপাশের লোকজন বোধহয় এসবে অভ্যস্তই ৷ বিকার নেই কোনও ৷ ট্রেনের খাবার খেতে খেতে আর ভাল লাগছে না ৷ কবে যে দিল্লি পৌছুব? "দিল্লি আব দূর নেহি" কথাটা মিথ্যে লাগছে !
ইতাওয়া স্টেশন,
উত্তর প্রদেশ
সকাল ১০ টা বেজে ২৫ মিনিট
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মে, ২০১৪ বিকাল ৪:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



